যেভাবে পৃথিবীকে পাল্টে দেয় মহামারী

Reading Time: 4 minutes

করোনাভাইরাসের কার্যকর টিকায় টানেলের শেষ প্রান্তে আশার পিদিম দেখা যাচ্ছে। তবে মহামারী উত্তর বিশ্ব কেমন হবে সে পূর্ভাবাস দেয়া কঠিন। অর্থনীতিতে কী ধরণের প্রভাব রাখবে, কোথায় কোথায় পরিবর্তন আসবে, সামাজিক ব্যবস্থায় কী পরিবর্তন আসবে তার ছবি আঁকতে হিমশিম খাচ্ছে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী থেকে ক্ষমতাধর দেশগুলোর রাষ্ট্রনায়করা। তবে অতীতের উদাহরণ থেকে হয়তো পূর্বাভাস দেয়া যেতে পারে।

সম্প্রতি একটি পডকাস্টে টাইডস অব হিস্ট্রির উপস্থাপক প্যাট্রিক উইম্যান চলমান মহামারীর সঙ্গে ইউরোপে ত্রয়োদশ শতকের ‘ব্ল্যাক ডেথ’ প্লেগের তুলনা করেছেন। অবশ্য এটা সত্য প্রাণহানীর দিক থেকে ব্ল্যাক ডেথের ধারে কাছেও নেই করোনা বা সাম্প্রতিক অনেক মহামারী। বলা হয় ওই প্লেগে ইউরোপের এক তৃতীয়াংশ মানুষ মারা গিয়েছিল। তবে ব্ল্যাক ডেথের সঙ্গে মিল হচ্ছে উভয় মহামারীতেই স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে দাঁড়িয়েছিল। মহামারীগুলো মানুষের জীবনে এমন পরিবর্তন নিয়ে আসে যা হয়তো সেই প্রজন্মের মানুষ আগে কখনো দেখেনি।যেমন আমাদের প্রজন্মের কেউই এরকম ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদী মহামারী দেখেনি। মার্চের পর থেকে লকডাউন শুরুর পর নয় মাস কেটে গেল। এর আগে ১৯৯৮ সালের বন্যায় আড়াই মাসের মতো গৃহবন্ধি জীবন কাটিয়েছিল দেশের বেশিরভাগ মানুষ। তার আগে ১৯৭১ সালের মুক্তি যুদ্ধের কথা বলা যায় যখন মানুষ এত দীর্ঘ সময় ধরে মৃত্যুভয়ে ভুগেছে।

ভয়াবহ ওই প্লেগ আসলে কী নিয়ে এসেছিল? মানবজাতির ইতিহাসে এটাকে সবচেয়ে প্রাণঘাতী মহামারী বলা হয়।১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ সালের মধ্যে সংগঠিত ওই প্লেগে ইউরেশিয়া ও উত্তর আফ্রিকায় মৃতের সংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি থেকে ২০ কোটি।আমাদের এ লেখার মূল উদ্দেশ্য প্লেগের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করা নয় বরং এটা অর্থ ও সমাজব্যবস্থায় কী পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল তা অনুসন্ধান করা। প্রথমত, প্লেগ শেষে বড় আকারের শ্রমিক স্বল্পতা দেখা দিয়েছিল যাতে সামন্ততান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা অস্তিত্বের সংকটে পড়েছিল। অবশ্য এর আগে থেকেই হাজার বছরের পুরনো ওই ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল। প্লেগ সেটা ত্বরাণ্বিত করে।

সামন্ততান্ত্রিক সমাজে কোন ব্যক্তি সাধারণত যে এলাকায়, যে পেশায় জন্ম নিতো জীবনের বেশিরভাগ সময় ওই এলাকায় এবং ওই পেশায় কাটিয়ে দিতো।আমাদের ভারতবর্ষের বর্ণভিত্তিক সমাজকাঠামোও অনেকটা একই রকম ছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই পেশায় থেকে গেছে বিভিন্ন বর্ণের মানুষ। করোনা মহামারীতে যেমন বিশ্বজুড়ে মানুষের গতিবিধি ও বসবাসস্থলে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে প্লেগেও বিশালাকার পরিবর্তন এসেছিল। অনেক কৃষি শ্রমিকই নিজেদের সামন্তপ্রভুর এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে গিয়েছে। করোনা মহামারী যেভাবে পেশায় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে ওই প্লেগেও পেশায় অনেক পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল। গ্রাম ছেড়ে মানুষগুলো আরো সুযোগের সন্ধানে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে জায়গা নিচ্ছিল। করোনা মহামারী নিয়ন্ত্রণে নেয়া বৈশ্বিক লকডাউনের শুরুর মাসগুলোতে অবশ্য উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ শহর ও মহানগরী ছেড়ে গ্রামে বা শহরতলীতে আশ্রয় নিয়েছিল।

গত কয়েক দশক ধরে তথ্য প্রযুক্তিখাতে যে আমূল পরিবর্তন বা বিপ্লব দেখা দিয়েছে প্লেগের অব্যাবহিত পূর্ব সময়েও বাণিজ্যিক বিপ্লবের পথে আগাচ্ছিল ইউরোপ। প্যাট্রিক উইম্যান বলেন, অগ্রসর অর্থনীতি বলতে আমরা যা বুঝি তার অনেকগুলোর শুরু তখন থেকে। ঋন বেশ সহজলভ্য হয়ে দাঁড়ায়। ব্যবসায়ীরা অনেক দূরে গিয়ে ব্যবসা করার সুযোগ পায়। জলবায়ু বেশ অনুকূল থাকায় তখন কৃষি শস্যেরও ভালো ফলন হয়। এতে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ ঘটে। একই চিত্র আমরা দেখছি গত কয়েক দশক ধরে। কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়নে খাদ্য সরবরাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি জনসংখ্যা বৃদ্ধিও সর্বকালের সর্বোচ্চ।

চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝিতে যখন প্লেগ দেখা দেয় তখন বাণিজ্যিক অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ সর্বোচ্চে পৌছায়। প্লেগ শুরুর আগে থেকেই পতন হতে শুরু করে। ইউরোপের বৃহত্তম কোম্পানীগুলো প্লেগের ধাক্কায় দেওলিয়া হয়ে পড়ে। করোনা মহামারীতে অবশ্য ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে, লাখো লাখো ছোট কোম্পানী যেখানে দেওলিয়া হয়ে গেছে সেখানে বৃহত্ কোম্পানীগুলোর সম্পদ ও ব্যবসা বেড়েছে।

‘ব্ল্যাক ডেথ’ মহামারীতে ব্যাপক প্রাণহানীর ফলে সামন্তপ্রভুরা শ্রমিক স্বল্পতায় পড়েন। যা নতুন অনেক প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সহায়তা করেছে। গুটেনবার্গ কর্তৃক প্রিন্টিং প্রেস আবিষ্কার প্লেগের প্রভাবেরই ফল বলে মনে করেন উইম্যান। করোনা মহামারীতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটের উপর আরও নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে দিচ্ছে এ মহামারী।

প্লেগের পর শুধু নতুন অনেক আবিষ্কারই হয়নি মানুষের ভোগের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। মানুষের ভোগ বৃদ্ধি নিয়ে চতুর্দশ শতকের শেষার্ধে ইউরোপের চার্চগুলো থেকে ভত্সর্না করতে দেখা যায়।মহামারী মানুষের বিশ্বাস ও আচরণে অনেক পরিবর্তন নিয়ে আসে। দেখা গেছে অনেকে নতুন করে ধর্মীয় বিধি-বিধান অনুসরণ শুরু করে। আবার অনেক শক্ত ঈমানদার তার ঈমান খুইয়ে ফেলেন। ‘ব্ল্যাক ডেথ’ মহামারী শেষে অনেকের মধ্যে এই ভয় ছড়িয়ে পড়ে-ফের কোন প্লেগে যদি মারা যায় সেই ভয়ে অনেকেই ভোগের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। শিল্প ও চিত্রকলা বিকাশের মাধ্যমে রেনেসাঁর সূত্রপাতে ব্ল্যাক ডেথ তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন উইম্যান। মানুষ তখন অনুধাবন করার ফুরসত পায় কীভাবে জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং শিল্প দীর্ঘস্থায়ী। ফ্লোরেন্সের মেডিচি পরিবারের  মতো বিত্তশালী পরিবারগুলো শিল্পকলায় উত্সাহ ও প্রণোদনা বৃদ্ধি করে। যার ফলে রেনেসাঁর হাত ধরে জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রভূত অগ্রগতি সাধিত হয় এবং সামন্ততান্ত্রিক অর্থ ও সমাজব্যবস্থা থেকে পুঁজিবাদী অর্থনীতির দিকে দীর্ঘ লাফ দেয় ইউরোপ। আঠারো শতকের শেষের দিকে এসে বেশ কয়েকটি প্রযুক্তি যেমন-আর্করাইটের সুতার কল, জেমস ওয়াটের বাষ্পীয় ইঞ্জিন ও স্টিফেনসনের রেলওয়ে আবিষ্কারের ফলে শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয় এবং তা সামন্ততন্ত্রকে একেবারে ধসিয়ে দেয়। নতুন এক অর্থ ও সমাজব্যবস্থায় প্রবেশ করে ইউরোপ।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত ইতিহাসবেত্তা উইল ডুরান্ট তার ‘দ্য গ্রেটেস্ট মাইন্ডস অ্যান্ড আইডিয়াস অব অল টাইম’ কেতাবে লিখেন, আইডিয়া পৃথিবী না পাল্টালেও আবিষ্কার পাল্টে দেয়। আজ আমাদের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর দিকে তাকান, দেখা যাবে লেখাপড়া তেমন না থাকলেও ইমো, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আপনজনদের সঙ্গে যেভাবে যোগাযোগ করছে এ ছবিটা হয়তো আমরা ২৫-৩০ বছর আগে কল্পনাও করতে পারিনি।কিন্তু এ আবিষ্কারগুলো পুরো সমাজকেই পাল্টে দিয়েছে। আমরা চাই বা নাই নতুন প্রযুক্তিগুলো গ্রহণ করতেই হবে। প্রত্যেকটি প্রযুক্তিই মানবিক সম্পর্ক, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থায় ছাপ রাখে।  

করোনা মহামারীও পুরো পৃথিবীর অর্থ ও সমাজব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে এবং আগামী দিনগুলোতে অব্যাহত রাখবে এটা স্পষ্ট। বাংলাদেশের মতো জানজটপূর্ণ দেশগুলোতে ঘরে বসেই অনেক জরুরী যোগাযোগ, মিটিং, আড্ডার মতো কাজগুলো সচল থাকবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী সংকোচন করে প্রযুক্তি নির্ভরতা বাড়াবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় মহামারীর আগে থেকেই মনোযোগ দিয়েছিল প্রযুক্তি জায়ান্টরা। এখন যে সেটা বাড়বে তা বলাই বাহুল্য। প্রাত্যহিক বিভিন্ন কাজ তামিলে রোবটের উপর নির্ভরতা বাড়বে। কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের দিকে জোর মনোযোগ দিচ্ছে বিশ্বের সব গাড়ি নির্মাতা কোম্পানীগুলো। বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা টেসলার প্রতিষ্ঠাতা ইলোন মাস্কের শীর্ষ ধনী হয়ে পড়া তারই ইঙ্গিত। নরওয়ের মতো দেশগুলোতে বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি গত বছর ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি বাড়বে।

সূত্র:

ব্লুমবার্গ, উইকিপিডিয়া, গেটি ইমেজেস, দ্য গ্রেটেস্ট মাইন্ডস অ্যান্ড আইডিয়াস অব অল টাইম-উইল ডুরান্ট

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!