ফুটবলাররা গবেষকদের চেয়ে কী বেশি টাকা পান?

Reading Time: 3 minutes

স্পেনে যখন করোনা ক্রাইসিস একেবারে তুঙ্গে তখন ফেসবুকে একটা উক্তি বেশ ভাইরাল হয়েছিল। একজন রিসার্চার বলছেন- একজন ফুটবলার কে এত টাকা দেয়া হয় কিন্ত একজন একাডেমিক এত অল্প টাকা বেতন পান। এজন্যই ত করোনার ভেক্সিন আবিস্কার হয় না।

উক্তিটা সত্য না মিথ্যা অথবা কোন একাডেমিক আসলেই এ কথা বলেছেন কিনা আমি সে আলোচনায় যাচ্ছি না। কথাটা যেই বলুন না কেন এর পেছনের যুক্তিটি কতটা শক্তিশালী সেটাই এ লেখার আলোচ্য বিষয়।

একজন একাডেমিক ধরেন একটা পিয়ার রিভিউড জার্নালে একটা পেপার পাবলিশ করলেন। পৃথিবীতে বহু পিয়ার রিভিউড জার্নাল আছে এবং বলাই বাহুল্য সেখানে অনেক ছাইপাঁশ ছাপা হয়। একজন একাডেমিশিয়ানের সবচেয়ে বড় একিলিস হলো- প্রায়শই তার কাজকর্মের একমাত্র বিচারক তার পিয়াররাই। তার পিয়াররা যদি মনে করে এটা একটা পাবলিশেবল কাজ তাহলে এটা পাব্লিশড হতে পারে। এবং এরকম পেপার দিনের পর দিন পাবলিশ করে একজন একাডেমিশিয়ান টিকে থাকতে পারেন। এটার সাথে মার্কেট ইকনোমিকসের সংযোগ যদি সরাসরি খুব একটা নাও থাকে। অর্থাৎ তার পেপার বা একাডেমিক কাজ দিয়ে আগামি কাল রকেট, ভ্যাক্সিন, ওষুধ বা কম্পিউটার নাও বানানো যায়।

অন্যদিকে ধরুন মেসি খুব ভালো ফুটবল খেলেন কিন্ত তার এ ভালো খেলাটা একমাত্র মেসির সতীর্থরাই বুঝতে পারেন অন্য কেউ না- আপনার ধারণা মেসির বেতন কত হবে ? দুনিয়ার সব নামিদামি ক্লাবগুলো তাকে নেয়ার জন্য কাড়াকাড়ি শুরু করে দিবে ? ভুয়া রিসার্চ দিয়ে আপনি টিকে থাকতে পারবেন কিন্ত ভুয়া খেলোয়াড় হয়ে না- মার্কেটে লুকিয়ে থাকার জায়গা নেই।

অবশ্যই রিসার্চের ক্ষেত্রেও একজন রিসার্চার এর রিসার্চ ইন্ডাস্ট্রির সাথে যত বেশী প্রাসঙ্গিক হবে তিনি তত বেশী ফান্ডিং পাবেন, হিসেব সহজ মার্কেট রুলস।

আপনি বিরাট শিল্পী কিন্ত আপনার গান কেউ বুঝে না, ছবি কারও ভালো লাগে না, খেলা কেউ দেখতে চায় না- এখন আপনার বুকে একরাশ ব্যাথা নিয়ে আপনি মরাল হাইগ্রাউন্ড ধরে রাখতে পারেন, আপনার ত অন্তত একটা পিএইচডি ডিগ্রী আছে! তা মশাই রাখুন না আপনার এই শ্রেষ্ঠত্ব -কিন্ত বাজার আপনার কথা মানবে কেন ?

একজন একাডেমিকের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং অন্যান্য নিরাপত্তা কিন্ত একজন খেলোয়াড় চেয়ে অনেক বেশী। একজন খেলোয়াড় একবার ইনজুরির কারণে পেশাগত জীবন থেকে ছিটকে পড়তে পারেন। এর একাডেমিক ইকুয়াল কি আছে ?

মানুষ সিইওদের বেতন নিয়ে প্রশ্ন তুলে, কিন্ত একজন এন্টারপ্রেনিয়ার এর বেতন নিয়ে প্রশ্ন তুলে না। কেন জানেন ? কারণ একজন সিইও হলেন অপরচুনিস্ট- যা কিছু ভালো তার । কোম্পানি যখন ভালো করে তার বেতন বোনাস বাড়তে থাকে। কিন্ত কোম্পানি খারাপ করলে এমনকি দেউলিয়া হয়ে গেলে ক্ষতির কত আনা তিনি বহন করেন ? প্রায় কিছুই না- বড়জোর চাকরি বদলে আরকেটা চাকরি নিয়ে অন্য কোম্পানি তে চলে যান। লাভের গুড় ষোল আনা কিন্ত কোম্পানির ক্ষতি হলে লবডঙ্কা !

উল্টো ট্যাক্স পেয়ারদের টাকা দিয়ে বেইল আউট হয় তার কোম্পানি, তার ভুলের মূল্য পরিশোধ করে ট্যাক্স পেয়াররা- এ কারণে সিইওদের ব্যাপারে মানুষের এ ক্ষোভ। কিন্ত একজন এন্টারপ্রেনিয়ারকে দেখুন- রিস্ক নিজের, আয়ও নিজের, যদি দেওলিয়া হয়ে যান সেটাই নিজের। এই যে রিস্ক এটাকে মার্কেট পুরস্কার দেয়। কারণ এন্টারপ্রেনিয়ারদের মধ্যে ফেল করার সম্ভাবনা অনেক অনেক বেশী। এটা জেনেও যারা রিস্ক নেন এবং সফল হন মার্কেটের হিসেবে তারাই পুরস্কৃত হওয়া যোগ্য।

একজন একাডেমিক যদি একটা বেস্টসেলার বই লিখে সফল হন মানুষ (মার্কেট) কিন্ত তাকে ঠিকই পুরস্কৃত করে। কারণ এবারে তিনি রিস্ক নিয়ে পরিশ্রম করে বই লিখেছেন এবং মানুষ তার বইকে পছন্দ করেছে। তিনি কেন একটা বই লিখে এত টাকা আয় করবেন কেউ এরকম অভিযোগ করবে না। কেউ করলেই কি ? মার্কেট তাকে ঠিকই মূল্য দিবে।

এই যে একামডেমিকরা মেধাবী হয়েও কেন একজন খেলোয়াড়ের তুলনায় কম টাকা পান এ আক্ষেপটা আমার বুঝে আসে না। প্রতিযোগিতায় সফল হওয়ার শতকরা হার, রিস্ক এবং কত বেশী মানুষ তার কাজকে সরাসরি মূল্য দিতে রাজি আছে এ ধরনের কিছু বেসিক হিসেব করলেই ত এ প্রশ্নটার উত্তর পাওয়া যায়। একজন টপ লেভেলের খেলোয়াড় যে হাজার হাজার ঘণ্টা পরিমাণ শারীরিক অথবা মানসিক পরিশ্রম করেন এটা কি একজন একাডেমিকের চেয়ে কম ?

একজন একাডেমিক কেন মনে করবেন যে তার কষ্ট করে করা গবেষণা কোন একটা কারণে বেশী ভারচুয়াস কিন্ত খেলোয়াড়ের কষ্টটা তার চেয়ে কম ভারচুয়াস। অবশ্যই আপনি ট্রাক ঠেলে কষ্ট করলে হবে না- কষ্ট করে এমন কিছু করেন মানুষ যেটাকে নগদ টাকা মূল্য দিয়ে কিনতে রাজি আছে- ব্যাস ল্যাঠা চুকে গেল।

আরেকটা জিনিস- একাডেমিশিয়ানরা খুব “মেধাবী”। ত মেধার স্কেলটা তাদেরই নির্ধারণ করা। ফুটবল মাঠে তারা মেধার পরীক্ষাটি দিতে রাজি নন কিন্ত আয় করতে চান ফুটবলারের সমান- এ কেমন বিচার ? ভাবুন না আপনি নিজেকে হরিদাস পাল, এর জন্যে লোকে আপনাকে পয়সা দিবে কেন ?

একশ মিটার দৌড়ে আপনি কত দ্রুত এটাকে মেধার ক্রাইটেরিয়া হিসেবে বিবেচনা করে দেখুন না- দেখবেন ভাত খাওয়ার জন্য একাডেমিশিয়ানের ঘরে চালের বন্দোবস্ত করার মেধাও হয়ত অনেকের নাই। মার্কেটের গোল্ডেন রুল একটাই- রিস্ক নিন, কাজ করুন, নিজের কাজের মার্কেট তৈরি করুন। আপনার কাজ লোকের ভালো লাগলে নিজেকে ভারচুয়াস বা মেধাবী কোনটাই প্রমাণ করার প্রয়োজন হবে না। লোকেই বলবে, খুশি হয়ে নগদেও মূল্য পরিশোধ করবে!

@Jahid Razan

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!