অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ: বইয়ের ভেতর থেকে

Reading Time: 5 minutes

নভেল করোনাভাইরাস মহামারিতে যারা ঘরে বসে দুই হাজার বছর পুরনো এ কালজয়ী বইটি পড়তে চান তাদের জন্য এই সুযোগ। রোমান দার্শনিক সেনেকার গুরুত্বপূর্ণ এ বইটির গুরুত্বপূর্ণ অংশের অনুবাদ থাকছে এখানে। রকমারিসহ বিভিন্ন দোকানপাট বন্ধ থাকায় অনেকেই ইচ্ছে থাকলেও বইটি কিনতে পারছেন না। আশা করি এখানে যে গুরুত্বপূর্ণ অংশ উপস্থাপন করা হচ্ছে সেখান থেকে পুরো বইটির সারকথা অনুধাবন করতে পারবেন। এ লেখাটি পড়ার আগে ‘অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ’ বইয়ের ভূমিকাটা পড়ে আসতে পারেন।

বই নিয়ে সম্প্রতি জাতীয় বই পাঠ প্রতিযোগিতা আয়োজন করছে বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম যেখানে ‘অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ’ রয়েছে। আয়োজকসহ অনেক অংশগ্রহণকারী বইটি পড়তে চেয়েছেন। বাজার থেকে কেনার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই পিডিএফ চাচ্ছেন। কিন্তু পুরো বই ছেড়ে দিলে প্রকাশক এবং আমার আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লোকসান হবে। আবার আমি চাই অধিকসংখ্যক পাঠক এ বই পড়ার সুযোগ পাক এবং উপকৃত হউক। সেই লক্ষকে সামনে রেখে এখানে বইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ উপস্থাপন করা হলো:

তুমি যখন জীবন যাপন করো তখন মনে করো যেন অমর থাকবে। মৃত্যুর কথা তোমাদের মাথাতেই আসে না। কত সময় পার হয়ে গেল টেরই পাও না। তুমি এমনভাবে সময় অপচয় করো যেন কোনো কূপ থেকে পর্যাপ্ত বরাদ্দ পাচ্ছ। কিন্তু ওই দিনটাতে ওই মুহূর্তটা যে পার করলে, কাউকে যে সময়টা দিলে সেটা হয়তো তোমার শেষ মুহূর্ত। তোমার ভয়গুলো সব মরণশীল প্রাণির আর আকাঙ্খাগুলো মৃত্যুহীনদের। অনেককেই বলতে শুনবে : পঞ্চাশ বছরের পর অবকাশে যাব, ষাট হলে সকল ধরনের জন-সংশ্লিষ্টতা থেকে ছুটি নিয়ে নেব।’ তুমি যে অতটুকু বাঁচবে তার গ্যারান্টি কী? তোমার পরিকল্পনা অনুযায়ীই সবকিছু যাবে তার নিশ্চয়তা কী? তোমার লজ্জা লাগে না! জীবনের খুচরা অংশটা বরাদ্দ রাখছ সব বড় কাজের জন্য? সে সময়টা বরাদ্দ রাখছ যে সময়টাতে অন্য কোনো কাজই করতে পারবে না? তোমার জীবনের শেষ ঘণ্টা যখন বাজতে শুরু করবে তখন তুমি বাঁচার সর্বোচ্চ পরিকল্পনাটা করছ! মৃত্যুকে ভুলে থাকার কী সুন্দর পরিকল্পনা! তুমি তোমার সুন্দরতম পরিকল্পনাগুলো রাখছ পঞ্চাশ বা ষাট বছরের জন্য। যে সময়টাতে জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করছ যেটিতে খুব অল্প লোকই পৌঁছাতে পেরেছে!

এ ব্যাপারে অবশ্যই সকলে একমত হবেন, কোনো ব্যক্তি যদি বহু কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে সে কোনোটাই ভালো করে সারতে পারে না। জ্ঞানকা-ে র কোনো শাখায় দখল নিতে হলে অবিচল মন থাকতে হয়। বিক্ষিপ্ত মন কোনোকিছুই গভীরভাবে নিতে পারে না। সেখানে যা-ই প্রবেশ করানো হোক না কেন বমি করার মতো সব বের হয়ে আসবে। ব্যতিব্যস্ত মানুষ আর সব কিছুই করে, শুধু বাঁচা ছাড়া। এই বাঁচতে শেখার মতো কঠিন শিক্ষা আর কিছুই হতে পারে না। শিক্ষার অন্যান্য বিভাগে সহজেই শিক্ষক মেলে। এমন কিছু জ্ঞানকাণ্ড আছে যেখানে অল্পবয়সী বালকরাও ওস্তাদ বনে যেতে পারে। কিন্তু কীভাবে বাঁচতে হয় সেটা জানতে পুরো জীবন চলে যায়। তোমাকে হয়তো আরো বিস্মিত করবে এই ব্যাপারটা, কীভাবে মরতে হয় সেটা জানতেও সারা জীবন চলে যায়।

তাই অনেক রথী-মহারথিকে দেখি তাঁরা সকল ধন-সম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য, আনন্দ-বিলাস পরিত্যাগ করেন। জীবনের শেষভাগে এসে কীভাবে বাঁচা যায় এটি শেখার চেষ্টা করেন। তার একটা বড় অংশই প্রাণত্যাগ করার সময় এটা স্বীকার করে যান যে তারা আসলে সেটি জানতে পারেননি। আর যাঁরা জেনেছেন তাঁদের সংখ্যাটা নেহাতই নগণ্য। বিশ্বাস করো, সময়কে কাবুতে রাখা অনেক বড় মানুষের কাজ। সেটি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে সাধারণ মানুষের দুর্বলতার ঊর্ধ্বে উঠতে হয়। যাঁরা এটা করতে পারেন তাঁদের জীবন সত্যিই অনেক বড়। কারণ তিনি তার পুরো সময়টাই নিজের জন্য বরাদ্দ করেছেন। তাঁর কোনো সময়ই অবহেলা বা আলস্যে কাটেনি, তাঁর সময়ের উপর অন্য কারো আধিপত্য ছিল না। তিনি খুবই কঠোরভাবে সময়ের পাহারা দিয়েছেন এবং সময়ের বিনিময়ে কোনো কিছু সওদা করে বসেননি। এ কারণে সে পর্যাপ্ত সময় পেয়েছে। অন্যদিকে যারা জীবনের বড় অংশটা অন্যকে বিলিয়ে দিয়ে নিঃশেষ করেছেন তিনি সময় খুব কমই পেয়েছেন।

আমার খুব অবাক লাগে কিছু লোক অন্যের কাছ থেকে সময় চায় যেন ওই লোকের ভাণ্ডারে অফুরান সময় আছে। দুজনেই সময় চাওয়ার অনুরোধটার দিকেই নজর দেয়, সময়টার উপর নয়। ভাবখানা এমন যে জিনিসটা চাওয়া হয়েছে সেটা খুবই তুচ্ছ। যা দেওয়া হয়েছে সেটা কিছু নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো নিয়ে মানুষ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। কারণ সময় তো বিমূর্ত জিনিস। চোখের কোনায় ধরা পড়ে না বলে খুবই সস্তা জিনিস হিসেবে ধরা হয়। যেন এর কানাকড়ি মূল্যও নেই। মানুষ তার পেনশনের টাকা বা সম্পত্তি ভাগাভাগির বেলাতে অনেক কড়া থাকে। কিন্তু সময়কে কোনো মূল্যই দেয় না। এমনি পাওয়া জিনিসের মতো এটা দেদারছে বিলিয়ে দেয়। আবার তারাই যখন অসুস্থ হয় বা কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় তখন ডাক্তারের পায়ে পরে বা বিচারকের কাছে প্রাণভিক্ষা চায় এবং সকল অর্জিত সম্পদের বিনিময়ে হলেও আরেকটু সময় বেশি বাঁচতে চায়। মানুষের অনুভূতির এই হলো দ্বিচারিতা। কিন্তু তাদের সামনে যদি তুলে ধরা যেত কত বছর রয়েছে সামনে যেমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় ফেলে আসা বছরগুলোর কথা তাহলে তারা ভিতবিহ্বল হয়ে পড়ত। যখন দেখত কত অল্প সময়ই না বাকি আছে তখন তারা কতই না কিপটে হয়ে যেত! যখন তোমার মালিকানায় থাকা জিনিসটির পরিমাণ সম্পর্কে জান তখন তার ব্যবস্থাপনা তুলনামূলকভাবে সহজ, সেটা যত অল্প পরিমাণই হউক না কেন। কারণ তখন সেটাকে খুবই সতর্কতার সাথে পাহারা দিয়ে রাখবে। আর যে জিনিসটা যেকোনো সময় শেষ হয়ে যেতে পারে সেটি ব্যবহারে কেমন সতর্ক হওয়া প্রয়োজন?

জীবনের সময়কে তিনভাগে ভাগ করা যায়- যেটা চলে গেছে, যেটা চলমান আর যেটা আসন্ন। তিনটার মধ্যে বর্তমানটা সংক্ষিপ্ততম, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত আর অতীতটা সুনিশ্চিত। কারণ শেষেরটিতে তুমি তোমার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছ। এটাকে ফিরিয়ে আনা কোনো ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু যারা মোহগ্রস্ত তারা হারিয়ে ফেলে। কারণ অতীতের দিকে মুখ ফেরানোর সময় নেই তাদের। যদিওবা অতীতের দিকে মুখ ফেরায় কিন্তু এর স্মরণ তাদের জন্য সুখকর নয়। কারণ সেটা অনুশোচনা নিয়ে আসে। তাই তারা অতীতের অহেতুক ব্যয় করা সময়ের দিকে চিন্তা ফেরাতে অনিচ্ছুক। অতীতের পর্যালোচনা করলে যে তাদের দোষগুলো চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠে। কিছু ক্ষণস্থায়ী প্রলোভনে সেসব ভুলগুলো করা হলেও সেই সব ঘণ্টায় ফিরে যাওয়ার সাহস পায় না তারা।

তাবৎ মানুষের মধ্যে তারাই সত্যিকারের অবকাশে আছে যারা দর্শনের জন্য সময় রাখে। তারাই আসলে সত্যিকারের বাঁচা বাঁচে। কারণ তারা শুধু এক জীবনের দেখভাল করেই সন্তুষ্ট নয় বরং তারা প্রতিটি যুগকে নিজেদের সাথে যুক্ত করে। যেসব বছরগুলো তাদের আগে চলে গিয়েছিল সেগুলো তাদের ভাণ্ডারে যুক্ত করে। আমরা যদি চরম অকৃতজ্ঞ না হই তাহলে স্বীকার করব সেইসব মহান চিন্তার অসাধারণ শিল্পীরা আমাদের জন্যই জন্মেছিলেন, আমাদের জন্যই তাঁরা একটি জীবন দর্শন প্রস্তুত করে গিয়েছেন। আরেকজনের শ্রমের উপর দাঁড়িয়ে আমরা এমনসব সুন্দর দৃশ্যের কাছে সমবেত হই যেসব দৃশ্য অন্ধকারে পড়েছিল। তাঁরা সেসব দৃশ্যকে আলোয় নিয়ে এসেছেন। আমরা কোনো যুগ থেকেই বিতারিত হই না। সব যুগেই রয়েছে আমাদের প্রবেশাধিকার। ইচ্ছে হলে আমরা মানবীয় দুর্বলতাকে অতিক্রম করতে পারি। সময়কে ইচ্ছেমত লম্বা করতে পারি এবং বিভিন্ন যুগে পরিভ্রমণ করতে পারি। আমরা ইচ্ছে করলে সক্রেটিসের সাথে তর্ক জুড়তে পারি, কার্নিয়াদ্স্ এর সাথে সন্দেহ করতে পারি, এপিকিউরাসের কাছে শান্তি পেতে পারি। মানবচরিত্রের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে স্টোয়িকদের সহায়তা নিতে পারি, সিনিকদের (সন্দেহবাদীদের) সহায়তায় আরও পরিশীলিত করতে পারি। যেহেতু প্রকৃতি আমাদেরকে প্রত্যেক যুগের সান্নিধ্য অনুমোদন করে তাহলে কেন আমরা নিবিষ্টচিত্তে অতীতের কাছে আত্মসমর্পণ করছি না? এই তুচ্ছ ও দ্রুতগামী সময় বাদ দিয়ে সে অসীম ও চিরন্তনের আশ্রয় নিচ্ছি না যা আমাদের উত্তম মানুষের সঙ্গদানে সমৃদ্ধ করবে?

আমরা স্পষ্ট করে বলে দিতে পারি, তারাই অর্থবহ কোনো কর্তব্য পালন করছে যারা নিজেদের সঙ্গী হিসেবে জেনো, পিথাগোরাস, ডেমোক্রিটাস ও মুক্ত জ্ঞানের বড় বড় পুরোহিতদের বাছাই করেছে। এবং যারা এরিস্টটল ও থিওফ্রাস্টাসকে তাদের প্রতিদিনকার অন্তরঙ্গ বন্ধু বানিয়েছে। তাদের কেউই দরজায় নোটিশ ঝুলিয়ে রাখবে না, ‘আমি বাড়িতে নাই’। তাদের কাছে গমনকারী কোনো ব্যক্তিই আগের চেয়ে বেশি সুখী না হয়ে যাবে না। এবং আগের চেয়ে আত্মনিবেদিত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে না। তাদের কেউই আমাদের শূন্য হাতে ফেরাবে না। দিন বা রাতের যেকোনো সময় যেকোনো ব্যক্তিই তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে পারে। এদের কেউই তোমাকে মরতে বাধ্য করবে না। বরং প্রত্যেকেই শিক্ষা দেবে কীভাবে মরতে হয়। তাদের কেউই তোমাকে বয়সে বুড়ো বানাবে না। বরং প্রত্যেকেই তোমার বয়সের সঙ্গে তাদের কিছু বয়স যোগ করে দেবে। তাঁদের সঙ্গে আলাপচারিতা বিপজ্জনক নয় বা বন্ধুত্ব ভয়ঙ্কর নয় বা উপস্থিতি ব্যয়বহুল নয়। তাদের কাছ থেকে তুমি যত ইচ্ছে ততই নিতে পারো। যদি না পারো তার জন্য ওরা দায়ী নয়। আহা! কত সুখ, কত সুন্দর বুড়োকাল অপেক্ষা করছে তাদের জন্য যারা এমনতর মানুষদের মক্কেল হিসেবে নিজেদের সঁপে দিতে পেরেছে! সে এমন বন্ধু পাচ্ছে যার কাছ থেকে ছোট-বড় সব বিষয়েই উপদেশ পাবে। প্রতিদিনই যাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পারবে। যাদের কাছ থেকে সত্য বচন শুনবে অপমান ছাড়া, প্রশংসা পাবে চাটুকারিতা ছাড়া। এবং যাদের মতো করে নিজেকেও সাজাতে পারবে নির্দ্বিধায়!

লুসিয়াস আন্নাএউস সেনেকার ‘অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ’ এর অংশবিশেষ

অনুবাদ: সাবিদিন ইব্রাহিম

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!