সব দোষ কি হুজুরের?

Reading Time: 3 minutes

এখন থেকে আট বছর আগের ঘটনা- আমি সেবছরই মাস্টার্স করতে নেদারল্যান্ডসে আসি। এক বাংলাদেশী পরিবার আমাকে ডিনার করার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বেশীরভাগ বাঙ্গালি গেদারিং ভালো আড্ডা দেয়ার মত জায়গা না, মানুষ একটু বেশী থাকায় আপনি সিরিয়াস কোন জিনিস নিয়ে কথা বলবেন এটা খুব একটা সম্ভব হয় না। এছাড়া আমাদের যে খাবার-দাবার এবং আমরা যে পরিমাণে খাই আড্ডার জন্য ব্যাপারটা খুব একটা কন্ডিউসিভ না। তবে সেদিনের পরিবেশ আড্ডার জন্য বেশ উপযোগী ছিল।

কথায় কথায় জানলাম ভদ্রলোক ধর্ম মানেন না- এটা হতেই পারে।

আলোচনা সব অলিগলি পেরিয়ে ধর্মে গিয়ে ঠেকল। তিনি আমাকে একটা গল্প বললেন। বাংলাদেশ থেকে একজন হুজুর মসজিদের ইমাম হয়ে নেদারল্যান্ডসে এসেছেন, এবং বেশ কয়েক বছর থাকার পর কোন একটা কারণে তার চলে যাওয়ার উপক্রম হলো। কিন্ত তিনি এখানের আয় রোজগার, চাকরি ছেড়ে যেতে চাচ্ছিলেন না। তো তিনি একটা ভাল পরিকল্পনা করলেন- তিনি একটা কার এক্সিডেন্ট ড্রামাটাইজ করলেন এবং নিজের শরীরের লিমিটেড ডেমেজ করে ডাচ অথরিটিকে বুঝালেন যে তিনি এখন শারীরিকভাবে অসুস্থ এবং এ অবস্থায় দেশে গিয়ে তার পক্ষে কাজ করা সম্ভব না। তিনি যেন মানবিক বিবেচনায় এদেশে থাকতে পারেন। নেদারল্যান্ডসে কোন এমপ্লয়ি অসুস্থ হলে এবং অসুস্থতার জন্য কাজের অনুপযুক্ত হলে এমপ্লয়ার তাকে বের করে দিতে পারে না। এবং বেতনের একটা বড় অংশ প্রতিমাসে তাকে দিয়ে যান কোন কাজ ছাড়াই। তিনি সম্ভবত সেরকম কোন একটা সুযোগ নিয়ে এদেশে থেকে গেলেন।

ভদ্রলোক এ গল্পটা ব্যবহার করেছিলেন দেশের ধার্মিক মানুষেরা কত অসৎ এবং কেন তিনি ধর্মের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন এটা বুঝাতে গিয়ে । এরকম আরও অনেক মানুষের সাথে আমার দেখা হয়েছে সময়ে সময়ে। মানুষের ধর্মবিশ্বাস থাক বা না থাক এটা নিয়ে আমার আপত্তি নেই, আপত্তি হলো অসততা নিয়ে।

বাংলাদেশ থেকে প্রগতিশীল, শিক্ষিত, নাস্তিক, ব্লগার পরিচয় দিয়ে অনেক মানুষ প্রায় প্রতিবছর বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় নেয়। ভালো জীবনযাপন, চাকরির সুবিধা, জীবনের নিরাপত্তা এসব বিবেচনায় তারা এ কাজটি করে থাকে। কিন্ত বাঙ্গালি বুদ্ধিজীবীর মন কখনো তাদের এসব অনাচার দেখে নাস্তিকতার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে না, প্রগতিশীলতার ঈমানে তারা সব সময় থাকেন টইটম্বুর।

অথবা দেখুন না- যেই দেশের সরকার মানুষ খুন করে, গুম করে, রাতদিন মানবাধিকার লঙ্ঘন করে তাদের কাছে থেকে পদক, শিরোপা সম্মাননা নেয়ার সময় তারা একটিবারও বলেন না যে আপনাদের পদক এবং বিবেচনার প্রতি আমার আস্থা এবং সম্মান নেই।

একজন হুজুর খারাপ কাজ করতে পারেন- ইনফ্যাক্ট বাংলাদেশ এমন কোন জায়গা না যে এখানে মানুষ নিষ্কলুষ হিসেবে থাকবে। কারণ এখানে অন্যায় ছাড়া থাকা খুব কঠিন কাজ। একেবারে নিরীহ কাজেও আপনাকে ঘুষ দিতে হবে। বাংলাদেশে এমন অনেক কাজ আছে যেটাকে মানুষ খারাপই মনে করে না। এটা আইডিয়াল না কিন্ত ফ্যাক্ট। একটা মানুষ যে সমাজে বড় হয় সে সমাজের প্রভাব সে অতিক্রম করতে পারে না। ফলে একজন হুজুর, আস্তিক, নাস্তিক খারাপ কাজ করতে পারেন কিন্ত এটা তার আইডিয়োলজির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে কখনো একমাত্র ক্রাইটেরিয়া হতে পারে না।

বাংলাদেশের যত চুরি, জোচ্চোরি এগুলো ত হুজুর রা করে না, করে আলোকিত প্রগতিশীল শিক্ষায় “শিক্ষিত” মানুষেরা। কিন্ত কি আশ্চর্য- বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষেরা সহজে ঈমান হারিয়ে ফেলেন শুধু ধর্মের উপরে। একটিবারের জন্য তারা এ পুরো ব্যবস্থাটির উপর ঈমান হারিয়ে এসব “শিক্ষিত” মানুষের সংস্রব থেকে দূরে থাকার নিরামিষাশী সংকল্পটি করেন না- বরং এ সিস্টেমের পুরো সুবিধা, সম্মাননা, পদক-পুরস্কার তারা নিয়ে থাকেন। তারা অল্পতেই অভিমান করে ধর্মহীনতার পুরোহিত হয়ে যান কিন্ত বাকি জীবন অন্যান্য সব অনাচারের সবটুকু সুবিধা নিয়ে যান। যাদের বিরুদ্ধে তাদের এ অভিমান তাদের চেয়ে হাজার গুণ জঘন্য মানুষের কাজে কারেবারে তাদের সে কি সম্মতি!

আনিসুজ্জামান সাহেব-রা শুধু মাত্র একটা খুতবা শুনে ধর্মে মতি হারিয়ে ফেলেন, কিন্ত চোখের সামনে ভোট ডাকাতি, ব্যাঙ্ক লুট, গুম, খুন দেখেও মনিবের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন না। মনিব ডাক দিলে লেজটি নাড়তে নাড়তে হাজির হন- মনিবের কাছ থেকে আরেকটা পালক কি করে নিজের সম্মানের মুকুটে যোগ করতে পারবেন সে চিন্তায় থাকেন মশগুল। নিজের বিশ্বাসের যে একটা ইন্টেলেকচুয়াল ভিত্তি দাঁড়া করাবেন- ভাতের সন্ধানে থাকা বুভুক্ষু বুদ্ধিজীবীদের হাভাতে মন এ পরিশ্রমের কাজটি করে কুলিয়ে উঠতে পারে না। আসলে হাভাতে হয়ে বুদ্ধিজীবিতা করা কিন্ত খুব কঠিন কাজ।

Jahid Razan

কভার ফটো: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রভাবশালী চরিত্র হাফেজ্জী হুজুর

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!