স্বাধীনতা এবং পরবর্তীকালের উপন্যাস, ছোটোগল্প ও শিশু-কিশোর সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি

Reading Time: 5 minutes

বাংলা উপন্যাস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা এবং দেশভাগের রক্তপঙ্কিল পথে যেন হারিয়ে গিয়ে ছিল এবং এর মধ্যদিয়েই এল ভারতের স্বাধীনতা। মূল্যবোধের অধঃপতন এবং অবক্ষয়ের অভিঘাতে বাংলা উপন্যাসের স্বাভাবিক বিকাশ ও গতিশীলতা রুদ্ধ হলেও যাযাবরের ‘দৃষ্টিপাত’ -এর মতো আলগা চটকদারিত্বে ভরা কিছু উপন্যাস লেখা হল। এসময় আশাপূর্ণা দেবীর ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’ কিছুটা তাৎপর্যপূর্ণ।

আশাপূর্ণা দেবীর ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’; ছবি: Goodreads

তাঁর লেখায় শৈলবালা ঘোষ জায়া, শান্তা দেবী, সীতা দেবী কিংবা প্রভাবতী দেবী সরস্বতীদের লেখালেখির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটা সময়ের পদছচিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠল। কেননা সেখানে ব্যক্তির সঙ্গে প্রেক্ষাপটের দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও মিলন গড়ে তোলায় লেখিকা মুন্সিয়ানা দেখালেন। পরে লেখা ‘সুবর্ণলতা’ এবং ‘বকুলকথা’ উপন্যাস সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। দৃষ্টিভঙ্গির এই স্বাতন্ত্র্যের সার্থক উত্তরাধিকার ভিন্নভাবে প্রকাশিত হল আরও পরে লীলা মজুমদার ও প্রতিভা বসুর লেখায়। শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনের পরিবারকেন্দ্রিক কাহিনি লিখলেন বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘তিথিডোর’ উপন্যাসে।

কিন্তু সমকালীন সময়ের অভিঘাতে, ধ্বস্ত জীবনের অসহায়তা ব্যক্ত হয়ে উঠল জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, সন্তোষকুমার ঘোষ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, বিমল কর প্রমুখের লেখায়। বাঙালি কি চিরতরে হারিয়ে ফেলল তা জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর ‘বারো ঘর এক উঠোন’ -এ সর্বকালের জন্য মুদ্রিত হয়ে রইল। রমেশচন্দ্র সেন এর ‘কুরপালা’ উপন্যাসে দরিদ্র মানুষের বেঁচে থাকার জন্য নিরন্তর লড়াইয়ের ছবি জীবনের ছন্দকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করল। সমরেশ বসু তাঁর ছোটোগল্পে গঙ্গার পাড় থেকে ধুলোকাদা মাখা ঘিঞ্জি খাপড়ার চালওলা বস্তিকে তুলে এনে দেখালেন মানুষের সংকট এবং জীবনসত্যের অপরিবর্তনীয়তা। ‘আদাব’ গল্পে অমানবিক অবস্থা ও পরিবেশেও মানবিকতার কাহিনি বিবৃত হল।

অসীম রায় তাঁর ‘গোপাল দেব’, ‘দ্বিতীয় জন্ম’ প্রভৃতি বাংলা সাহিত্যের অননুকরণীয় গদ্যে ফুটিয়ে তুললেন অস্তিত্বের সংকট, অর্থহীনতা, এবং আপাত তাৎপর্যহীন জীবনকে সমগ্রে বুঝে নেওয়ার তাৎপর্য। মধ্যবিত্ত মনের বিচ্ছিন্নতা, সংকট আর মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের অবনমন নানা ভাবে ও রূপে প্রকাশিত হল সন্তোষ কুমার ঘোষের ‘কিনু গোয়ালার গলি’, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শিলালিপি’, সমরেশ বসুর ‘শ্রীমতি কাফে’, নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘চেনামহল’ উপন্যাসে। এঁদের ছোটোগল্পেও বিচিত্র কাহিনির মোড়কে এই টানাপোড়েন ফিরে ফিরে ধরা দিল। এ বিষয়ে নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘হেডমাস্টার’, ‘পালঙ্ক’, ‘পতাকা’, নবেন্দু ঘোষের ‘কল্কি’, ‘ত্রাণকর্তা’, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘মাননীয় পরীক্ষক মহাশয় সমীপেষু’, ‘তিতির’ প্রভৃতি সেরা সাহিত্যের নাম করা যায়।

আবার এই সময়েই তিতাসের ঢেউয়ের মতো ধীর আলগা স্রোতে মালো পাড়ার জন্ম-বিবাহ-মৃত্যুর সঙ্গে অন্তর্লীন জীবিকার ছবিকে কাব্যের স্তরে পৌঁছে দিলেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের লেখা অদ্বৈত মল্লবর্মণ। সমরেশ বসুর ‘গঙ্গা’ ও অমরেন্দ্র ঘোষের ‘চরকাশেম’ নদীকেন্দ্রিক শ্রমজীবী মানুষের আখ্যান হলেও তা কখনই ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ -এর স্তরে উন্নীত হতে পারেনি। সমরেশ বসুর প্রথম পর্বের লেখায় মানুষ-প্রকৃতি-সমাজের পারস্পরিক টানাপোড়েন মুখ্য বিষয় ছিল, কিন্তু পরের দিকে তিনি যখন মানুষের ব্যক্তিক সংকট, আত্মসমীক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েছেন তখন তাঁর উপন্যাস হয়ে উঠেছে তীক্ষ্ণ, তীব্র ও গভীর। এ প্রসঙ্গে ‘স্বীকারোক্তি’, ‘শেকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে’, ‘মহাকালের রথের ঘোড়া’ উপন্যাসের কথা বলা যায়। আর প্রমথনাথ বিশীর ‘লালকেল্লা’, বিমল মিত্রের ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ —এর ধারায় ইতিহাসের চিহ্ন লক্ষণযুক্ত কিছু সেরা ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার একটা ঘরানা তৈরি হল।

এছাড়া এই সময়ের কথার উপসংহার টানতে হলে কমলকুমার মজুমদারের ‘অন্তর্জলী যাত্রা’, ‘অনিলা সুন্দরী’, ‘তাহাদের কথা’ প্রভৃতি উপন্যাসের চিত্রকাব্যময় গদ্যভাষা, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখার বৈচিত্র্য ও সমাজ সচেতনতা এবং আশাপূর্ণা দেবীর ‘কার্বন কপি’, ‘জয়’, ‘মলাটের মুখ’, ‘ঘুষ’, ‘মাথা ধরা’ প্রভৃতি গল্পে মধ্যবিত্ত পরিবার জীবনের পরিবেশ, সমস্যা এবং নির্মম সত্য যেভাবে উদঘাটিত হয়েছে সেকথা আলাদা করে উল্লেখ করতেই হয়। এরপরই একে একে মহাশ্বেতা দেবী, মতি নন্দী, কবিতা সিংহ,অমিয়ভূষণ মজুমদার, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, দেবেশ রায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের মতো একদল তরুণ লেখকের আবির্ভাব ঘটেছিল। কিন্তু তাঁদের শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধিত্বমূলক লেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরও কিছুকাল।

বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়দের পরে সম্পূর্ণ পৃথক ও নতুন রীতির গল্প-উপন্যাস লেখার কাঠিন্য, স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা উপন্যাস ও গল্পে এক সাময়িক বন্ধ্যাত্ব ও নতুনত্বের অভাব সৃষ্টি করেছিল (অসীম রায়ের মতো কয়েকজন উজ্জ্বল ব্যতিক্রমের কথা আলাদা)। তবে বিচিত্রকর্মা, অনুসন্ধিৎসু এবং বলিষ্ঠ লেখকদের স্বতন্ত্র পথ খোঁজার নিরন্তর প্রয়াসে তা দূর হল। ক্রমে বাংলা গল্প-উপন্যাস আবার শাখাপ্রশাখায় বিস্তৃতি লাভ করল জীবনের দ্বন্দ্ব-অবক্ষয়-সংকটকে পরিবর্তমান সময়ের নতুন জল-মাটিতে পুনরাবিষ্কারের মধ্য দিয়ে।

শিশু-কিশোর সাহিত্য প্রসঙ্গে:

পৃথিবীর যে-কোনো ভাষাতেই প্রাথমিকভাবে নীতিশিক্ষামূলক ছোটো ছোটো লেখা দিয়ে পাঠ্যপুস্তকের প্রয়োজন মিটত। ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে বিদ্যালয়ে যখন বাংলা ভাষার পঠন পাঠন শুরু হল, তখন কীভাবে তা পড়ানো হবে এটিই ছিল প্রধান সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অক্ষর পরিচয়ের জন্য ‘বর্ণপরিচয়’ এবং সদ্য পড়তে শেখা পড়ুয়ার দ্রুত পঠনের জন্য ‘কথামালা’, ‘আখ্যানমঞ্জরী’, ‘বোধোদয়’ —প্রভৃতি পাঠ্যপুস্তক লিখলেন। একই সঙ্গে উচ্চারিত হতে পারে মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘শিশুশিক্ষা’, অক্ষয়কুমার দত্তের ‘চারুপাঠ’ প্রভৃতি পাঠ্যপুস্তকের নাম।

তবে শিশুদের পাঠ্যপুস্তকের প্রয়োজনে, এর বেশির ভাগ লেখাই হত অন্যভাষা থেকে অনূদিত, প্রচলিত কাহিনির্ভর বা সংস্কৃত রচনার ভাবানুবাদ। অর্থাৎ শিশুমনের উপযুক্ত মৌলিক রচনার জন্য আরও কিছুকাল অপেক্ষা করতে হল। অক্ষর পরিচয়ের বইকে আরও মনোরম ও শিশুমনের উপযোগী আর সচিত্র করে তুললেন যোগীন্দ্রনাথ সরকার। তাঁর রচিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘হাসিখুশি’, ‘হাসিরাশি’, ‘ছবি ও গল্প’, ‘হাসিমেলা’ প্রভৃতি। তখনও কিন্তু শিশুদের উপযুক্ত গল্প-কবিতা-ছড়া সেভাবে লেখা হয়নি; তবে শিবনাথ শাস্ত্রী, কেশবচন্দ্র সেন বা ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের কলমে কিশোর-কাহিনি রচিত হতে দেখা গেল। এঁদের রচনায় আরোপিত শিক্ষামূলক বিষয়ের পরিবর্তে কিশোর বয়সের নানাবিধ সমাজ-অভিজ্ঞতা রূপায়িত হল। সেখানে নানান উপকথা, আজগুবি বিষয়, ভূতের গল্প, রোমাঞ্চকর গল্পের দেখা মিলল।

বাংলা শিশুসাহিত্য যাঁর চেষ্টায় স্বাবলম্বী হয়ে উঠল, তিনি উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। তিনি একই সঙ্গে রূপকথা-উপকথা-প্রচলিত কাহিনি (যেমন ‘টুনটুনির বই’, ‘পানতাবুড়ি’, ‘সাক্ষীশেয়াল’ প্রভৃতি), দেশ-বিদেশের লেখার অনুবাদ, তথ্যসমৃদ্ধ জ্ঞানমূলক রচনা এবং খাঁটি বাঙালিয়ানায় সমৃদ্ধ বহু লেখা লিখলেন। পরবর্তীকালে অনেকেই যেমন সুকুমার রায়, সুখলতা রাও, যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ তাঁকে অনুসরণ করে বাংলা শিশুসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। বিশেষ করে সুকুমার রায়ের ‘আবোল-তাবোল’ বইটির কথা উল্লেখ করতেই হয়। প্রচলিত বাংলা ছড়া বা কবিতার ঐতিহ্যের বাইরে বেরিয়ে তিনি উদ্ভট বা ননসেন্স কবিতার এক আশ্চর্য জগৎ তৈরি করলেন। তাঁর লেখা নাটক, বহু কাহিনি, ইসকুলের গল্প, মণীষী ও অভিযাত্রীদের জীবনী বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যের একটা বড়ো অংশ জুড়ে আছে।

রায়চৌধুরী পরিবারের অন্যান্যদের মধ্যে সুখলতা রাও, পুণ্যলতা চক্রবর্তী, লীলা মজুমদার এবং সত্যজিৎ রায় বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যে অনেকগুলি নতুন ধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করলেন। ছোটো মেয়েদের অভিজ্ঞতার গল্প, কল্পবিজ্ঞানের গল্প, মজার গোয়েন্দা কাহিনি প্রভৃতির সংযোজনে শিশুর কল্পনার জগৎকে অসামান্য ব্যাপ্তি এনে দিলেন।

একদিকে শিশুমনের লাগামছাড়া কল্পনা যেমন শিশু সাহিত্যে স্থান করে নিল, তেমনই প্রচলিত রূপকথার গল্প, ছড়া, ব্রতকথা, পাঁচালীর গল্প প্রভৃতি সংগ্রহের উদ্যোগ দেখা দিল। যার প্রতিফলন দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ‘ঠাকুরমার ঝুলি’, ‘ঠাকুরদাদার ঝুলি’ প্রভৃতিতে লক্ষ করা যায়। এই রূপকথা বলার ধরনটি আরও আধুনিক হয়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনায় ফুটে উঠল। প্রসঙ্গত তাঁর ‘ক্ষীরের পুতুল’, ‘রাজকাহিনি’, ‘নালক’, ‘বুড়ো আংলা’র নাম করা যায়।

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে নানান সমাজ-রাজনৈতিক আন্দোলন শিশুসাহিত্য, বিশেষত কিশোর সাহিত্যের ধারাকে প্রভাবিত করেছে। ইংরেজ-বিরোধী স্বাধীনতার চেতনা, প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কিশোর চরিত্রগুলির মধ্যে প্রকাশিত হল। এই প্রবণতা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, হেমেন্দ্রকুমার রায়, খগেন্দ্রনাথ মিত্র, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনির্মল বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিমলচন্দ্র ঘোষ প্রমুখের রচনায় লক্ষ করা গেল। এঁদের লেখায় চঞ্চল, দুঃসাহসী, কখনও বা বেপরোয়া, প্রতিষ্ঠানবিরোধী অন্য এক ধরনের মুক্তিকামী ভালো আদর্শ তরুণের টাইপ তৈরি হল।

এখানে বলা উচিত, বাংলা সাহিত্যের প্রথিতযশা প্রায় সকলেই শিশু-কিশোরদের জন্য কিছু-না-কিছু লিখেছেন। এ ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ‘শিশু’, ‘শিশু ভোলানাথ’, ‘সে’, ‘খাপছাড়া’ —এ ধরনের বই ছাড়াও গঠন পাঠনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতেন বলেই ‘সহজ পাঠ’ -এর মতো পাঠ্যপুস্তকও তিনি লিখেছেন। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবর্তী, আশাপূর্ণা দেবী প্রমুখের রচনায় শিশু-কিশোরেরা তাঁদের বহু-বিচিত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। আর এই ধারা এখনও সমানে চলেছে।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!