মায়ের কাছে সেনেকার চিঠি (২য় পর্ব)

Reading Time: 5 minutes

এ লেখাটা পড়ার আগে প্রথম পর্ব পড়ে আসলে ভালো হয়। লিংক

নিজের নির্বাসন নিয়ে মাকে অহেতুক ভয় না পাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরণের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনি খাপ খাইয়ে নিতে পারবেন। অনেকে হয়তো বলে, নিজ দেশ থেকে বঞ্চিত হওয়া অসহনীয়। তুমিও হয়তো তা মনে করছো। কিন্তু রোমের বড় বড় বাড়িগুলোর দিকে খেয়াল করো তাদের বড় কর্তারা কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ ও রাজ দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত। জীবনের বড় অংশই তারা রোমের বাইরে কাটিয়ে দেন। কেউ কেউ সেখানেই সংসার পাতেন, মারা যান। আবার রোমেও যারা আশ্রয় গেরেছেন তাদের কতজনই বা এখানে জন্ম নিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তারা বিভিন্ন উদ্দেশ্যে এখানে জড়ো হয়েছে। খুব অল্প মানুষই যেখানে জন্ম নিয়েছে সেখানে মৃত্যুবরণ করতে পারে। নির্বাসনের পক্ষে সাফাই গাইতে ইতিহাসের দ্বারস্থও হয়েছেন সেনেকা। তিনি বলেন, রোমান সাম্রাজ্যও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে নির্বাসিতদের মাধ্যমে। ট্রয় থেকে দাবড়ানি খেয়ে বেড়ানো ঈনিসের নেতৃত্বে অল্প কজন ট্রয়বাসী রোমের পত্তন করেছিলেন।  কোন শহর যে সবসময় তার জনগোষ্ঠিকে/বাসিন্দা পাল্টে দেয়। সেক্ষত্রে রোমের উদাহরণ প্রাণিধানযোগ্য। আকাশের রূপ যেমন ক্ষণে ক্ষণে পাল্টায় তেমনি নিয়মিত পাল্টায় কোন শহর বা মহানগরীর ক্যানভাস।

চিঠির এ পর্যায়ে সেনেকার আরেকটি কথা আমাদের চিন্তা জগত নাড়িয়ে দেবে। তিনি বলেন, কোন ব্যক্তির জীবনে ভালো কিছু হওয়া বা না হওয়ার বিষয়টি অন্য কারো উপরে নির্ভর করে না। এটা কেউ দিতেও পারে না আবার কেউ কেড়েও নিতে পারে না।  যারা ধন-সম্পদ অর্জনের মাধ্যমেই অভাব কাটবে বলে মনে করেন তাদের উদ্দেশ্যে সেনেকা লিখেন, প্রত্যেক অভাবই স্রেফ কোন প্রয়োজন থেকে জাগে না, বরং এক একটা বদভ্যাস/বাসনা থেকে জাগে। যে ব্যক্তি প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জীবনধারণ সে কখনো অভাব অনুভব করবে না। যে প্রকৃতির সীমা লঙ্ঘন করবে তাকে প্রচুর অর্থে ডুবিয়ে দিলেও তাকে দারিদ্র্য তাড়া করে বেড়াবে।

প্রকৃতভাবে মানুষ কেবল তার মনকে বা চিন্তাকে সমৃদ্ধ করতে পারে। এটাকে নির্বাসনে কিংবা বিরান ভূমিতেও নিয়ে যাওয়া যায়। আমাদের মন/চিন্তা শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে ছাড়িয়ে গিয়ে সর্বত্র ভ্রমণ করতে পারে; অতীত ও ভবিষ্যতে পরিভ্রমণ করতে পারে। আমাদের মানবদেহের ক্ষমতা খুবই সীমাবদ্ধ। এটা ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যেই ঘুরাফেরা করে।  

অতিরিক্ত ধন-সম্পদ যে দীর্ঘ ভ্রমণের ভার বাড়িয়ে দেয় সেদিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, দীর্ঘ ভ্রমণে সঙ্গে থাকা বাক্সপ্যাটরার আকার কমিয়ে আনতে হয়; ব্যয় ও সময় বাঁচাতে লোকবলও কমিয়ে আনতে হয়। এক্ষেত্রে সেনাদলের উদাহরণ টেনেছেন, তারা কতটুকু বিলাসব্যসন সঙ্গে নিতে পারেন। সেনানিবাসের কড়া নিয়ম হলো সেখানে শুধু অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সমরাস্ত্র ও সেনাদলের রসদ রাখা হয়। কোন ধরণের বিলাস-ব্যসনের সংস্থান ও সংরক্ষণ কোন কালে যুদ্ধরীতি ছিল না।

প্রাচীন গ্রিস ও রোমান সাম্রাজ্যে ডজনখানেক দাস রাখা ছিল অভিজাত পরিবারের বৈশিষ্ট্য। কারো কারো শতাধিক কৃতদাস থাকলেও অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। অনেকটা পোষা পশু-পাখির মতো দাস উপহার হিসেবেও আদানপ্রদান হতো। সেই সময়ের প্রেক্ষিতেও অনেক বড় বড় কবি-দার্শনিক যে ঝাকঝমকহীন জীবনযাপন করেছেন তার উদাহারণ হিসেবে হোমার, প্লেটো ও জেনোর উদাহরণ টেনেছেন। ওই সময়ে এটা সবারই জানা ছিল যে মহাকবি হোমারের একজন দাস ছিল এবং প্লেটোর ছিল ৩ জন। এথেন্সের সবচেয়ে অভিজাত একটি পরিবারের সদস্য প্লেটোর জন্য এ সংখ্যাটি নিতান্তই কম। এছাড়া স্টোয়িক দর্শনের উদগাতা জেনোর যে কোন দাসই ছিল না সে প্রসঙ্গটিও তুলেন। তাদের জীবনকে কী দারিদ্র্যপীড়িত জীবন বলা যায়? বরং তারা সমকাল কিংবা পরবর্তীকালের হাজারো ধনাঢ্য ব্যক্তিদের চেয়ে কয়েকশগুণ সমৃদ্ধ জীবন যাপন করেছেন। এবং তাদের জীবন থেকে লাখো লাখো মানুষ মসলা/রসদ নিলেও তাদের ভাণ্ডারে একটুও টান পড়ছে না বরং তা দিনে দিনে বাড়ছে। সেনেকা তার ‘অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ’ বইয়েও এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন।  

সেনেকা একটু এগিয়ে বলেন, কোন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিতে মানুষের কুত্সা টলাতে পারে না। যে ব্যক্তি সম্পূর্ণভাবে নিজের উপর নির্ভরশীল সাধারণ মানুষের মতামত তাকে কী করতে পারে? সবচেয়ে ভয়াবহ অপমান হচ্ছে অপমানজনক মৃত্যু। কিন্তু সক্রেটিসের মৃত্যুটা কতই না মহীয়ান সে প্রসঙ্গ টানেন সেনেকা। ব্যক্তি হিসেবে সক্রেটিসকে হয়তো কারাগারের প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করতে পেরেছে এথেন্সের শাসকগোষ্ঠি। কিন্তু সক্রেটিসের ব্যক্তিত্বকে কী কারাগারের চারদেয়ালে আটকাতে পেরেছে? এছাড়া প্লেটোর সংলাপগুলোতে আমরা প্লেটোর যে ছবি পাই সেখানে কারাগার সক্রেটিসের উপর তেমন কোন প্রভাবই রাখতে পারেনি। এর মাধ্যমে সেনেকা বলার চেষ্টা করেছেন কোন মহান ব্যক্তির চরিত্রে বা ব্যক্তিত্বে স্থানের প্রভাব সীমিত।

একই সঙ্গে ‘অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ’ এর মূল সুরের প্রতিধ্বনী করে প্রকৃত সুখ ও শান্তি অনুসন্ধানে দর্শন চর্চায় মনোনিবেশ করার আহ্বান জানান সেনেকা। মাকে আশ্বস্থ করেন, দর্শন চর্চা তার ঘা শুকাতে সাহায্য করবে এবং সব দুঃখ সমূলে নির্মূল করবে। আগে এ চর্চার সঙ্গে পরিচিত না হলেও এখন তা করতে পারেন বলে পরামর্শ দেন। এ চর্চা জীবনের যেকোন পর্যায়ে শুরু করার যুক্তি দেখিয়ে সেনেকা বলেন, তুমি যদি ওই চর্চায় ফির ওটা তোমার নিরাপত্তা বিধান করবে। এটা তোমাকে প্রশান্তি দেবে, আনন্দিত করবে। দর্শনচর্চা যদি তোমার জীবনে জায়গা করে নিতে পারে তাহলে তা তোমার মনে দুঃখ, উদ্বেগ, উত্কণ্ঠাকে প্রবেশ করতে দেবে না। দর্শনই তোমার অব্যর্থ প্রহরী হতে পারে।

চিঠির সিংহভাগেই সংসার ও পারিবারিক বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করেছেন। শুধু প্রয়োজনীয় পারিবারিক তথ্য রেখে বাকিগুলো ছেকে ফেলে দিয়েছি। বিশটি অনুচ্ছেদের মধ্যে আমাদের নেয়ার মতো, গ্রহণ করার মতো, শিক্ষা গ্রহণের মতো কথাগুলো এখানে তুলে এনেছি। কোন গুরুত্বপূর্ণ কথা বাদ গেলে এটা আমার ব্যর্থতা। আর সব কৃতিত্ব সেনেকার। আমি তার প্রজ্ঞার সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়েছে এবং সেই মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছি মাত্র। 

এবার সেনেকার চিঠির শেষ অনুচ্ছেদ নিয়ে কথা বলে আলোচনা শেষ করবো। সেনেকার নির্বাসন কেন মার চিন্তায় বারবার আসবে সে বিষয়ে যুক্তি প্রদর্শনে বলেন, আমি জানি তোমার চিন্তায় আমি বারবার চলে আসবো; হয়তো তোমার অন্য সন্তানদের চেয়ে বেশি। এমন নয় যে তুমি তাদেরকে কম ভালোবাসো। আহত/আঘাতপ্রাপ্ত স্থানেই বারবার হাত চলে আসে-এটা মানুষের স্বাভাবিক মনোঃপ্রবৃত্তি। মায়ের চিন্তা ও উদ্বেগ বন্ধ করতে পারবেন না এটা মাথায় রেখে সেনেকা মাকে এই পথ বাতলে দেন-তাকে কীভাবে স্মরণ করতে হবে।  তিনি মাকে এ ছবি দেখান-ভালো সময়ের মতোই আমি খুশি ও আনন্দিত। বরং বলা যায় আমার সর্বোত্তম সময় যাচ্ছে; যেখানে আমার মন যেকোন ব্যতিব্যস্ততা থেকে মুক্ত। এটা সম্পূর্ণ অবকাশে রয়েছে; একটু পঠনপাঠনে আনন্দ খুজার ফুরসত্ পাচ্ছে; যেখানে আমার নিজের এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রকৃতি নিয়ে ভাবনার অবসর পাচ্ছি।

মায়ের কাছে চিঠি হলেও এ চিঠি থেকে অনুপ্রেরণা/রসদ পেয়েছে পরবর্তী জমানার অনেক পাঠক। মায়ের কাছে পাঠানো এ চিঠি সব পাঠকের কাছে পাঠানো চিঠিতে রূপ পাচ্ছে এখন। মা-ছেলের সম্পর্ককে ছাপিয়ে এ চিঠি বিশ্বজনীন চিন্তাকে ধারণ করেছে। এখান থেকে যেকোন বয়সের পাঠকই যার যার প্রয়োজনীয় রসদ নিতে পারবেন। সেনেকা যেমন তার পূর্ববর্তী দার্শনিকদের কাছ থেকে উদারহস্তে নিয়েছেন-তাদের ভাণ্ডারে টান না ফেলে তেমনি সেনেকার ভাণ্ডার থেকেও যেকোন পাঠক অগাধে নিতে পারবে। এখানে হিসেবের খাতা খুলে বসার কেউ নেই। আধুনিক সময়ের জটিল সমস্যা ও সম্পর্কের জটিল সমীকরণের প্রেক্ষিতে স্টোয়িক দর্শন এবং বিশেষ করে এর তিন রোমান পুরোধা ব্যক্তির চিন্তা বেশ জনপ্রিয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবছরই সেনেকা, এপিকটেটিউস ও মার্কাস অরেলিয়াসের উপর বই লেখা হচ্ছে; তাদের চিন্তাকে নতুন করে আবিষ্কারের প্রয়াসে। রোমান সাম্রাজ্যে কোন প্রতিষ্ঠিত ধর্মের অনুপস্থিতির কারণে স্টোয়িকবাদ যেমন একটি প্রভাবশালী দর্শন হিসেবে দাঁড়ায় এবং ক্ষমতার লড়াইয়ে শান্তি, স্বস্তি ও পূর্ণতা বিধানে এ দর্শন ভূমিকা রাখে তেমনি বর্তমানেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক অনুপস্থিতি এবং আধুনিক মানবের সংকটের জটিলতা স্টোয়িকবাদকে প্রাচীন দর্শনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় দর্শন হিসেবে হাজির করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থেকে বেঁচে ফেরা ভিক্টর ই ফ্রাঙ্কেলের ম্যান’স সার্চ ফর মিনিং, ভিয়েতনাম যুদ্ধে নর্থ ভিয়েতনামিজের হাতে আটকে পড়া মার্কিন কমান্ডার জেমস স্টকডেল এবং হাল আমলে রায়ান হলিডের মতো লেখকরা তার জনপ্রিয়তা ও প্রাসঙ্গিকতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছেন।

Image Credit: Pinterest, Nirvanic Insights


Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!