বুক রিভিউ-ইহুদী জাতির ইতিহাস

Reading Time: 5 minutes

বইয়ের নাম- ইহুদী জাতির ইতিহাস
লেখক-আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ
প্রকাশক-ছায়াবিথী প্রকাশন
মুদ্রিত মূল- ৬০০ টাকা


ইহুদী জাতির ইতিহাস by Abdullah Ibn Mahmud




একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড অনুযায়ী ইঞ্জিনিয়ার হয়েও আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ রোর বাংলা ওয়েবসাইটে ইতিহাস সহ বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখির মাধ্যমে পাঠকমহলে বেশ পপুলার হয়েছেন। এই বছর,২০১৯ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তার ”ইহুদী জাতির ইতিহাস” বইটি । মূলত রোর বাংলায় প্রকাশিত এই সম্পর্কিত আর্টিকেলগুলো কম্পাইল করেই বইটা প্রকাশিত হয়েছে।


মধ্যযুগের ইউরোপে ইহুদীদেরকে বেশ ঘৃনার চোখে দেখা হত। শেক্সপিয়ারের মার্চেন্ট অফ ভেনিস বইতে ইহুদী শাইলক একটা বড় উদাহরন । ক্রিস্টোফার মার্লোর দ্য জিউ অফ মাল্টা কিংবা গেস্টা রোমানেরাম সমসাময়িক আরো কিছু উদাহরন, যেখানে ইহুদী দেরকে বেশ পচানো হয়েছে। ( দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ইহুদীদের প্রতি সেই ঘৃনা ডাইভার্ট হয়েছে মুসলিমদের প্রতি ; ইসলামোফোবিয়ার মাধ্যমে। এমনটাই দাবি ওরিয়েন্টালিস্ট এডওয়ার্ড ডাব্লিউ সাইদের, তবে সেই প্রসংগ আজ থাক) । তবে শাইলকদের ও আগে, ইহুদী জাতির বিকাশ মধ্যযুগের অনেক অনেক আগে । এমনকি যীশু খৃষ্টের জন্মের ও অনেক আগে।

ইহুদী ধর্মবিশ্বাসীদের দাবি, আমরাই সঠিক পথে আছি। আল্লাহ/গড/ঈশ্বর আমাদেরকেই হেদায়েত দিয়েছেন। শেষ জমানায় একজন নবী আসবে, আমরা তার অপেক্ষায় আছি ।

খৃষ্টানরা বলে, ইহুদীরা যা বলে সে সব ঠিক আছে। তবে, শেষ জমানার নবী হচ্ছেন আমাদের যীশু / ঈসা(আ) । কাজেই আমরা সঠিক পথে আছি । (ইহুদীরা বলে, না,তা হতে পারেনা, যীশু ভন্ড নবী)

মুসলমানরা বলে, হুম, ইহুদী আর খৃষ্টানরা যা যা বলে সবই ঠিক আছে। তবে ইহুদী ধর্মের নবী এবং খৃষ্টানদের নবী (ঈসা (আ)) এর পরে আমাদের মুহম্মদ (সা) হলেন আখেরী জমানার নবী। আমরাই সঠিক (ইহুদী আর খৃষ্টানরা বলে, না , তোমাদের এই নবী ভন্ড )

পরবর্তী পর্যায়ের ধর্মগুলা (যেমন বাহাই ধর্ম বা কাদিয়ানী সম্প্রদায় )আবার বলে, ইহুদী,খৃষ্টান,ইসলাম সবই ঠিক আছে । তোমাদের নবীরাও সবাই ঠিক আছেন। কিন্তু এদের পরে নতুন নবী এসেছেন , হযরত বাহাউল্লাহ , বা গোলাম আহমেদ কাদিয়ানী। যেহেতু আমরা লেটেস্ট, আমাদের ধর্মই ঠিক ( ইহুদী,খৃষ্টান, ইসলাম আবার বলে, না , তোমাদের নবী ভন্ড )

এভাবেই চেইন রিঅ্যাকশন চলতেছে । এই ধর্মগুলোকে একত্রে বলে সেমেটিক ধর্ম।

কমন প্লাটফর্ম হওয়ার কারনেই এই ধর্মগুলার বিশ্বাস , নবী-রাসূল কিংবা অনেক রিচুয়ালের মধ্যেও মিল পাওয়া যায়। আর তাদের নবীদের সম্পর্কে প্রচলিত উপকথা/কাহিনীর মধ্যে মিল তো থাকবেই।

সেমেটিক ধর্ম সম্পর্কিত বিভিন্ন ঘটনা আমরা কমবেশি ছোটবেলা থেকেই শুনে শুনে বড় হয়েছি । মূসা (আ) এর অলৌকিক উপায়ে নীল নদ পার হওয়া , সোলায়মান (আ) এর মৃত্যুর পরেও ৪০ বছর ধরে লাঠি ভর দিয়ে ডেডবডি দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা আল্লাহর নূর দেখে তুর পাহাড় ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কাহিনী অনেক শুনেছি।

ধর্মের বাইরে সাহিত্য সংস্কৃতিতেও অনেক প্রভাব আছে প্রচলিত এই গল্পগুলার। আলিফ লায়লায় দেখেছি, সোলায়মান নবীর আমল থেকে আটকা পড়ে থাকা জিন বর্তমান সময়ে ছাড়া পেয়ে কি তান্ডব চালায়। হেনরি রাইডার হ্যাগার্ডের সলোমনের গুপ্তধন খোজার অভিযান পড়েছি আমরা ছোটবেলায় । নীলক্ষেত্রের ফুটপাথে সোলেমানি খাবনামা বিক্রি হতে দেখেছি অনেক। wwe wrestling এ অসম সাইজের দুইজন রেসলার মারামারি করতে লাগলে কমেন্টেটর ডেভিড বনাম গোলিয়াথ প্রবাদটার কথা উচ্চারন করেন। স্যামসাং এন্ড ডেলায়লা সিনেমা দেখে আমরা অবাক হই , সেই সময়ে ফিলিস্তিনিরা কি নৃশংসভাবে ইজরাইলিদের উপর অত্যাচার করত ।

এই বিশাল প্রেক্ষাপটে, ইহুদী ধর্ম সম্পর্কিত বেশি পরিচিত এবং কম পরিচিত ম্যাক্সিমাম ঘটনাগুলো বাছাই করে লেখক তুলে এনেছেন এই বইতে। মূলত লেখক বাইবেল থেকেই সিরিয়াল ওয়াইজ একটার পর একটা নবীর জীবনী এবং তাদের সম্পর্কিত উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন । প্রাসঙ্গিক কোরান ,হাদিস, তালমুদ বা অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ ও কোট করেছেন, তবে বাইবেলের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করলাম ,কারন বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে যেভাবে ধারাবাহিকভাবে ঘটনাগুলো সাজানো রয়েছে, সেটা অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থে নেই। বইয়ের কয়েকটা জায়গায় একটু বিরক্তিই লেগেছে, কারন পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা বাইবেল থেকে কপি পেস্ট ।

বইটার নামকরন নিয়ে আপত্তি আছে আমার। ৩৮ টি চ্যাপ্টারে বিভক্ত এ বইতে কেবলমাত্র একটি চ্যাপ্টার এর মধ্যেই প্রপার ইতিহাসের বর্ননা পাওয়া যায় । (৩৩ নাম্বার চ্যাপ্টার- ইসরাইল ফিলিস্তিন সংঘাত, যে চ্যাপ্টারের উল্লেখযোগ্য অংশে আছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ ) । এর বাইরে বাকি সবগুলা চ্যাপ্টার লেখা হয়েছে কোরান, বাইবেল , তাল্মুদ বা অন্যান্য ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ন গ্রন্থগুলোর আলোকে।

ইতিহাস শব্দের অর্থ হচ্ছে History . যে ঘটনাগুলো পূর্বে ঘটে গেছে এবং সেগুলো ঘটার সুস্পষ্ট প্রমান আছে ,এবং সেই ঘটনাগুলো সমসাময়িক অন্য ঘটনা বা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে কোনো রকম ছাপ ফেলেছিল ,সেগুলাকে আমরা ইতিহাস বলতে পারি।

১৯৭১ সালের ঘটনাগুলোকে আমরা ইতিহাস বলি, কারন সেই সময়কার নিউজপেপারে ঘটনাগুলো লেখা আছে। সমসাময়িক প্রকাশিত বইতে এই ঘটনাগুলার উল্লেখ পাওয়া যায় । ভারত সরকারের বার্ষিক বাজেট,জাতিসংঘের ভোটাভুটির ঘটনাগুলো দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় , তখন এই এলাকায় একটা বিশাল যুদ্ধ হয়েছিল ।

বইয়ের কভারে বইটার পরিচয় সম্পর্কে বলা হয়েছে, ”ইসলাম ও ইহুদী ধর্মবিশ্বাসের আলোকে পবিত্র ভূমির ৩ হাজার বছরের দ্বন্ধের গোড়া অনুসন্ধান”। বইয়ের ভিতরেও বিভিন্ন জায়গায় (যেমন -পৃষ্ঠা ১৬) বলা হয়েছে, প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষনায় এই বইয়ের ঘটনাগুলো পাওয়া যায়না।

সেক্ষেত্রে বইটার নামে ”ইতিহাস” শব্দটা থাকলে সাধারন পাঠক কনফিউজড হয়ে যেতে পারেন। ইতিহাস শব্দের বদলে আখ্যান বা কাহিনী শব্দটা ইউজ করলে বোধহয় এপ্রোপ্রিয়েট হত।

বইটা লেখক শুরু করেছেন হযরত ইসরাইল (আ) বা হযরত ইয়াকুব নবী কে নিয়ে । এই ইসরাইল এর নামানুসারেই বর্তমানের ইসরাইল দেশের নামকরন করা হয়েছে। ( ছোট একটা ট্রিভিয়া শেয়ার করি। বিশ্বে আরো কয়েকটা দেশ আছে, যে দেশের নাম কোনো একজন মানুষের নামে। যেমন সৌদি আরবের নামকরন করা হয়েছে রাজা সৌদ এর নামে। সিরিয়া দেশের নামকরন করা হয়েছে রাজা সাইরাস এর নাম অনুসারে)

হযরত ইসরাইল এবং তার ফ্যামিলি থাকত ইসরাইল এলাকায় । সেখান থেকে তার ছেলে, হযরত ইউসুফ (আ) গেলেন মিশরে। মিশরে প্রথম একেশ্বরবাদী ধর্মের সূচনা হল। কয়েক জেনারেশন ইহুদীরা সেখানেই থাকলেন। তারপর হযরত মূসা (আ) এর নের্তৃত্বে তারা ফিরে আসলেন ভূমধ্যসাগরের এই পারে, ইসরাইলে। সেখানে তারা দেশবিহীন হয়ে যাযাবর ঘুরে বেড়ালেন কয়েকশো বছর। একটা পর্যায়ে ইসরাইল দেশে তারা পাকাপোক্ত শাসন গড়ে তুললেন। হযরত দাউদ(আ) বা সোলাইমান(আ) এর নের্তৃত্বে দেশে অনেক স্থাপনা তৈরি করলেন। কিন্তু ব্যবিলন বা রোমের রাজারা এসে তাদের সাথে মাঝে মাঝেই যুদ্ধ করত—এটাই হচ্ছে মোটা দাগে বইয়ে বর্ননা করা কাহিনী।

হযরত ইয়াকুব(আ) থেকে যীশু খৃষ্টের জন্ম পর্যন্ত কাহিনী গুলা ধারাবাহিকভাবে বর্ননা করা হয়েছে । যীশুর জন্মের পরেই বইটা শেষ করে দিলে ভাল হত। কিন্তু অপ্রাসঙ্গিকভাবে লেখক এরপর মহানবী(সা) এর জন্ম এবং সামসাময়িক আরবের গল্প বর্ননা করেছেন। লেখকের মতে, এই চ্যাপ্টারগুলো তার পরবর্তী বইয়ের অংশ। সেক্ষেত্রে এই চ্যাপ্টারগুলা এই বইয়ে ঢোকানোর কোনো দরকার ই ছিলনা। ৬০০ টাকা দামের এই বইটার দাম সেক্ষেত্রে আরো অনেক কম হত।

বইটার আরেকটা বড় নেগেটিভ সাইড হচ্ছে, বর্নিত ঘটনাগুলোর কোনো সায়েন্টিফিক বর্ননা না দেওয়া। কিছু কিছু জায়গায় বাইবেলের বর্ননা এবং আর্কিওলজিস্টদের বর্ননা পাশাপাশি উপস্থাপন করা হয়েছে । কার্বন ডেটিং এ কোন জিনিসের বয়স কত পাওয়া গেল সেই রেজাল্ট জানানো হয়েছে। কিন্তু ঘটনাগুলোর সায়েন্টিফিক ব্যাখ্যা একেবারেই অনুপস্থিত। নীল নদ বা জর্ডান নদী পার হওয়া, পিপড়ার কথা বুঝতে পারা , বাতাস কিংবা জিনের সাহায্যে সিংহাসন ক্যারি করা, আকাশ থেকে পড়া মান্না কিংবা সালওয়া খাবার , লাঠির সাপ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি ঘটনাগুলো সম্পর্কে সায়েন্স কি বলে, কোনটা ঘটা সম্ভব, কোনটা অসম্ভব সেই ব্যাখ্যাগুলো থাকলে ভাল হত।

সবচেয়ে হতাশ হয়েছিলাম চ্যাপ্টার ২৮ এ হযরত ইজেকিয়েল এর আজব অভিজ্ঞতার বর্ননায় । অনেক এলিয়েন বিশ্বাসী দাবি করে, হযরত ইজেকিয়েল এর সাথে এলিয়েনদের একটা UFO এর দেখা হয়েছিল। আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ এই ঘটনা লিখতে গিয়ে ৩ পৃষ্ঠার চ্যাপ্টারে আড়াই পৃষ্টাই বাইবেল থেকে কোট করেছেন , কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে বলেছেন– এই ঘটনা ছিল ইসরাইল ধ্বংসের ভবিষ্যতবানী ।

ওভারল ,বইটা ভাল। পাঠকদের রেকমেন্ড করব বইটা পড়তে ।অনেক অজানা জিনিস জানতে পারবেন । তবে এই বইটাকে রেফারেন্স হিসাবে ইউজ না করাই ভাল হবে । বইটার সাথে সাথে যদি আপনি বাইবেল-কোরান বা উইকিপিডিয়া-গুগল ও একটু করে মিলিয়ে নেন, তাহলে অনেক বেশি উপকৃত হবেন।

This image has an empty alt attribute; its file name is 91982132_1558301507679526_1172559130171277312_o.jpg


অনলাইনে বইটার উল্লেখযোগ্য অংশ পড়তে পারবেন এই লিংক থেকে 

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!