বুক রিভিউ-বিবাহ ও নৈতিকতা

Reading Time: 3 minutes

বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ছেলেদের নাম রেখেছিলেন আন্তার্জাতিক সেলিব্রেটিদের নামানুসারে।

যেমন- শেখ জামালের নাম রেখেছিলেন মিশরের প্রেসিদেন্ট জামাল আব্দুল নাসেরের নামানুসারে। শেখ কামালের নাম রেখেছিলেন তুরস্কের প্রেসিদেন্ট মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক এর নামে। একেবারে ছোট ছেলে- শেখ রাসেল এর নাম রেখেছিলেন ইংল্যান্ডের লেখক বার্ট্রান্ড রাসেল এর নামানুসারে।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বার্ট্রান্ড রাসেল (১৯৭২-১৯৭০) ছিলেন একাধারে লেখক, দার্শনিক, ভাষাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ,গণিতবিদ, ইতিহাসবিদ এবং আরো বহু কিছু। ১৯৫০ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন।

তার On Marriage and Morals বইটা লেখা হয়েছিল ১৯২৯ সালে। আজ থেকে ৯১ বছর আগে। তখনো আমেরিকায় মহামন্দা লাগেনি, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ আসেনি। তারপরেও তিনি তার বইতে যে সকল আইডিয়া নিয়ে আলোচনা করেছেন, সেগুলা এখনো আলোচিত হচ্ছে।

অনেকগুলা আইডিয়া আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ( এমনকি কিছু পশ্চিমা দেশেও) একেবারেই বিপ্লবাত্মক আইডিয়া। কয়েকটা নিয়ে আলোচনা করছি।

১। আদিবাসী সমাজে সকল ছেলে/মেয়ে একই ক্যাটাগরীর। কোনো ভ্যারিয়েশন নাই। এ কারনে আদিবাসীদের মধ্যে র‍্যান্ডমলি যে কোন একজনকে বিয়ে করলেই হয়ে যায়, ওরা অত বাছাবাছি করেনা। গ্রামেও কমবেশি সবার মেন্টালিটি, রুচি, শিক্ষা, ইকোনোমিক অবস্থা একই রকম। ভেরিয়েশন কম। শহরে ভেরিয়েশন অনেক অনেক বেশি । একারনে শহুরে ছেলেমেয়েদের মধ্যে উপযুক্ত সংগী খুজে বের করতে অনেক অনেক সমস্যা হয়।

২। ইউরোপের খৃষ্টানরা প্রধানত রোমান ক্যাথলিক, কিন্তু আমেরিকার খৃষ্টানরা হল প্রটেস্টান্ট। ক্যাথলিক ধর্মে ডিভোর্স কে নিরুতসাহিত করা হয়। এ কারনে ইউরোপে ডিভোর্স কম। যত ক্রাইম ই করুক, ওরা গীর্জায় গিয়ে কনফেশন করে, ডিভোর্সে যেতে চায় কম। সমাজেও পরকিয়াকে একেবারে খারাপ চোখে দেখে না। কিন্তু প্রটেস্টান্ট আমেরিকায় সিচুয়েশনটা ভিন্ন। সেখানে পরকীয়াকে ওরা অনেক ঘৃণা করে। এ কারনে আমেরিকায় ডিভোর্স অনেক বেশি, কিন্তু পরকীয়া কম। অন্যদিকে , ইউরোপে ডিভোর্স কম, বিবাহিত জীবনে থেকেই পরকীয়া বেশি।

(১৯২৯ এ এই বই লেখার পর সিচুয়েশন একটু মনে হয় চেঞ্জ হয়েছে। প্রিন্সেস ডায়না, বিল ক্লিনটন এবং টাইগার উডস এর উদাহরন মনে পড়ছে )

৩। ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টদের উচিত -আধা স্থায়ী ভিত্তিতে ‘সাময়িক বিয়ে’ করা। ভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারেই একজোড়া ছেলে মেয়ে নিজেদেরকে পছন্দ করে ‘সাময়িক বিয়ে’/প্রেম /লিভ টুগেদার/সংসার শুরু করবে। ৪ বছর ধরে একসাথে সংসার করবে, লেখাপড়া করবে। ৪ বছর শেষে তারা চাইলে এঁকে অপরকে স্থায়ীভাবে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিংবা চাইলে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে নতুন করে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারে।


৪। রাষ্ট্রের মূল উপাদান- জনগন। এ জন্য রাষ্ট্র চাইবে, যেন জনগন বেশি থাকে। নাগরিকরা বেশি করে যেন আনডা বাচ্চা উতপাদন করে, সেই উদ্দেশ্য থাকবে রাষ্ট্রের। বেশি বাচ্চা নেওয়ার উদ্দেশ্যে সরকার কাপলদের বিয়ে করতে উতসাহিত করবে। যেসব কাপলের কোনো বাচ্চা হয়না, সেসকল কাপলকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে অন্য ছেলে/মেয়ের সাথে বিয়ে দিতে হবে। অন্যদের সাথে বিয়ে হলে হয়তো ওদের বাচ্চা হবে।

(১৯২৯ সালে সম্ভবত ইনফার্টাইলিটির ভাল চিকিৎসা ছিলনা। আর ইন্ডিয়া-বাংলাদেশের ক্ষেত্রে , বেশি জনসংখ্যার এই থিওরি এপ্লাই করলে ঝামেলা আছে 🙂 )

৫। সেক্স এডুকেশন এবং এ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা দরকার বলে তিনি মত দিয়েছিলেন এই বইতে।

( উন্নত বিশ্বে এটা কার্যকর হয়ে গেছে অলরেডি। বাংলাদেশের টেক্সট বইতে এটা অবশ্য আসেনি এখনো। তবে সামাজের বিভিন্ন জায়গায় এ বিষয়ে আলোচনা চলছে)

৬। পির্তৃ এবং মাতৃ তান্ত্রিক সমাজ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা আছে বইটিতে। লেখক নিজে মাতৃ তান্ত্রিক সোসাইটির পক্ষে। সম্পদের অধিকার সুনির্দিষ্ট করার জন্যই পিতার অধিকার এবং স্থায়ী ফ্যামিলি গড়ে উঠেছে বলে তিনি মনে করেন। রাসেল স্থায়ী পরিবারের পক্ষে কথা বলেছেন । পরিবার থাকার বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দেখেছেন তিনি। আবার যৌনতার জন্য বিয়ে করতেই হবে–এমন কনসেপ্ট ও তিনি মানেন নি। কিন্তু সন্তান লালন পালনের জন্য, দেশের ভবিষ্যত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিবাহের কোনো বিকল্প দেখেননি তিনি।

(১৯২০ এর দশকে, রাশিয়ার বলশেভিক পার্টি বলেছিল , বাচ্চা লালন পালনের জন্য ফ্যামিলির দরকার নাই। রাষ্ট্র নিজেই বাচ্চা পালন করবে। সকল ফ্যামিলির কাছ থেকে বাচ্চাদের সংগ্রহ করে পেশাদার নার্স দের তত্ত্বাবধানে শিশু বিকাশ কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে লেখাপড়া এবং খেলাধূলার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। মেইনল্যান্ড রাশিয়ার বাইরেও বুলগেরিয়া, গ্রিস ইত্যাদি জায়গা থেকে বাচ্চাদের নিয়ে এসে ভাবে যৌথ নার্সারিতে বাচ্চাদের লালন পালন করা হতে লাগল। https://en.wikipedia.org/wiki/Orphans_in_the_Soviet_Union ) আইডিয়াটা ফলপ্রসু হয়নি। কয়েক বছর পরে এই কর্মসূচী প্রত্যাহার করা হয়েছিল। )


ব্যক্তিগত জীবনে রাসেল ৪ টা বিয়ে করেছিলেন। সবার সাথে দীর্ঘ সংসার করেছেন।

২২ বছর বয়সে Alys Pearsall Smith কে বিয়ে করেছিলেন। এই সংসার টিকেছিল ২৭ বছর। (১৮৯৪-১৯২১)। সেপারেশনের সময় রাসেলের বয়স ৪৯ বছর।

এর পর ডোলা ব্ল্যাক এর সাথে সংসার করেছেন ১৪ বছর (১৯২১-১৯৩৫) ।এর সাথে সেপারেশনের সময় রাসেলের বয়স ছিল ৬৩ বছর।

এরপর Patricia Spence এর সাথে সংসার করেছেন ১৬ বছর (১৯৩৬-১৯৫২).৭৭ বছর বয়সে এর সাথেও সেপারেশন হয়।

এরপর Edith Finch এর সাথে সংসার শুরু করেন ১৯৫২ সালে , ৭৭ বছর বয়সে। ৯৮ বছর বয়সে তার যখন মৃত্যু হয়, ১৯৭০ সালে, তখনো এই স্ত্রীর সাথেই ছিলেন।

বাচ্চাকাচ্চা সব মিলিয়ে ৪ টা ছিল। বাচ্চাদের সাথে তিনি সেক্স এর বিষয়ে অনেক খোলামেলা আলোচনা করতেন, সেটা বিবাহ ও নৈতিকতা বইতেই উল্লেখ আছে। এমনকি তার বাচ্চাদের স্কুলমেটরাও তাদের বাড়িতে আসত সেক্স এডুকেশনের জন্য।

বইটার খুব ছোট কয়েকটা পয়েন্ট তুলে ধরলাম । আশা করি , আপনারা আরো অনেক আলোচনা – সমালোচনা করবেন এই বইটা সম্পর্কে।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!