অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও সমকালীন ইতিহাস

Reading Time: 11 minutes

রিভিউ

আত্মজীবনী বলতে সাধারণত কোনো ব্যক্তির আত্মকথনকে বোঝানো হয়। লেখক যখন তার নিজের জীবনের ইতিহাস ও তৎকালীন সময়ের কথা নিজস্ব বাচনে তুলে ধরেন, সেটাকেই আমরা সাধারণত আত্মজীবনী বলে থাকি। সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, লেখক সাধারণত তাঁর আত্মজীবনীতে নিজের ঢাকঢোল পেটানোর দিকে নজর দিয়ে থাকেন। কিন্তু অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ক্ষেত্রে তার সম্পূর্ণ বিপরীত কাজটি করা হয়েছে। নিজের লেখা এই বইটিতে শেখ মুজিবুর রহমান নিজের পরিবর্তে তাঁর রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। তাঁর ভাষ্যমতে,

একদিন সন্ধ্যায় বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দিয়ে জমাদার সাহেব চলে গেলেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ছোট্ট কোঠায় বসে বসে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবছি, সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কথা। কেমন করে তাঁর সাথে আমার পরিচয় হল। কেমন করে তাঁর সান্নিধ্য আমি পেয়েছিলাম। কিভাবে তিনি আমাকে কাজ করতে শিখিয়েছিলেন এবং কেমন করে তাঁর স্নেহ আমি পেয়েছিলাম।

বাংলাদেশ সংবিধানের ৪(ক) নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আমরা যাকে “জাতির পিতা” বলে জানি, তাঁর লেখা আত্মজীবনীর মধ্যে যে তৎকালীন সময়ের অর্থনীতি, সমাজ ব্যবস্থা ও রাজনীতির কথা আসবে, তা আলাদা করে বলবার প্রয়োজন পড়ে না। এই বইটির ভূমিকা লিখেছেন বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা ও বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বইটিতে ১৯৩৮-৩৯ সাল থেকে শুরু করে ১৯৫৫ সালের ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে। ৫৫ বছরের জীবনের মধ্যে ১৪ বছর (৪৬৮২ দিন) জেলে কাটানো শেখ মুজিব এই বইটি জেলে বসে লিখেছিলেন। বইটির মূল পাণ্ডুলিপি জেলে বসে লেখার চারটি খাতা দেখে জানা যায় যে, সেগুলো ১৯৬৬-৬৯ সালে লেখা। বইয়ের ভূমিকা লিখতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু-তনয়া সে কথা উল্লেখ করতে ভুল করেননি।

উপন্যাসের ঢঙে লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনীর শুরুতে লেখক তাঁর বংশ-পরিচয় ও শৈশব কালের বর্ণনা দিয়েছেন। ছোটবেলাতেই তিনি সুভাষ বসুর ভক্ত হয়ে পড়েন। ছোটবেলা থেকেই দেশের মানুষের জন্য কিছু করবার ব্যাপারে নিবেদিতপ্রাণ শেখ মুজিব ১৯৩৭ সালে তাঁর গৃহশিক্ষক কাজী আবদুল হামিদ এম.এস.সি. সাহেবের অনুপ্রেরণায় “মুসলিম সেবা সংগঠন” নামক একটি সেবা সমিতিতে জড়িয়ে পড়েন। নিয়মিত লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি একই সঙ্গে সমাজ সেবামূলক কার্যক্রম ও রাজনীতিতে সমান সক্রিয় ছিলেন। এরপরের বছর অর্থাৎ ১৯৩৮ সালে তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুপ্রেরণায় প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। সেখান থেকেই শুরু…. এরপর একে একে নানা রাজনৈতিক সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েছেন। দেশের মানুষের জন্য সারা জীবন লড়াই করে গেছেন।

বইটির বিষয়বস্তু কী, সে ব্যাপারে আমরা সকলেই কম-বেশি অবগত আছি নিশ্চয়ই। ১৯৩৮-৫৫ সালের মধ্যে সংঘটিত নানা ঘটনার চমৎকার বর্ণনা লেখক ধারাবাহিকভাবে দিয়েছেন। এগুলোর মধ্যে লেখকের নিজের শৈশব ও বংশ-পরিচয়, শিক্ষাজীবন, তেতাল্লিশের মন্বত্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশবিভাগ, ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন (যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন), পাকিস্তানিদের বৈষম্যমূলক শাসন প্রভৃতি ঘটনা অত্যন্ত সাবলীলভাবে বলে গিয়েছেন একের পর এক। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল তারিখে বিখ্যাত সাপ্তাহিক পত্রিকা যাকে “রাজনীতির কবি” (Poet of Politics) বলে আখ্যায়িত করেছিল, তাঁকে সত্যিকারের কবি বলে আখ্যায়িত করলেও বোধহয় খুব একটা অত্যুক্তি হবে না।

আত্মজীবনী হলেও এই বইটিতে ব্যক্তি শেখ মুজিবকে যতখানি না ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তার চেয়ে ঢের বেশি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা, অর্থনীতি ও রাজনীতিকে। সবকিছু ছাপিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বাংলার আপামর জনসাধারণের দুঃখ-দুর্দশার চিত্রকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বিদেশীদের মধ্যে এক সময় জনশ্রুতি ছিল যে, বাংলায় একবার গেলে আর ফেরত আসা যায় না। এ থেকে বোঝা যায়, একসময় বাংলার মানুষ কতটা সম্পদশালী ছিল! সেই বাংলার মানুষের জীর্ণতার চিত্র অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন লেখক। এর পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাপারে লেখকের কিছু নিজস্ব জীবন দর্শন তাঁর প্রত্যক্ষ্ উক্তির মাধ্যমে উঠে এসেছে। যেমনঃ

  • পরশ্রীকাতরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের আমাদের রক্তে রয়েছে। বোধহয় দুনিয়ার কোন ভাষায়ই এই কথাটা পাওয়া যাবে না, ‘পরশ্রীকাতরতা’।
  • অন্ধ কুসংস্কার এবং অলৌকিক বিশ্বাসও বাঙালির দুঃখের আর একটা কারণ।
  • নেতারা যদি নেতৃত্ব দিতে ভুল করে, জনগণকে তার খেসারত দিতে হয়।
  • মাতৃভাষার অপমান কোনো জাতিই কোনো কালে সহ্য করে নাই।
  • আমাদের দেশে যে আইন সেখানে সত্য মামলায়ও মিথ্যা সাক্ষী না দিলে শাস্তি দেওয়া যায় না।
  • জনমত সৃষ্টি হয়েছে, জনমতের বিরুদ্ধে যেতে শোষকরাও ভয় পায়।
  • যেখানে আদর্শের মিল নেই, সেখানে ঐক্যও বেশি দিন থাকে না।
  • অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোনোদিন একসাথে হয়ে দেশের কোনো কাজে নামতে নেই। তাতে দেশসেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়।

সুপাঠ্য বইয়ের মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে পারস্যের মহাকবি ওমর খৈয়াম তাঁর “রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম” শীর্ষক অমর কাব্যগ্রন্থে লিখেছিলেন, “রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্ত- যৌবনা- যদি তেমন বই হয়।” এই একটি কথা থেকেই সহজেই বোঝা যায়, একটা ভালো বইয়ের গুরুত্ব ঠিক কতখানি! অনুরূপভাবে, আলোচ্য বইটি সম্পর্কে শুধু এটুকুই বলব যে, এটি নিছক কোনো আত্মজীবনী নয়; বরং তৎকালীন ভারতবর্ষ ও পাকিস্তানের ইতিহাসের এক নির্মোহ, অনবদ্য দলিল। কোনো লেখক এভাবে নির্মোহভাবে, সাবলীল ভাষায় ইতিহাসের বর্ণনা নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে কখনো দিতে পারেন বা পেরেছেন কিনা, আমার ঠিক জানা নেই। রবি ঠাকুর যেমন ছোটগল্পের ধরন সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলেন , “…… শেষ হইয়াও হইলো না শেষ”, ঠিক তেমনি বিবিসির জরিপে সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ঘোষিত বঙ্গবন্ধুর “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” পড়তে গিয়ে জ্ঞানপিপাসু ও বোদ্ধা পাঠকদের মনে জ্ঞান আহরণের তৃপ্তি অপূর্ণ রয়ে যাবে।

পাঠের অভিজ্ঞতা সুখের হোক।

এক নজরে বই সম্পর্কিত তথ্যঃ

নামঃ অসমাপ্ত আত্মজীবনী

লেখকঃ শেখ মুজিবুর রহমান

প্রকাশনাঃ দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড

প্রথম প্রকাশঃ জুন, ২০১২

প্রচ্ছদঃ সমর মজুমদার

পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ৩২৯

মুদ্রিত মূল্যঃ ২২০ টাকা (সুলভ সংস্করণ)

সমকালীন ইতিহাসঃ পাক-ভারত প্রেক্ষাপট

হক মন্ত্রীসভার শাসনঃ প্রথমে আসা যাক ১৯৩৮ সালের কথায়। ১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক আইনসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হলে শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হকের নেতৃত্বে কোয়ালিশন সরকার গঠন করা হয়, যা ইতিহাসে “হক মন্ত্রীসভা” নামে পরিচিত। উল্লেখ্য যে, ১৯৩৭ সাল থেকেই স্বায়ত্তশাসনের দাবি প্রকট হয়ে উঠতে শুরু করে। পরবর্তীতে কিছু বিষয়ে কৃষক প্রজা পার্টির মধ্যে অভ্যন্তরীণ কো্ন্দল দেখা দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৩৮ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়। বস্তুত, তখন থেকেই পাক-ভারত উপমহাদেশের রাজনীতিতে প্রথম রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জের ধরে উন্মত্ততার উন্মুক্ত চর্চা শুরু হয়, যার প্রতিফলন আমরা পরবর্তীতে আমরা আরো বৃহৎ পরিসরে দেখতে পাই। সত্যি বলতে, এ চর্চা তৎকালীন ভারত উপমহাদেশের ভূখণ্ড নিয়ে সৃষ্ট তিনটি পৃথক স্বাধীন দেশে আজও দেখতে পাই্। এ তো গেল তৎকালীন সময়ের রাজনীতির কথা। বাংলার রাজনীতির কথা বলতে গেলে সে আলোচনার কথা আসতে বাধ্য। এ প্রসঙ্গে শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হকের একটি উক্তি স্মরণযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, “Politics of Bengal is in reality Economics of Bengal.”  তৎকালীন সময়ের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সুবাদে বাংলার গোটা মুসলমান সমাজ জীবনের সকল ক্ষেত্রে অধঃপতিত জাতিতে পরিণত হয়। বেনিয়া ব্রিটিশদের “Divide & Rule Policy” এর খপ্পড়ে পড়ে একদিকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হতে শুরু করে ও বৈষম্য দেখা দেয়, অন্যদিকে একসময়কার সমৃদ্ধশালী বাংলা ক্রমশ দরিদ্র হতে থাকে। বাংলার মানুষের পরিশ্রমের ফসল ভোগ করতে শুরু করে। বলা বাহুল্য যে, ১৯২৩ সালে বেঙ্গল প্যাক্ট নামক ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে বাংলার হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি বৃদ্ধির যে স্বপ্ন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ছাড়াও স্যার আব্দুর রহিম, মৌলভী আব্দুল করিম, মৌলভী মুজিবুর রহমান, মাওলানা আকরাম খাঁ প্রমুখ মুসলমান নেতৃবৃন্দ এবং জে.এম. সেনগুপ্ত, শরৎচন্দ্র বসু, ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় প্রমুখ হিন্দু নেতৃবৃন্দ দেখেছিলেন, তা ১৯২৫ সালের ১৬ জুন তারিখে দেশবন্ধুর অকাল প্রয়াণের মাধ্যমে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। এ সম্প্রীতি অটুট থাকলে আজ তৎকালীন বাংলার ইতিহাস হয়ত ভিন্নভাবে রচিত হতে পারত।

দ্বিজাতি তত্ত্ব ও লাহোর প্রস্তাবঃ ১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ তারিখে মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশনে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক “লাহোর প্রস্তাব” ঘোষণা করেন। বস্তুত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার কারণে হিন্দু-মুসলমানের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়ে পড়ে। এরূপ অবস্থায় মুসলমানেরা নিজেদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠনের কথা ভাবতে শুরু করে। এর আগে একই বছরের গোড়ার দিকে কায়েদে আজম মুহম্মদ আলী জিন্নাহ দ্বিজাতি তত্ত্ব ঘোষণার মধ্য দিয়ে এ ভাবনার পালে নতুন হাওয়া যেন পেল। এরই ধারাবাহিকতায় লাহোর প্রস্তাব এতে এক নতুন মাত্রা যুক্ত করে। পাক-ভারতের ইতিহাসের ভাগ্যাকাশে এর প্রতিফলন আমরা কিছুদিন বাদেই দেখতে পাই্‌। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এ তত্ত্বকে ভালোভাবে নেয়নি। এর বিরোধিতা করে মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, লাহোর প্রস্তাব মেনে নেওয়ার অর্থ ভারতকে ব্যবচ্ছেদ করা এবং তা হবে একটি পাপ কাজ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের আরেক নেতা জওহরলার নেহেরু লাহোর প্রস্তাবের প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, “লাহোর প্রস্তাব মেনে নিলে ভারত হয়ে পড়বে বলকান রাষ্ট্রগুলোর ন্যায় ছোট ছোট রাষ্ট্রে বিভক্ত কর্তৃত্ববাদী পুলিশী রাষ্ট্র।” তাঁদের ক্রমাগত বিরোধিতা ও মিডিয়ার কল্যাণে লাহোর প্রস্তাব একসময় ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ নামেই পরিচিতি লাভ করে। তাই ১৯৪০ সালের এপ্রিল মাসে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা শরৎচন্দ্র বসুর অপূর্ণ স্বপ্নকে পূর্ণতা দানের চেষ্টা করলেও জাতীয়তাবাদী মুসলমান নেতৃবৃন্দের ঘোর বিরোধিতার কারণে সেটা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।

তেতাল্লিশের মন্বত্তরঃ বিশ্বব্যাপী তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে চলেছে। জাপান বার্মাকে আক্রমণ করে বসেছে। প্রতিপক্ষ জাপানকে ঘায়েল করার জন্য্ সেখানে অবরোধ দেওয়া হলে বার্মা থেকে বাংলায় চাল আমদানি করা বন্ধ হয়ে যায়। এর পাশাপাশি ১৬ অক্টোবর তারিখে মেদিনীপুর এলাকায় প্রলয়ঙ্করী সাইক্লোন দেখা দিলে পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়। ফলে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে বাংলার প্রায় ৩০ লক্ষ লোকের মৃত্যু হয়। অথচ, তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল দম্ভোক্তি করে বলেছিলেন, “ব্রিটিশ সরকার নয়, বাঙালিদের ইঁদুরের বাচ্চার মতো সন্তান প্রসব করাই এ দুর্ভিক্ষের মূল কারণ।” অতি সম্প্রতি ২০১৮ সালে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অর্থনীতির অধ্যাপক Utsa Patnaik তাঁর গবেষণাকর্মে এই দুর্ভিক্ষের প্রধান কারণ হিসেবে ব্রিটিশদের নির্বিচারে লুটপাটকে দায়ী করেছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, “১৮০০-১৯৩৮ সালে ব্রিটিশদের লুটপাটকৃত সম্পদের পরিমাণ ছিল ৪২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ইংল্যান্ডের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি)-র প্রায় ১৭ গুণ।” তিনি আরো বলেন, “বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের অবদান ছিল ৩০%, যা ১৯৪২ সালে এসে দাঁড়ায় মাত্র ৫ শতাংশে।” এ দুর্ভিক্ষ কতটা ভয়াবহ ছিল, সে প্রসঙ্গে তপন রায়চৌধুরী লিখেছেন, “কলকাতার রাস্তায় ভিখারী কিছু নতুন দৃশ্য নয়। কিন্তু এই নবাগতরা অন্য ধরনের মানুষ। এক-এদের দেখলেই বোঝা যেত যে, ভিক্ষাবৃত্তি এদের স্বাভাবিক পেশা না। অনেক সময়েই দেখা যেত মা-বাপ-ছেলেমেয়ে নিয়ে একটা পুরো পরিবার এসে রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছে। কলকাতায় ভিক্ষাবৃত্তির এটা সাধারণ লক্ষণ নয়। দ্বিতীয় কথা-প্রথম প্রথম এরা ভিক্ষা চাইত না, শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত। বোঝা যেত এরা গৃহস্থ মানুষ। সঙ্কোচ কাটিয়ে ভিক্ষা করতে পারছে না। কখনও কখনও শহরবাসীরা এদের দুরবস্থা দেখে নিজের থেকেই কিছু ভিক্ষে দিয়ে যেত। কিন্তু তখন চালের দাম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মন প্রতি তিন/সাড়ে তিন টাকা থেকে বেড়ে মন প্রতি চল্লিশে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং দুঃস্থ পরিবারগুলির সবচেয়ে যা প্রয়োজন সেই চাল দেওয়ার মত অবস্থা বেশী লোকের ছিল না। ক্রমে শহরের পথে সেই অবিস্মরণীয় আবেদন শোনা যেতে লাগল, চাল ভিক্ষা করা বৃথা জেনে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষ অন্য সুর ধরল, ‘ফ্যান দাও গো, ফ্যান দাও।’ ” উল্লেখ্য, বাংলা ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত হয় বলে এ দুর্ভিক্ষ পঞ্চাশের মন্বত্তর নামেও পরিচিত।

দেশবিভাগ ও পরবর্তী রাজনীতিঃ স্বাধীনতার দাবিতে ১৯৪৬ সালের ২৯ জুলাই তারিখে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগ কাউন্সিল সভায় জিন্নাহ ১৬ আগস্ট তারিখে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস পালনের ঘোষণা দেন। এ দিবসটি শান্তিপূর্ণভাবে পালনের জন্য সেদিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এ দিবস পালন করতে গিয়ে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার সূত্রপাত হয়। কলকাতা ও নোয়াখালিতে এই দাঙ্গা ভয়াবহ রূপ লাভ করে। এর প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা ও বিহারেও এই দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূত্র ধরে লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারত বিভাগ এবং এর পাশাপাশি বাংলা ও পাঞ্জাব প্রদেশ বিভক্ত করবার সিদ্ধান্ত নিলেন। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের এই সিদ্ধান্ত একপর্যায়ে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতারা মেনে নিলেন। প্রথমে বাংলাকে স্বাধীন ভূখণ্ড হিসেবে রাখবার পরিকল্পনা করা হলেও পরবর্তীতে সে সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসে। ফলে ব্রিটিশ আমলা স্যার সিরিল রেডক্লিফ কর্তৃক প্রদর্শিত রেডক্লিফ লাইন অনুযায়ী দেশভাগ করা হয়। জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ করা হলেও আদতে পূর্ববাংলার লোকদেরকে সাথে একপ্রকার প্রবঞ্চনা করা হয়। কারণ ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের কথা বলা হলেও ভারতে যেমন অনেক মুসলমান লোক রয়ে গিয়েছিল, তেমনি পাকিস্তানেও অনেক হিন্দুর বাস ছিল। দেশভাগের ফলে আমরা বিরাট সংখ্যক দক্ষ জনসম্পদ হারিয়েছিলাম। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের প্রায় ৩ লক্ষ শিক্ষিত হিন্দু এ দেশ ছেড়ে চলে যান। এদের মধ্যে অনেক দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ-ও ছিলেন। বিনিময়ে ভারত থেকে প্রায় ১০ লক্ষ খেটে খাওয়া মানুষ এই দেশে চলে আসেন। ফলে বৈষম্য আরো প্রকট থেকে প্রকটতর হতে থাকে। ফলশ্রুতিতে আমরা দুই অঞ্চলের প্রায় দেড় হাজার মাইল ভৌগোলিক দূরত্ব বিশিষ্ট এক অসম রাষ্ট্র পাই।

ভাষা আন্দোলনঃ ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরপরই নবগঠিত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। শত শত বছর ধরে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি এই দেশের মানুষের প্রাণের ভাষা ও লালিত সংস্কৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তৎকালীন সময়ে পাকিস্তানের মাত্র ৩.৩৭% লোকের মুখের ভাষা ছিল উর্দু। সেখানে ৫৬.৪০% লোক বাংলায় কথা বলত। তবুও পাকিস্তানিরা জোর করে রাষ্ট্র্রভাষা হিসেবে উর্দুকে এ দেশের মানুষের উপর চাপিয়ে দেবার পাঁয়তারা শুরু করল। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ও ২৪ মার্চ তারিখে যথাক্রমে ঢাকার রেসকোর্স ময়দান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেছিলেন, “Urdu and only urdu shall be the state language of Pakistan.” উল্লেখ্য যে, তিনি শুধু এটুকু বলেই ক্ষান্ত হননি; একই সঙ্গে উর্দুকে “Lingua Franca” (বহুল প্রচলিত ভাষা) বলে আখ্যায়িত করতেও পিছপা হননি। যা হোক, এরই ধারাবাহিকতায় উর্দুর পাশাপাশি অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন শুরু হয়। এ আন্দোলনে ১৯৫২ সালের ২১, ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি তারিখে মোট ৮/১০ জন মারা যান। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ২১শে ফেব্রুয়ারি তারিখে সর্বত্র আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হলেও পরবর্তী দুই দিনেও অনেককে প্রাণ দিতে হয়েছিল। মাতৃভাষার জন্য প্রাণদানকারী একমাত্র জাতি হিসেবে আমরা বাঙালি জাতিকে চিনি। মাতৃভাষার জন্য বাঙালি জাতির প্রাণদানের ইতিহাস কিন্তু এখানে শেষ নয়। ১৯৬১ সালের ১৯ মে তারিখে আসামের বরাকে ১১ জন বাঙালিকে ভাষার দাবিতে প্রাণ দিতে হয়েছিল।

প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনঃ ১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ তারিখে পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম ও গণতন্ত্রী পার্টির সমন্বয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে সক্ষম হয়। পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের জন্য নির্ধারিত মোট ৩০৯টি আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসনে জয়ী হয়। এর মধ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম ও গণতন্ত্রী পার্টি পেয়েছিল যথাক্রমে ১৪৩টি, ৪৮টি, ১৯টি ও ১৩টি আসন। কিন্তু ২১ দফার ভিত্তিতে নির্বাচনে জয়ী যুক্তফ্রন্ট সরকারকে পাকিস্তানের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও অন্তর্কলহের জের ধরে ক্ষমতা গ্রহণের দুই মাসের মধ্যে (১ মাস ২৮ দিনের মাথায়) ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হয়। নবগঠিত পাকিস্তানে শুরু হয় ক্ষমতা গ্রহণ ও ক্ষমতাসীন ব্যক্তিকে হটিয়ে পাল্টা ক্ষমতা গ্রহণের অসুস্থ প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতা এতটা তীব্রমাত্রা ধারণ করেছিল যে দেশভাগের পর থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত এই ১২ বছরে মোট ৭ জন পাকিস্তানের সরকারপ্রধান হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। বলা বাহুল্য যে, এই চর্চা পরবর্তীতেও, এমনকি সাম্প্রতিক কালেও অব্যাহত রয়েছে।

সমকালীন ইতিহাসঃ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধঃ ১৯৩৯ সালের কথা। মাত্র পঁচিশ বছর আগে ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে পাঁচ বছর স্থায়ী প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান হয়েছে। এমন সময় আবার নতুন করে আরেকটি মহাযুদ্ধের ভেরি বেজে উঠল। কিন্তু কেন হলো এমন? প্রথম যুদ্ধ শেষে যখন ভার্সাই চুক্তি করা হলো, তখন উক্ত চুক্তিতে বলা ছিল যে জার্মানি নতুন করে কোনো যুদ্ধ সংঘাতে জড়াতে পারবে না। পাশাপাশি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং বিরাট জরিমানার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়। মূলত জার্মানিকে রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়াই ছিল উক্ত চুক্তির উদ্দেশ্য। কিন্তু বাস্তবে হলো তার উল্টোটা। নাৎসিবাদের জনক অ্যাডলফ হিটলার ১৯৩৯ সালের ১লা সেপ্টেম্বর তারিখে পোল্যান্ডকে আক্রমণ করে বসেন। ফলে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। তৎকালীন সময়ের যুদ্ধের ভয়াবহতার চিত্র উঠে এসেছে প্রত্যক্ষদর্শী ও তখনকার ৬ বয়সের বালক ইয়ান টিসলারের বর্ণনায়। তাঁর ভাষ্যমতে,

‘‘যখন প্রথম বোমাটি আমাদের শহরে আঘাত হানে, আমি আমার বাবার-মায়ের সাথে দৌঁড়ে গিয়ে বাড়ির এক পাশে অবস্থিত গ্যারেজটিতে আশ্রয় নিই। আমরা অনেকক্ষণ আটকে ছিলাম ওখানে। আর প্রতি মুহূর্তে ভাবছিলাম কিভাবে এড়ানো যায় বোমার আঘাত৷ দিন গড়িয়ে বিকেল হয়। আর তখন বুঝতে পারি বোমার আঘাতে তছনছ হয়ে গেছে আমাদের শহরটি। ধারণা করতে পারি আমাদের বাড়িটি ছাড়া শহরের আর বাকী সবগুলো বাড়ি পরিণত হয় ধ্বংসস্তুপে, প্রাণ হারায় প্রায় ১২শ’ লোক।

হিটলার তাঁর গোপন পুলিশ বাহিনী গেস্টাপোর সাহায্যে নির্বিচারে ইহুদি নিধন শুরু করে। এ হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহতা কতটা ছিল, তা তখনকার ১৩ বছর বয়সী জার্মান কিশোরী আনা ফ্র্রাঙ্কের লেখা ডায়েরি পড়লে আঁচ করা যায়। ১৯৪৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই ভয়াবহতার পরিসমাপ্তি ঘটে। তবে এর প্রভাব এখানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর প্রভাবে একে একে বিভিন্ন দেশের উপনিবেশভুক্ত রাষ্ট্র্সমূহ স্বাধীন হতে থাকে। গঠিত হয় জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠান।

উত্তর আধুনিকতাবাদের প্রসার ও স্নায়ুযুদ্ধের সূচনাঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটলেও বিভিন্ন বিবাদমান রাষ্ট্রসমূহের মধ্যকার দ্বন্দ্ব আজও শেষ হয়নি; সময়ের পরিক্রমায় এর রূপের পরিবর্তন ঘটেছে মাত্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নতুন করে আদর্শের দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ এ দ্বন্দ্বকে “পূর্ব-পশ্চিম দ্বন্দ্ব” নামে অভিহিত করে থাকেন। মূলত সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের প্রসারের দ্বন্দ্বে সারা বিশ্বের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে তখন দ্বিমেরুকরণের উদ্ভব ঘটে। পঞ্চাশের দশকে ট্রুম্যান নীতির ফলে এ দ্বন্দ্ব আরো প্রকট রূপ ধারণ করে। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে একদিকে যেমন ন্যাটো ও ওয়ারশ প্যাক্টের মতো সামরিক জোট করা হয়েছে, অন্যদিকে আবার ন্যামের মতো নিরপেক্ষ জোট গঠিত হয়েছে। এর পাশাপাশি উত্তর আধুনিকতাবাদের ধারণার সৃষ্টি হয়। মূলত সদ্য স্বাধীন দেশসমূহকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করাই ছিল এ ধারণার মূল কথা। এ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বিশ্বব্যাংক ও আই.এম.এফ. এর মতো নানা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও জোট গঠন করা হয়।

ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাঃ ১৯১৭ সালের ২রা নভেম্বর তারিখে তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আর্থার বেলফোর কর্তৃক ঘোষিত বিখ্যাত “বেলফোর ঘোষণা” মধ্যেই ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের মূল বীজ অন্তর্নিহিত ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত প্যালেস্টাইন অটোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ বাহিনী সেটি দখল করে নিলে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে তারিখে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য যে, জাতিসংঘের ১৮১ নং প্রস্তাবে ফিলিস্তিনের ভূমিতে ইসরাইল ও ফিলিস্তিন নামক দু’টি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হলেও সে প্রস্তাব আজও আলোর মুখ দেখেনি। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত “আরব বিশ্বের ক্যান্সার” খ্যাত ইসরাইল রাষ্ট্রের মোট চারবার যুদ্ধ হয়েছে। এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, মিশর ও জর্ডানের পর অতি সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাত আরব বিশ্বের তৃতীয় দেশ হিসেবে ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে। এ নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বাঁক নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কোরিয়া যুদ্ধঃ  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে শুরু হওয়া স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাবে ১৯৫০ সালে দুই কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধ ৩ বছর স্থায়ী হয়েছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বর মাসে মার্কিন ও সোভিয়েত বাহিনী কোরীয় উপদ্বীপে প্রবেশ করে সামরিক কৌশলগত কারণে ৩৮ ডিগ্রি অক্ষরেখা বরাবর কোরিয়াকে দু’ভাগে বিভক্ত করে ফেলে। এর মধ্যে সোভিয়েত বাহিনী ও মার্কিন বাহিনী যথাক্রমে উত্তর ভাগ ও দক্ষিণ ভাগ দখল করে ফেলে। ১৯৪৬ সালে কোরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে রুশ-মার্কিন দ্বন্দ্ব চরমে ওঠে। তখনকার সময়ে চলমান স্নায়ুযুদ্ধ যে এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিল, তা আলাদা করে বলবার প্রয়োজন পড়ে না।  সমগ্র কোরিয়ার দখল গ্রহণের চেষ্টার দরুন ১৯৫০ সালে দুই কোরিয়ার যুদ্ধ শুরু হলে মার্কিন সরকার দক্ষিণ কোরিয়াকে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা প্রদান করতে থাকে। অন্যদিকে, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন উত্তর কোরিয়াকে সামরিক সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখে। এ যুদ্ধে কয়েক লক্ষ লোক নিহত হয়। মার্কিন বাহিনীর ৫৫ হাজারের মতো সৈন্য নিহত হয়। পরবর্তীতে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে ১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই তারিখে এই যুদ্ধের অবসান ঘটে।

তথ্যসূত্র

  • আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, খোশরোজ কিতাব মহল, ঢাকা, ১৯৯৫
  • শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ইউপিএল, ঢাকা, জুন ২০১২
  • প্রফেসর মোঃ মোজাম্মেল হক, পৌরনীতি ও সুশাসন (২য় পত্র), হাসান বুক হাউস, ঢাকা, এপ্রিল ২০১৪
  • মাধ্যমিক পৌরনীতি ও নাগরিকতা (NCTB কর্তৃক প্রণীত)
  • তপন রায় চৌধুরী, বাঙালনামা, আনন্দ পাবলিশার্স, তৃতীয় মুদ্রণ, জুন ২০১২, পৃষ্ঠা ১২৬-১২৭।
  • Patnaik, U., Dispossession, Deprivation and Development, Tulika Books, November 2018.
  • মওদুদ আহমেদ: বাংলাদেশ- স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা, ইউপিএল, ঢাকা, ১৯৯৬
  • বদরুদ্দীন উমর, পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি
  • দৈনিক প্রথম আলো, প্রকাশকালঃ ১৯ মে, ২০১৬

url: https://www.prothomalo.com/world/india/বরাক-উপত্যকার-ভাষা-আন্দোলন

  • হুসায়ন, মুয়াযযম, আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস, ফরাসি বিপ্লব থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ২০১৫ 
  • https://www.dw.com/bn/প্রত্যক্ষদর্শীর-চোখে-দ্বিতীয়-বিশ্বযুদ্ধ/a-50247711
  • https://roar.media/bangla/main/history/the-emergence-of-2nd-world
  • হাই, শাহ মোঃ আব্দুল, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সংগঠন ও পররাষ্ট্রনীতি, বিদ্যাধন প্রকাশনী, ঢাকা, ২০১৩
  • https://www.dw.com/bn/ইসরায়েল-ও-আমিরাত-সংস্থার-চুক্তি/a-54593160
  • রেহমান, ড. তারেক শামসুর, বিশ্ব রাজনীতির ১০০ বছর, শোভা প্রকা্শ, ঢাকা
Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!