অন কনসোলেশন টু হেলভিয়া: মায়ের কাছে সেনেকার চিঠি

Reading Time: 4 minutes

অন কনসোলেশন টু হেলভিয়া[1] মায়ের কাছে পাঠানো সেনেকার (খ্রি.পূর্ব. ৪-৬৫ খ্রি.) একটি অসাধারণ চিঠি।  এখানে অসীম দুঃখের ও বিসর্জনের সামনে দাঁড়িয়ে মাকে স্বান্তনা দিয়েছেন সেনেকা। তিনি এ সময়টাতে এটা লিখেন যখন তাকে রোম থেকে কর্সিকা দ্বীপে নির্বাসন দেয়া হয়। তার বিরুদ্ধে ৪১ খ্রিস্টাব্দে অভিযোগ তোলা হয় তিনি তত্কালীন রোমান সম্রাট কালিগুলার বোনে জুলিয়া লিভিল্লার সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক বা পরকীয়া করছেন। কর্সিকা যাওয়ার পথে ৪২ খ্রিস্টাব্দে এ চিঠি লিখেন রোমান এ দার্শনিক। ছোট্ট এ পুস্তিকাটিকে অনেকে ২০ টি অনুচ্ছেদে ভাগ করে থাকেন।  

চিঠির শুরুতে মায়ের অসীম দুঃখকে না ঢেকে তা থেকে পর্দা সরিয়েছেন। এক্ষেত্রে তার যুক্তি হচ্ছে দুঃখ-শোক চাপিয়ে রাখার মধ্যে শান্তি নেই। এটাকে নদীর স্রোতের মতো ছেড়ে দিতে হবে। সেনেকা মাকে বলছেন-আমি তোমার হৃদয়ের ক্ষতে প্রলেপ দিব বলে আহত স্থানে তোমার দৃষ্টি আকর্ষন করছি। তোমার ক্ষত সাড়বো বলে তাতে সেলাই মেশিন চালাচ্ছি। তিনি তার মায়ের চোখের পানি মুছে দেবেন না কারণ এটা দুঃখের ভার আরও বাড়িয়ে দেবে। এক্ষেত্রে সেনেকার যুক্তি হচ্ছে কারো তাজা দুঃখে সঙ্গে সঙ্গে মলম দিতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। কোন শারীরিক অসুস্থতার ক্ষেত্রে অসময়ে ওষুধ প্রয়োগ করলে তা আরও ক্ষতিকর ঠেকে। এ যুক্তি প্রদর্শনের পর একে একে মায়ের সবগুলো দুঃখ/শোকের ঘটনা তার চোখের সামনে উপস্থাপন করেন। সেনেকা রোম থেকে নির্বাসিত হচ্ছে শুধু সেটাই হেলভিয়ার বড় দুঃখ নয়। বরং জন্মের পর থেকে যে একের পর এক দুঃখ-শোকের মধ্য দিয়ে গিয়েছেন সন্তান সেনেকা তা মায়ের সামনে ঠেলে দেন।

জন্মের পর থেকেই মায়ের দুঃখের যে সীমা নেই সে বিষয়ে বলেন, ভারি ভারি দুঃখ থেকে বিধাতা কখনো তোমাকে অব্যাহতি দেননি। এমনকি তোমার জন্ম কিংবা তারও আগে থেকেই তোমাকে গভীর দুঃখের মালায় আবদ্ধ করার ষড়যন্ত্র করছিলেন যেন তিনি। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই তুমি তোমার মাকে হারাও। সত্ মায়ের ঘরে তুমি বড় হয়েছো। সম্পূর্ণ আনুগত্য ও শ্রদ্ধার মাধ্যমে তাকে প্রকৃত মা হয়ে উঠতে সহায়তা করেছো। তবে প্রত্যেক শিশুকেই সত্ মায়ের জন্য অনেক মূল্য চুকাতে হয় সে যত ভালো মা-ই হউক না কেন। তোমার সবচেয়ে প্রিয় চাচা; অসাধারণ ও সাহসী যে মানুষটির আগমনের পথ চেয়ে বসে ছিলে তাকে হারালে। বিধাতা যেন তার নির্মমতার ভাণ্ডার শুকিয়ে না ফেলে সেজন্য তার এক মাসের মধ্যেই তুমি তোমার স্বামীকে হারালে-যে ছিল তোমার তিন সন্তানের বাবা। তুমি যখন একটি মৃত্যুর শোক করছিলে তখন আরেকটি শোক সংবাদ চলে আসে। এমন সময়ে সে সংবাদ আসে যখন তোমার কাছে তিন সন্তানের কেউই ছিল না। অল্প সময়ের ব্যবধানে তোমাকে দুঃখে দুঃখে ভরিয়ে দিতে তারা আসলো যেন তুমি কোন অবকাশ না পাও। তারা বিরতিহীনভাবে তোমাকে দুঃখের কামান নিক্ষেপ করতে থাকলো।

অতীতের দুঃখের পর্বগুলো বর্ণনার পর একেবারে সাম্প্রতিক দুঃখের পেন্ডোরা বাক্স খুলেন সেনেকা। তিনি বলেন, তোমার কোলেপিঠে করে যে তিন নাতি-নাতনী বড় হলো অল্প কয়েকদিনের মধ্যে তাদের লাশ গ্রহণ করতে হলো তোমাকে। আমার ছেলের মৃত্যুর বিশ দিনেরও কম সময়ের মধ্যে তুমি জানতে পারলে আমাকে নির্বাসনে দেয়া হচ্ছে। তুমি অনেক মৃত্যুশোকের মধ্য দিয়ে গিয়েছো-এবার তোমার সামনে জীবিত মানুষকে নির্বাসনে দেয়ার দুঃখ যাপনের পালা। তুমি আগে কখনো এ দুঃখের মধ্য দিয়ে যাওনি।

সেনেকা বলছেন, সর্বশেষ এ দুঃখটি শুধু হেলভিয়ার চামড়ায় আচড় কেটেই ইস্তফা দেয়নি বরং হৃদয় বিদীর্ণ করে দিয়েছে এবং ভেতর থেকে দুমরে মুচরে দিয়েছে। আমি তোমার সামনে কোন দুঃখই গোপন করিনি; সবগুলো একসঙ্গে তোমার টেবিলে পেশ করেছি। এর পেছনে কী উদ্দেশ্য রয়েছে সে ব্যাপারে সেনেকা বলেন, আমি এক মহান উদ্দেশ্যে এগুলো তোমার সামনে পেশ করেছি-তা হলো আমি তোমার দুঃখের সঙ্গে প্রতারণা করতে চাইনি, সেগুলোকে জয় করতে চেয়েছি। মায়ের ভয় কাটাতে একজন দক্ষ স্টোয়িক হিসেবে আশ্বস্থ করেন, চলমান পরিস্থিতি তার জন্য অসহনীয় নয়। তাই তার ভয় কাটাতে বলেন, কোন ঘটনা তাকে অসুখী করতে পারে না।

সেনেকা তারপর বলেন, মানব জনমের তেলেসমাতি এটাই যে আমরা যে পরিস্থিতিতেই জন্মাই না কেন আমরা এটা থেকে না পালালে তা আমাদের জন্য অনুকূল রূপ নেয়। প্রকৃতি আমাদেরকে এমনভাবে তৈরি করেছে যে সুখী হতে আমাদের অনেক জোগাড়যন্ত্র করতে হয় না। আমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ সুখ সৃষ্টি করতে পারি। বাহিরের প্রভাবকের ভূমিকা এক্ষেত্রে খুবই নগন্য। সুখ বা দুঃখের পেছনে এগুলোর বড় কোন প্রভাব নেই।

Image Credit: www.nirvanicinsights.com

সেনেকা তখন কালজয়ী একটি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ধনদৌলত প্রজ্ঞাবান লোকের মহিমা বৃদ্ধি করে না, দুর্ভোগ/প্রতিকূল পরিবেশ তাকে ছুড়ে ফেলে দেয় না। কারণ তিনি নিজের কাছ থেকেই সব আনন্দ আহরণ করতে পারেন। এক্ষেত্রে তিনি সম্পূর্ণভাবে নিজের উপর নির্ভরশীল।

রোমান সম্রাটের পর রোমের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজন হওয়া সত্ত্বেও সেনেকা বলেন, তিনি কখনো অর্থ-সম্পদের উপর সুখ-দুঃখের ঠিকা দেননি যদিও তা খানিক স্বস্তি প্রদানের ক্ষমতা রাখে। তিনি তার অর্থ-সম্পদ, পদ-পদবি ও ক্ষমতাকে জীবনের এমন জায়গায় রেখেছেন যা ছিনিয়ে নেয়া গেলেও তার তেমন লোকসান হবে না। এ কথা যখন বলছেন তখন আমাদের মনে রাখতে হবে সম্রাট নিরোর প্রায় প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান উপদেষ্টার মতো ক্ষমতা ছিল সেনেকার। এমনকি অভিজাত ও রোমানদের ঋন দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি নিজেই একটা ব্যাংকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

সেনেকা বলছেন, আমি সবসময়ই এ বিশ্বাস রেখেছি, পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ যেগুলোকে পরম কাঙ্খিত/আরাধ্য বলে মনে করে সেখানে প্রকৃত কল্যাণ নেই। আমি বরং দেখেছি সেগুলো বেশিরভাগই ঠুনকো ও মেকি। অধিকাংশ মানুষই কোন বস্তুর বহিঃরূপেই বিমোহিত হয়ে যায়।

…….to be continued (2nd Part Coming Soon)


[1] ল্যাটিনে এর শিরোনাম ছিল ‘দো কনসোলেশন এড হেলভিয়াম’।

Book Cover Credit: www.kobo.com

Image Credit: www.nirvanicinsights.com

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!