ইতিহাসের এই দিনে চাঁদ কি দ্বিখন্ডিত হয়েছিল ?

Reading Time: 8 minutes

আজ ২০২০ সালের ১৮ই জুন। আজ থেকে গুনে গুনে ঠিক ৮৪২ বছর আগের আরেক ১৮ই জুনের গল্প বলি শুনুন। সেটা ছিল ১১৭৮ সাল । ঘটনাস্থল- ইংল্যান্ডের কেন্ট শহরের ক্যান্টারবেরি ক্যাথিড্রাল।


এই ক্যাথিড্রালে তখন আবাসিকভাবে অনেক সন্যাসী বাস করতেন। তারা নিয়মিত উপাসনা করতেন এবং ধর্মীয় গবেষনা করতেন । আমাদের দেশে যেমন সোমপুর বিহারের বৌদ্ধ ভীক্ষুরা বৌদ্ধ ধর্ম চর্চা করেছেন , এবং সেই সাথে চর্যাপদ এর মত সাহিত্য ও লিখে গেছেন , প্রায় সেইরকম ব্যবস্থা ছিল এই ক্যান্টারবেরি ক্যাথিড্রালেও ।

আমরা যারা বিসিএস এর লেখাপড়া করি, তারা হয়তো জিওফ্রে চশারের নাম শুনেছি । তাকে বলা হয় ইংরেজি সাহিত্যের জনক ( আমাদের বাঙলা সাহিত্যের লুইপা এর মত অবস্থা)। Geoffrey Chaucer এর লেখা বইয়ের নাম ছিল The Canterbury Tales । এই বইটাতে ক্যান্টারবেরি ক্যাথিড্রাল এবং আশেপাশের অন্যান্য গীর্জার খৃষ্টান সন্যাসীদের জীবন সম্পর্কে লেখা রয়েছে ।

বইটা লেখা হয়েছিল ১৩৮৭ সালে। সেই ক্যান্টারবেরী টেলস এর চেয়েও ২০০ বছর আগের ঘটনা শোনাচ্ছি আজ আপনাদের।

১৮ই জুন গীর্জার সন্যাসীরা তাদের সন্ধ্যার প্রার্থনা শেষ করে বাইরে খোলা মাঠে একটু বাতাস খেতে বেরিয়েছিলেন।সূর্যাস্তের আনুমানিক এক ঘন্টা পরে হঠাত তারা খেয়াল করলেন, আকাশের চাদের কিছু একটা হয়েছে। সেই সন্ধ্যায় আকাশে ছিল ছোট এক ফালি চাঁদ । রমজানের বা ইদের সময় যেমন ছোট এক চিলতে চাদ দেখা যায়, সেইরকম। প্রায় খাড়াভাবে চাদটা আকাশে ঝুলে ছিল। উপর এবং নিচে, গরুর শিং এর মত দুইটা অংশ দেখা যাচ্ছিল। হঠাৎ সন্যাসীরা দেখলেন , চাদের উপরের ফালির অংশটা দুই ভাগ হয়ে গেল । শুধু তাই নয়, সে দুই ভাগের মাঝখান থেকে একটি জ্বলন্ত মশাল বেরিয়ে আসল। আগুনের ফুলকি এবং ধোয়া ছড়িয়ে পড়ল পুরো চাঁদ জুড়ে। চাদটা বেশ কিছুক্ষন সাপের মত পাক খেয়ে মোচড়ামুচড়ি করল। চাদের এই মাথা থেকে ওই মাথা পর্যন্ত পুরা অংশ ছাই রঙের হয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষন এই অবস্থায় থাকার পরে চাঁদ আবার আগের মত অবস্থায় ফিরে গেল।



চার্চে ক্রনিকলার নামে একটা পোস্ট ছিল। সে সকল ঘটনার সাল তারিখ সহ রেকর্ড রাখত। ১১৭৮ সালে ক্যান্টারবেরি চার্চের ক্রনিকলার ছিলেন Gervasus Cantuariensis । তিনি এই ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছিলেন তার ক্রনিকলে ।

তার লিখিত বিবরনটা এইরকম —

This year on the Sunday before the Feast of Saint John the Baptist, after sunset when the moon was first seen, a marvellous sign was seen by five or more men sitting facing it. Now, there was a clear new moon, as was usual at that phase, its horns extended to the east; and behold suddenly the upper horn was divided in two. Out of the middle of its division a burning torch sprang, throwing out a long way, flames, coals and sparks. As well, the moon’s body which was lower, twisted as though anxious, and in the words of those who told me and had seen it with their own eyes, the moon palpitated like a pummelled snake. After this it returned to its proper state.



দীর্ঘদিন এই ঘটনার কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছিল না। ১৯৫০ এর পরে যখন একের পর এক রকেট চাদে যাওয়া শুরু করল , তখন চাদের সারফেসের প্রচুর ছবি বিজ্ঞানীদের হাতে আসা শুরু করল। দেখা গেল, চাদের মাটিতে প্রচুর খাদ বা গর্ত রয়েছে। লাখ লাখ বছর ধরে অনেক গ্রহানু বা ধূমকেতু চাদের মাটিতে আছড়ে পড়ে এই গর্তগুলো তৈরি করেছিল ।

১৯৭৬ সালে Jack B. Hartung নামক এক ভূ-তত্ত্ববিদ দাবি করলেন, ক্যান্টারবেরির সন্যাসীরা সম্ভবত চাঁদের বুকে একটা ধূমকেতু বা গ্রহানুকে আছড়ে পড়তে দেখেছিলেন। বিষয়টা ভালভাবে বোঝার জন্য গ্রহানু বা ধূমকেতু সম্পর্কে ভালভাবে জানতে হবে।



২.


মহাশূন্যে প্রচুর গ্রহানু ঘুরে বেড়াচ্ছে। এগুলা বিভিন্ন সাইজের হতে পারে। কয়েক সেন্টিমিটার থেকে শুরু করে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত। গ্রহানুরা সূর্যের চারদিকে নিজের কক্ষপথে ঘুরতে থাকে। তবে মাঝে মাঝেই তাদের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে অন্যদিকে চলে আসে। পৃথিবীর আশেপাশেও মাঝে মাঝেই প্রচুর গ্রহানু চলে আসে। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে এই গ্রহানুরা ঢুকে পড়লেই বাতাসের সাথে ঘষা খেয়ে আগুন জ্বলে ওঠে। গ্রহানুগুলো পুড়ে যায়, পৃথিবীর মাটিতে ছাই হয়ে পড়ে যায় । আমরা একে উল্কাপাত ,বা প্রচলিত ভাষায়,তারা খসা বলি ।





মহাশূন্যে বাতাস নেই। এই কারনে সেখানে প্রচন্ড গতিতে গ্রহানুগুলো চলতে থাকলেও আগুন ধরে না । পৃথিবীর সারফেসের কয়েক কিলোমিটার উপর পর্যন্ত বায়ুমন্ডল আছে। এই বায়ুমন্ডলের মধ্যে প্রচন্ড গতিতে কোনো বস্তু ঢুকে পড়লে অনেক তাপ উৎপন্ন হয় । বায়ু মন্ডলে অক্সিজেন রয়েছে প্রচুর। প্রচুর তাপ+ অক্সিজেন মিলিয়ে গ্রহানুটায় আগুন জ্বলে ওঠে। বাইরে থেকে কোনো রকেট পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে যখন ঢোকে তখন এ্যস্ট্রনটরা অনেক হিসাব নিকাশ করে ঢোকে, যেন বেশি তাপ তৈরি না হয়। রকেটে যেন আগুন ধরে না যায় 🙂


২০১৩ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি সকাল ৯ টায় রাশিয়ার সেলিয়াবিনস্ক শহরের আকাশে ৬৬ ফুট ব্যাসার্ধের একটা গ্রহানু আছড়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা দেখছিল, হঠাৎ কোথা থেকে আকাশে একটা আগুনের গোলা আসতেছে, এবং সেটা ক্রমাগত বড় হচ্ছে । কয়েক সেকেন্ডের জন্য সূর্যের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল আলোর ঝলকানি দেখতে পায় শহরবাসী। মাটিতে পড়েনি এটা, আকাশেই আগুন ধরে বিস্ফোরিত হয় (মাটি থেকে ২৭ কিলোমিটার উপরে)।



সেই বিস্ফোরনের প্রচন্ড শব্দে মানুষের কানে তালা ধরে যায়, প্রচন্ড শব্দের শক ওয়েভে বাসার জানালার কাচ বা দুর্বল কাঠামো ভেঙ্গেচুরে পড়ে । এই ঘটনায় কেউই নিহত হয়নি, তবে ওই সময়ে মানুষজন প্রচন্ড আতংকিত হয়েছিল। পুরা শহর বারুদ এবং গানপাউডারের গন্ধে ভরে যায়। আগুনের গোলা যে কয়েক সেকেন্ড আকাশে ছিল, তখন কয়েকজন বাড়তি উত্তাপ টের পেয়েছিলেন। ইউটিউবে ওই সময়ের মুহুর্তের বেশ কিছু ভিডিও পাওয়া যায়। 

মাঝে মাঝে কিছু বড় সাইজের গ্রহানু পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে ঢুকে পড়ে। তারা সাইজে এতই বড় হয় ,যে আগুন ধরে গিয়ে পুড়তে পুড়তে কিছু অংশ মাটিতে চলে আসে। এবং মাটিতে আসার পরেও তাদের শরীরের বেশ কিছু অংশ বাকি থাকে।

১৯০৮ সালে রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলে তাঙ্গুশকার বনে একটা গ্রহানু আছড়ে পড়েছিল। কয়েক বর্গকিলোমিটার বনের গাছপালা পুড়ে গিয়েছিল। এলাকায় ৫ রিখটার স্কেলের একটা ভূমিকম্পও হয়েছিল। এই গ্রহানুটার ব্যাস ছিল ৬৫ মিটার (প্রায় ২০০ ফুট)


তবে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর গ্রহানুটা আছড়ে পড়েছিল ৬ কোটি বছর আগে। এইটার সাইজ ছিল ১১ কিলোমিটারের ও বেশি। ফলে মাটিতে যখন এসেছিল, ততক্ষনে কিছুটা অংশ পুড়ে যাওয়ার পরেও এর ভাল একটা অংশই বেচে ছিল। এটা ড্রপ করেছিল মেক্সিকো উপসাগরে। তার প্রভাবে ৩৩০ ফুট উচু সুনামি হয়েছিল। (তুলনা করার জন্য মনে করিয়ে দেই , ২০০৪ সালে ২০ ফুট উচু সুনামি হয়েছিল, তাতে ২ লাখ ২০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল এক দিনেই) । ৬ কোটি বছর আগের ওই গ্রহানুর আঘাতের ফলে সাগরের মাটি কাদা বালু বায়ুমন্ডলে উঠে গিয়েছিল। আকাশ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। সূর্যের আলো আসতে পারেনি। মাটি কাদা গুলা ধীরে ধীরে পৃথিবীতে নেমে আসলে ২০০ বছর পরে সূর্যের আলো এসেছিল পৃথিবীতে। এই ২০০ বছরে সকল গাছপালা মরে গেছিল। গাছ খেয়ে যারা বেচে থাকত, সেই সব প্রাণী মরে গেছিল। ডাইনোসর জাতীয় সব প্রাণী এইসময় পটল তুলেছিল । কেবলমাত্র কেচো, তেলাপোকার মত কয়েকটা প্রানী বেচে ছিল, যারা মরা কাঠ বা অন্য জিনিস খেয়ে বাচতে পারে।


৩.


ধূমকেতু (comet) গ্রহানুর চেয়ে সাইজে বড়। তবে ধূমকেতুর মূল অংশ ,মানে নিউক্লিয়াস বেশ ছোট। এটা ১০০ মিটার থেকে শুরু করে ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। পাথর,ধূলা, বরফ এবং বিভিন্ন গ্যাসের কম্বিনেশনে এই নিউক্লিয়াস গঠিত। ইউজুয়ালি নিউক্লিয়াসের ৮০% ই বরফ।

মূল নিউক্লিয়াসের পরে দীর্ঘ পাতলা লেজ থাকে । নিউক্লিয়াসের উদ্বায়ী গ্যাস বা ধূলিকনাগুলোই লেজ হয়ে পেছনে ঘুরে বেড়ায় । এই লেজ লম্বায় কয়েক কোটি কিলোমিটার হতে পারে। ধূমকেতুর লেজ খসে গেলে সেটা গ্রহানুতে পরিনত হয়।

Ceres নামক গ্রহানুটা পূর্বজন্মে এইরকম একটা ধূমকেতু ছিল 🙂 । তখন পুরা সৌরজগত জুড়ে সে লম্বা লেজ ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াতে । এখন লেজ কাটা যাওয়ার পর শান্তভাবে মংগল গ্রহের পাশে চুপচাপ ঘুরে বেড়াচ্ছে। লম্বা লেজের কারনে ধূমকেতুকে সহজেই চোখে পড়ে। পৃথিবীর আশে পাশে চলে আসলে খালি চোখেই ঝাটার মত ধূমকেতু দেখা যায়। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে জ্যোতিষীরা ধূমকেতু দেখেছেন। প্রাচীন বিবরনে বা ছবিতে বা ক্যান্টারবেরি ক্রনিকলের মত সরকারি ডাইরিতে মাঝে মাঝেই এদের বিবরন পাওয়া যায়।

Halley's Comet | Spherical Chickens in a Vacuum



অনেক ধূমকেতু নির্দিষ্ট সময় পর পর পৃথিবীর আশেপাশে ঘুরতে আসে। যেমন হ্যালির ধূমকেতু প্রতি ৭৫ বা ৭৬ বছর পরপরই পৃথিবীর কাছে চলে আসে।

ইমপ্যাক্ট এর দিক দিয়ে গ্রহানু আর ধূমকেতুর মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। দুইটাই একই রকম ক্ষতি করতে পারে। ইনফ্যাক্ট আমরা নিশ্চিত নই, টাংগুশকা তে গ্রহানু আছড়ে পড়েছিল, নাকি ওটা কোনো ধূমকেতু ছিল।



৪.


পৃথিবীর বয়স কম-বেশি ৪৫০ কোটি বছর। এই কয়েক কোটি বছরে প্রচুর ধূমকেতু বা গ্রহানু এসেছে পৃথিবিতে । অনেক গর্ত করেছে। তবে সেই সব গর্তের অধিকাংশই পূরন হয়ে গেছে বায়ুপ্রবাহ বা নদীর স্রোতের কারনে। অল্প কিছু গর্তের আলামত দেখা যায় শুধু ।

কিন্তু চাদে কোনো বায়ুমন্ডল নাই। কোনো বায়ুপ্রবাহ নেই , কোনো নদীর স্রোত নেই। ফলে পৃথিবীর উল্কাপাতের তুলনায় চাঁদের উল্কাপাতে দুইটা জায়গায় বড় পার্থক্য থাকবে ।

প্রথমত, চাঁদে যেহেতু বায়ুমন্ডল নেই, তাই বাতাসের সাথে ঘর্ষনে উল্কায় আগুন জ্বলে উঠবে না । সেটা ডাইরেক্ট চাঁদের মাটিতে গিয়ে আঘাত করবে । ছোটখাট ভূমিকম্প হবে। মাটিতে গর্ত হবে। অনেক মাটি/পাথর ছিটকে পড়বে

দ্বিতীয়ত, বায়ুপ্রবাহ বা নদীর স্রোত না থাকার কারনে গর্তগুলো যেমন অবস্থায় তৈরি হয়েছে, ঠিক তেমন অবস্থাতেই থাকতে দীর্ঘদিন। ভূমিকম্প ,বা আগ্নেয়গিরির অগ্নুতপাত বা অন্য গ্রহানুর আঘাতেই শুধু গর্তগুলোর মানচিত্র চেঞ্জ হতে পারে।

জিওর্দানো ব্রুনো, যিনি মধ্যযুগের মৌলবাদী চার্চের বিরুদ্ধে গিয়ে বলেছিলেন, সূর্য নয়, পৃথিবী ঘোরে। এই কারনে চার্চ তাকে আগুনে পুড়িয়ে মেরেছিল



তো, যা বলছিলাম, চাদের উত্তর পূর্ব অংশে ২২ কিলোমিটার বড় একটা ক্রেটার পাওয়া গেল । মধ্যযুগের জ্যোতির্বিদ জিওর্দানো ব্রুনোর নাম অনুসারে ওই গর্তের নাম রাখা হল Giordano Bruno crater. গুগল ম্যাপে এখন পৃথিবী ছাড়াও চাদ,মংগল,শনি সহ অনেক গ্রহ উপগ্রহের ম্যাপ দেখা যায় এখন। চাঁদের জিওর্দানো ব্রুনো ক্রেটার খুব সহজে গুগল ম্যাপে দেখতে পাবেন এই লিংক থেকে




১৯৭৬ সালে জিওলজিস্ট Jack B. Hartung খেয়াল করলেন , এই ক্রেটারের অবস্থানের সাথে ক্যান্টারবেরীর সন্যাসীদের পর্যবেক্ষণ মিলে যায় । একটা ধূমকেতু কিংবা গ্রহানু যদি চাদের খুব কাছে আসে, সেক্ষেত্রে সন্যাসীরা দুইটা চাঁদ ভেবে ভুল করতে পারেন। কিংবা চাঁদ দুই ভাগ হয়ে গেছে ভেবেও ভুল করতে পারেন। ক্যান্টারবেরি মংকরা যেখানে বিস্ফোরন দেখেছিলেন (চাঁদের উপরের শিং এর কাছে) , ব্রুনো ক্রেটার টা সেখান থেকে খুব বেশি দূরে না। ইন ফ্যাক্ট , ব্রুনো ক্রেটারটা চাঁদের অন্ধকার অংশের একেবারে উপরের দিকেই অবস্থিৎ , উত্তর -পূর্ব কোণে।





গ্রহানুটা চাদের বুকে আছড়ে পরার পরে প্রচুর পাথরখন্ড , ধূলাবালি ছিটকে বেরুবে । সন্যাসীদের পরবর্তী বিবরন (পুরা চাঁদ ধূলায় ঢেকে গিয়ে ছাইবর্ন হয়ে গিয়েছিল) এর সাথেও সেটা মিলে যাচ্ছে । যথেষ্ট বড় সাইজের ধূমকেতু যদি চাদকে আঘাত করে, তাইলে সেটা তার নিজের কক্ষপথ থেকে একটু সরে যাবে । চাঁদ মোচড়ামুচড়ির ব্যাখ্যা সেটাই হতে পারে।



১৯৭৬ এর পর বিজ্ঞানীমহল এই ব্যাখ্যা নিয়ে মোটামুটি সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। ১৯৮০ সালে জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী কার্ল সাগান এর বানানো Cosmos: A Personal Voyage সিরিয়ালেও এই ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল , যে ক্যান্টারবেরী মংক রা সেদিন চাঁদের বুকে একটা ধূমকেতু আছড়ে পড়ার বিরল দৃশ্য লাইভ দেখেছিলেন।



৫.



তবে এই হাইপোথিসিসের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে । যেমন- ১১৭৮ সালের ১৮ই জুন চাদে যদি ২২ কিলোমিটার বড় কোনো ধূমকেতু/উল্কাপাত ঘটে, তবে প্রচুর পরিমানে পাথরখন্ড চাঁদ থেকে ছিটকে মহাশূন্যে যাওয়ার কথা। এদের মধ্যে অনেক পাথরখন্ড পৃথিবীর বায়ুমন্ডলেও ঢুকে পড়ার কথা । ফলে পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পৃথিবীতে অনেক বেশি উল্কাপাত হওয়ার কথা ছিল । কিন্তু তেমন কিছুই ঘটেনি। বাগদাদ, ভারত কিংবা চীনের কোনো লিখিত ইতিহাসেই সেই সময়ে এমন কোন উল্কা বৃষ্টির কথা পাওয়া যায়নি।


আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে, মহাজাগতিক বড় কোনো ঘটনা ( যেমন -চন্দ্র গ্রহন, সূর্যগ্রহন , বা ধূমকেতুর আগমন) বিশ্বের সব জায়গা থেকেই কম বেশি দেখা যায়। একাধিক জাতির পুরনো ইতিহাস বা ছবিতেই সেই সকল ঘটনার বিবরন পাওয়া যায়। কিন্তু ক্যান্টারবেরির সন্যাসীদের চাঁদ দ্বিখন্ডিত হতে দেখার ঘটনার বিবরন আর কোথাও পাওয়া যায়না।

এসব দিক বিবেচনা করে ক্যান্টারবেরি সন্যাসীদের ঘটনার আরেকটি নতুন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে । এই হাইপোথিসিসের প্রবক্তা University of Arizona Lunar and Planetary Laboratory এর Paul Withers .

ব্যাখ্যাটা হল- ওই সময়ে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের মধ্যেই একটা উল্কাপাত হয়েছিল। (২০১৩ এর রাশিয়ার সেলিয়াবিনস্ক এর মত)। ইংল্যান্ডের কেন্ট এর আকাশ থেকে দেখে মনে হয়েছিল, উল্কাটা ঠিক চাদের উপরে পড়েছে। কারন ওদের আকাশে উল্কাপাতটা হয়েছিল ঠিক চাঁদ বরাবর। এ কারনে ক্যান্টারবুরির সন্যাসীরা লিখেছেন, চাঁদের গায়ে কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু বিশ্বের অন্য এলাকার মানুষ দেখেছে, চাঁদ থেকে বহুদূরে আকাশের অন্য জায়গায় একটা উল্কাপাত ঘটেছে। এ কারনে সেই গুরুত্বহীন ঘটনাটা কেউ আর লিখে রাখেনি।



পরবর্তীতে Paul Withers এর ব্যাখ্যাটাই অধিকাংশ বিজ্ঞানী গ্রহন করেন। বর্তমানে অধিকাংশ মহাকাশ বিজ্ঞানীদের অভিমত হল , ১১৭৮ সালের ১৮ই জুন ছোট কোনো গ্রহানু পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে ঢুকে পড়েছিল , বায়ুমন্ডলেই সেটায় আগুন ধরে যায় , প্রচুর ধোয়া আর আগুনের স্ফুলিঙ্গ কিছু সময়ের জন্য চাদকে ঢেকে দেয় । তবে একটু পরেই সেই ধোয়া কেটে যায়।

চাঁদ আগে যেমন ছিল, তেমনই থেকে যায় , চাঁদের গায়ে কিছু ঘটেনি। ক্যান্টারবুরির সন্যাসীরা যেমনটা ভেবেছিলেন , তেমন কিছু ঘটেনি।

চাঁদের গায়ে নতুন কোনো কলঙ্ক লাগেনি সেদিন।


তথ্যসূত্র-


১।Cosmos: A Personal Voyage by Carl Sagan (1980)- Episode 4
২।https://en.wikipedia.org/wiki/Gervase_of_Canterbury
৩।https://en.wikipedia.org/wiki/Giordano_Bruno_(crater)
৪।https://www.youtube.com/watch?v=9sTdtS8NMSM
৫।https://science.nasa.gov/science-news/science-at-nasa/2001/ast26apr_1
৬।https://patrickmurfin.blogspot.com/2016/06/monks-claim-something-went-boom-on-moon.html
৭।https://www.wired.com/2008/06/june-18-1178-english-monks-observe-lunar-explosion/
৮।http://www.spaceref.com/news/viewpr.html?pid=4534 https://io9.gizmodo.com/why-did-a-group-of-medieval-monks-see-part-of-the-moon-1694716988
৯।https://en.wikipedia.org/wiki/Chelyabinsk_meteor
১০।https://en.wikipedia.org/wiki/Tunguska_event
১১। http://sirius.bu.edu/withers/media/bruno/scinasabruno.html






Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!