এ মিস্ট্রি অব ফোর্থ সেঞ্চুরি: পাঠ পর্যালোচনা

Reading Time: 4 minutes

অভেদ্য রহস্যে ঘেরা এক অবিরাম যাত্রার উপাখ্যানের নাম-ই জীবন। আর সে জীবনের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ যে দর্পণে প্রতিফলিত হয়, তার নাম সাহিত্য। কোনো কোনো সাহিত্যকর্ম কখনো কখনো জীবনের বাস্তবতাকে ছাড়িয়ে যায়; বাস্তব থেকে বাস্তবতর হয়ে ওঠে। তখন সে সাহিত্যকর্মকে সাহিত্যের ধরা-বাঁধা গণ্ডিতে আর আটকে রাখা যায় না।

এমনই এক সীমানা-ছাড়িয়ে-যাওয়া সাহিত্যকর্ম নিয়ে পাঠকসমাজে হাজির হয়েছেন সমকালীন বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক জিমি তানহাব। তাঁর এই সাহিত্যকর্মের নাম “এ মিস্ট্রি অব ফোর্থ সেঞ্চুরি”। এই জীবনঘনিষ্ঠ উপন্যাসে কোন সময়কালের আলোচনা করা হয়েছে, তা নাম শুনে নিশ্চয়ই সহজেই অনুমেয়। জীবন যাত্রার উত্থান-পতনের পাশাপাশি মানব মনের জটিলতা ও জীবনপ্রবাহে তার প্রভাব এই উপন্যাসটিকে আলাদা উচ্চতা দান করেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, নাম দেখে অনেকে এটাকে অনুদিত উপন্যাস অথবা বিদেশি ভাষায় রচিত উপন্যাসের ছায়া অবলম্বনে রচিত উপন্যাস বলে ভুল করেন। উপন্যাসের নামটি ইংরেজি হলেও আসলে এটা বাংলা ভাষায় রচিত মৌলিক উপন্যাস।   

কাহিনি সংক্ষেপ 

চতুর্থ শতাব্দীর শেষ দিককার কথা। গ্রিসের এক গভীর অরণ্যের মধ্যে বিপত্নীক কাঠুরে নিকোলাস ও তার একমাত্র শিশু সন্তান অ্যালেক্স বাস করে। বনের কাঠ কেটে ও তা নিকটস্থ বাজারে বিক্রি করে যে যৎসামান্য অর্থ পাওয়া যায়, তা দিয়েই বাপ-বেটির জীবন কোনোভাবে চলে যায়। সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও তারা কেউ অসুখী ছিল না। বেশ ভালোভাবেই তাদের দিন কেটে যাচ্ছিল। ঘটনাচক্রে এক অদ্ভুত লোকের সঙ্গে নিকোলাসের দেখা হয়। এরপর একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটতে থাকে। একপর্যায়ে নিকোলাসকে নিজের জীবন পর্যন্ত দিতে হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবে অ্যালেক্সের জীবনেও আমূল পরিবর্তন আসে। তার জীবনে নতুন পুরুষ আসে, আসে প্রেম। এর অন্তরালে এক ব্যর্থ প্রেমিকের হতাশার চিত্র অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তাঁর অনুভূতি ব্যাখ্যার প্রসঙ্গে কবি পৃথ্বীরাজ চৌধুরী রচিত পত্র কবিতার লাইন প্রণিধানযোগ্যঃ

“যারা চলে যায়, কে বলল শুধু তাদেরই শবদাহ হয়?”  

শেষ পর্যন্ত এই পরিণয়-ও কি তার জীবনে অভিশাপের কারণ হয়ে দাঁড়াবে? অ্যালেক্স কি পারবে তার পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে? জানতে হলে শ্বাসরুদ্ধকর এই উপন্যাসের গল্পের শেষাবধি চোখ রাখতে হবে। 

চরিত্র বিশ্লেষণ 

এই উপন্যাসে বেশ কিছু চরিত্র চিত্রিত হয়েছে। এর মধ্যে মুখ্য চরিত্র হিসেবে রাখা হয়েছে অ্যালেক্স ও লিওকে। ঘটনাচক্রের শুরুতে লিওর উপস্থিতি না থাকলেও বাকি পুরোটা সময় জুড়ে তার সরব উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়৷ সত্যি বলতে, বাকিটা সময় তার উপস্থিতি উপন্যাসের গল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। চরিত্রের বিচারে অ্যালেক্সকে গল্পের নায়িকা এবং লিওকে গল্পের নায়ক বলা যেতে পারে। কারণ মূলত তাদের দুজনকে কেন্দ্র করেই মূল কাহিনি অগ্রসর হয়েছে। রহস্য গল্পের পাশাপাশি তাদের দুজনের পরিণয়ের বিষয়টি ঔপন্যাসিক অত্যন্ত চমৎকার ভাবে তুলে ধরেছেন পাঠকের সামনে। সবমিলিয়ে তাদেরকে প্রেমিক-প্রেমিকা হিসেবে যতটা না উপস্থাপন করা হয়েছে, তার চেয়ে বড় করে উপস্থাপন করা হয়েছে পরষ্পরের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হিসেবে। হ্যাঁ, সঙ্গী! তথাকথিত প্রেমিক-প্রেমিকার পরিচয় থেকে বেরিয়ে এসে অ্যালেক্স ও লিও পরষ্পরের সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়ে উঠেছে। উপস্থাপনের এই অনন্যতার জন্য ঔপন্যাসিক আলাদা করে ধন্যবাদ পাবার যোগ্য  দাবিদার। 

উপর্যুক্ত দুইটি মুখ্য চরিত্রের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে রাখা হয়েছে একজোড়া লাল জুতোকে। শুনতে অবাক লাগলেও একজোড়া লাল জুতো এই উপন্যাসের গল্পে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রয়েছে। প্রসঙ্গত, উপন্যাসের গল্পে সাধারণত প্রাণীবাচক চরিত্রের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এই উপন্যাসে তার ব্যতিক্রম চোখে পড়েছে। গৎবাঁধা নিয়মের বাইরে গিয়ে ঔপন্যাসিক একজোড়া লাল জুতোকে গল্পের প্রয়োজনে হাজির করেছেন। কিন্তু তাতে উপন্যাসের গল্পপ্রবাহে বিন্দুমাত্র হেরফের হয়নি। বরং এই ভিন্নতার ফলে উপন্যাসের গল্পে নতুন রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে, যা পাঠক মনে নতুন কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। অন্যান্য পাঠকেরাও এই ব্যাপারে আমার সঙ্গে একমত পোষণ করবেন বলে আমার বিশ্বাস। 

উপন্যাসের আলোচিত চরিত্র নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরে অনেকের কথা-ই বলা হলো না। বলা হলো না জনদরদী যুবরাজ ইথান মিরিউলাস এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর ও সেনাপতি প্যারিসের কথা। বলা হলো না প্রিন্সেস রিভান ও তাঁর দুই সন্তান বোহেম ও গ্লোরিয়ার কথা। নির্দিষ্ট গণ্ডির এই আলোচনায় বাদ পড়ে গেল সম্রাট, গুপ্তচর সাইলাস, রোমের জ্ঞানী ব্যক্তি থ্যালামাস, তিন দস্যু ভিটাস, থরমিস ও ফ্যালিপের কথা। আরো বলা হলো না মোজেস সওদাগর ও তাঁর পরিবারের সদস্য সহ অনেক চরিত্রের কথা। তন্মধ্যে এলিয়ানা, অলিভার ও লুসিয়াসের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ভাষারীতি বিশ্লেষণ ও পাঠপ্রতিক্রিয়া

চরিত্র চিত্রায়ণ নিয়ে তো অনেক কথা হলো। এবার উপন্যাসের ভাষারীতি ও পাঠপ্রতিক্রিয়া নিয়ে কথা বলবার পালা। চলিত গদ্যরীতিতে রচিত এই উপন্যাসের পুরো কাহিনি অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে। ঘটনাপ্রবাহ বর্ণনায় ঔপন্যাসিকের বিশেষত্ব চোখে পড়বার মতো। অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ভাষায় বর্ণিত হওয়ায় তা সহজেই পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখতে সক্ষম। এদিক দিয়ে ঔপন্যাসিক সার্থক হয়েছেন বলা যায়। সত্যি বলতে, পাঠক হিসেবে কখনো এক মুহূর্তের জন্যেও মনে হয়নি যে, এটা ঔপন্যাসিকের প্রথম রচনা। পুরোটা সময় পরবর্তী অংশ জানবার তীব্র আগ্রহবোধ কাজ করেছে। এই কারণে ৪০৫ পেজের এই ঢাউস সাইজের বইটি পড়তে মোটেও বিরক্তি জাগেনি। রহস্য গল্পের পাশাপাশি মানব সম্পর্কের জটিলতা উপন্যাসের গল্পকে আলাদা অনন্যতা দান করেছে। আশা করি, এই বিষয়টি অন্য পাঠকদের কাছেও ভালো লাগবে। 

ভালো না লাগা দিকসমূহ

এবার বইটির ভালো না লাগা দিকসমূহ নিয়ে কথা বলব। প্রত্যেকটি জিনিসের ভালো দিকের পাশাপাশি কিছু খারাপ দিকও থাকে। এই বইটিও তার ব্যতিক্রম নয়। বইটির বিভিন্ন দিক যেমন ভালো লেগেছে, তেমনি কিছু কিছু জায়গায় বানান ভুলের বিষয়টি দৃষ্টিকটু লেগেছে। এর পাশাপাশি ঘটনার ধারাবাহিক বর্ণনার ক্ষেত্রে কিছুটা অসামঞ্জস্যতা চোখে পড়েছে। এই বিষয়গুলো ঔপন্যাসিক ভবিষ্যতে বিবেচনা করবেন বলে আমার বিশ্বাস। এছাড়া সার্বিক বিচারে ইতিহাস আশ্রিত এই বইটি আমার কাছে এক কথায় সুখপাঠ্য বলে মনে হয়েছে। 

পছন্দের উক্তিসমূহ 

  • যুদ্ধ কোনো খেলা বা বিনোদন নয় যে, তা দেখার জন্য এত উদগ্রীব হতে হবে। যুদ্ধ বড়ই নির্মম, যেখানে আহতদের হাহাকারে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। আর সে বাতাসে মিশে থাকে তাজা রক্তের গন্ধ। 
  • বিজয় অর্জনের জন্য প্রয়োজন বীরত্ব আর বিজয় রক্ষার জন্য প্রয়োজন বিচক্ষণতা। 
  • মাতৃশিক্ষাই একজন রাজপুত্রকে ভালো বা খারাপ সম্রাট হিসেবে গড়ে তোলে।
  • যুদ্ধ আসলে কাউকে উপকৃত করে না, বিজয়ীদেরও নয়।
  • কেউ একটু ভালোবাসা পাবার জন্য হাহাকার করে মরে আর কেউ ভালোবাসা কী তাই বোঝে না।
  • কোনো কোনো ক্ষেত্রে সহানুভূতি এবং সমবেদনা বড়ই বেমানান।
  • অন্ধকার হাহাকারের! অন্ধকার হতাশার! অন্ধকার আর্তনাদের! 
  • কখনো কখনো মানুষের মৃত্যু হয় অন্তরে।
  • দেবতাকে ভক্তি করা যায়, প্রার্থনা করা যায়, কিন্তু প্রিয়তমার আসনটিতে তো আর বসানো যায় না।
  • কখনো কখনো বলপ্রয়োগের অপর নাম কাপুরুষতা।

পাঠ অনুভূতি সুখের হোক! 

রেটিংঃ ৭.৫/১০

এক নজরে বইটি সম্পর্কিত তথ্য

বইয়ের নামঃ এ মিস্ট্রি অব ফোর্থ সেঞ্চুরি  

লেখকঃ জিমি তানহাব

বইয়ের ধরনঃ ইতিহাস-আশ্রিত রহস্য উপন্যাস 

প্রকাশনাঃ ঐতিহ্য  

প্রথম প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

প্রচ্ছদঃ রেড কোলস

পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ৪০৫

মুদ্রিত মূল্যঃ ৭৫০ টাকা

ISBN No: 978-984-776-341-5

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!