জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ এর অন্দরমহল

Reading Time: 3 minutes

জীবনানন্দের বনলতা সেন কবিতা হলো এমন এক সৃষ্টি যা তাঁর স্রষ্টার চেয়েও শক্তিশালী। কি আছে সে সৃষ্টিতে?


“হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে
সিংহল সমুদ্র হতে নীশিতের অন্ধকার মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি বিম্বিসার অশোকের দূসর জগতে
আরো দূর অন্ধকার বিদর্ভ নগরে,আমি ক্লান্ত প্রাণ এক,চারদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন আমারে দু’দন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন”


হাজার বছরের ভ্রমণ বলতে পূনর্জন্মকে বুঝানো হয়, কবিতায় আমি শব্দটা কেবল কবিকেই বুঝায় না কবি যার প্রতিনিধিত্ব করে তাকেই বুঝায়। এখানে সামগ্রিক মানুষকে বুঝানো হয়েছে। সমুদ্রের রূপকে বুঝানো হয়েছে মানুষের জীবনটাই একটা মহাসমুদ্রের মতো, মানুষই যেখানে জাহাজ এবং নাবিক। মানুষের জীবনকে এখানে এক সমুদ্র যাত্রার সাথে তুলনা করা হচ্ছে। আর বনলতা সেন সরল অর্থে রক্ত মাংসের নারী মূর্তি।
তবে কবিরা এই মানবীয় নারীমূর্তির রূপকে প্রকৃতিকে বুঝায়। কেউ আবার পরমাত্মাকেও বুঝায়। আবার অনেকে পরম আরাধ্য ‘মোক্ষ লাভ’কেও’ বুঝায়।


হিন্দুধর্ম মতে মানুষ পরিপূর্ণরূপে মোক্ষ লাভ করার আগ পর্যন্ত পূর্ব জন্মের কর্মানুযায়ী পৃথিবীতে নানান রূপে আসে। জীবনানন্দ তাঁর আবার আসিব ফিরে কবিতায় যার স্পষ্ট আকুতি এবং ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এই কবিতায় তিনি তার পূর্ব জন্মের কথা বলেছেন হাজার বছরের ভ্রমণের রূপকে। কবির মোক্ষ লাভের পরম আকাঙ্খাই তাকে তাড়িত করেছে বারবার। সিংহল সমুদ্র,মালয় সাগর,বিম্বিসার অশোকের জগতে কবি তার পূর্ব জন্মে ভ্রমণ করেছেন আরো অন্ধকারময় বিদর্ভ নগরেরও ভ্রমণ করেছেন।


কবির এই ভ্রমণকে কেবল বস্তুগত জগতের ভ্রমণই বুঝায় না তাঁর ভেতরকার আধ্যাত্মিক জগত কিংবা তাঁর কালেক্টিভ আনকনসাস জগতে ভ্রমণের বিষয়টাকেও বুঝায়।
এই কালেক্টিভ আনকনসাস জগতে ভ্রমণের মাধ্যমে ভ্রমণকারী পুরো মানবজাতির সকল অভিজ্ঞতার সাথে একীভূত হয়। যার মধ্য দিয়ে সে তার পূর্ব জন্মের সকল ঘটনা জানতে পারে। যেটা বুদ্ধ তার জাতক সমগ্রে উল্লেখ করেছেন সুনিপুণ ভাবে। রসূল মোহাম্মদও এই অর্ন্তমুখী ভ্রমণের মাধ্যমে সকল নবী রসূলের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং জান্নাত জাহান্নামের সকল ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেন। যেটা ট্রেডিশনালি মিরাজ নামে খ্যাত।
কবি তাঁর এই ভ্রমণের মাধ্যমে কোথাও কোন শান্তি পান নি, কিংবা তাঁর পূর্ব জন্মের মোক্ষ লাভহীনতার করুণ ইতিহাস অবলোকন করেছেন। এই নিদারুণ ক্লান্তিকর ভ্রমণে তাঁকে দু’দন্ড শান্তি দিয়েছে মোক্ষ লাভের পরম আকাঙ্খা। যেটাকে তিনি বনলতা সেন আকারে প্রকাশ করেছেন।

ছবি: বিডি আর্টস


কবিতার পরবর্তী লাইনে তিনি বনলতার রূপ বর্ণনা করেছেন এভাবে, “চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা মুখ তার শাবস্ত্রির কারুকার্য, অতিদূর সমুদ্রের পর হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা,সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে বলেছে সে এতোদিন কোথায় ছিলেন পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন?”

কবির জীবনের এই ক্লান্তির ভ্রমণে মোক্ষ লাভের আকাঙ্খাটা তার কাছে মনে হয়েছে হাল ভাঙা সমুদ্র নাবিকের হঠাৎ সবুজ ঘাসের দ্বীপ চোখে পড়ার মতো পরম আনন্দময়। যে আকাঙ্খা তাকে তার পূর্বের সকল জন্মে ঐশী ইশারার মতো শিহরিত করেছে। তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে এই লাইনটাকে রসূল মোহাম্মদের লাইলাতুলকদরের কোরআন নাযিলের মতো আনন্দদায়ক। অস্তিত্বের গাঢ় অন্ধকারে আলোকিত হওয়ার মতো। যেটা নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ কবিতায় গুহায় প্রভাত পাখির গান এবং সূর্যালোক প্রবেশের সাথে তুলনীয়।


“শিশিরের শব্দের মতো সন্ধ্যা আসে

ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল

পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন

তখন গল্পের তরে জোনাকির রংয়ে ঝিলমিল

সব পাখি ঘরে আসে,সব নদী ফুরায় জীবনের সব লেনদেন

থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন


এই লাইনগুলোতে সন্ধ্যার আগমন,সব রং নিভে যাওয়া,সব পাখির ঘরে ফেরা,সব নদীর সমুদ্রে মিশে লেনদেন ফুরানো এই সবই হলো রূপক। সন্ধ্যা মানে হলো কবির সত্তার চূড়ান্ত অন্ধকারে পতন বুঝায়। তখন তার জীবনের সকল বর্ণিল আয়োজন নিভে যায়। পাখি এবং নদী প্রতীকী অর্থে মানবাত্মাকে বুঝায়। এখানে পাখি এবং নদীর ঘরে ফেরাকে বুঝানো হয় সকল আত্মার পরম আত্মায় মিশে যাওয়াকে।


কোরআনেও বলা হয়েছে,”সবকিছু তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তিত হয়”। সবকিছুর ঘরে প্রত্যাবর্তনকে কেয়ামতের সাথেও তুলনা করা যায়। তারপর
সবশেষে থাকবে চূড়ান্ত অন্ধকার যে অন্ধকারে বসে কবি পরমাত্মার সাথে মুখোমুখি বসবেন। যেটাকে তিনি মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন বলে উল্লেখ করেছেন। এবং এই মুখোমুখি বসাকেই তার মোক্ষ লাভ বলে ব্যাখ্যা করা যায়। যেখানে এসে তার সকল ক্লান্তি দূর হবে। যেখানে এসে তার শত জন্মের প্রত্যাশার লয় ঘটবে। এটাকে নির্বাণ লাভ অর্থাৎ কবির আলোকপ্রাপ্তির সাথেও তুলনা করা যায়।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!