টাকা-পয়সার উদ্ভাবন নিয়ে অসাধারণ বই

Reading Time: 5 minutes

নিয়েল ফারগুসনের খুব বিখ্যাত বই The ascent of money. ফিন্যানশিয়াল হিস্টোরির উপরে গল্পের মত করে লেখা বই। মেসোপটেমিয়া সভ্যতা থেকে শুরু করে আজকে যে ডলার সাম্রাজ্যবাদ পর্যন্ত বিবর্তন, তার গুরুত্তপূর্ণ বাঁকগুলো তিনি চিহ্নিত করেছেন।

স্প্যানিশ কনকুইসস্টেডররা যখন রুপার পাহাড় আবিস্কার করে দক্ষিন আমেরিকাতে সেই গল্প, প্রথম দিককার স্প্যানিশ ইনফ্লেশনের গল্প এবং কিভাবে এই আবিস্কারের কারনে আল্টিমেইটলি স্প্যানিশদের মাঝে ফিন্যানশিয়াল ইনোভেশন বিলম্বিত হয়েছিলো, তার বর্ননা আছে এই বইতে। শেক্সপিয়রের শাইলক কেন ধুর্ত ছিলো, ফ্লোরেন্স কিংবা নেপলসে সুদী কারবার কেন শুধু ইহুদীরা করতো অথবা কেন “লোন শার্কেরা” মাইনরিটি থেকেই আসে এইসবের সুলুক সন্ধান করেছেন। ক্রিশচিয়ান স্ক্রিপচারে সুদকে ডিসকারেজ করা হয় এবং মধ্যযুগে তারা সেটা পালন ও করতো কিন্তু তোরাহতে স্পেসিফিক্যালি বলা ছিলোনা। নন জিউশদের সাথে করতে পারার প্রভিশন ছিলো।

এরপরে আসে বন্ড মার্কেটের কথা। ডাচ সিটি স্টেইট এবং ইতালিয়ান সিটি এস্টেট্গুলোর পারস্পরিক সংঘাতের সময় যুদ্ধ খরচ নির্বাহের জন্য বন্ড মার্কেট চালু হয়। পাবলিক ডেবট যারা ভালোভাবে ম্যানেজ করতে পারতো, তারা আল্টিমেটলি জিততো। মেদিচি ফ্যামিলির মতো বনেদী ফ্যামিলিগুলোর ইনকামের আসল উৎস ছিলো বন্ড। রেনেসাঁতে এই ধরনের বনেদী ফ্যামিলিগুলোর অবদান অনেক। এদের স্পনশরশিপে প্রচুর ম্যুরাল হয়েছে, পেইন্টিং হয়েছে ফ্লোরেন্সে, নেপলসে, জেনোয়াতে। এরপরে সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কগুলোর উদ্ভব মোটামুটি কাছাকাছি সময়ে হয়েছে ইংল্যান্ডে ও নেদারল্যান্ডে।

রথসচাইল্ড ফ্যামিলির কথা এসেছে বইয়ে। পাঁচ ভাই ইউরোপের পাঁচ শহরে বসে ছড়ি ঘুরাতো। তাদের ফিন্যানশিয়াল নেটঅয়ার্ক অসম্ভব শক্তিশালী ছিলো। কারেন্সি রেইট আরবিট্ট্রেজের মাধ্যমে, সুদের মাধ্যমে তারা শুরু করে কিন্তু মেইন দাঁওটা মারে নেপোলিয়নিক যুদ্ধের সময়ে। ওয়াটারলুতে নেপোলিয়ন হেরেছিলেন এডমিরাল নেলসনের কাছে কিন্তু আসল কুশীলব ছিলেন রথসচাইল্ড। ব্যাক্তিগত জীবনে খুব কিপটা ছিলেন ভদ্রলোক। ফ্রাঙ্কফুর্টের একটা ঘেটো থেকে উঠে এসে একটা সময় ইউরোপের সকল প্রিন্সের চেয়ে ও শক্তিশালী ছিলেন তিনি। ইনফ্যাক্ট আমেরিকান ফেডের উপর এখনো রথসচাইল্ড ফ্যামিলির প্রভাব আছে বলা শোনা যায়। ওয়াটারলু যুদ্ধের পরে তিনি গোল্ড ধরে রেখে প্রচুর মাল কামান। পরবর্তীতে রথসচাইল্ডরা আমেরিকান সিভিল ওয়ারের সময় ও সঠিক পক্ষ বেছে নেয়, নর্দানারদের সাথে থাকে।

শেয়ার মার্কেটের কথা এসেছে। সতেরোশ শতকে আর্মস্টারডার্ম ও লন্ডনে শুরু কিন্তু আর্মস্টার্ডামে মার্কেট ক্যাপিটালাইযেশন বেশী ছিলো এবং ব্রিটিশ ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানীর তুলনায় ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী কয়েকগুন বেশী সম্পদশালী ছিলো সেই সময়। জয়েন্ট স্টক কোম্পানীর আইডিয়া না থাকলে নিউ অয়ার্ল্ডে চালানো রিস্কি ভেঞ্চারগুলো করা সম্ভব হতোনা। ইউরোপের ল্যান্ডেড জেন্ট্রি টের পাচ্ছিলো যে একদল নতুন পয়সাওয়ালার আগমন ঘটছে যারা হাওয়া থেকে টাকা বানায়। ওয়াল্টার স্কট এবং বোদলেয়ারের মতন লোকেদের চিঠিপত্রে এই নতুন উম্মাদনার উল্লেখ ছিলো। জন লো নামের এক ব্রিটিশ সেই সময় ফ্রেঞ্চ শেয়ার মার্কেটে বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছিলো। “মিসিসিপি বাবল” নামে পরিচিত এই ক্র্যাশে পুরো ফ্রেঞ্চ ফিন্যানশিয়াল সিস্টেম ভেঙ্গে পড়েছিলো, যার ফলশ্রুতিতে কয়েক দশক পরে ভেঙে পড়েছিলো সাম্রাজ্য ও ত্বরান্বিত হয়েছিলো ফরাসী বিপ্লব। লন্ডনের “সাউথ সি বাবল” মিসিসিপি বাবলের মতো বিধ্বংসী ছিলোনা।

জন লো একইসাথে অর্থমন্ত্রী, সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর, এক্সচেঞ্জ কমিশনের প্রধান ও ইনভেস্টর ছিলেন। কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্টের আব্বু বলা যায়। আমাদের দরবেশ সাহেবের চাইতে ও চতুর ছিলেন তিনি। ইন্স্যুরেন্স মার্কেটের উদ্ভব হয়েছিলো স্কটল্যান্ডের এক চার্চে। প্রয়াত মিনিস্টারদের ফ্যামিলির ভরনপোষনের তাগিদ থেকে এর উদ্ভব। সেই সময়েই প্রবাবিলিটি থিওরেম আসছে, বেল কার্ভ আসছে, পরিসঙ্খ্যান নতুন একটা ডিসিপ্লিন হিসেবে দাঁড়াচ্ছে। আজকে ইন্স্যুরেন্স ফান্ডগুলো সবচেয়ে শক্তিশালী প্লেয়ার মার্কেটের। সোস্যাল সিকিউরিটি কনসেপ্টটা কিভাবে লিবারেল ডেমোক্রেসিতে আসলো, জাপান একসময় সোস্যাল সিকিউরিটিতে এত ভালো করছিলো কিন্তু এখন এইজিং পপুলেশনের কারনে কেন তারা সাফার করছে এবং ডেমোগ্রাফির কারনে আমেরিকা ও সামনে এই সমস্যায় পড়বে বলে অনুমান করছেন লেখক।

হাউজিং মার্কেটের শুরু এবং এংলো ইউরোপিয়ান দুনিয়ায় “সেইফ এজ হাউস” এই কথাটা কিভাবে আসলো সেসব নিয়ে লিখেছেন। আয়ারল্যান্ডে ৮৩ ভাগ লোকের নিজের ঘর আছে, এটা পৃথিবীতে সর্বোচ্চ। প্রপার্টি অউনিং ডেমোক্রেসিকে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া আমেরিকা ও কানাডাতে খুব গুরুত্ব দেয়া হয়। বড় বড় হাউজিং ক্র্যাশগুলো ও এইসব দেশেই হয়েছে। আমেরিকান ফেডের চেয়ারম্যান গ্রীন্সপ্যান সাতাশির মন্দা সামাল দিতে পারলে ও ২০০৮ এর সাবপ্রাইম মর্টগেজে কেন অনুমান করতে ব্যার্থ ছিলেন, তারপর এনরন কেলেঙ্কারি, ডটকম বাবল এবং সাতানব্বইয়ের এশিয়ান ক্রাইসিস নিয়ে লিখেছেন। বিশ্বব্যাংকের পলিসি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মার্শাল প্ল্যানের সময়ে কাজ করলে ও এইসব ইমার্জিং কান্ট্রিগুলোতে করেনি।

ফার্গুসন নিও লিবারেল স্কুলের লোক, শিকাগো স্কুলের প্রশংসাই করেছেন, মিল্টন ফ্রিডম্যানের নিন্দা করেন নি। তার দৃষ্টিতে পিনেশোর রেজিমে চিলি রিকভার করেছে এবং এটা সোশ্যাল সিকিউরিটি প্রাইভেটাইযেশনের কারনেই হয়েছে। মাইক্রোফিন্যান্স এবং ডক্টর ইউনুসের কথা এসেছে। তিনি সবাইকে ব্যাঙ্কেবল করার পক্ষে এবং ক্রেডিট আম্ব্রেলার আন্ডারে আনার পক্ষে। হেজিং সবচেয়ে লেইটেস্ট ফিন্যানশিয়াল ইনোভেশন। পুরো মার্কেট কিভাবে কাজ করে এবং গত কয়েক দশকে হেজ ফান্ডের বিকাশ নিয়ে লিখেছেন। জর্জ সরোস সহ বিগ শটদের ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা করেছেন। একটা জায়গায় ডাটা দিয়ে লিখেছেন যে হার্ভার্ড থেকে পাশ করে বিশ কিংবা তিরিশের দশকে যে শতাংশ ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার হতেন, তার কয়েকগুন এখন হচ্ছে। আইভি লীগের সবগুলো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই এই কথা সত্য। ফাইনাইনশিয়াল মার্কেট এখন সবচেয়ে বেশী মেধাবীদের আকর্ষন করে আগের যেকোন সময়ের তুলনায়।

ফার্গুসন ২০০৮ এর মন্দার উপর ভালো মনোযোগ দিয়েছেন। এসেট ব্যাকড সিকিউরিটির সাথে সাবপ্রাইম মর্টগেজগুলো কিভাবে কাপল্ড ছিলো এবং ডমিনো ইফেক্টের মত নন ব্যাঙ্কেবল লোকেদের লোন দেওয়ার কারনে কিভাবে পুরো সিস্টেম ভেঙে পড়েছিলো এটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আমেরিকান হাউজিং মার্কেটের বিকাশ, সরকারের প্রনোদনা, রিগ্যান থ্যাচারের পলিসি এবং নব্বইয়ের দশকের ডিরেগুলেশনের কারনে কিভাবে ২০০৮এর মন্দা এসেছিলো সব লিখেছেন। এরপরে এসেছে চায়নার প্রসংগ। চায়নাকে তিনি বলছেন আমেরিকার ব্যাঙ্ক এবং তিনি এটার নাম দিয়েছেন “চিমেরিকা”। চাইনিজ ইকোনমিক মিরাকলের উপরে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি নির্ভরশীল এখন। এইটা অনেকটা একশত বছর আগের জার্মানী ও ইংল্যান্ডের সম্পর্কের মতন, এক্ষেত্রে জার্মানীর ভূমিকায় আছে চায়না আর ইংল্যান্ডের ভুমিকায় আমেরিকা। ইন্ড্রাস্টিয়াল ক্যাপিটালিজম ও ফিন্যানশিয়াল ক্যাপিটালিজমের সংসার। চাইনিজদের সেভিংসের হার পৃথিবীর যেকোন দেশের তুলনায় বেশী, ইনফ্যাকট ইস্ট এশিয়াতেই এই রেইট বেশী আর আমেরিকানরা চলেই পুরা ক্রেডিটের উপর।

পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মত ক্যাপিটাল ফ্লো পূর্ব থেকে পশ্চিমের দিকে যাচ্ছে বলে ফার্গুসন মত দিয়েছেন। একটা অলআউট যুদ্ধ এইসময়ে খুব ইমপ্রোবাবল। পৃথিবীর প্রত্যেকটা দেশ এমনভাবে কানেক্টেড যে নিতান্তই বাধ্য না হলে বিশ্বযুদ্ধের মত কিছু হওয়া টাফ, শ্যাডো ওয়ার হতে পারে, আইসিস নিয়ে রাশিয়া আমেরিকা ইউরোপ যেভাবে করছে। ক্রেডিট ক্রিয়েশনের আইডিয়াটা ক্যাপিটালিস্ট ইকোনমির ডিএনএ। শুধু ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভলিউশন না, ফিন্যানশিয়াল ইনোভেশন ও খুব গুরুত্তপূর্ন ছিলো। ইউরোপ এইসবের ও ফোরবিয়ারার। রিস্ক মিটিগেশনের আইডিয়া কিংবা হেজিংএর ইন্সট্রুমেন্টগুলো ফিউচার মার্কেটে কিভাবে ট্রেডেড হয়, এইসব খুব ইন্টারেস্টিং।

বইটা গ্রীক ইকোনমিক ক্রাইসিসের আগে লেখা কিন্তু গ্রীসকে যেভাবে চেপে ধরা হয়েছে, একিভাবে চেপে ধরা হয়েছিলো কলোনিয়াল চায়নাকে এবং নেপোলিয়নের সময়কার মিশরকে। একটা সভেরেন কান্ট্রি তার ডেবট পরিশোধে ব্যার্থ হলে মিলিটারি এগ্রেসন জায়েজ ছিলো উনবিংশ শতকে। লাতিন আমেরিকান ডেবট ক্রাইসিস এবং নেপোলিয়নের মিশর অভিযান তার প্রমান। শুধুমাত্র আফিম ট্রেডের মনোপলি রাখার জন্য চীনে আগ্রাসন চালিয়েছিলো ব্রিটিশরা। পৃথিবীর প্রথম নারকোস্টেইট।

কয়েকদিন আগে পত্রিকায় পড়েছিলাম যে নিউজিল্যান্ডের কারেন্সির দাম হঠাত করে বেড়ে গেছে। কারন কি? নিউজিল্যান্ড চীনে গুড়োদুধ রপ্তানী করে আর চীনা সরকার ঘোষনা দিয়ে এক সন্তান পলিসি থেকে সরে এসেছে। কিংবা চিন্তা করেন সৌদী আরবের ফিন্যান্স মিনিস্টার কে হবে অথবা অপেকের চেয়ারম্যান কে হবে তার সাথে তেলের দামের সম্পর্ক এবং তার আফটার ইফেক্টে ফরচুন ফাইভ হান্ড্রেডের কোন কোম্পানীর শেয়ার মার্কেটে দাম উঠানামার কথা। কোন ট্রেডার হয়তো তার সাবআর্বে বাড়ির ডাউন পেমেন্ট দিবে ঠিক করেছিলো, দূর পৃথিবীর কোন একটা মিসহ্যাপের কারনে তার বাড়ির স্বপ্ন হারায় গেলো। অথবা সেন্ট্রাল ব্যাংকের ভুলের কারনে যেভাবে শেয়ার মার্কেটের কোন ট্রেডার জীবন দিলো বাংলাদেশে। ফিন্যানশিয়াল মার্কেট হিউম্যান ক্যারেক্টারকে রিফ্লেক্ট করে।

লোভ ও ভয়ের বসবাস একসাথে। সবাই একসাথে একদিকে চলে, অয়ারেন বাফেট এইটাকে বলে ইলেক্ট্রনিক হার্ড। লাভের লোভ ও ক্ষতির প্যানিক। আমাদের প্রত্যেকের ফিউচার প্রেডিকশন ডিফ্রেন্ট, এবং আমরা কেউ ন্যাচারাল রিস্ক টেইকার এবং কেউ এভার্স। একারনে ডিস্ক্রিপেন্সি তৈরী হয়। মানুষ পুরোপুরি হোমো ইকোনমিকাস না। বিহেভিওরাল ইকোনমিক্সে তো এই র্যা শনাল ইকোনমিক বিয়িংটাকেই খারিজ করে দেওয়া হয়। বইটা খুব জোশ। যাদের ইকোনমিক্সে সামান্য আগ্রহ আছে এবং ফিন্যানশিয়াল মার্কেটের এম্বিয়েন্স ভালো লাগে, তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য বই। পড়তে আরাম, হাইলি ইনফরমেটিভ এবং খুব ইন্টারেস্টিং বই। ইন্টারনেটে বইটা পাওয়া যায়। ভালো লাগবে আশা করি। হ্যাপি রিডিং।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!