বাদশাহ নামদার: এক খেয়ালি মোঘলের গল্প

Reading Time: 3 minutes

বই: বাদশাহ নামদার

লেখক: হুমায়ূন আহমেদ

পৃষ্ঠা: ২৩১

গায়ের মূল্য: ৪০০ টাকা

প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ

প্রকাশনী: অন্যপ্রকাশ

বাবরের হাত ধরে যে মোঘল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হয়, তার পুত্র হুমায়ূনের সময়কালেই সেই সাম্রাজ্য ধ্বংস হতে হতে বেঁচে যায় বৈরাম খাঁ’র নিপুণতায়।

বৈরাম খাঁ: মোগল সাম্রাজ্যের ...
বৈরাম খাঁ

বৈরাম খাঁ নিঃসন্দেহে মোঘল ইতিহাসের অন্যতম প্রবাদপুরুষ। যার সঙ্গ হুমায়ূন সবচেয়ে পছন্দ করতেন। তবে হুমায়ূন পুত্র আকবর দ্য গ্রেট সিংহাসনে বসার সাথে সাথে বৈরাম খাঁ-কে হত্যা করে। রাজ হিসেব খুব সোজা। সিংহাসনে বসে সর্বপ্রথম কাজ হচ্ছে সম্ভাব্য শত্রুদের হত্যা করা, কিংবা সিংহাসন দখল নিতেও হত্যাযজ্ঞ চালাও। এটাই রাজ নিয়ম। কামরান মির্জা অবশ্য তার বড় ভাই হুমায়ূনকে মেরে ফেলার অনেক চেষ্টা চালিয়েছিলেন। সেটা কাজে আসেনি। বলা চলে হুমায়ূনের মাহাত্ব্যের জন্য পারেননি। কামরান মির্জা পারস্যের অধিপতি তামাস্পকে কান্দাহারের লোভ দেখিয়ে বলেছিলেন হুমায়ূনকে তার হাতে তুলে দিতে। যাতে করে শের খাঁ’র হাতে হুমায়ূনকে তুলে দিতে পারেন। এখানেও অবশ্য কামরান মির্জার গোপন অভিসন্ধি ছিল শের খাঁকে পরাজিত করে দিল্লী দখল নেয়ার। কিন্তু সেটা আর সম্ভব হয়নি। হুমায়ূন এখানেই অনন্য। অযথা মারামারি কাটাকাটি তিনি পছন্দ করতেন না। ঘোর শত্রুও তার এই মানবিক গুণের কারণে প্রেমে পড়ে যেতেন। অনেক অপরাধ করেও তাই অনেকেই মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে যেতো, যেমন ভাগ্য ছিল কামরানের পক্ষে। অনেক অপরাধ সত্ত্বেও হুমায়ূন কামরানকে মৃত্যুদণ্ড দেননি। পুনরায় দিল্লী দখলের পর কামরানের চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছিল যেন পরবর্তীতে সম্রাটের বিরুদ্ধে আর কোন ষড়যন্ত্র করতে না পারে।

বাবর একদা বলেছিলেন, “সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আছে শুধুই আল্লাহপাকের। মানুষকে মাঝে মাঝে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রমাণ করতে হয় সে মানুষ”। হুমায়ূনও ভুল করেছিলেন তার ভাইদের হত্যা না করে, শের খাঁ’র (পরবর্তীতে শের শাহ্‌) চাটুকারিতায় বিশ্বাস করে। লেখক হুমায়ূন অবশ্য সম্রাট হুমায়ূনের আরও একটি ভুল সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করেছেন। লেখক হুমায়ূনের মতে, আচার্য হরিশংকরকে সভাসদ করা সম্রাট হুমায়ূনের অনেকগুলো ভুলের মধ্যে একটি। প্রকৃতপক্ষে আচার্য হরিশংকর সম্রাটের আজ্ঞাবহ-ই ছিলেন। তবে হরিশংকর নিঃসন্দেহে একটা ভুল করেছিলেন। যার কারণে হুমায়ূনের আদরের মেয়ে আকিকা বেগমকে জীবন দিতে হয়েছিল। তথাপি হরিশংকরকে এখানে প্রত্যক্ষ দোষী বলা চলে না। তার ধর্মভীরুতা নিয়ামকের ভূমিকা পালন করেছে মাত্র। অবশ্য হরিশংকরের এই ভুলের মাশুল তার জীবন দিয়েই দিতে হয়েছিল।

আকিকা বেগমের প্রসঙ্গ যেহেতু চলেই আসলো, সতীদাহ প্রথা নিয়ে তবে বলে ফেলা যাক। একদা আকবর রাজ্যভ্রমণে বের হয়েছিলেন। পথিমধ্যেই হুমায়ূন সতীদাহ’র আনুষ্ঠানিকতা দেখতে পান। ধর্মভীরু এবং মহান মনের মানুষ হওয়ায় হুমায়ূন চেয়েছিলেন সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তি করে দিতে। কিন্তু গোঁড়া হিন্দুত্ববাদীর চিন্তায় আর সেটা করে যেতে পারেননি। অম্বা মেয়েটিকে হুমায়ূন এই সতীদাহ থেকে বাঁচিয়েছিলেন। অম্বাকে সাথে নিয়ে হুমায়ূন মহলে ফিরলে আকিকা বেগমের সাথে অম্বার ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। অম্বাকে বাঁচাতে গিয়েই আকিকা বেগমের মৃত্যু হয়।

হুমায়ূন সর্বমোট ৭ বিয়ে করেছিলেন। চিতোরের যুদ্ধে (শের শাহ’র বিপক্ষে) ২ স্ত্রী পানিতে ঢুবে মারা যায়। চিতোরের যুদ্ধে শের শাহ্‌ চাতুরতার আশ্রয় নিয়েছিলেন। হুমায়ূনকে বারংবার চিঠির মাধ্যমে শের শাহ্‌ জানিয়েছিল যে মোঘল আজ্ঞাবহ, কিন্তু পশ্চাতে মোঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এর বিশদ বর্ণনা বাদশাহ নামদার বইয়ে পাওয়া যাবে।

দিল্লীর সিংহাসন হারানোর পর ৭ম স্ত্রী হিসেবে হামিদা বানুকে বিয়ে করেন হুমায়ূন। হামিদা বানুর গর্ভেই জন্ম নেন আকবর দ্য গ্রেট। হামিদা বানু প্রথমে রাজি না হলে হুমায়ূন নাওয়া খাওয়া বন্ধ করে দেন। হামিদা বানু সম্রাটের এহেন কষ্ট সহ্য করতে পারেননি। একপ্রকার বাধ্য হয়েই বিয়েতে মত দেন। কিন্তু স্পষ্টভাষী হামিদা বানু সম্রাটের দুর্দশার মধ্যেও তাকে কখনো ছেড়ে যাননি। পরাজিত সম্রাটের হাতে হাত রেখে পালিয়ে বেরিয়েছেন, শারীরিক অসুস্থতাও তাকে টলাতে পারেননি। বরং সুযোগ পেলেই সম্রাটের মনোরঞ্জন করেছেন, শিশুসুলভ আবদার করেছেন।

অভিযোগ আছে হুমায়ূন যুদ্ধ পছন্দ করেন না, একা থাকতে পছন্দ করেন (বাবরের কাছে তা স্বীকারও করেন), বেখেয়ালি মানুষ ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই তাকে দিয়ে সিংহাসন রক্ষা করা সম্ভব না। কিন্তু হুমায়ূনকে সবচেয়ে ভালো চিনতেন শের শাহ্‌। হুমায়ূনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতিকালীন শের শাহের সেনাপতি এবং পুত্র জালাল খাঁ’র (পরবর্তীতে ইসলাম শাহ্‌ নাম ধারন করে দিল্লী’র আসনে বসেন) সাথে হুমায়ূন সম্পর্কে কিছু চমকপ্রদ তথ্য দেন। তবে শের শাহ’র কড়া নির্দেশ ছিল হুমায়ূনকে হত্যা না করার, তাকে পালিয়ে যেতে দেয়ার।

বাদশাহ নামদারে হুমায়ূনের আরও কিছু মাহাত্ব্যের কথা জানা যায়। চিতোরের যুদ্ধে অতি সামান্য এক ব্যক্তি হুমায়ূনকে বাঁচতে সাহায্য করেছিলেন, প্রেক্ষিতে হুমায়ূন কথা দিয়েছিলেন একদিনের জন্য দিল্লীর সিংহাসনে বসাবেন। হুমায়ূন কথা রেখেছিলেন। নদীর তীরে অর্ধমৃত অবস্থায় তাকে কুঁড়িয়ে পেয়ে সেবাশ্মশ্রূশা করে বাঁচিয়ে তোলার প্রতিদানে সেই মেয়েকে খুঁজেছিলেন পুরস্কৃত করার জন্য।

ও হ্যাঁ… হুমায়ূন কিন্তু আসলেই খেয়ালি রাজা ছিলেন। শের শাহ্‌ আনুগত্য প্রকাশ করার প্রমাণস্বরূপ কোহিনূর (জ্বি, বিখ্যাত সেই কোহিনূরের কথাই বলা হচ্ছে। যেটা পরবর্তীতে বৃটিশরা নিয়ে যায় এবং বর্তমান রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের মুকুট) উপঢৌকন দেন, সুযোগ পেলেই হুমায়ূন কোহিনূরের মূলা ঝুলিয়ে দিতেন। উদাহরণস্বরূপ তামাস্পের (পারস্য অধিপতি) কথা বলা যায়। তবে বিষয়টা অবশ্যই এমন নয় যে কোহিনূরের মূলা ঝুলিয়ে কার্য হাসিল করে নিতেন। হুমায়ূনের এসবের প্রতি লোভ কখনোই ছিল না। কিন্তু অন্যদের তো ছিল!

যুদ্ধের দামামা যেখানে বেজে উঠত, সেখানে হুমায়ূন কবিতা আওড়াতেন, কিংবা চিত্রকর্ম করতেন। এমন সম্রাটকে খেয়ালি না বলে থাকা যায়!

তবুও এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে সম্রাট হুমায়ূন খাঁটি মনের মানুষ ছিলেন। তার মাহাত্ব্য বারবার বাদশাহ নামদারে উঠে এসেছে। স্বমহিমায় তাই দিল্লীর আসনে পুনরায় বসতে পেরেছিলেন।

লেখক হুমায়ূনের অনবদ্য লেখনি ধারন করে আছে পুরো উপন্যাস জুড়েই। হ্যাঁ… বাদশাহ নামদার ঐতিহাসিক উপন্যাস বটে। হুমায়ূনের বই যারা পড়তে ভালোবাসেন এবং যারা বাসেন না, তাদের সবার জন্যই এটা অবশ্যই পাঠ্য।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!