বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভব, বিকাশ ও বিউপনিবেশায়ন: পাঠ পর্যালোচনা

Reading Time: 9 minutes

সৈয়দ নিজার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষক। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় হতে। পঠিত বিষয় ছিল: দর্শন ও সমাজবিজ্ঞান এবং গাণিতিক যুক্তিবিদ্যা। বর্তমানে নিউজিল্যান্ডের ক্যান্টরবারী বিশ্ববিদ্যালয়ের গানিতিক যুক্তিবিদ্যায় পিএইচডি গবেষক হিসেবে অধ্যয়ন করছেন। বর্নিল সে জ্ঞান অন্বেষণের প্রচেষ্টা । লেখকের মতে, ‘যেকোন বিষয়কেন্দ্রিক জ্ঞান অন্য বিষয়ে অজ্ঞতা সৃষ্টি করে। এমনকি বিশেষজ্ঞরা ও নিজেরা বিষয়ের বাইরে জগত জীবনের অন্য বিষয়ে অজ্ঞতা থাকার কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে পারে না। এ ধরনের জ্ঞান বিভাজন মানুষকে আত্মবিশ্বাসহীন হীনমন্য করে তোলে ( পৃ. ৬১)’। ঐতিহাসিকভাবে ও আমরা দেখি জ্ঞানের এই বিষয় ভিত্তিক বিভাজন এরিস্টটলের হাত দিয়ে। তিনি জ্ঞানকে বিভাগ ও অনুষদে বিভক্ত করেন। পরবর্তীতে এখান থেকেই উদ্ভব ঘটে জ্ঞানের দুটি প্রচলিত ধারা: উচ্চ ধারা ও নিম্নধারা। মধ্যযুগে উচ্চতর ধারার অন্তর্ভুক্ত বিষয় ছিল মূলত আইন, ধর্মতত্ত্ব ও চিকিৎসা। অন্যদিকে মানববিদ্যা ( ব্যাকরণ, অলঙ্কারশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা) এবং বিজ্ঞানের ( পাটিগনিত, জ্যামিতি, সঙ্গীত, জ্যোতিশাস্ত্র) তদানিন্তন বিষয় গুলো নিয়ে গঠিত ছিল কলা অনুষদ যা ছিল নিম্নধারার অন্তর্ভুক্ত।

জ্ঞানতাত্ত্বিক এই যে বিভাজন সেটা আলোচনা করাই এই লেখার উদ্দেশ্য নয়, বরং একজন পাঠক হিসেবে লেখকের এই যে দার্শনিক এবং ইতিহাস আশ্রিত সৃষ্টি যার নাম তিনি দিয়েছেন “বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভব, বিকাশ ও বিউপনিবেশায়ন” সেটি প্রর্যালোচনা করাই এই লেখার উদ্দেশ্য। মূল আলোচনাটি ৭৬ পৃষ্টার, তিনটি পর্বে বিভক্ত। আমরা দেখবো, প্রথম পর্বে লেখক মূলত বিশ্ববিদ্যালয়কে খুঁজে দেখেছেন। এই অন্বেষণ করতে যেয়ে লেখক মধ্যযুগ এবং আধুনিকযুগের বিশ্ববিদ্যালয়, তার ধরন, তার জ্ঞানতাত্ত্বিক এবং প্রশাসনিক কাঠামো, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, ইউরোপ এবং আমেরিকায় গড়ে ওঠা পাঠদান এবং গবেষণাকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বরুপ উন্মোচন করেছেন। দ্বিতীয় পর্বে, লেখক ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক আমলে গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়, তার উদ্দেশ্য, সমাজ জীবনে তার প্রভাব এবং বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের হালচাল বর্ননা করেছেন। সর্বশেষ পর্বে লেখক প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলে ভারতবর্ষে গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয় (মহাবিহার), তার জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো, লোকজ সংস্কৃতিতে তার প্রভাব, বাংলাদেশে মুনাফাকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জরী কমিশনের নেওয়া ২০০৫ কৌশলপত্রের ত্রুটি আলোচনাপূর্বক এদেশে বি-উপনিবেশিত বিশ্ববিদ্যালয়ের রুপরেখা দাঁড় করিয়েছেন। আমরা আরো দেখি, লেখক ভূমিকাতেই একটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। তিনি দেখেছেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে উপমহাদেশের সর্বোচ্চ সংখ্যক যুক্তিবিদ্যা বিষয়ক কোর্স চালু থাকার পরে ও সেখানে এ অঞ্চলের যুক্তিবিদ্যা বিষয়ক কোন কোর্স নেই। এ অঞ্চলের যুক্তিবিদ্যা বিভাগের পাঠ্যক্রমে যুক্ত করতে চাইলে বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক জোড়ালো সমর্থন জানালে ও অধিকাংশ সহকর্মী এর বিরুদ্ধাচারণ করেন। এরকম বিরুদ্ধচারুণের পেছনের ইতিহাস খুঁজতে যেয়ে লেখক তার এই গবেষণায় দেখেছেন, “এখানকার জ্ঞানজগত ইউরোপকে শুধু অনুকরণই করে না, তারা এখনও ধারণ করে দেড়শো বছর আগের ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিকে (পৃ, ১৪)”। কিন্তু কি সেই দৃষ্টিভঙ্গি? জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোই বা কেমন? পুরো গ্রন্থে লেখক সেই উত্তর খুজেঁছেন। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মের একটা ইতিহাস আছে এবং সে ইতিহাস স্বতন্ত্র। আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টির পেছনে যেমন একটা ইতিহাস আছে, তেমনি বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় নালন্দার ও একটি ইতিহাস আছে। তদ্রুপ ইউরোপ-আমেরিকায় গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়ের ও আছে স্ব-স্ব ইতিহাস এবং বিকাশের ধারা। কিন্তু আমরা দেখি, প্রত্যেক সমাজেই কিছু লোক থাকে যারা বনে গিয়ে বন খুঁজে পায়না; শুধু পায় গাছ, আগাছা এবং লম্বা লম্বা ঘাস। কিন্তু যারা “কনসেপ্ট বা প্রত্যয় বোঝেন তারা কিভাবে ” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের’ সাথে ঢাকা কলেজের’ পার্থক্য করেন? লেখকের মতে, প্রশ্নটি হালকা মনে হলে ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা অত্যন্ত গভীর এবং দার্শনিক। এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য চলুন এবার বিশ্ববিদ্যালয় শব্দটির উৎপত্তির দিকে নজর দেই।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভবের কথা বলতে যেয়ে বলেছেন, “ইউরোপরা যাকে ইউনিভার্সিটি (University ) বলে বাংলায় তা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় যার উদ্ভব প্রধানত ইউরোপে (পৃ, ২৩), কিন্তু ইংরেজি ‘University’ শব্দটি আমদানি করা হয়েছে ল্যাটিন শব্দ ‘ Universitas’ থেকে যার অর্থ সমগ্র বা বিশ্ব। এজন্যই হেনরি নিউমেন তার “The idea of a University” নামক গ্রন্থে বিশ্ববিদ্যালয় বলতে বুঝিয়েছেন, ‘School of Universal Learning’ যার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের বিকাশের মধ্য দিয়ে সমাজের বিকাশকে ত্বরান্বিত করা। কিন্তু জার্মান ভাষাতাত্ত্বিক ভিলহাল্ম হামবোল্ডট এরকম মনে করেন না। তিনি মনে করেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য মানুষের বিকাশ নয়, জ্ঞানের বিকাশই মুখ্য উদ্দেশ্য (পৃ, ১১)”। এরই সুত্র ধরে আমরা দেখতে পাই, গোটা বিশ্বে মোটা দাগে দুই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে- মধ্যযুগের পাঠদানকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং আধুনিক যুগের গবেষণাকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়। পাঠদানকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় মূলত স্মৃতিনির্ভর পরীক্ষার উপরে জোর দেয় যেখানে একজন শিক্ষকের দায়িত্ব থাকে কোন বিষয় সহজ সরল ভাষায় প্রকাশ ও ব্যাখ্যা করা। আর শিক্ষার্থীর করনীয় থাকে সেই জ্ঞানকে মৌখিক বা লিখিতভাবে প্রকাশ এবং তা ব্যবহার করতে শেখা। অন্যদিকে, গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান লক্ষ্য গবেষণা, যেখানে একজন শিক্ষকের দায়িত্ব থাকে তার শিক্ষার্থীদেরকে কোন বিষয় সহজ সরল ভাবে ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ করার সাথে সাথে শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করা এবং সেই অনুসারে গবেষণার প্রশিক্ষণ দেওয়া। আর শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব এসে বর্তায় বিষয়ভিত্তিক তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনের সাথে সাথে উক্ত বিষয় নিয়ে গবেষণা করা, নতুন সমস্যা চিহ্নিত করণ এবং সমস্যার সমাধানে বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন করা। এই দুটি বিপরীতধর্মী কিন্তু একটি আরেকটির সাথে সম্পর্কযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ধারনার দিকে লক্ষ্য রেখে আমরা দেখতে পাই মধ্যযুগে ১০৮৮ সালের দিকে ইটালির বলোনিয়াতে সর্বপ্রথম শিক্ষার্থীদের হাত দিয়ে ‘Universitas Boloniensis’ নামে বলোনিয়াতে পাঠকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় যার উদ্দেশ্য ছিল নগররাষ্ট্রের উদ্ভবের কারণে প্রশাসনিক এবং বিচারব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের স্বার্থে শিক্ষার্থীদের রোমান আইন শিক্ষা দেওয়া। উল্লেখ্য যে, এ সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের থেকে শিক্ষার্থীদের ক্ষমতা ছিল বেশি। শিক্ষার্থীরাই শিক্ষক নিয়োগ, বেতন, এমনকি শিক্ষককে চাকুরিচ্যুত করার ব্যাপারে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারতো। এছাড়াও ইতিহাস ঘেটে দেখা যায়, প্রথম কয়েক শত বছরে শিক্ষার্থীরা রেক্টর (অধ্যক্ষ) পদে ও নিয়োগ পেত। ধীরে ধীরে ইউরোপে বলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সাথেই মধ্যযুগে এরকম আরো কিছু পাঠদানকারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্টিত হয়: প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় (১০৯৬), অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় (প্রতিষ্ঠা-১০৯৬, স্বীকৃতি- ১১৬৭), মদেনা বিশ্ববিদ্যালয় (১১৭৫), প্যেলেনসিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (১২০৮) ইত্যাদি অন্যতম । এ সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে প্যারিসই হচ্ছে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় যা শিক্ষকদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত। মধ্যযুগের এ সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত আইন, ধর্মতত্ত্ব, চিকিৎসা, ব্যাকরণ, অলঙ্কারশাস্ত্র, পাটিগনিত, জ্যামিতি, সঙ্গীত, জ্যোতিষশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা পাঠ দেওয়া হত। দর্শন শিক্ষা শিক্ষা দেওয়া হত না। শিক্ষার্থীদের জ্ঞানগত স্বাধীনতা ছিল না, এমনকি স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার যে আইন ও রীতি রাজা প্রথম ফ্রেডরিখ বারবারসা প্রবর্তন করেছিলেন তা বলোনিয়া ছাড়া আর অন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে মানা হত না। মূলত, অতীতের জ্ঞানের সুরক্ষা এবং গীর্জার নিয়ম-কানুন শেখা ও মেনে চলা ছিল এসকল প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য যেখানে বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় সরাসরি চার্চ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হত। চার্চের একচ্ছত্র প্রভাব থাকার কারণে মাঝেমধ্যেই ভিন্ন মতের মানুষ নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হতেন। ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা, গ্যালিলিওকে গৃহবন্দী করে রাখা, দাড়ি রাখলে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রত্ব বাতিল করা ইত্যাদি তার উদাহরণ। তবে রেনেসাঁস এবং আলোকবর্তিকার সময় থেকে ধীরে ধীরে এ অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল ক্যান্ট (১৭২৪-১৮০৪) এবং ভাষাতাত্ত্বিক ভিলহাল্ম হামবোল্ডট (১৭৬৭-১৮৩৫) শিক্ষা দর্শনের প্রভাবে বদলে যেতে থাকে মধ্যযুগের ইউরোপ এবং আমেরিকার এসকল বিশ্ববিদ্যালয়। ক্যান্ট মনে করতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান হচ্ছে সার্বিক জ্ঞান ( Universal knowledge)। এই সার্বিক জ্ঞান অভিজ্ঞতা প্রসূত ( a posteriori) নয়, বরং তা প্রাক-সিদ্ধ ( a priori) যা লাভের মাধ্যম হচ্ছে যুক্তিনির্ভর বুদ্ধি। তিনি আরো মনে করতেন, ” এই সার্বিক জ্ঞানই একমাত্র সত্য জ্ঞান এবং এই সার্বিক জ্ঞানই আধুনিকতার ভিত্তি” (পৃ, ৩১); যা দেশ কাল নিরপেক্ষ এবং সবার কাছে গ্রহনযোগ্য। অন্যদিকে হামবোল্ডট মনে করতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানের বিকাশই সত্য। শিক্ষার্থীরা সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আনবে এবং তাদের নিজেদের পাঠক্রম বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা ভোগ করবে। তিনি আরো মনে করতেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী নেই, আছে একজন উপদেষ্টা এবং অপরজন গবেষক” (পৃ, ৩২)। এসকল ধারনার উপর ভিত্তি করে আমরা দেখি উনিশ শতকের গোড়ায় ইউরোপে জার্মানির বার্লিনে ১৮০৯ সালে সর্বপ্রথম আধুনিক গবেষণাকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ‘ বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের” পথচলা শুরু হয় যেখানে অধ্যাপকদের বলা হত জ্যেষ্ঠ গবেষক ( Lehrfreiheit), আর শিক্ষার্থীদের বলা হত তরুন গবেষক (Lernfreiheit)। কিন্তু এসকল বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাকেন্দ্রিক হলে ও মধ্যযুগের মত সকল শ্রেনী ও পেশার মানুষের সন্তানেরা এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারতো না। অন্যদিকে, আমেরিকাতে ১৮৬২ সালের মরিল অধ্যাদেশের মধ্য দিয়ে ল্যান্ড- গ্রান্ট বিশ্ববিদ্যালয় নামে কয়েক হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরী হয় যেখানে গ্রামের কৃষকের সন্তান, শ্রমিকের সন্তানের উচ্চ শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এ জন্যই লেখক বলেছেন, ” আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম জার্মানীতে কিন্তু তার বিকাশ হয়েছে আমেরিকায়” ( পৃ, ৩০)।

ইতিহাস ঘেটে আমরা আরো দেখতে পাই, যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম গবেষণাকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ১৮৭৬ সালে যাত্রা শুরু করে জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়। এখানকার নীতিমালা গবেষণাকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। ১৮৮৭ সালের হ্যাচ অধ্যাদেশ অনুযায়ী কৃষি গবেষণার জন্য প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতিবছর ১৫,০০০ ডলার প্রদান করা হত। ফলে এ সকল বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষির উন্নয়নে অভূতপূর্ব অবদান রাখতে সক্ষম হয়। তবে যেহেতু এ সকল শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান সরকারী সাহায্য পেত না, চার্চ এবং ব্যক্তিগত অর্থায়নেই পরিচালিত হত সেকারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ পাঠদান ও গবেষণায় ধর্মের প্রভাব হতে মুক্ত হতে পারেনি। ওল্টার মিটগার এ জন্য আক্ষেপ করে বলেছেন, ” বিজ্ঞান ধর্মের অধীনস্ত হয়ে পড়েছিল এই সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে (পৃ, ৩৬)”। ফলে আমরা দেখি উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ম, লিঙ্গ, অর্থনৈতিক বিষয়ে মত প্রকাশের কারণে অনেক শিক্ষককে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে। শিক্ষকদের জীবনে নেমে আসা এরুপ অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করার জন্যই জন হপকিন্সের নেতৃত্বে ১৯১৫ সালে গঠিত হয় আমেরিকান শিক্ষক সমিতি ( American Association of University Professors, AAUP)। একই বছরে উক্ত শিক্ষক সমিতির দেওয়া একটি বিবৃতিকে কেন্দ্র করে ১৯৪০ সালে ‘ Statement of Principles on Academic Freedom and Tenure’ নামে একটি আইন পাশ হয় যেখানে বলা হয়, ” শিক্ষকগন যে কোন গবেষণালব্ধ ফল প্রকাশ করতে পারবেন, এমনকি তা সমাজ, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রবিরোধী হলেও। সেই বিষয়ে শ্রেণীকক্ষে আলোচনা করতে পারবেন এবং এই কারণে তাদের চাকুরিচ্যুত করা হবে না (পৃ, ৩৮-৩৯)”। উপরের আলোচনা থেকে আমরা মধ্যযুগ এবং আধুনিক যুগের ইউরোপ এবং আমেরিকার পাঠদান ও গবেষণাকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা অর্জন করেছি। এবার আমরা যদি ঔপনিবেশিক শাসন আমলের দিকে ফিরে তাকাই, তাহলে বিভিন্ন সময়ের মেকলে এবং অ্যাংলিসিস্টগনের আলোচনা থেকে দেখবো, ভারতবর্ষে দীর্ঘ মেয়াদী ব্রিটিশ শাসন বলবত থাকার প্রয়োজনেই দাপ্তরিক এবং উচ্চ আদালতের ভাষা করা হয় ইংরেজী। আর এজন্য দরকার পড়ে প্রচুর ইংরেজী জানা লোকের। সেই চাহিদা পূরন করতেই ১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় হিন্দু কলেজ (ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ) সহ অসংখ্য কলেজ। কিন্তু এসকল কলেজের মান খুব খারাপ হওয়ায় ১৮৫৭ সালে মান নিয়ন্ত্রনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে জন্ম নেয় প্রথমে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, পরবর্তীতে মাদ্রাজ ও বোম্বাই ( মুম্বাই) বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল এইসকল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালীন ইউরোপের পাঠদানকেন্দ্রিক কিংবা গবেষণাকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মডেল অনুসরণ না করে অনুসরণ করা হয় সম্পূর্ণ এক ব্যাতিক্রমধর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ের মডেল- লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়। ১৮৩৬ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় একটি ধর্মনিরেপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে জন্ম লাভ করে কেননা সেই সময়ে অক্সফোর্ড এবং ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হতে গেলে কোন না কোন চার্চের সদস্য হতে হত। প্রথমদিকে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় পাঠদানকারী প্রতিষ্ঠান ছিল না, ছিল পরীক্ষা গ্রহনকারী প্রতিষ্ঠান- আজকের বাংলাদেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মত। পরবর্তীতে ১৮৫৮ সালে তারা পাঠদান শুরু করে। ধীরে ধীরে তিন দশকের মধ্যে এ উপমহাদেশে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকরণে আরো দুটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়ঃপাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় (১৮৮২) এবং এলাহবাদ বিশ্ববিদ্যালয় (১৮৮৭)। তবে, ১৯০৪ সালের আগ পর্যন্ত কোলকাতা, মাদ্রাজ, বোম্বাই বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষাগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবেই কার্যক্রম পরিচালনা করে গেছে। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্যবিদ্যা ও আইন শিক্ষা দেওয়া হত। সে হিসেবে আমরা বলতে পারি, পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ই ইউরোপীয় অনুকরণে উপমহাদেশের প্রথম পাঠদানকারী বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু এসকল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনটির অবস্থাই তেমন ভালো ছিল না। ফলে ভারতবর্ষের উচ্চশিক্ষা নিয়ে এখানে এবং বৃটেনে তুমুল সমালোচনা হয়। ১৯৯৮ সালে লর্ড কার্জন এখানকার ভাইসরয় হয়ে আসেন। তিনি ১৯০৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয় আইনের পরিবর্তন আনেন এবং সকল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ইউরোপের আদলে পাঠদানকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তরিত করেন। ততদিনে অবশ্য ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পূর্ণভাবে গবেষণাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে।শুরুতে এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো হত ইউরোপের ইতিহাস, ইউরোপের দর্শন এবং ইংরেজী সাহিত্য। এখানকার সমাজব্যবস্থা কৃষিভিত্তিক হওয়া সত্ত্বেও কৃষি এবং প্রকৌশলবিদ্যার মত বিষয় পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি । ফলে ১৮৮৭ সালের এক জরিপে দেখা গেল, এসকল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা ৬০০০০ সনদধারীদের মধ্য হতে এক তৃতীয়াংশ ওকালতিতে এবং ২১০০০ জন সরকারী চাকুরিতে যোগ দিয়েছে। তখন থেকেই উপমহাদেশে সরকারী চাকুরির প্রভাব কেমন ছিল, তা বোঝা যায়। তপন চৌধুরীর বিষয়টি আরো ভালোভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন । তিনি বলেন, ” প্রাক-ঔপনিবেশিক বাঙালি নারীর প্রার্থনার বিষয় ছিল- প্রথম সন্তান হিসেবে যেন একটা সুস্থ-সবল ছেলে সন্তান হয়। অন্যদিকে, ঔপনিবেশিক সমাজে এই প্রার্থনা পরিবর্তিত হয়ে দাড়ায়- ছেলে যেন ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে সরকারী চাকরি পায় (তপন, ২০১৩, নিজার,২০১৮ : ৪৭)”। ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান শাসনামলে বাংলাদেশে ইউরোপের আদলে ৪ টি পাঠদানকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯২১), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৫৩), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬৬) এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৭০)। চাকুরীজীবি উৎপাদনই এসকল বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম লক্ষ্য। প্রতিবছর বিসিএস এবং অন্যান্য সরকারি চাকরীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিগুলোতে সকাল বেলায় যে দীর্ঘ লাইন পড়ে যায় তা এই সত্যতাকে আরো বেশি বেগবান করে। আরো উল্লেখ্য যে, এসমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হলে (১৯৭৩ এর অধ্যাদেশ) ও জ্ঞানজাগতিক স্বাধীনতা অর্জিত হয় নাই। স্বাধীনতার পরে প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা আরো শোচনীয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শুধু রাজনৈতিক মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই তা না, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন সমালোচনা করার ও অধিকার নেই। ১৯৯২ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে প্রতিষ্টিত ব্যক্তিগত (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে চাকুরির ন্যূনতম নিশ্চয়তা ও নেই। ফলে দেখা যাচ্ছে, ঔপনিবেশিক আমল থেকেই ইংরেজী ভাষা শিক্ষা ও ইউরোপীয় ‘সার্বিক’ জ্ঞানের নীতিকে অনুসরণ করার কারণেই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেনী রাষ্ট্র ও জনগনের সমস্যা সমাধানে যেমন ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি এ অঞ্চলের ধারাবাহিক জ্ঞানের উন্নয়নে অক্ষম থেকেছে।।কিন্তু বর্তমানে এ উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জ্ঞান উৎপাদনের সংস্কৃতি না থাকলে ও এ অঞ্চলে কখনোই তা ছিল না, এমন নয়। হিউয়েন সাং ও তিব্বতীয় অনেক সূত্র থেকে প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলে প্রতিষ্ঠিত নালন্দা, সোমপুর, বিক্রমশীলা মহাবিহার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। আনুমানিক ৪র্থ শতকে প্রতিষ্ঠিত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭ম শতকে প্রায় দশ হাজার শিক্ষার্থী ও দুই হাজার শিক্ষক ছিল। তাদের অনেকে কোরিয়া, জাপান, চীন, তিব্বত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, তুরস্ক থেক্র পড়তে আসতো। সোমপুর,বিক্রমশীলা এবং ওদন্তপুরী মহাবিহারে ও দশম ও একাদশ শতকের দিকে প্রায় ছয় থেকে আট হাজারের মত শিক্ষার্থী ছিল ( নিজার, ২০১৮ঃ৭১, Tarantha, 1604; Thoman, 1996)। এমনকি নালন্দা মহাবিহারের তিনটি লাইব্রেরীর মধ্যে ‘রত্নদধি’ নয়তলা ভবন বিশিষ্ট ছিল। যদি ও এ সকল মহাবিহারগুলো ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়ের মত ছিল না সত্য, কিন্তু ভাবনা, চর্চা এবং উদ্দেশ্যের কারণে এগুলো প্রকৃত অর্থেই জ্ঞানতাত্ত্বিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। এইসকল মহাবিহারগুলোর পাঠ্যক্রম কোন বিশেষ তত্ত্ব এবং ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত ছিল না। এ অঞ্চলে ব্রাহ্মণদের প্রভাব থাকা সত্ত্বে ও মাধ্যমিক বৌদ্ধদের মাধ্যমে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গড়ে উঠেছিল। কেননা জ্ঞান সম্পর্কে ব্রাহ্মণদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ক্যান্টের মত। ক্যান্টের মত ব্রাহ্মণরা ও মনে করতো , ” প্রকৃষ্ট জ্ঞান, যাকে সংস্কৃতিতে প্রজ্ঞা বলা হয়ে থাকে, তা সার্বিক। তা দেশ, কাল নির্ভর নয়, এবং যে কোন বিষয়ে একটি মাত্র সত্য রয়েছে এবং সেই জ্ঞান আত্মস্থ করাই শিক্ষা (পৃ, ৭১)”। অন্যদিকে বৌদ্ধ, বিশেষত মাধ্যমিকরা মনে করতো, ” জগত এবং জীবন সম্পর্কিত সকল তত্ত্ব আংশিক সত্য নয়, বরং আপাত বা ব্যবহারিক সত্য”( পৃ, ৭২)। আরো উল্লেখ্য, এই সমস্ত বিহারগুলোতে জ্ঞানের অধিকার সর্বজনের ছিল। জ্ঞানচর্চার বিশেষ কোন বর্ণ বা লিঙ্গ, এমনকি ইউরোপের মত কোন অর্থনৈতিক শ্রেনী ও ছিল না। সেকারণে মধ্যযুগের ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংখ্যা যেখানে হাজার অতিক্রম করতো না, সেখানে এই সকল বিহারগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আট হাজার থেকে দশ হাজারে ও পৌছেছে যেখানে বেদ, যুক্তিশাস্ত্র, ব্যাকরণ, আয়ুর্বেদ, গণিত, সঙ্গীত, নৃত্য, শিল্পকলাসহ ব্যবহারিক অনেক জ্ঞানের পাঠ ও উৎকর্ষ সাধন করা হয় ( পৃ,৭৩)। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে ( সংশোধিত ১৯৭৮) উচ্চ শিক্ষার উন্নয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য ‘বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন’ গঠিত হয়। দেশের প্রয়োজন বিবেচনা নিয়ে গবেষণা এবং শিক্ষার অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান পরিস্থিত থেকে উন্নয়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ২০০৫ সালে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে একটি কৌশলপত্র প্রকাশ করে যেখানে দেশ এবং বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন অধ্যাপকদের পরামর্শ গ্রহন করা হয়নি। কৌশলপত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে বলা হয়েছে ‘কর্ম দক্ষতার প্রশিক্ষণ’। কিন্তু টমাস কুন ও পল ফায়ারবেন মনে করেন, ” জ্ঞানের বিকাশ বা বিজ্ঞানের বিকাশ প্রশিক্ষণ বা দক্ষতা দিয়ে হয়না। বরং জ্ঞান বিজ্ঞানের বিকাশ বিজ্ঞান বা অন্যান্য বিষয়ের স্ববিরোধিতা বা সমস্যাগুলোকে চিহ্নায়নের মধ্য দিয়ে হয় (পৃ, ৬৪)”। এরকম উদ্ভূত পরিস্থিতিতে লেখক মনে করেন, এই কৌশলপত্র ত্রুটিপূর্ণ এবং তা প্রকারন্তরে ঔপনিবেশিক আমলের ইউরোপীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকেই নতুন মোড়কে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। তিনি আরো মনে করেন, ” ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদেরকে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে প্রাক-ঔপনিবেশিক জ্ঞানকান্ড থেকে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠেছে পশ্চিম থেকে আসা ‘সার্বিক’ নামে উপস্থিত একটি স্থবির জ্ঞানকান্ডের শিক্ষা এবং প্রসার কেন্দ্র। ঐ জ্ঞানের উদ্ভব এবং বিকাশের প্রেক্ষাপটের সাথে আমাদের কোন মিল নেই। ফলে ঐ জ্ঞানের উদ্ভবের কারণ আমাদের কাছে সবসময় থাকে অপরিচিত; তাই জ্ঞান পরিণত হয় সত্য-তথ্যে। ফলে তাকে ছেদ করে জ্ঞান উৎপাদনের আত্মবিকাশ থাকে না। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জ্ঞান প্রকাশের আংশিক আইনী অধিকার থাকলে ও জ্ঞান উৎপাদনে তা ব্যর্থ। ফলে এগুলো শুধুমাত্র আচার সর্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয় মাত্র ( পৃ, ৫৮)”। এরকম সমস্যা থেকে উত্তরনে মাধ্যমিকদের জ্ঞানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি সহায়ক। একই সাথে প্রয়োজন নতুন জ্ঞান প্রকাশের আইন। পরিশেষে এই বিষয়গুলো বিউপনিবেশিত বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানতাত্ত্বিক শর্ত বিবেচনা করে এখানকার প্রেক্ষাপটের উপর ভিত্তি করে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জ্ঞানজাগতিক এবং প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তন করা প্রয়োজন।

শিক্ষক,বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ -৮১০০।email: shams.rehan@bsmrstu.edu.bd

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!