সমুদ্র অর্থনীতিঃ বিশ্ব ও বাংলাদেশ

Reading Time: 3 minutes

পরিচিতি

Blue Economy-কে বাংলায় আমরা সমুদ্র অর্থনীতি বলছি। কেউ কেউ আবার এটিকে সুনীল অর্থনীতিও বলে থাকেন। এই কথাটি বলতে সমুদ্র্র থেকে প্রাপ্ত খনিজ ও মৎস্য সম্পদ এবং এর সাথে জড়িত মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমষ্টিকে বোঝানো হয়। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এ বিষয়টিকে বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস চালিয়েছেন। বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত সংজ্ঞায় বলা হয়েছে যে, “The Blue Economy is the sustainable use of ocean resources for economic growth, improved livelihood and jobs, and oceanic ecosystem health.” (অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নত জীবিকা ও কর্ম এবং সমুদ্রের বাস্তুগত পরিবেশ ঠিক রাখার উদ্দেশ্যে সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবহৃত হলে তাকে সমুদ্র অর্থনীতি বলে।) অন্যদিকে, ইউরোপীয় কমিশনের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, “Blue Economy refers to all economic activities related to oceans, seas and coasts.” (মহাসাগর, সাগর ও উপকূলের সাথে সম্পর্কিত সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নাম-ই সমুদ্র অর্থনীতি।) বাংলাদেশ সরকার প্রণীত ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সমু্দ্র অর্থনীতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, “Blue Economy comprises activities that directly or indirectly take place in the seas, oceans and coasts using oceanic resources and eventually contributing to sustainable, inclusive economic growth, employment, [and] well-being, while preserving the health of ocean.” তবে এ ধারণাটি খুব বেশি দিনের আগের নয়। ২০১০ সালে প্রকাশিত “The Blue Economy: 10 Years, 100 Innovations, 100 Million Jobs” নামক বইটিতে বেলজিয়ামের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ Gunter A. Pauli সর্বপ্রথম ব্লু ইকোনোমি পরিভাষাটি ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে ২০১২ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে আয়োজিত রিও+২০ সম্মেলনে এ পরিভাষাটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।

বিশ্বেসমুদ্র অর্থনীতি

সারা বিশ্বে সমুদ্র অর্থনীতি কথাটি রীতিমতো এক গুঞ্জনে পরিণত হয়েছে। প্রথমে বিশ্ব অর্থনীতির কথা-ই ধরা যাক। বিশ্বে আমদানি-রপ্তানির শতকরা ৯০ ভাগ পণ্য সমুদ্র পথে পরিবহন করা হয়ে থাকে। এছাড়া সমুদ্রের তলদেশে থাকা মূল্যবান খনিজ সম্পদ ও মৎস্য সম্পদের কারণে সমুদ্র অর্থনীতির গুরুত্ব দিন দিন বেড়ে চলেছে। মানুষের কর্মসংস্থানের উন্নতির ক্ষেত্রেও সমুদ্র অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। ইউরোপীয় কমিশনের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, ২০১৬ সালে বিশ্বে সমুদ্র সংক্রান্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ৩.৪৮ মিলিয়ন লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে আরো জানানো হয় যে, এ সময় এ খাতের সাথে জড়িত লোকের মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১৪.২%। একই সাথে বিশ্ব রাজনীতির ক্ষেত্রেও সমুদ্র অর্থনীতির প্রভাবের বিষয়টি চলে আসে। সুদূর অতীত কাল থেকে বিশ্বে যত বড় বড় নগরী ও বন্দর গড়ে ওঠেছে, তার প্রায় সবগুলো নদী ও সমুদ্রবন্দর কেন্দ্রিক। এ ধারা আধুনিক যুগেও অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ ও ক্ষমতার লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রয়েছে সমুদ্র। বলা বাহুল্য যে, সমুদ্রের কথা এলে তার By-Product হিসেবে এর সাথে সংশ্লিষ্ট মানুষের কর্মকাণ্ড তথা সমুদ্র অর্থনীতির কথা চলে আসাটাই স্বাভাবিক বৈকি! এ প্রসঙ্গে ১৯০৪ সালে ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন ম্যাকিনদারের হার্টল্যান্ড তত্ত্বের কথা উল্লেখ না করে পারছি না। এ তত্ত্বে তিনি বলেছিলেন, “…… যারা সমুদ্রকে শাসন করবে, তারা সারা বিশ্বকে শাসন করবে।” আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে বিশ্ব রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন দেখা গেলেও বর্তমান বিশ্বেও এর যথেষ্ট প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়।

বাংলাদেশেসমুদ্র অর্থনীতি

বিশ্ব প্রেক্ষাপটের মতো বাংলাদেশে-ও এই পরিভাষাটি চলমান দশকের মধ্যভাগের দিকে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ভারত ও মায়ানমারের সাথে সমুদ্র বিরোধ মীমাংসার পর থেকে সমুদ্র অর্থনীতি নিয়ে বহুল আলোচনার জন্ম হয়। আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হওয়ায় বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র অঞ্চল, ২০০ নটিক্যাল মাইলের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কর্তৃত্ব পায়। একইসঙ্গে চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠারও অধিকার পায় বাংলাদেশ। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতিতে প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে মাননীয় অর্থমন্ত্রী বলেন, “আমাদের ৮৮ শতাংশ নীল সমুদ্র অর্থনীতিকে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।”

চিত্র: বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতির কিছু চ্যালেঞ্জ
ক্রেডিট: ড. মো. ম. ফারুক হোসেন, অধ্যাপক, ইন্সটিটিউট অব মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড ফিসারিজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ভারত সাগর রিম এসোসিয়েশন ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে দুই দিনব্যাপী এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে। ভারতের সঙ্গে এ ব্যাপারে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ব্যাপারে চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে জাপান ও চীন আগ্রহ দেখিয়েছে। অর্থায়নে আগ্রহ পোষণ করেছে বিশ্বব্যাংক। মৎস্য সম্পদ আহরণ, খনিজ তেল ও সম্পদ, বিদ্যুৎ খাত সহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বাংলাদেশে সমুদ্র অর্থনীতির যেমন সম্ভাবনাময় খাত রয়েছে, তেমনি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ-ও রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়ে না। এ প্রসঙ্গ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রো-ভিসি অধ্যাপক আ.স.ম. মাকসুদ কামাল বলেন, সমুদ্রে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়াতেই সরকার বহুলাংশে সন্তুষ্ট থেকেছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে সমুদ্র সম্পদকে যেভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন, সেভাবে কাজে লাগানো হয়নি।” এসব সম্ভাবনাকে বাস্তবে কতটা রূপ দেওয়া সম্ভব হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!