ওশোর হেরাক্লিটাস পাঠ

Reading Time: 4 minutes

ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে যে পণ্ডিত বা সাধু হেরাক্লিটাসকে বেশ ভালো বুঝতে পেরেছেন বা রপ্ত করেছেন তিনি হলেন শ্রী রজনীশ ওশো। ১৯৭৮ সালে ‘দ্য হিডেন হারমোনি’ নামে তার একটি বই প্রকাশিত হয় যেখানে হেরাক্লিটাসের উপরে তার সিরিজ লেকচার জায়গা পায়। বইটি পড়ে মুগ্ধ হয়েছি এবং খুব ভালো লেগেছে যে এক ভারতীয় সন্ত হেরাক্লিটাসকে ভালোভাবে বুঝতে পেরেছেন এবং ওই বুঝাপড়া সুন্দর ও সহজভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। হেরাক্লিটাস পাঠে আমি ওশোর ওই বইটি বা লেকচার সিরিজটি অত্যন্ত উপকারী ও কার্যকরী বলে মনে করি।

ওশো তার বইয়ের বা আলোচনার শুরতেই স্বীকার করে নিয়েছেন ‘হেরাক্লিটাস একমাত্র গ্রীক দার্শনিক যাকে জানার পর থেকে/আজীবন ভালোবেসে এসেছি।’ এর পেছনে যে কারণ উল্লেখ করেন তা সরল অর্থে এমন; হেরাক্লিটাস সত্যিই সুন্দর/চমৎকার এক দার্শনিক। তিনি যদি ভারতে বা প্রাচ্যে জন্ম নিতেন তাহলে তিনি বৌদ্ধ হিসেবে স্বীকৃতি পেতেন। কিন্তু গ্রীক ইতিহাস, গ্রীক দর্শনে তিনি যেন একজন আগন্তুক, এক অপরিচিত ব্যক্তি। গ্রীসে তিনি আলোকিত মানুষ হিসেবে পরিচিত নন বরং তার পরিচিতি দুর্বোধ্য দার্শনিক হিসেবে।তার নামের সঙ্গে নেতিবাচক অভিধাগুলো লেপ্টে থাকে। এর পেছনে এরিস্টটলের মতো অনেক বড় দার্শনিকরা দায়ী। হেরাক্লিটাসকে কোন দার্শনিকই মনে করতেন না এরিস্টটল।সর্বোচ্চ হলে হেরাক্লিটাসকে কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারেন। এজন্য দেখা গেছে মূল ধারার পাশ্চাত্য দর্শন থেকে হেরাক্লিটাসকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে।

ওশো  মনে করেন, যদি হেরাক্লিটাসকে পাশ্চাত্য গ্রহণ করতো তাহলে পশ্চিমা দর্শনের ইতিহাস ভিন্ন পথে আগাতো। পাশ্চাত্য তাকে ঠিকভাবে বুঝতেই পারেনি।তিনি পশ্চিমা চিন্তার মূল স্রোত থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে গেছেন। হেরাক্লিটাস এশিয়ার বুদ্ধ বা চীনের লাও জুর মতো। গ্রীসের মাটি তার জন্য উপযুক্ত ছিল না। প্রাচ্যে জন্ম নিলে তিনি এক মহীরুহ হতেন যা থেকে লাখো লাখো মানুষ উপকৃত হতো, আলো পেতো, নতুন পথের দিশা পেতো। কিন্তু গ্রীকদের কাছে তিনি যেন পারিয়াহ এক চরিত্র, বড় অদ্ভূত, বড় অস্বাভাবিক। মনে হয় তিনি কোন গ্রীক চরিত্র নয়।একারণে গ্রীক চিন্তার ইতিহাসে হেরাক্লিটাসকে পার্শ্বচরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং ধীরে ধীরে তার বইয়ের বিভিন্ন অংশের মতো তার নামটিও মলিন হয়ে পড়ে।

এখানে মনে রাখার মতো বিষয় হলো হেরাক্লিটাস যখন জন্মগ্রহণ করন তখন মানবতা তার সর্বোচ্চ শিখরে দাঁড়িয়েছিল এবং বিশাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। কোন এক ব্যক্তির জীবনে যেমন বিভিন্ন স্তর বা পর্ব থাকে তেমনি মানবতায় বিভিন্ন পর্ব পাড়ি দিয়ে আজকের জায়গায় পৌছেছে। সাতবছর অন্তর অন্তর মানব শরীরে রূপান্তর ঘটে এবং প্রতিটা পর্ব শেষে সে নতুন মানুষে দাঁড়ায়।৭০ বছরের গড় আয়ুতে একটি মানুষের জীবনে অন্তত দশবার রূপান্তর ঘটবে।

মানবশিশুর মতই বিভিন্ন পর্ব পার হয় মানবসভ্যতা।আড়াই হাজার পূর্বে চিন্তাজগতে, ধর্মীয় ভাব-বিপ্লবে মানবজাতি তার চূড়ায় পৌছেছিল। মানবজাতির উত্তঙ্গ ওই মুহূর্তটা কেউ যদি ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারে তাহলে সহজেই কেউ মুখ্য লাভ বা আলোকিত হতে পারে, অন্য সময় যা কিছুটা কষ্টকর। অবশ্য অন্য সময়েও এরকম কিছু কিছু মহান ব্যক্তি জন্ম নেন যারা আসলে সময় ও সমাজকে পাল্টে দেন বা সমূলে নাড়িয়ে দিতে পারেন। কিন্তু মানবজাতির ইতিহাসে মাঝে মাঝে এরকম বিরল কিছু মৌসুম আসে যখন শ্রেষ্ঠ মানবসন্তানদের সৌরভে পুরো বিশ্বপ্রান্তর বিমোহিত হয়ে যায় বা ভেসে যায় তার চিন্তার আলোকচ্ছটায়। ওই চূড়ায় থাকা মুহূর্তটা টইটুম্বুর টালমাটাল নদীর মতো-যা সব তীর ছুয়ে যায় সবাইকে ভাসিয়ে সমুদ্রে নিয়ে যায়।

মানবজাতির ইতিহাসে খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ এমন একটি সময়। আমরা যদি পুরো বিশ্ব এক্সরে করে দেখি তাহলে দেখবো ওই সময়ে ভারতে জন্ম নিচ্ছেন গৌতম বুদ্ধ ও মহাবীর জৈন, চীনে তখন লাওজু, কনফুসিয়াস, চুয়াং জু, ইরানে জরথ্রুস্ট্র এবং গ্রীসে হেরাক্লিটাস, পিথাগোরাস, সক্রেটিস। এর আগে মানবজাতির ইতিহাসে একই সময়ে বিভিন্ন প্রান্তে এরকম মহান মানুষদের সমাবেশ ঘটেনি।মানবজাতি যেন শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে।

আড়াই হাজার বছর পর বর্তমানেও নাকি সেই কালপর্ব চলছে। ওশো মনে করেন এখনো কেউ যদি সেই টইটুম্বুর নদীর স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে পারে তাহলে সেও সমুদ্র ছুতে পারবে।মানবজাতি গত একশো বছরে অসাধারণ সব অর্জন করেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিন্তা-দর্শন, রাজনীতি, সাহিত্য সবকিছুতে সর্বোচ্চ অর্জন করেছে। এখন যে কেউ ইচ্ছে করলে অসাধারণ সব অর্জনের অংশীদার হতে পারে। গত কয়েক দশকে পরিবর্তনটা আরো বৈপ্লবিক ও নাটকীয়।

গ্রীক চিন্তার ইতিহাসে হেরাক্লিটাস ওই বিরল সময়ের বিরল সত্তা।খুবই অন্তর্ভেদী সত্তার অধিকারী হেরাক্লিটাস যেন হিমালয়ের এভারেস্ট চূড়া। তাকে বুঝাপড়া বা জয় করার চেষ্টা খুবই কঠিন, অনেক কাঠখড় ও স্তর-পর্ব পেরিয়ে তাকে অনুধাবন করতে হয়। তাকে জয় করার বা অনুধাবনের আগে বা সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে ভালো করে অনুধাবন করতে হয়, নিজেকে সমূলে নাড়িয়ে নিতে হয়। এজন্য হেরাক্লিটাস দুর্বোধ্য যেমন দীর্ঘদিন ধরে এভারেস্ট ছিল অজেয়।তিনি আসলে দুর্বোধ্য নন, তাকে বুঝাপড়ার সফটওয়ার ও মাধ্যমে গলদ থাকলে তাকে ধরা যাবে না। তাকে বুঝাপড়ার জন্য ব্যক্তিকে ভিন্ন এক সত্তায় পরিণত হতে হবে।জ্ঞান ও চিন্তা জগতে দুধারার লোক থাকে। উদাহরণহিসেবে এরিস্টটলের কথা বলেন ওশো। ধরেন আপনি যদি এরিস্টটলকে বুঝতে চান তাহলে আপনার সত্তার কোন পরিবর্তন লাগবে না।তাকে বুঝাপড়ায় আপনাকে কোন পরিবর্তন করতে হবে না, খানিকটা প্রয়াসই যথেষ্ঠ। কিন্তু হেরাক্লিটাসকে বুঝতে আপনাকে ভিন্ন পথে হাঁটতে হবে।

জীবন সতত পরিবর্তনশীল। হেরাক্লিটাস বলেন, ‘শুধু পরিবর্তনই চিরন্তন।’ শুধু পরিবর্তনটাই পরিবর্তন হয় না, বাকি সব কিছুই পরিবর্তন হয়। হেরাক্লিটাস যখন নদীর দৃশ্যকল্পটা ব্যবহার করেন সেটা খুবই অর্থপূর্ণ। আপনি একই নদীতে দুবার পা রাখতে পারবেন না। তার সাধারণ অর্থ নদীতে পরিবর্তন হয়েছে, নদীর পানি পরিবর্তন হয়েছে। তারো গভীর অর্থ হচ্ছে আপনিও কিন্তু পরিবর্তন হয়েছেন। মানুষের মধ্যও নিত্য পরিবর্তন চলছে।

বুদ্ধের একটা ঘটনা এখানে উল্লেখ করেছেন ওশো। একবার এক ব্যক্তি বুদ্ধকে অপমান করার জন্য তার মুখে থুথু মারেন। বুদ্ধ থুথু মুছে তাকে জিজ্ঞেস করলেন: তোমার কী আরো কিছু বলার আছে? মনে হচ্ছে যেন লোকটি বুদ্ধকে কিছু বলেছে। লোকটি বেশ অবাক হলো কারণ সে এরকম জবাব প্রত্যাশা করেনি।সেখান থেকে চলে গেল লোকটি। সারাদিন ঘুমাতে না পেরে পরদিন আবার এলো। তার কাছে মনে হলো সে বড় অন্যায় করেছে। বুদ্ধের পায়ে পড়ে ক্ষমা চাইলো।

বুদ্ধ বলেন, এখন কে তোমাকে ক্ষমা করবে? তুমি যে লোকটিকে থুথু মেরেছিল ওই লোকটি নেই, এবং যে তুমি থুথু মেরেছিল সে তুমিও তো নেই।তাই কে কাকে ক্ষমা করবে?… তুমি একজন নতুন মানুষ, আমিও একজন নতুন মানুষ।

হেরাক্লিটাসেরও গভীর বার্তা এটাই: সবকিছুই প্রবাহমান এবং সবকিছুই পরিবর্তন হচ্ছে; সবকিছুই পাল্টে যাচ্ছে, কোন কিছুই স্থির নয়। আপনি কোন কিছু ধরে রাখলে সংকটের শুরু। কারণ সবকিছু পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে অথচ আপনি কিছু জিনিস আটকে ধরে রেখেছেন।

হেরাক্লিটাস-কুড়িয়ে পাওয়া মুক্তা প্রকাশক: ঐতিহ্য গায়ের মূল্য: ১৬০ টাকা (২৫% ডিসকাউন্টে ১২০ টাকা)

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!