হেরাক্লিটাস পাঠের ভূমিকা

Reading Time: 3 minutes

সক্রেটিসপূর্ব দাশনিকদের মধ্যে একমাত্র হিরাক্লিটাসের চিন্তাই প্রাসঙ্গিকতা ধরে রেখেছে এবং প্রতি যুগের পাঠকের কাছে নতুনভাবে আবির্ভূত হচ্ছে।তার চিন্তা প্রভাবিত করেছে এবং করে যাচ্ছে আধুনিক জমানার অনেক চিন্তককে।প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে জ্ঞানপিপাসু ও সত্যানুসন্ধানীদের আগ্রহ ধরে রাখা হিরাক্লিটাসের চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ বৈকি। জগতের ব্যাখ্যা এবং সেখানে মানুষের অবস্থান মূল্যায়ন, ভাষা ও তার অর্থ এবং যোগাযোগের সংকট অনুধাবনের চেষ্টায় হিরাক্লিটাসের অংশগ্রহণ এখনো আধুনিক পাঠককে বিমোহিত করবে, চমকিত করবে।

এ বইয়ের লক্ষ্য হচ্ছে প্রাচীন গ্রীসের এ মৌলিক চিন্তককে বাংলা ভাষার পাঠককুলের সঙ্গে পরিচয় করে দেয়া। এজন্য আমরা তার চিন্তার খণ্ডাংশ যেগুলো পেয়েছি সেগুলো বাংলায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। দুঃখজনকভাবে বাংলাভাষায় এতদিন পর এটা অনুবাদ করতে হচ্ছে। অথচ কয়েক যুগ আগেই এটা অনুবাদ হওয়া জরুরী ছিল।

হিরাক্লিটাসের লেখার অংশবিশেষ বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। হয়তোবা তার মৃত্যুর এক হাজার বছর পরও তার মূল বই অক্ষত ছিল। কিন্তু সময়ের স্রোতে সে বই হয়তো হারিয়ে যায় এজন্য আমরা হুবহু হিরাক্লিটাসের লেখা থেকে বঞ্চিত হয়েছি। এ দুর্ভাগ্যের সঙ্গে সৌভাগ্য হলো তার বেশিরভাগ চিন্তাই পরবর্তী চিন্তকদের লেখায় উঠে এসেছে। হেরাক্লিটাসের মূল বই চেখে দেখার সৌভাগ্য না হলেও তার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার যথেষ্ঠ উপকরণ পাবো তার উত্তরসুরীদের বরাতে। হেরাক্লিটাস বা হিরাক্লিটাস খ্রি.পূ ৫০০ অব্দে গ্রীসের এফেসুসে জন্মগ্রহণ করেন যা বর্তমানে আধুনিক তুরস্কের কুসাডাসিতে অবস্থিত।এশিয়া মাইনরের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত প্রাচীন গ্রিক শহর এফেসুস। যুদ্ধের দেবি আর্টেমেসিস বা ডায়ানার মন্দিরের জন্য বিখ্যাত। একইসঙ্গে খ্রিস্ট ধর্মের ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর। এখানে সন্ত পল ধর্ম প্রচার করেছেন। এছাড়া সন্ত জনও এখানে বসবাস করেছেন। আধুনিক তুরস্কের এ শহরটি পরিদর্শনে আসেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। হেরাক্লিটাসের অনন্য চিন্তার সঙ্গে আকর্ষন বা বিস্ময়ের বিষয় হলো তার ভাষা। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক জমানায় তিনি ‘দুর্বোধ্য দার্শনিক’ হিসেবে খ্যাত। সক্রেটিসের এ বিষয়ে মন্তব্য-হেরাক্লিটাসের যা বোধগম্য তা অসাধারণ, যা দুর্বোধ্য তাও অসাধারণ বোধ করি।

ভিন্ন একটি ভাষাভঙ্গি তৈরির পেছনে তার লক্ষ্যও স্পষ্ট। যারা জ্ঞান বা সত্যানুসন্ধানী তারা যেন একটু খেটেখুটে তা করেন সে লক্ষ্যে এ দ্ব্যর্থবোধক বা বহু অর্থবোধক ভাষা ব্যবহার করেছেন।

হেরাক্লিটাসের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব কমই জানা যায়। যতটুকু জানা যায় তা লিজেন্ড ও গালগল্পে ভরা। তবে আয়োনিয়া অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহর এফেসুসের এক অভিজাত পরিবারের সদস্য ছিলেন তিনি। এক বর্ণনায় পাওয়া যায় তাকে এফেসুসের রাজা হওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি নিজে শাসনভার গ্রহণ না করে তার ভাইয়ের হাতে অপর্ন করে যান। কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে যান।গণতন্ত্রের/লোকতন্ত্রের চেয়ে তিনি অভিজাততন্ত্রকে বেশি পছন্দ করতেন। সাধারণ মানুষের সংস্পর্ষ পছন্দ করতেন না বলে তিনি মানুষের বসতি থেকে দূরে এক উচু পাহারে বসবাস করতেন।

এফেসুস মিলেতুসের খুব কাছাকাছি অবস্থিত যেখানে থেলিস, অ্যানাক্সিমিন্ডার ও অ্যানাক্সিমিনিসের হাত ধরে পাশ্চাত্য দর্শনের সূত্রপাত্র হয়। তবে ওই মাইলেসীয় কোন দার্শনিকের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল কী না সে বিষয়টি নিশ্চিত নয়।

হেরাক্লিটাস একটি বই লিখেছেন বলেই জানা গেছে। প্যাপিরাস রোলে লেখা ওই বইটি এফেসুসের আর্টেমিসের মন্দিরে মজুদ/সংরক্ষন করা হয়েছিল। আদিকালে আধুনিক কালের লাইব্রেরির সংস্কৃতি ছিল না, তখন গুরুত্বপূর্ণ বই, অর্থকড়ি বা অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী মন্দিরে সংরক্ষন করা হতো। উল্লেখ্য, ইহুদি, বৌদ্ধ, হিন্দু বা অন্যান্য অনেক ধর্মের ধর্মীয় উপাসনালয় থেকে ধর্মীয় গ্রন্থের পাশাপাশি অনেক বই-পুস্তকাদি উদ্ধার হয়েছে।

হেরাক্লিটাসের বইয়ের কাঠামো নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।বইটি হয়তো সুগ্রন্থিত ও সুগঠিত কাঠামোর ছিল। আমাদের হাতে হেরাক্লিটাসের লেখার যে শতাধিক অংশবিশেষ/খণ্ডাংশ পাওয়া যায় সেগুলো একটি অপরটির সঙ্গে সহজে খাপ খায় না যদিও ওই খণ্ডাংশগুলো হয়তো পুরোটার উল্লেখযোগ্য অংশ।

আবার এটাও হতে পারে বইটি প্রবাদ-প্রবচন বা গুরুত্বপূর্ণ উক্তির সমাহার। গ্রীসের সাত সাধুর নামে যেরকম উক্তি প্রচলিত হেরাক্লিটাসও ওই ধারা অনুসরণ করে তার চিন্তার সারসংক্ষেপ অল্প কথায় লিখে গেছেন।

বিজ্ঞানী থিওফ্রাসটাস মনে করেন, বইটি অর্ধেক শেষ হওয়া। এটা স্পষ্ট হয়তো অ্যারিস্টটলের এ শিষ্যের সংগ্রহে হেরাক্লিটাসের বইয়ের পুরো অংশই ছিল।

এরিস্টটল ও থিওফ্রাসটাসদের পাঁচশো বছর পরের ঐতিহাসিক ডায়োজেনিস লেয়ার্টিউস তার বিখ্যাত ‘লাইভস অ্যান্ড অপিনিয়নস অব এমিনেন্ট ফিলোসফার্স’ বইয়ে উল্লেখ করেন, হেরাক্লিটাসের বইটি তিনটি সেকশনে বা ভাগে বিভক্ত, তবে তিনি এটি স্পষ্ট করে বলেননি কে বা কারা এই ভাগাভাগি করেছে। সে যাই হউক তিনি যে তিনটি সেকশনের কথা বলেছেন সেগুলো হচ্ছে; মহাকাশবিজ্ঞান (কসমোলজি), রাজনীতি ও নীতিবিজ্ঞান (পলিটিক্স অ্যান্ড এথিক্স) এবং ধর্মতত্ত্ব (থিওলজি)। হেরাক্লিটাসের বইকে যে-ই এ ভাবে বিভক্ত করুক না কেন তা বইয়ের স্পিরিটকে ধারণ করেছে। সত্যিই হেরাক্লিটাসের চিন্তাকে মোটাদাগে এভাবে তিনটি ভাগে বিভক্ত করাই যায়।

প্রথমদিককার অন্যান্য দার্শনিকদের চেয়ে হেরাক্লিটাস ভিন্ন এদিক থেকে যে অন্যান্যদের যেমন বিভিন্ন স্কুল বা ভাগে বিভক্ত করা যায় তাকে করা যায় না। এবং তিনি নিজেই এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি স্বশিক্ষিত, কোন উস্তাদ বা দর্শনের কোন বিশেষ স্কুল থেকে নিজের চিন্তা রূপ দেননি।

গত আড়াই হাজার বছর ধরেও হেরাক্লিটাসের দার্শনিক অবস্থান নিয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত আসেনি।এক যুগের দার্শনিক বা দর্শন অনুগ্রাহীরা একেকভাবে হেরাক্লিটাসকে আবিষ্কার করেন। এমনটা যে আগামী শতকগুলোতেও চলতে থাকবে, হেরাক্লিটাসের আড়াই হাজার বছরের প্রাসঙ্গিকতা তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

হেরাক্লিটাসের প্রাচীন বা আধুনিক ধারাভাষ্যকারদের কেউ কেউ তাকে বস্তুতান্ত্রিক একেশ্বরবাদী (ম্যাটারিয়াল মনিস্ট) বা একজন প্রসেস ফিলোসফার, সায়েন্টিফিক কসমোলজিস্ট, একজন মেটাফিজিশিয়ান, অথবা প্রধানত এক ধর্মীয় চিন্তক, এক এমফিরিসিস্ট, একজন র‌্যাশনালিস্ট, অথবা কোন মিস্টিক, তিনি এক প্রথাগত চিন্তক কিংবা বিপ্লবী, যুক্তিবিদ্যার উন্নয়নকারী অথবা যিনি ল-অব নন-কন্ট্রাডিকশন অস্বীকার করেছেন, হয়তো বা তিনিই প্রথম সত্যিকারের দার্শনিক বা অ্যান্টি-ইন্টেলেকচুয়াল অবসকারেন্টিস্ট।

এ বিষয়ে সন্দেহ নেই এফেসুসের এ সাধু আগামীতেও বিতর্কিত থেকে যাবেন এবং সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার অতীত থাকবেন। তবে পণ্ডিতরা/স্কলাররা তাকে ব্যাখ্যায় তার লেখা মূল্যায়নে বেশ অগ্রগতি সাধন করেছেন। হাজার দুয়েক বছর ধরে যে অগ্রগতি হয়েছে গত এক দেড়শো বছরে তার চেয়ে কয়েকগুণ অগ্রগতি হয়েছে। বিশ শতকের শীর্ষ অনেক দার্শনিক, চিন্তক, কবি-সাহিত্যিক হেরাক্লিটাস দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন।

হেরাক্লিটাস

হেরাক্লিটাস-কুড়িয়ে পাওয়া মুক্তা

অনুবাদ ও তর্জমা: সাবিদিন ইব্রাহিম

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!