দেয়াল: হুমায়ূনের শেষ উপন্যাস

Reading Time: 2 minutes

বই: দেয়াল

লেখক: হুমায়ূন আহমেদ

পৃষ্ঠা: ১৯৮

গায়ের মূল্য: ৩৮০ টাকা

প্রচ্ছদ: মাসুম রহমান

প্রকাশক: অন্যপ্রকাশ

দুইটি গল্প সমান্তরালে এগিয়েছে। হয়তো আপেক্ষিকতার সূত্র মেনেই কোন একবিন্দুতে গিয়ে গল্প দুটি মিশে যায়। গল্পের মিলে যাওয়া খুঁজে পেতে আপনাকে পড়ে ফেলতে হবে বইটি।

প্রথম গল্পটা ষোড়শী অবন্তির। অবন্তি তার দাদার সাথেই থাকে ঢাকায়। অবন্তির মা স্প্যানিশ। অবন্তির বাবা’র সাথে একপ্রকার সম্পর্ক ত্যাগ করেই স্পেনে চলে যায় অবন্তির মা। কয়েক বছর ধরেই অবন্তি’র বাবা-ও নিরুদ্দেশ। পরে জানা যায় অবন্তির বাবা স্পেনের কারাগারে ছিল দুই বছর। অবন্তির গৃহশিক্ষক শফিক আহমেদ। অবন্তির জন্মদিনে শফিক বিভূতি’র ইছামতি উপন্যাস উপহার দিতে চায়। কিন্তু অবন্তি’র জন্মদিনে শফিক নিমন্ত্রিত নয় বলে কাদের মোল্লার চায়ের দোকানে বসে ভাবতে থাকে বইটা দিবে কিনা। এমন সময়ই বাসার দারোয়ান কালাম চায়ের দোকানে এগিয়ে আসলে শফিক বইটা কালামের হাতে দিয়ে সোজা অবন্তি’কে দিতে বলে চলে যায়। অবন্তি’র হাতে কোন কিছু পৌঁছানোর আগে তা দাদা সরফরাজ খানের হাত হয়ে যেতে হয়। তার ধারনা শফিক আর অবন্তি’র মধ্যে কিছু আছে। তাই এই সন্দেহপ্রবণতা। শুধু শফিকের ক্ষেত্রেই না, অবন্তি’র মা তাকে চিঠি লিখলে সেই চিঠিও সরফরাজ খান আগে নিজে পড়েন। প্রয়োজনে তাতে সংস্কারের কাজটাও করে থাকেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সরফরাজ খান তার নাতনিকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যান। সেখানকার পীরের ছেলের সাথে ঘটনাক্রমে অবন্তি’র বিয়ে পড়িয়ে দেয়া হয়। যদিও অবন্তি’র এই বিয়েতে একদম মত ছিল না। তাই বাসর রাতেই দাদার দেয়া পিস্তলের মুখে অবন্তি’র স্বামী হাফেজ জাহাঙ্গীরকে বাধ্য করে তাকে ঢাকায় দিয়ে আসতে। জাহাঙ্গীরের অন্যকোন উপায় ছিল না অবন্তি’কে ঢাকায় দিয়ে আসা ছাড়া। জাহাঙ্গীরকে সরফরাজ খান একদম পছন্দ করতেন না। অবন্তি তার দাদাকে রাগাতে মজা পেত। তাই সরফরাজ খান যেটা অপছন্দ করতেন, অবন্তি সেটাই করতো। জাহাঙ্গীর কিংবা শফিককে সরফরাজ খান পছন্দ না করলেও তাদের সাথে অবন্তি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেনি।

অন্য গল্পটি মুজিব হত্যা’র পেছনের গল্প থেকে শুরু করে জিয়া হত্যা পর্যন্ত। বাকশালের কারণে দেশে যখন একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন থেকেই মুজিবপ্রীতি কমতে থাকে মানুষের। তার ধারনা পাওয়া যায় মুজিব হত্যার পর আনন্দ মিছিল থেকে। আর জিয়া হত্যার পেছনের ঘটনা সেনাবাহিনীর জাওয়ানদের কোর্ট মার্শালের নামে হত্যা করার সঞ্চিত ক্ষোভ থেকে। খন্দকার মুশতাক মুজিবের অতি প্রিয়ভাজন হলেও মুজিব হত্যার দায় এড়াতে পারবে না। জাতীয় ৪ নেতা হত্যার পেছনেও খন্দকার মুশতাক ছিলেন নির্বিকার। মেজর ফারুক সবকিছুর রচয়িতা (মুজিব হত্যা এবং ৪ নেতা হত্যা) হলেও খন্দকার মুশতাক জ্ঞাত থাকা স্বত্বেও খুনিদের সাহায্য করেছেন। তবে মুজিব হত্যায় এটা বলা যায় না। মুজিব হত্যার সময় মুশতাক ছিলেন নির্বিকার।

মুজিব, মুশতাক কিংবা জিয়া- এরা প্রত্যকেই ক্ষমতালোভী ছিলেন। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতেই মুজিব করেছেন বাকশাল, মুশতাক দিয়েছেন হত্যার আদেশ, জিয়া করেছেন জাওয়ানদের নির্মুল। আর এসবের সঞ্চিত ক্ষোভই তাদের মৃত্যুর জন্য দায়ী। পার্থক্য বলতে এটাই যে, মুজিবকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত মানুষ যতটা ভালোবেসে ছিল, বাকশালের পর ততটা না। আর জিয়ার আমলে সবকিছুর দাম নাগালের মধ্যে ছিল বলে জিয়াপ্রীতি বেড়ে যায়। জিয়ার আরেকটা কৃতঘ্ন কাজ হচ্ছে কর্নেল তাহেরকে হত্যা। জিয়াকে যখন খালেদ মোশাররফ বন্ধি করে, তখন জিয়া তাহেরের সাহায্যেই বেরিয়ে আসেন। পরবর্তিতে সেই তাহেরকেই জিয়া শূলে চড়িয়েছেন।

বইটির সীমাবদ্ধতা: হুমায়ূন আহমেদ বইটি শেষ করে যেতে পারেননি। এটাই সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা বইটার। বইটা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে এই কারণেই। এর বাইরে, ঘটনার বর্ণনা কখনো প্রথম পুরুষে, তো কখনো উত্তম পুরুষে করা হয়েছে। যে কোন এক পুরুষকে বেছে নিলে ভালো হতো বলে আমি মনে করি। ‘দেয়ালে’ একটা বইয়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে- An Atheist’s God। এই নামে কোন বইয়ের খোঁজ আমি পাইনি। আদো এমন কোন বই আছে কিনা, তা বলতে পারছি না। লেখক হয়তো গল্পের কারণে বইটির নাম নিয়েছেন, হয়তো কল্পনা করেই। তবে আমার মনে হয়েছে এটা স্পর্শকাতর বিষয়। বইটি প্রকাশের আগেই বিতর্কিত ছিল। এটা স্বাভাবিক। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে খুবই স্বাভাবিক (এই যেমন আমি বলে ফেললাম যে মুজিব ক্ষমতালোভী ছিলেন, এটা নিয়েও বিতর্ক হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না।)। তাই বইয়ে কাঁচি চালাতে হয়েছে বলে অনেক কিছু বাদ পড়ে গেছে। বইটা অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়ার আরও একটি কারণ এটি।

  • Excellent
  • Very Good
  • Good
4
Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!