সবচেয়ে ধনী মানুষ কারা- সক্রেটিক সংলাপ

Reading Time: 3 minutes

সক্রেটিস (খ্রি.পূ. ৪৭০-৩৯৯) যেন আলোকের ঝর্নাধারা যেখান থেকে অনেকগুলো স্রোত প্রবাহিত হয়েছে। প্রাচীন গ্রীক দর্শনের অন্তত তিনটি ধারার উৎসমূল হিসেবে সক্রেটিস বিবেচিত হন। তিনি যেমন প্লেটো-এরিস্টটল-থিওফ্রাসটাস এই ধারার প্রাণপুরুষ তেমনি স্টোয়িকবাদের প্রবক্তা জেনো (খ্রি.পূ. ৩৩৪-২৬২)ও সক্রেটিসকে সরাসরি না দেখে শুধু তার জীবন সম্পর্কে জেনে তাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং স্টোয়িকদের একটি ধারা তৈরি করেন। এ ধারায় প্রধান চরিত্র সেনেকা, এপিকটেটিউস ও মার্কাস অরেলিয়াসের মতো দার্শনিক। অন্যদিকে সক্রেটিসের ঘনিষ্ঠ এক অনুসারী এন্টিস্থেনিসকে (খ্রি.পূ. ৪৪৫-৩৬৫) বলা হয় সিনিকবাদের প্রবক্তা। এন্টিস্থেনিসের যোগ্য উত্তরসুরী ডায়োজেনিস সবচেয়ে বিখ্যাত সিনিক। তারা সক্রেটিসের মত-পথের চূড়ান্তটি গ্রহণ করেন। ডায়োজেনিস প্লেটো, ডেমোস্থেনিসসহ সমকালীন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গকে কড়া সমালোচনা করলেও সক্রেটিসকে আদর্শ হিসেবে মানতেন।

সক্রেটিস সমাজের প্রথা ও রীতি নীতির মধ্যে থেকেই তার সংস্কারের চেষ্টা চালিয়েছেন কিন্তু ডায়োজেনিস সমাজকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে প্রচলিত প্রথা, রীতি নীতিকে নিজের ব্যতিক্রমী জীবনের মাধ্যমে ধাক্কা দিয়েছেন।

অল্প কয়েকজন ভালো মানুষের বিরুদ্ধে অজস্র খারাপ মানুষের লড়াইয়ের চেয়ে খারাপের বিরুদ্ধে অল্প কয়েকজন ভালো মানুষের লড়াই উত্তম।

-এন্টিস্থেনিস

সক্রেটিসের অনুসারী এন্টিস্থেনিসের অনেকগুলো সুন্দর উক্তি রয়েছে যা তার জীবনের গভীর উপলব্ধি থেকে উৎসারিত। তিনি বলতেন, অল্প কয়েকজন ভালো মানুষের বিরুদ্ধে অজস্র খারাপ মানুষের লড়াইয়ের চেয়ে খারাপের বিরুদ্ধে অল্প কয়েকজন ভালো মানুষের লড়াই উত্তম। তার আরেকটি কথা হচ্ছে, শত্রুর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা উচিত কারণ তারাই প্রথমে তোমার ভুল ধরিয়ে দিতে পারে। তিনি বলতেন, প্রজ্ঞা হচ্ছে সবচেয়ে মজবুত দুর্গ যাকে ভাঙ্গা যায় না, পরাস্ত করা যায় না।

শত্রুর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা উচিত কারণ তারাই প্রথমে তোমার ভুল ধরিয়ে দিতে পারে

-এন্টিস্থেনিস

সক্রেটিসের অপর এক অনুসারী জেনোফোনের (খ্রি.পূ. ৪৩১-৩৫৪) ‘সিম্পোজিয়ামে’ এন্টিস্থেনিসের একটি গল্প উঠে এসেছে। এন্টিস্থেনিসকে একবার সক্রেটিস জিজ্ঞেস করেন, নিজের কী নিয়ে গর্বিত তুমি। এন্টিস্থেনিসের জবাব, ‘আমার সম্পদ’। উপস্থিত হার্মোজেনিস নামে এক গ্রিক জিজ্ঞেস করলো, তার কাছে অনেক টাকাকড়ি আছে কী না? এন্টিস্থেনিসের জবাব, কানাকড়িও নেই। তাহলে নিশ্চয়ই অনেক জায়গা জমি আছে? জানতে চাইলো ওই ব্যক্তি।

এবার গুরু সক্রেটিস তার সম্পদের ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। অল্প জিনিসপত্র নিয়ে এন্টিস্থেনিস কীভাবে সম্পদের গর্ব করেন তা ব্যাখ্যা করতে বলেন। এন্টিস্থেনিস তখন বলেন, আমার দৃঢ়বিশ্বাস/প্রতীতি জন্মেছে মানুষের প্রাচুর্য্য কিংবা দারিদ্র্য তার সম্পদের পরিমাণের উপর নির্ভরশীল নয় বরং এটা একটা মানসিক অবস্থা। আমি হরহামেশাই দেখি, অনেকের প্রচুর সয়সম্পদ থাকা সত্ত্বেও অভাবে রয়েছেন বলে মনে করেন। তাদের কাছে সম্পদ কম থাকায় সম্পদ ভাণ্ডারে আরো কিছু যোগ করার জন্য তারা যেকোন ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত থাকে। এমনকি সমপরিমাণ সম্পদের উত্তরাধিকার পাওয়া ভাইদের মধ্যেও দেখেছি, একজন তার সম্পদে তুষ্ট আর অপরজন অতৃপ্ত।এমনকি আমরা এমন স্বৈরাচারী শাসক দেখেছি যাদের সম্পদের প্রতি এতই মোহ যে তা অর্জনের জন্য তারা পৃথিবীর জঘন্যতম অপরাধ করতেও দ্বিধাবোধ করে না। বিত্তহীন মানুষ কোন জিনিসের অভাব অনুভব করলে সে চুরি করে, সিদকেটে ঘরে ঢুকে বা দাসব্যবসা করে কিন্তু স্বৈরাচারী শাসক পুরো পরিবার ধ্বংস করে দেয়, ব্যাপক গণহত্যা চালায়। অর্থের জন্য এমনকি পুরো শহরকে দাসত্বের শৃঙ্খলে বেধে ফেলে।

এসব লোকদের জন্য করুণা অনুভব করি। তারা খুবই জঘন্য এক রোগে আক্রান্ত। তাদের অবস্থা ওই লোকদের মতো যাদের সামনে অনেক খাবার আছে এবং গলা পর্যন্ত খেয়েও যাদের ক্ষুধার আগুন নেভে না।
কিন্তু আমার কাছে যা আছে তাতেই সন্তুষ্ট। আমার সামনে যে খাবার আছে তা আমার ক্ষুধা নিভারণের জন্য যথেষ্ঠ, যে জল আছে তেষ্টা নিভারণের জন্য যথেষ্ঠ, যে ঘর আছে-আশ্রয়ের জন্য যথেষ্ঠ। সম্পদ পুঞ্জিভূতকরণের মধ্যেই সুখ নেই, মনের তুষ্টিতেই সুখ। যারা তাদের যাই আছে তাতে সন্তুষ্ঠ তাদের পক্ষে কখনো অন্যের সম্পদ লুট করে দখলের লোভ থাকে না। এমনতর লোক বরং তাদের সম্পদ বিলিয়ে দিয়ে আনন্দ পায়। সংলাপে উপস্থিতদের সামনে এন্টিস্থেনিস আরো বলেন, দেখুন সক্রেটিসের প্রতি-যার কাছ থেকে আমি আমার বেশিরভাগ সম্পদ পেয়েছি। তিনি কীভাবে বিলিয়ে দেন! বাটখারা কিংবা গজ ফিতা দিয়ে মেপে দেন না বরং আমার পক্ষে যতটুকু ধারণ করা সম্ভব ততটুকুই দেন। আমার জন্যও এটা সত্য। কাউকে দেয়ার বেলায় আমি তো কার্পণ্য করতে পারি না। কেউ চাইলে আমার কাছে যে সম্পদ আছে তা সবটুকু বিলিয়ে দিলেও কষ্ট লাগবে না।

আমার সম্পদের আরেকটি চমৎকার দিক হচ্ছে, আমি সবসময় অখণ্ড অবসরে আছি। (আরো আরো সম্পদ দখলের ব্যতিব্যস্ততা নেই)।এ কারণে দেখার মতো কিছু দেখতে, শুনার মতো কিছু শুনতে যেকোন সময় যাত্রা শুরু করতে পারি, যা আমার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই যে দেখুন, আজ সারাদিন আমি সক্রেটিসের সঙ্গ লাভ করেছি।

তথ্যসূত্র:
জেনোফোনের ‘সিম্পোজিয়াম’
ডায়োজেনিস দ্য সিনিক-সেয়িংস অ্যান্ড অ্যানেকডটস, রবিন হার্ড, অক্সফোর্ড ওয়ার্ল্ডস ক্লাসিকস সিরিজ, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস-২০১২

ছবিসূত্র: thoughts-brigitte.blogspot.com

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!