জীবন গড়তে ৭ টি বই

Reading Time: 12 minutes

প্রতিকূল এ সময়ে আপনারা যার যার সক্ষমতার জায়গা থেকে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন আশা করি। লকডাউনে গৃহবন্ধি থেকে প্রায় সকলেই হাপিয়ে উঠেছেন। প্রত্যেকেই কোন না কোনভাবে সময়ের অর্থপূর্ণ ব্যবহারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যাদের খাওয়াপড়ার সংস্থান হচ্ছে তাদের মানসিক ক্ষুধা নিবারণের জন্য ভালো কিছু বই নিয়ে এখানে আলাপ করা যায়। প্রত্যেকের পাঠ অভিরুচি ভিন্ন এবং একেকজনের জীবনে একেকটি বই প্রভাবশালী হয়ে দেখা দেয়। যারা তাদের পছন্দের বই, জীবন গড়ার মতো বই পেয়েছেন তাদের জন্য শুভকামনা। আর যারা এমন কয়েকটি বই খুঁজছেন যেগুলো আমাদের মনে স্থায়ী দাগ কাটে, ভাবনার দুয়ার খুলে, দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দেয়, জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয় তাদের জন্য এখানে এমন সাতটি বইয়ের পরিচয় তুলে ধরা হলো।

১.

গুলিস্তাঁ ও বোস্তাঁ-শেখ সা’দী

গত কয়েক মাস ধরে অল্প অল্প করে পড়ছি এ বইটি। বইটির গভীরতা এত বেশি যে প্রতিদিন একপৃষ্ঠা, দুইপৃষ্ঠার বেশি আগাতে পারছি না। আমার হাতে ফার্সী শে’রসহ ‘গুলিস্তা ও বোস্তাঁ’র সহজ বঙ্গানুবাদ রয়েছে। মীনা বুক হাউস থেকে প্রকাশিত বইটির অনুবাদ করেছেন মোস্তাফিজুর রহমান খাঁন। চার লাইন এবং কখনো কখনো দুই লাইনের ফাসী শে’রের প্রথম সহজ বাংলা অনুবাদ দিয়েছেন। তারপর দিয়েছেন সেগুলোর ব্যাখ্যা, শানে নজুল ও শিক্ষণীয় দিক। ফার্সী পুরোপুরি না বুঁঝলেও এখানে যখন শে’রগুলো পড়ি তখন শব্দের দ্যোতনা এবং অর্থের ব্যপ্তি নাড়িয়ে দেয়।

পারস্যের আরেক মহান কবি হাফিজের ‘দিওয়ানে হাফিজ’ পড়ে ফার্সি শেখার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে (আইএমএল) আরবী ভাষায় ভর্তি হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম আরবীতে কিছুটা সক্ষমতা আসলে ফার্সী শিখতে সুবিধা হবে। ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হলেও মক্তবীয় পাঠপদ্ধতিতে বিরক্ত হয়ে ফাইনাল পরীক্ষা না দিয়ে কোর্স থেকে চম্পট দিয়েছিলাম। এখন শেখ সা’দী পড়তে গিয়ে ফার্সীতে অক্ষমতার বিষয়টি সামনে চলে এলো। অল্পবিস্তর যতটুকু বুঝি তাতে স্পষ্ট- গানের ভাষা, কবিতার ভাষা হিসেবে ফার্সী অসাধারণ।

ভাষার বয়ান শেষে আমরা যদি বিষয়বস্তুতে যাই তাহলে দেখবো গুলিস্তাঁ ও বোস্তাঁর প্রতিটি শে’র কোন নীতিমূলক গল্পকে ধারণ করে এবং প্রতিটি গল্প বড় কোন বার্তা প্রদান করে। উপদেশমূলক প্রতিটি গল্প থেকে জীবন গড়ার রসদ পাওয়া যায়, চিন্তাজগত নাড়িয়ে দেয়ার উপকরণ পাওয়া যায়। বইটির নাম আমরা স্কুলের পাঠ্যবইয়ে পেলেও তা পড়ার সময় বা সৌভাগ্য হয়নি। স্কুল-কলেজে পড়তে না পারার কারণে নিজেকে বঞ্চিত মনে করছি। যাই হউক, একেবারে না পড়ার চেয়ে দেরীতে পড়া অবশ্যই উত্তম। যারা পড়েননি তারা ধীরে ধীরে বইটি পড়া শুরু করতে পারেন। স্কুল-কলেজে পড়ুয়া স্বজনদের পড়তে দেবেন। আশা করি এটা যেকোন পাঠকের ভাবনার জগতে নাড়া দিতে, দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিতে এবং চরিত্রে স্থায়ী প্রভাব রাখতে সক্ষম। বইটি অবশ্যই স্পিডরিডিং করা যাবে না, কয়েক মাস বা প্রয়োজন কয়েক বছর নিয়ে পড়তে হবে। অল্প অল্প করে পড়লে বইটির রস সর্বোত্তম উপায়ে আস্বাদন করা যাবে।

অসংখ্য গল্প বা প্যারাবলের মাধ্যমে কোন একটা বার্তা দেয়ার চেষ্টা করেছেন সা’দী। দীর্ঘ ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কারণে তিনি দেখেছেন অনেক সুশাসক ও নিপীড়ক শাসক। সুশাসকদের প্রশংসা ও নিপীড়কদের কড়া সমালোচনা রয়েছে তার শে’রগুলোতে।

এখানে এমন একটি শে’র উপরস্থাপন করা হলো:

”নাকুনাদ্ জওরে পেশা সুল্তানী

কে নাইয়ায়েদ্ জে গোরগে চুঁ পানি,

বাদ্শাহে কে তারহে যুলম আফগানাদ

পায়ে দেওয়ারে মুলকে খেশ ব-কানাদ্।”

অর্থ হচ্ছে-যালেম কখনও বাদশাহী করতে পারে না। কেননা, চিতাবাঘ কখনও রক্ষকের কাজ করতে পারে না। যে বাদশাহ যুলুমের ভিত্তি স্থাপন করে, সে ডেন নিজেই নিজের বাদশাহীর ভিত্তিমূলে ছুরিকাঘাত করে।

দুই লাইনের অপর একটি শে’র:

তরিকাত্ বজুষ্ খেদমতে খলকে নিস্ত

বা তাসবিহ্ ও সাজ্জাদাহ্ ওদলকে নিস্ত

 অর্থ হচ্ছে: সৃষ্টির সেবা ছাড়া মারেফাত আর কিছুই নয়। শুধু তাসবিহ, জায়নামাজ ও ছেঁড়া পোষাক পরে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়া যায় না।

শেখ সা’দী একজন অসাধারণ চরিত্র। ৯০ বছরের দীর্ঘ জীবন পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগিয়েছেন। বলা হয়, প্রথম ৩০ বছর তিনি জ্ঞানসাধনা করেছেন, দ্বিতীয় ৩০ বছর ভ্রমণ করেছেন এবং শেষ ৩০ বছর আধ্যাত্ম সাধনা করেছেন। জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়ে সে অনুযায়ী জীবনকে পরিচালনা করার মাধ্যমে সর্বযুগের সত্যানুসন্ধানীর জন্য পাথেয় রেখে গিয়েছেন শেখ সা’দী। শেখ সা’দীর প্রতিটি লেখাই জীবন গড়তে সহায়তা করতে পারে। ‘গুলিস্তাঁ ও বোস্তাঁ’ বা তার অন্য যেকোন বই নিয়েই মহত্তর, সুন্দরতম কোন পথের দিকে আগাতে পারেন পাঠক।

২.

অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ-সেনেকা

রোমান দার্শনিক লুকিউস আন্নাইউস সেনেকার লেখা ‘জীবন এত ছোট কেন’ আমার পড়া সবচেয়ে সেরা বইয়ের একটি। বইটির প্রথমদিকেই জীবন এত ছোট কেন সেটি নিয়ে অনেকের প্রশ্নের বিষয়টি তুলে আনা হয়েছে।  বইটি শেষ করলে আমরা উত্তর পাব জীবন ছোট নয়।  তবে এর সাথে কিছু ‘যদি, কিন্তু’ রয়েছে।  সেগুলো অনুসন্ধানের জন্যই বইটি পড়তে হবে।  শুধু পড়লেই হবে না।  সেনেকা যে পথ বাতলে দিয়েছেন সেই মতে কাজ না করলে ফল লাভ হবে না।  এই স্বল্পমেয়াদি জীবনকে যদি ফলবান, মূল্যবান করতে চাই তাহলে সময়কে কীভাবে কাজে লাগাতে হবে সে বিষয়ে কার্যকরী সদুপদেশ নিয়ে হাজির সেনেকা।

বইটি আকারে ছোট কিন্তু গুরুত্বে অনেক ভারী, তাই এক পাঠে চলবে না। সবসময় কাছে রাখার মতো একটি বই। বইটিতে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা এসেছে। যেমন অনেকেই এই প্রশ্ন করে মানুষ এত অল্প দিন বাঁচে কেন, মানুষের জীবন এত ছোট কেন?

অনেকের মাথায় এই প্রশ্ন জাগে, কত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণি, অণুজীব, ভাইরাস আছে যা মানুষের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি সময় বাঁচে কিন্তু মানুষ কেন এত অল্প সময় বাঁচে? মানুষ যেখানে কত বড় বড় কাজ করতে পারে সেখানে কিছু প্রাণিকে মানুষের চেয়ে পাঁচগুণ, দশগুণ বেশি সময় দিয়ে রাখা হয়েছে যাদের ভোজন-আহার ও বাচ্চা পয়দা ছাড়া আপাত আর কোনো কাজ নেই।

মানুষকে কম সময় দেয়া হয়েছে এটি স্বীকার করতে সেনেকা নারাজ। তিনি মনে করেন, আমাদেরকে অল্প সময় দেওয়া হয়নি বরং আমরা আমাদের সময়ের বড় অংশটাই অপচয় করি। আমাদের সময়ের পুরোটা যদি ভালোভাবে কাজে লাগানো যায় তাহলে সে সময়ের মধ্যেই অনেক বড় বড় কাজ করাই সম্ভব।  কিন্তু এটা যদি হেলায় উড়িয়ে দেওয়া হয়, শুধু ভোগে বিলিয়ে দেওয়া হয়, কোনো মহান উদ্দেশ্যে কাজে লাগানো না হয় তাহলে দেখা যাবে সময়টা কখন যে হাওয়ায় উড়ে গেছে, একেবারে টের পাওয়ার আগেই।

বেশিরভাগ মানুষই কীভাবে অন্যের জন্য বাঁচে, অন্যের জীবন যাপন করে এবং সবচেয়ে কম কাছের থেকে যায় নিজের কাছে, এর উপলব্ধি হবে বইটি পড়ে। মানুষ কেমন অদ্ভুতরে আচরণ করে, এমনকি নিজের সঙ্গেও তারা তাদের মালিকানায় থাকা জায়গা-জমির এক ফুটও যদি অন্য কেউ নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে তাহলে কেমনে ক্ষেপে যায়, তেড়ে আসে, এমনকি জান কুরবান করে ফেলে বা অন্যেরটা নিয়ে ফেলে  অথচ কোনো মানুষের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ যদি থাকে সেটা হলো সময়। আমরা সেই মূল্যবান সম্পদ সময়টিতে কীভাবে বিভিন্ন মানুষকে ভাগ বসিয়ে দিতে দেই? এবং জায়গা-জমি, অর্থ-সম্পদের ক্ষেত্রে বড় কিপটা হলেও সময় সম্পদ বিতরণের ক্ষেত্রে আমরা অনেক বদান্য।  যাকে তাকে মালিকানা দিয়ে দেই এই মহামূল্যবান সময় বা সময়ের বড় অংশটুকুর।  সেনেকার মতে এটা এমন বড় ডাকাতি যেটা মালিক টেরই পায় না।

৩.

দ্য স্টোরি অব ফিলসফি-উইল ডুরান্ট

কিছু কিছু বই আছে যেগুলো মনে হবে যেন এক সমৃদ্ধ খনি। সেখানে মেলে নানা মণি- মুক্তা, মূল্যবান সম্পদ। সেসব সম্পদ আবার কিপটে লোকের মতো সিন্দুকে তালা দিয়ে রাখতে হয় না। এ সম্পদ এমন যা বিলিয়ে দিলে বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।

উইল ডুরান্ট তার দ্য স্টোরি অব ফিলসফিতে এমন মহামূল্যবান সম্পদের সমারোহ ঘটিয়েছেন। পাশ্চাত্য দর্শনের আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস এই ৭০০ পৃষ্ঠার বইয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন।

এই সুদীর্ঘ সময়ের মধ্যেকার বিভিন্ন দার্শনিকদের জীবন ও প্রধান দার্শনিক কর্মকা-গুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। যেকোনো স্তরের পাঠক দর্শনের দুনিয়ায় প্রবেশ করতে, আড়াই হাজার বছরের গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ও তাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজের সাথে পরিচিত হতে পরম বন্ধু হিসেবে কাছে পেতে পারে দ্য স্টোরি অব ফিলসফিকে।

উইল ডুরান্টের বড় যে শক্তির জায়গা সেটি হলো তার সমৃদ্ধ কিন্তু সহজবোধ্য ভাষা। উইল ডুরান্ট স্বয়ং নিজে ইতিহাসের দর্শনের বড় পুরোহিতদের একজন। এজন্য দর্শনের অগ্রযাত্রার কোন পর্বটাতে আলো ফেলতে হবে, দর্শনের কোন রথি মহারথীকে জনসমক্ষে পেশ করতে হবে তা তিনি বেশ ভালো করেই জানেন। এজন্য বইটির আঙ্গিক, বুনন ও বিস্তারে পরিপক্বতা ও নিপুণতার ছাপ স্পষ্ট করে প্রতিভাত হয়।

তার লেখা প্রতিটি ইতিহাস গ্রন্থই একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতার সন্ধান দেয়

দর্শনের বিস্তৃত দুনিয়ায় প্রবেশ ও দখল করতে আগ্রহীদের জন্য সবচেয়ে সুন্দর ও কার্যকর একটি দরজা হতে পারে উইল ডুরান্টের দ্য স্টোরি অব ফিলসফি।

৪.

দ্য সেয়িংস অব কনফুসিয়াস

কনফুসিয়াস ছিলেন একই সাথে একজন রাজনীতিবিদ, কবি, ঐতিহাসিক, দার্শনিক এবং সাধু। একই সঙ্গে অনেক কিছুর মিশেল।

শিক্ষার এই নিত্য নিম্নমুখী যাত্রার প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে অতীতে ফিরে দেখতে চাচ্ছিলাম এমন শিক্ষক কি ছিলেন যাদেরকে ছাত্ররা মন থেকে সম্মান করত? যাদের জ্ঞান সমকাল থেকে শুরু করে তৎপরবর্তী বিভিন্ন যুগে মানুষকে দিশা দিত? এই অনুসন্ধান চালিয়ে দেখলাম মানবজাতির ইতিহাসে সেরা কয়েকজন শিক্ষকের তালিকাতে বেশ সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত কনফুসিয়াসের নাম।

চীনে কয়েক হাজার বছর ধরে অনেক সম্মানিত এবং আদৃত মহামানব হিসেবে স্বীকৃত হয়ে আসছেন তিনি, বর্তমানে যার নাম বিশ্বের আনাচে কানাচেও উচ্চারিত হচ্ছে।  চীনের তিন মহারথী লাও জু, সান জু আর কনফুসিয়াসের শিক্ষা সবসময় আলো জাগানিয়া।

কনফুসিয়াসের শিক্ষার একটা বড় দিক হচ্ছে এটা একেবারে পরিবার থেকে শুরু করার কথা বলেন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সুসংহত ও সুন্দর সম্পর্ক থাকলে সবচেয়ে বড় পরিবার যে রাষ্ট্র সেখানেও সুন্দর সম্পর্ক নিশ্চিত হয়। কারণ রাষ্ট্রও তো একটি বৃহৎ পরিবার।  ছোট্ট পরিবার থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা আমাদের বৃহৎ পরিবারে খুবই কাজের হিসেবে ঠেকে।

কনফুসিয়াসের মতে-‘আমরা তিনটি উপায়ে প্রজ্ঞা লাভ করি: প্রথমত, গভীর চিন্তা বা অনুধ্যানের মাধ্যমে যেটা মহত্তম উপায়; দ্বিতীয় যে উপায়ে প্রজ্ঞা লাভ করি সেটা হলো অনুকরণ, যেটা সহজতম; আর তৃতীয় উপায় হচ্ছে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, যেটা সবচেয়ে তেতোময়।’

শিশু প্রথম বড় শিক্ষাটা পায় তার পরিবার থেকে। সেখানে বাবা-মার আচার আচরণ শিশুর জীবনে প্রভাব বিস্তারী ভূমিকা রাখে। পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে একজন শিক্ষার্থীর মন-মগজ-মনন ও চরিত্র গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান।  শিক্ষকদেরকে অনুকরণ করে শিক্ষার্থীরা।  এজন্য শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে খুব সতর্কভাবে নিজেদেরকে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করতে হয়। কনফুসিয়াস বলেন ‘পচা কাঠে নকশা করা যায় না’। এজন্য নষ্ট শিক্ষক, নষ্ট শিক্ষা কাঠামো থেকে বড় মানুষ, ভালো মানুষ বের হওয়া অনেক কঠিন।

কনফুসিয়াস বলেন ‘পচা কাঠে নকশা করা যায় না’। এজন্য নষ্ট শিক্ষক, নষ্ট শিক্ষা কাঠামো থেকে বড় মানুষ, ভালো মানুষ বের হওয়া অনেক কঠিন।

নিজ জন্মভূমি থেকে স্বেচ্ছায় নির্বাসন নিয়ে চীনের বিভিন্ন রাজ্যে ঘুরে ফিরে খুঁজছিলেন সেই দার্শনিক সম্রাটকে। এ যেন প্লোটোর ‘ফিলসফার কিং’ খোঁজার প্রচেষ্টার সাথে তুল্য, বা চাণক্যের চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মধ্যে অখ- ভারতের অধিপতি খুঁজে পাওয়ার আকাক্সক্ষা।

এক শাসক কনফুসিয়াসের কাছে জিজ্ঞেস করেছিলেন: কী কাজ করলে জনগণকে সন্তুষ্ট রাখা যায়? কনফুসিয়াসের উত্তর ছিল :

‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা কর এবং সকল অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনো। তাহলে জনগণ সন্তুষ্ট হবে। আর যদি অপরাধীদেরকে লালন কর এবং ভালো মানুষদেরকে বিতাড়িত কর তাহলে অসন্তুষ্ট হবে।’

একটা দেশের রাজনীতি ও সরকার ব্যবস্থার সাথে সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এবং সে দেশের কৃষ্টি কালচার অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।  ভালো সরকার ব্যবস্থার জন্য এ সবকটি উপাদান একসাথে কাজ করতে হবে।  জু কুং নামে এক শিষ্য কনফুসিয়াসকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘ভালো সরকার কেমন?’ এর উত্তরে কনফুসিয়াস বলেন: ‘জনগণের পর্যাপ্ত অন্ন সংস্থান করলে,  দেশের নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত সৈন্য মজুদ রাখলে এবং দেশের মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হলে তাকে ভালো সরকার বলা যাবে। এখন এ তিনটি জিনিসের মধ্যে যদি একটিকে ত্যাগ করতে হয় তাহলে প্রথমে সৈন্য-সামন্তকে ত্যাগ করতে হবে। তারপর বাকি দুটোর মধ্যেও যদি একটিকে ত্যাগ করতে বলা হয় তাহলে সেটা হবে অন্ন। কারণ কোনো না কোনো সময় মানুষকে তো মরতে হবেই। কিন্তু জনগণের আস্থা ছাড়া কোনো সরকারই টিকে থাকতে পারে না।’

কী অসাধারণ এবং প্রাসঙ্গিক শিক্ষা কনফুসিয়াসের।  তার কথাগুলো আমাদের জন্য কতই না প্রাসঙ্গিক।

৫.

হাউ টু থিঙ্ক লাইক লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি- মাইকেল জে গেল্ব

সকল জিনিয়াসই অনন্য এবং এটা লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির জন্য বড় করে সত্য। এক জীবনে তিনি যা অর্জন করেছেন তা গত চারশো বছর ধরে বিস্ময় উৎপাদন করে যাচ্ছে এবং আগামীর দিনগুলোতেও তা বন্ধ হবে বলে মনে হচ্ছে না। ভিঞ্চির মধ্যে কী এমন গুণ বা মসলা ছিল যে কারণে এমন বিস্ময়কর সৃষ্টিশীল সত্তা হলেন এবং পুরো জীবনে অনন্য সব কীর্তি গড়লেন। ভিঞ্চির সৃষ্টিশীলতার কোনো সূত্র রয়েছে কী? সে সূত্র অনুসরণ করে কারো সৃষ্টিশীলতা বাড়ানো যাবে কি বা ভিঞ্চির মতো বিভিন্ন সেক্টরে অসাধারণ সৃষ্টি করা যাবে কী?

‘হাউ টু থিংক লাইক লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি’ বইয়ের লেখক মাইকেল জে. গেল্ব মনে করেন তা সম্ভব। লিওনার্দোর অনন্য সৃষ্টিশীলতা এবং দীর্ঘ কর্মময় ও বৈচিত্র্যময় জীবনের কিছু সূত্র রয়েছে এবং ওই সূত্রগুলো অনুসরণ করে যে কেউ অসাধারণ কিছু অর্জন করতে পারবে এবং কেউ কেউ ভিঞ্চির মতো সৃষ্টিশীলতাও দেখাতে পারবে। অবশ্য এখানে মনে রাখতে হবে ভিঞ্চির মতো সৃষ্টিশীলতা দেখানোর কথা বলার মানে এটা নয় আপনাকে ‘মোনালিসা’, ‘দ্য লাস্ট সাপার’ আঁকতে হবে, উড়োজাহাজের ডিজাইন করতে হবে, মানবদেহের ছবি আঁকতে হবে। আমরা স্টিভ জবসকে কি সৃষ্টিশীল বলব না বা বিল গেটসদের মতো ব্যক্তিদের বা ইন্টারনেট আবিষ্কারক টিম বার্নাস লিকে বা রবীন্দ্রনাথ ও এ আর রহমানের মতো সৃষ্টিশীলদের? একটা জিনিস লক্ষণীয়, জিনিয়াসদের কাজের খাত এক হতে পারে তবে তাদের অবদান ভিন্ন।

অনন্য ও আপাতঃদৃষ্টিতে অবিশ্বাস্য সব অর্জনের পেছনেও কিছু সূত্র রয়েছে। মাইকেল জে. গেল্ব তার ‘হাউ টু থিংক লাইক লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি’ বইতে ভিঞ্চির সৃষ্টিশীলতার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করেছেন। তিনি বইটিতে বেশ সবল যুক্তির সঙ্গে দেখাতে পেরেছেন কীভাবে বর্তমানের ভিঞ্চির মতো/ধরনের মানুষ/বা অনন্য সৃষ্টিশীল মানুষ হওয়া যায়। তিনি নিজের জীবনের এই সূত্রগুলো প্রয়োগ করে অনন্য সৃষ্টিশীলতার প্রমাণ রেখেছেন। মাইকেল গেল্ব নিজে এক বহুমুখী সৃষ্টিশীল লোক। তাহলে আমরা বুঝতেই পারছি লেখক এমন কিছু সূত্রের কথা বলবেন যা ব্যবহার করে তার সৃষ্টিশীলতার দরজা উন্মুক্ত করেছেন এবং নিজের থেকে সর্বোচ্চটা বের করে আনার চেষ্টা করেছেন।

এখন বেশিরভাগ পাঠকের সন্দেহ সহজেই কাটবে বলে মনে হচ্ছে না। আমাদের মনের ভেতরে এ সন্দেহ থাকতেই পারে-আসলেই কি ভিঞ্চির মতো সৃষ্টিশীল হওয়া সম্ভব? বেশিরভাগ মানুষের মধ্যেই এ সন্দেহ থাকবে এবং এটাই স্বাভাবিক। গেল্ব নিজেও একটা উদাহরণ দিয়েছেন। প্রথমটা একেবারে তার নিজের সঙ্গে আর অপরটা ভিঞ্চির সময়ের। তিনি যখন এ বিষয়ে লেকচারের জন্য আমন্ত্রিত হয়েছেন সেখানে এক অংশগ্রহণকারী তাকে মুখের উপর বলে দিয়েছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি না কেউ লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মতো হতে পারে, তারপরও আপনার লেকচারে এসেছি।’

মাইকেল গেল্ব নিজেও এই সন্দেহকে স্বাগত জানান এবং সমর্থন করেন। ভিঞ্চির উপর কয়েক দশক সময় দিয়ে গেল্ব মনে করেন-ভিঞ্চির মতো সক্ষমতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করলেও সব শিশু তার মতো এরকম সৃষ্টিশীল হতে পারে না। এক্ষেত্রে তিনি ভিঞ্চির এক শিষ্যের কথা টেনেছেন। ভিঞ্চির মৃত্যুর পর তার প্রিয় শিষ্য ফ্রান্সেসকো মেলজি একটি শোকবাণী লিখেছিলেন। সেখানে তিনি লিখেন, ‘এরকম এক অসাধারণ লোকের মৃত্যুতে সকলেই শোক করছে। কারণ প্রকৃতির এমন ক্ষমতা নেই যে এরকম আরেকটা তৈরি করবে।’

ভিঞ্চির শিষ্যের বয়ানটিতে আপনারা সকলেই কিংবা বেশিরভাগই বিশ্বাস রাখতে পারেন এবং তার মতো সৃষ্টিশীলতা নিজের বা কারো জীবনে অর্জন সম্ভব না- এটা বিশ্বাস করে সাধারণের জীবন যাপন করে পৃথিবী থেকে গত হতে পারেন। কিন্তু যারা ভিন্ন মতে, ভিন্ন পথে আস্থা রাখেন-মানুষের অনন্য ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন তারা গেলবের কথায় বিশ্বাস রেখে ব্যাপক লাভবান হতে পারেন। আরেকটা লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি যেমন পাওয়া বা হওয়া সম্ভব না তেমনি তার শেখার ও বৌদ্ধিক চর্চার বিষয়টি অনুসরণ করে স্ব স্ব ক্ষেত্রে অনন্য সৃষ্টিশীলতার প্রমাণ দেয়া সম্ভব বলে মনে করেন গেলব।

শুরুতে কিছুটা অবিশ্বাস হলেও বইটি পড়ার সময় তা দূরে রেখে বসবেন এবং গেল্বের যুক্তি অনুসরণের চেষ্টা করবেন, তিনি কী বলতে চান তা মনোযোগ দিয়ে শুনবেন এবং যেভাবে চর্চা করতে বলেছেন সেভাবে চর্চা করবেন। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আপনি নিজেই দেখতে পারেন ওই কৌশল কার্যকর কি না বা ফাঁপা বুলি। যদি ফল না দেয় তাহলে কোটি টাকার ক্ষতি তো হচ্ছে না? আপনার ব্যর্থতাও তো অনেক বড় শিক্ষক হতে পারে-আপনার জন্য বা আপনার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য?

চলেন অনুসন্ধান করি ভিঞ্চিকে এবং তার সৃষ্টিশীলতার রহস্য অনুধাবনের চেষ্টা করি এবং নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করি-এক্ষেত্রে আমাদের পথনির্দেশক মাইকেল জে গেল্ব।

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির জানা-বুঝার সূত্র এবং তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পন্থা অনেক স্পষ্ট এবং তা অধ্যয়ন বা পাঠ করা যাবে, অনুসরণ ও অনুকরণ করা যাবে এবং প্রয়োগ করা যাবে। ভিঞ্চির জীবন পাঠ করে তার অনন্য সৃষ্টিশীলতার পেছনে সাতটি সূত্র আবিষ্কার করেছেন। এই সূত্রগুলো যে কেউ যে কোনো জায়গায় ব্যবহার করে সফলতার পরিচয় দিতে পারেন। গেল্ব ভূমিকায় জানিয়েছেন, পোল্যান্ডের এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সাতটি সূত্র ব্যবহার করে তার ক্লাস কারিকুলাম প্রস্তুত করেছিলেন এবং উপকৃত হয়েছেন।

হাঁসের বাচ্চা মা হাঁসকে অনুকরণ করে সাঁতার কাটতে শিখে। এরকম প্রায় সব প্রাণির বেলাতেই এটা সত্য-অপরকে অনুকরণ করে মৌলিক জিনিসগুলো শেখে তারা। মানুষের মধ্যেও এই গুণটি বেশ ভালোভাবেই বিদ্যমান। আপনি কাকে অনুসরণ করে বড় হতে চান, বিকশিত হতে চান সে ব্যাপারে আপনার স্বাধীনতা রয়েছে। আপনি নিজেই পরীক্ষা করে দেখতে পারেন-আপনার পছন্দের কাউকে অনুকরণ করে। দেখতে পারেন আপনার মধ্যে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসে কি না। বলা হয়, আমরা যাদের সঙ্গে চলি আমাদের চরিত্র ও মনোজগতে তাদের প্রভাব সর্বাধিক। এজন্য নিজের জীবনে বড় কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসতে হলে মানব সমাজের মধ্যে সবচেয়ে সেরা প্রতিমূর্তি বা মডেলকে অনুসরণ করা উত্তম। কারণ তারা আমাদেরকে মহত্তম ও শ্রেষ্ঠতম পথে নিয়ে যাবেন। মার্কিন ম্যানেজমেন্ট গুরু পিটার এফ ড্রাকার বলেছিলেন, আমাদের কাছের পাঁচ বন্ধুর গড় আয়ের সমান আমাদের আয়। ড্রাকারের এ সূত্রটি অন্যান্য জায়গাতেও প্রযোজ্য বলে মনে করি। আমি মনে করি আমাদের কাছের বা অন্তরঙ্গ পাঁচ বন্ধুর জ্ঞানের সমান হবে আমাদের জ্ঞান। এজন্য মনোবিজ্ঞানী বা চিন্তকরা বা মনীষীরা শ্রেষ্ঠতম সন্তানদের সঙ্গ পান করেন এবং অন্যদেরকে সেদিকে উৎসাহিত করেন।

৬. সক্রেটিসের জবানবন্দি-প্লেটো

সক্রেটিসের বাবা ছিলেন ভাস্কর আর মা ধাত্রী।  সক্রেটিস পরবর্তী জীবনে মা-বাবার পেশাকে ধারণ করেছেন বলে মনে করতেন। ধাত্রী যেমন কোনো মানবশিশুকে পৃথিবীতে নিয়ে আনতে, জন্ম নিতে সহায়তা করেন সক্রেটিসও তেমনি একজন জ্ঞানপিপাসুর জন্মের ক্ষেত্রে ধাত্রীর মতো ভূমিকা পালন করতেন।  আবার একজন ভাস্কর যেমন কঠিন পাথরকে কেটেকুটে সুন্দর মূর্তির রূপ দেন তেমনি দার্শনিক সক্রেটিসও একজন মানবশিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের ক্ষেত্রে নিপুণ ভাস্করের ভূমিকা পালন করেছেন। বৃক্ষ তোমার নাম কী-ফলে পরিচয়। এখন সক্রেটিস কেমন শিক্ষক ছিলেন তার প্রমাণ প্লেটো, অ্যারিস্টটলদের মতো ওস্তাদদের পরম্পরা। তার প্রিয় এবং যোগ্যতম শিষ্যকে নিয়ে বলা হয়, ‘পুরো পাশ্চাত্য দর্শন প্লেটোর ফুটনোট মাত্র’।

প্লেটোর প্রত্যেকটি লেখাতে প্রধান চরিত্র হিসেবে থেকেছেন সক্রেটিস। মনে হচ্ছে যেন সক্রেটিস কথা বলছেন আর প্লেটো নোট লিখছেন। ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। বয়স ত্রিশের দিকে গুরু সক্রেটিসের করুণ বিয়োগের ঘটনাটি এমনভাবেই তাড়িত করেছিল তরুণ প্লেটোকে যে সে তার পুরো জ্ঞানচর্চাকেই সক্রেটিসের পদতলে বিছিয়ে দিয়েছেন। ব্যাপারটা অনেক পরিষ্কার প্লেটো প্রথমদিকে হয়তো সক্রেটিসের দর্শনই সক্রেটিসের মুখ দিয়ে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু তার সেরা লেখাগুলোতে বা শেষদিকের লেখাগুলোতে নিজের দর্শন সক্রেটিসের মুখ দিয়ে বলিয়ে নিয়েছেন। সক্রেটিসের প্রতি তার একাত্ম আনুগত্য ও ভালোবাসার ব্যাপারে কোনো প্রকার সন্দেহের লেশমাত্র নেই।

‘সক্রেটিসের জবানবন্দি’তে এথেন্সের আদালতে দাঁড়িয়ে নিজের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো যুক্তির হাতুড়ি দিয়ে নিপুণভাবে খণ্ডন করেছেন সক্রেটিস। আদালতের সামনে তার পুরো জীবনের ভ্রমণটাও তুলে এনেছেন।  সত্য, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতি তার একনিষ্ঠতার প্রমাণ ঠিকরে বের হবে প্রতিটি উক্তিতে। সক্রেটিসকে খুব কাছ থেকে বুঝতে হলে তার জবানবন্দি পড়তে হবে।  এর একাধিক বাংলা তর্জমা আছে।  ইংরেজিতেও অনেকগুলো সংস্করণ আছে।  যেকোনো একটা পড়ে ফেলতে পারেন।

৭. দি হানড্রেড- মাইকেল এইচ হার্ট

আমার প্রিয় শিক্ষক উইল ডুরান্টের কথায় বলতে হয় ‘আমি মহামানবদের লাজহীন স্তাবক’। বড় মানুষদের জীবন আমাকে বেশ টানে। এজন্য জীবনী, আত্মজীবনী, বড় মানুষদের কথা আমার সবচেয়ে প্রিয় পাঠ্য বিষয়। মাইকেল এইচ হার্টের এই বিশ্বখ্যাত বইটিতে একসাথে একশো জন মহামানবের উপস্থিতি বইটিকে আমার কাছে অনেক আকর্ষণীয় করে তুলেছে।  এজন্য মাঝে মাঝে এই বইটা থেকে কয়েকজন মহামানবের জীবনের উপর দিয়ে একটু ভ্রমণ করে আসি। মহামানবদের জীবন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে আমাদের সামনে উপস্থাপন করতে যে যুক্তি, তথ্য ও তত্ত্ব নিয়ে এসেছেন সেগুলো আমাদের দৃষ্টি খুলে দেবে। তার সাথে দ্বিমত করার যথেষ্ট সুযোগ থাকলেও তার যুক্তির কাছে বশ মানা ছাড়া সুযোগ খুবই সীমিত। ১০০ জন মহামানব বাছাই করা অনেক কষ্টের কাজ আবার তাদের মধ্যে শ্রেণিবিন্যাস করা আরো কঠিন কাজ। মানবসভ্যতার উপর দীর্ঘস্থায়ী অবদানের উপর ভিত্তি করে গুরুত্বের ক্রম অনুযায়ী তিনি একশো জনের জীবন নিয়ে সংক্ষিপ্ত কিন্তু পরিপূর্ণ আলোচনা করেছেন। তার তালিকায় আবার অনেক রথী মহারথী কেন জায়গা পায়নি যে বিষয়ে পরবর্তীতে আরো কয়েকটি অধ্যায় লিখেছেন হার্ট।

বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম ১০০ জন মহামানবের জীবনের সঙ্গে যদি কেউ পরিচয় লাভ করতে চায় সহজেই হাতে নিতে পারে ‘দি হানড্রেড’। মহামানবদের সমৃদ্ধ জীবনের সঙ্গে পরিচয় লাভ করে যে কেউ সমৃদ্ধ হবে সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। মাইকেল এইচ হার্টের ইংরেজি অনেক সুখপাঠ্য। মূল ইংরেজিতে পড়া কঠিন বলে ঠেকবে না বলেই আমার দৃঢ়বিশ্বাস। এক্ষেত্রে একটি সতর্কবাণী দিয়ে দেই। ‘দি হানড্রেড’ নামে বাংলা ভাষায় একাধিক বই পাওয়া যায়। গতবারের বইমেলায় তল্লাশী চালিয়ে দেখেছি অন্তত ১০টি প্রকাশনীতে ‘১০০ মনীষীর জীবনী’ বা ‘শত মনীষীর জীবনী’, ‘দি হান্ড্রেড’ ইত্যকার বিভিন্ন নামে বই বেরিয়েছে যেগুলো ভুয়া। মাইকেল এইচ হার্টের নাম থাকলেও থাকেনা তার বাছাইকৃত ১০০ মহামানব। আমি এরকম একটা বাংলা বই পড়েছি যেখানে অন্তত ৪০ জন ভারতবর্ষের ব্যক্তিত্ব; অথচ হার্টের তালিকায় মাত্র চার-পাঁচজন ভারতবর্ষের। হার্টের ওই তালিকায় নেই মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ব্যক্তিত্ব। বাংলা ভাষায় যে কয়েকটি বই পাওয়া যায় সেগুলো না কোনো অনুবাদ বা না কোনো মৌলিক লেখা। ওই জগাখিচুড়ি বই পড়লে আপনারা বঞ্চিত হবেন। আমি বলব উচ্চ মাধ্যমিক পাস যেকোনো ব্যক্তিই মাইকেল এইচ হার্টের ইংরেজি বুঝতে পারবেন এবং বইটির সৌন্দর্য ও মাহাত্ম্য উপভোগ করতে পারবেন।

নোট: ঐতিহ্য থেকে প্রকাশিতজীবন গড়তে বইথেকে সংক্ষেপিত সংশোধিত আকারে প্রকাশ। সেখানে ২১ টি বইয়ের পরিচয় দেয়া আছে। পাঠকের কাছে তালিকাটি আরো ছোট করার জন্য লেখা। এখানে নতুন যুক্ত হয়েছে মহান কবি দার্শনিক শেখ সাদীরগুলিস্তাঁ বোস্তাঁ আশা করি এই অবরুদ্ধ সময়ে বইগুলো বা যেকোন একটি বই পড়ে আমরা আমাদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবো। বই শুধু বিনোদন বা আনন্দের জন্যই নয়; বই পড়া হউক জীবন গড়তে, জীবন সাজাতে, দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!