পাওলো কোয়েলহোর দ্য এ্যালকেমিস্ট : ভিন্ন দৃষ্টিতে

Reading Time: 9 minutes
১.

ব্রাজিলিয়ান লেখক পাওলো কোয়েলহোর এই বইটা বিশ্বের অনেক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বিক্রি হয়েছে কয়েকশো মিলিয়ন কপি । উইকিপিডিয়ার বেস্ট সেলার লিস্টের ২ নাম্বারে আছে এই বই । অবশ্য বেশি বিক্রিত বইগুলার মধ্যে রূপকথা টাইপ বই ই বেশি। হ্যারি পটার, লর্ড অফ দ্যা রিংস, এ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড, হবিট ইত্যাদি রূপকথার বইগুলাই বিশ্বের বেস্ট সেলার বই।

তবে দ্যা এ্যলকেমিস্টকে পিওর রুপকথার বই হিসেবে সম্ভবত কেউই মানতে চাইবেন না। লেখক পাওলো কোয়েলহো ব্যক্তিগত জীবনে একজন বিশ্বাসী খৃষ্টান। এই বইয়ের মাধ্যমে তিনি তার ধর্মবিশ্বাসের আলোকে অনেক মেসেজ দিয়েছেন। সেটা করতে গিয়ে তিনি এমন এমন প্রসংগ টেনেছেন, যেগুলো অবৈজ্ঞানিক ; এমনকি সোসাইটির জন্য ক্ষতিকর ও হতে পারে।

গল্পের নায়ক, স্পেনের মরুভূমির ভেড়ার রাখাল সান্টিয়াগো, গুপ্তধন পাওয়ার লোভে সাগর পাড়ি দিয়ে মিশরের মরুভূমিতে আসে । মাঝখানে তার সাথে এক বেদুইন মেয়ে, ফাতেমার দেখা হয়। সান্টিয়াগো তার মিশন ভুলে গিয়ে ফাতিমার সাথে প্রেম করা শুরু করে। অনেকদিন পরে তার মিশনের কথা মনে পড়ে। সে তখন সংসার ফেলে আবার তার গুপ্তধন খোজার জন্য দৌড়ায় । এবার পথে তার পরিচয় হয় একজন এ্যালকেমিস্টের সাথে , যিনি পরশ পাথরের খোজ করছেন, যে পাথর দিয়ে যেকোনো ধাতুকে সোনা বানানো যাবে। —এটাই হচ্ছে খুব সংক্ষেপে এ্যালকেমিস্ট এর কাহিনী।

বইয়ের ভেতরের ধর্মীয় মেসেজকে অনেকে ব্যাখ্যা করেন এইভাবে– আল্লাহ আমাদের পৃথিবীতে পাঠাইছেন তার ইবাদাত করার জন্য ( একটা মিশন দিয়ে) । পৃথিবীতে এসে আমরা ভোগ বিলাসে মত্ত হয়েছি, আমাদের মিশনের কথা ভুলে গেছি (আয়েশাদের সাথে প্রেম করে বেড়াচ্ছি 🙂 আমাদের উচিত হবে, আয়েশাদের ভুলে গিয়ে আমাদের মিশন কমপ্লিট করা। তা নাহলে আল্লাহ করোনাভাইরাসের মত অনেক গজব দিতে পারে

২.

মোটাদাগে , একটা ইনসপাইরেশনাল বই বলা যায় এটাকে । শিব খেরার ”তুমিও জিতবে” বা সাম্প্রতিক মোটিভেশনাল স্পিকারদের বলা ”তোমাকে দ্বারাই সম্ভব” –কথাগুলাই পাওলো কোয়েলহো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে চেয়েছিলেন। তবে তিনি আরেকটু বেশি এগিয়ে গেছেন ,যেটা ঠিক লজিকাল না।

যেমন, বইয়ের বিভিন্ন জায়গায় একটা লাইন বারবার এসেছে — ”যদি তুমি মন থেকে কিছু পেতে চাও, পুরা পৃথিবী তোমাকে তা পেতে সাহায্য করবে।” (when you want something, all the universe conspires in helping you to achieve it.”) এই সূত্র মেনেই সান্তিয়াগো তার গুপ্তধন খোজার মিশন চালিয়ে যায় । এই সূত্র মেনেই বুড়া এ্যালকেমিস্ট পরশ পাথর আবিষ্কার করে।

কিন্তু এই সূত্র অনুযায়ী, সবকিছু চললে প্রাণীজগতের ইকোসিস্টেমে ব্যাপক বিশৃংখলা লেগে যেত । বাঘ মন থেকে চাইত হরিণ খাইতে, আর হরিণ মন থেকে চাইত বাঘের কাছ থেকে বাচতে। গোটা পৃথিবী তখন কাকে হেল্প করতে চাইত ? বাঘকে নাকি হরিনকে? দুইটাই কি সম্ভব?

ক্লাসের সবাই ফার্স্ট বয় হতে চায় । সবাই বিসিএস ক্যাডার হতে চায় । সবাই ক্রিকেটার তাসকিনকে বিয়ে করতে চায় । কিংবা জয়া আহসানের উপর ক্রাশ খায়। এদের মধ্যে কয়জনের স্বপ্ন পূরন হয়? গোটা পৃথিবী সবাইকেই কি সাহায্য করে? সেটা তো সম্ভব নয়।

এছাড়া মানুষের ভাগ্য নিয়েও যে দর্শন আছে বইটাতে, সেই দর্শন অনুযায়ী আমরা খুব কম মানুষই চলি। আমাদের নিজের ভাগ্য নিজেরাই তৈরি করার চেষ্টা করি।

কোথাও কোথাও এমন বাক্যও আছে,যেখানে উৎসাহিত করা হয় তোমার যা মন চায়,সেটাই করো। কোন গাইড লাইন, কোন ধর্মীয় আইন, কোনো রাষ্ট্রীয় আইন বা সামাজিক বিধি নিষেধ ফলো করার দরকার নেই, তুমি যা চাও, তাই করো । ( “People are capable, at any time in their lives, of doing what they dream of.” কিংবা “People are capable, at any time in their lives, of doing what they dream of.”)

সবাই এই ফর্মূলা ফলো করলে সূস্থ সোসাইটিতে ভায়োলেন্সের উৎপত্তি ঘটবে। ড্রাগ এ্যাডিক্টরা পাওলো কোয়েলহোর বাণীতে এনকারেজড হয়ে আরো বেশি ড্রাগ খাওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে। ড্রাগের টাকা পূরনের জন্য রাস্তায় নেমে হাইজ্যাকিং বা অন্যান্য ভায়োলেন্সের কথা ভাবতে পারে। চাল চোর ত্রান চোরেরা বেশি বেশি ত্রান চুরি করতে উতসাহিত হতে পারে।

প্রজাপতি নামক বাঙলা সিনেমার একটা উদাহরন দেই। মৌসুমী আর জাহিদ হাসানের বিবাহিত সংসারের মধ্যে ঢুকে পড়ে ভিলেন, মোশাররফ করিম। সে মৌসুমীকে পেতে চায়। আমাদের এক্সিস্টিং সামাজিক দৃষ্টিভংগি অনুযায়ী মোশাররফ করিমের এই কাজ তীব্র নিন্দার যোগ্য। কিন্তু দ্য এ্যালকেমিস্টের থিওরি অনুযায়ী, সে সঠিক কাজই করতেছে ।তার মন যা চাচ্ছে, সেটাই পাওয়ার চেষ্টা করতেছে।

৩.

বইয়ের পরবর্তী অংশে ,সান্টিয়াগো যখন গুপ্তধনের খোজে মিশরের পিরামিডের দিকে যাচ্ছে, তখন তার সাথে দেখা হয় একজন এ্যালকেমিস্টের। এরপর তার টার্গেট ও কিছুটা চেঞ্জ হয়ে যায়। গুপ্তধনের বদলে এ্যালকেমিস্টের পরশপাথরের দিকে তার ফোকাস বেড়ে যায়।

মধ্যযুগে , এ্যলকেমিস্ট নামে এক প্রজাতির বিজ্ঞানী/সাধক ছিলেন, যারা একটা ভুল ধারনার পিছনে শত শত বছর নষ্ট করেছেন। তারা বিশ্বাস করতেন, নির্দিষ্ট কেমিকাল এর সাহায্যে লোহাকে (বা অন্য কোনো পদার্থকে) সোনায় পরিনত করা সম্ভব।

বৈজ্ঞানিকভাবে, এমন কাজ করা সম্ভব না। তবে আলকেমিস্টরা বিশ্বাস করতেন , এটা সম্ভব। নরমাল ভাবে কাজ না হওয়ায় , তেমন কোনো কেমিকাল তৈরি করতে না পারায়, তারা বিশ্বাস করা শুরু করলেন, এই কাজের সাথে আধ্যাত্মিকতা জড়িত। যে লোক বেশি নামাজ পড়ে বা বেশি ইবাদাত করে,আল্লাহর যে প্রিয় বান্দা, তার পক্ষে এই কাজ করা সম্ভব। অন্যরা পারবে না।

অন্য এক আলকেমিস্ট গ্রুপ আবার এর বিপরীত প্রচারণাও চালানো শুরু করল। ইবলিস শয়তানকে খুশি করতে পারলে আলকেমিতে সফলতা আসবে, এমনটা বিশ্বাস করত তারা ।

তাদের গবেষনার কাজগুলো জনসাধারনের সাথে খুব বেশি শেয়ার করত না। ফলে তাদেরকে নিয়ে অনেক ধরনের গুজব তৈরি হয়। অনেকে বিশ্বাস করত, আলকেমিস্টরা লোহাকে সোনা বানানোর পরশ পাথর তৈরি করে ফেলেছে । কিংবা অমর হওয়ার ওষুধ তৈরি করে ফেলেছে ।

প্রকৃতপক্ষে এমন কোনো কিছুই তারা করতে পারেনি । তবে সকল কেমিকাল নিয়ে নাড়াচাড়া করার ফলে মৌলগুলোর রাসায়নিক ধর্ম নিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছিল তাদের। সেই সকল জ্ঞান পরবর্তীকালের রসায়ন বিজ্ঞানীদের অনেক কাজে লেগেছিল ।

৪.

লোহার খনিতে মাঝে মাঝেই খনি শ্রমিকরা দেখতেন, লোহার উপরে তামার প্রলেপ জমেছে। এখান থেকে তারা ধারনা করেছিলেন, হয়তো কোনো অলৌকিক শক্তিবলে লোহাগুলা তামা হয়ে গেছে। তারা তখন ধারনা করেছিলেন, এক ধাতুকে আরেক ধাতুতে পরিনত করা সম্ভব। লোহা যেহেতু তামায় পরিনত হয়েছে, তাইলে আরো মূল্যবান ধাতু যেমন সোনা বা রুপাতেও পরিনত করা যাবে–এটাই ভেবেছিলেন তারা ।

আলকেমিস্টরা তখন দুনিয়ার সব জিনিস লোহার সাথে মিশিয়ে সোনা বানানোর চেষ্টা করতে লাগল। তারা কি কি জিনিস মেশাত , তার একটা আইডিয়া পাবেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের হান্ড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচিউড বইয়ের নায়ককে দেখে। ওই লোকটা সারা জীবন এই আলকেমির পিছনে নষ্ট করেছে।

প্রকৃতপক্ষে ,লোহার সাথে তুতে (CuSO4) মিশলে কিংবা মেশালে তামা পাওয়া যায় । এর সাথে অলৌকিক কোনো শক্তি নেই। পুরাটাই মৌলগুলার সাধারন ধর্ম। লোহার খনিতে লোহার পাতের উপর তুতে এসে পড়লে লোহা গুলা তামায় পরিনত হত। এটা রাসায়নিক বিক্রিয়া, কোনো যাদু না।

সহজে বোঝানোর চেষ্টা করি। লোহার ( Ferum) প্রতীক হচ্ছে Fe আর তামার (Cuprum) প্রতীক হচ্ছে Cu . মনে করুন, Cu এবং তার গার্লফ্রেন্ড,সালফেট,SO4, সুখে শান্তিতে বসবাস করতেছে । হলিউডের নায়ক ব্র্যাড পিট আর এ্যাঞ্জেলিনা জোলিকে যেমন সংক্ষেপে ব্র্যনজেলিনা বলে সাংবাদিকরা, তেমনি, এই কপার আর সালফেটকে সংক্ষেপে CuSO4 বলব আমরা।

একদিন Cu তার গার্লফ্রেন্ড SO4 কে নিয়ে এসে পরিচয় করিয়ে দিল তাদের ভার্সিটির সিনিয়র বড় ভাই Fe এর সাথে ।

এদিকে Fe ব্যাপক লুচ্চা প্রকৃতির। সে জুনিয়র Cu এর কাছ থেকে তার গার্লফ্রেন্ড ভাগায়ে নিয়ে এসে নিজে SO4 এর সাথে প্রেম করতে লাগল। তারা তখন FeSO4 হিসেবে পরিচিত হল।

এখন, Cu কি FeSO4 এর কাছ থেকে SO4 কে নিয়ে আসতে পারবে?

এন্সার হচ্ছে, না পারবে না। Cu এর চেয়ে Fe এর পাওয়ার বেশি। কপার জুনিয়র, আয়রন সিনিয়র। যে ধাতুর পাওয়ার যত বেশি (সিনিয়র) , সে অন্যের (জুনিয়রদের) কাছ থেকে জিনিসপত্র নিয়ে আসতে পারে। কিন্তু যার পাওয়ার কম, মানে জুনিয়র, সে সিনিয়রদের কাছ থেকে কিছু নিয়ে আসতে পারে না।

সকল ধাতুর বিক্রিয়া দেখে দেখে তাদেরকে সিনিয়র-জুনিয়র র‍্যাংক দেওয়া হয়েছে। লাইনটা অনেকটা এরকম ( K-Na-Ca-Mg-Al-Zn-Fe-Sn-Pb-H-Cu-Hg-Ag-Pt-Au) এই সিরিয়ালের পরের গুলা হল জুনিয়র, আগের গুলা সিনিয়র।

লিস্টের সবচেয়ে জুনিয়র এর নাম কি ? Au ? মানে Aurum অর্থাৎ সোনা। এর পাওয়ার সবচেয়ে কম, কারো কাছ থেকে কিছু নিতে পারেনা। খুবই নিষ্ক্রিয় । প্রায় কারো সাথেই মেশে না, বিক্রিয়া করেনা। ফলে প্রকৃতিতে প্রায় বিশুদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়।

সোনার খনিতে সোনাকে মাঝে মাঝে রুপা কিংবা পারদের সাথে মিশানো অবস্থায় পাওয়া যায় । এই মিশ্রিত ধাতুকে তখন সোহাগা ( বোরাক্স বা সোডিয়াম পাইরোবোরেট) দিয়ে আলাদা করা হয়। এখান থেকে বাঙলা ভাষায় একটা প্রবাদ তৈরি হয়েছে- সোনায় সোহাগা (অর্থ-সুন্দর মিলন)।

সোনা যেহেতু কারো গার্লফ্রেন্ড ই না, প্রায় কারো সাথেই সে বন্ধন তৈরি করেনা, তাই CuSO4 এর মত তার কোনো সংসার ও হয়না । কোনো সিনিয়র ও কখনো তার সংসারে বিক্রিয়া করে তাকে নিয়ে যেতে পারেনা।
সো, আলকেমিস্টরা যত হাবিজাবি জিনিসের সাথে যা ই মিশাক , সেগুলার কোনোটাই মধ্যেই Au নেই। তাই সোনা বের করতে পারবেনা।

নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ায় ,পরমানুর নিউক্লিয়াসের মধ্যে বিক্রিয়া ঘটার ফলে এক মৌল আরেক মৌলে পরিনত হতে পারে। যেমন -সূর্যের মধ্যে হাইড্রোজেন গুলা হিলিয়ামে পরিনত হচ্ছে। কিংবা এটম বোমার মধ্যে ইউরেনিয়াম পরমানু সীসায় পরিনত হচ্ছে। কিন্তু এমন নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া ঘটানোর জন্য প্রচুর তাপ এবং চাপ দরকার। সেই তাপ+চাপের এনভায়রনমেন্ট বানানোর জন্য যে খরচ, সেটা দিয়ে সোনা তৈরি করা পোষাবে না । এই কারনে আধুনিক রসায়ন বিজ্ঞানের কেউ এইভাবে সোনা তৈরি করতে এগোয়নি। প্রাচীনকালে এত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা না থাকায় তারাও এমন কিছু করতে পারেনি। সবচেয়ে বড় কথা, তারা পরমাণুর গঠন সম্পর্কে জানত না, তাই তাদের কোনো আইডিয়া ছিল না যে কি সম্ভব আর কি সম্ভব না। তারা অনেকটা আন্দাজেই একেকটা জিনিসের সাথে র্যান্ডমলি অন্য জিনিস মিশিয়ে দেখত, সোনার মত কিছু তৈরি হয় কিনা।

৫.

পাওলো কোয়েলহোর দ্য এ্যালকেমিস্ট বইটাতে একজন এ্যালকেমিস্টের সাথে পাঠকের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে । তিনি বিভিন্ন কেমিকাল মিশিয়ে পরশ পাথর তৈরি করেছেন। এই পাথর দিয়ে যা ই স্পর্শ করা হবে সেটাই সোনা হবে। এমনকি তিনি অমর হওয়ার কেমিকাল ও তৈরি করেছেন। তার অনেক বয়স হয়েছে,কিন্তু মরছেন না। নায়ক সান্তিয়াগোর সাথে তার শেষ যখন দেখা হয় , তখন তিনি আকাশে ভাসছিলেন, মাধ্যকর্ষন শক্তি উপেক্ষা করে।

একজন লেখকের অনেক ক্ষমতা। বিভিন্ন শব্দ,বাক্য,ঘটনা নিয়ে তিনি খেলা করতে পারেন। বিভিন্ন ঘটনা দিয়ে রূপক অর্থে তিনি তার মেসেজ দর্শকদের কাছে পৌছেও দিতে পারেন। কিন্তু ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক মেসেজ দেওয়ার জন্য এই ধরনের অবৈজ্ঞানিক ঘটনা বর্ননা না করলেই ভাল হত। হ্যারি পটার বা ব্যাটম্যান-সুপারম্যানের বই পড়ার সময় সবাই বিশ্বাস করে যে এগুলা রুপকথা , ঘটনাগুলা সবই কাল্পনিক, এমন ঘটনা ঘটা সম্ভব না। কিন্তু কোনো লেখক যখন তার বইয়ে আমাদের বাস্তব জগতের গল্পের প্রেক্ষাপটে অবৈজ্ঞানিক ঘটনাগুলো লিখেন, তখন পাঠক বিভ্রান্ত হতে পারে সব কিছুই সত্য ভেবে ।

দ্যা এ্যালকেমসিট পড়ে অনেকে বিভ্রান্ত হতে পারেন আলকেমির ক্ষমতা সম্পর্কে। হান্ড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচিউডের নায়কের মত অনেকে হয়তো অনেক সময় ব্যয় করতে পারেন এর পিছনে ছুটে। অতীত ইতিহাসে দেখা যায় , অনেকেই আলকেমির পিছনে সময় নষ্ট করেছিলেন। এমনকি আইজ্যাক নিউটন ও ১০ বছর আলকেমিতে সময় নষ্ট করেছিলেন। ওই ১০ বছর তিনি মূলধারার বিজ্ঞানে ব্যয় করলে হয়তো আমাদের বিজ্ঞান আরেকটু এগিয়ে যেত।

ভুল জ্ঞান কিংবা অবৈজ্ঞানিক তথ্য সংবলিত বই কিভাবে মানুষকে মিসগাইডেড করতে পারে, তার কয়েকটা উদাহরন দিচ্ছি।

১। ভারতের অন্য এলাকার তুলনায় কোলকাতায় শিশু ধর্ষণের ঘটনা অনেক বেশি । শিশু ধর্ষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা বিভিন্ন প্রাপ্তবয়স্কদের বই ( চটি /পানু গল্প) পড়ে জেনেছে যে কিশোরী বা ভার্জিন মেয়েদের সাথে সঙ্গম করলে যৌন রোগ সেরে যায়। এ কারনে তারা কম বয়সী মেয়েদের সাথে সঙ্গম করার চেষ্টা করে । কেউ রাজি না হলে ধর্ষণ করে।

২। ২০১৯ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর কোলকাতায় রুদ্র নায়েক নামের ৭ বছরের এক ছেলেকে তন্ত্রসাধনার জন্য বলি দেয় এক তান্ত্রিক। মজার ব্যাপার হল, এই তান্ত্রিকের বয়স মাত্র ১৪ বছর (পত্রিকায় সেই তান্ত্রিকের নাম ছাপায়নি) । বই সহ বিভিন্ন মাধ্যমে সে তন্ত্র আধনা সম্পর্কে জানতে পেরেছিল ।

অন্যান্য বয়স্ক তান্ত্রিক/ফকিরদের ক্ষেত্রে আমরা সন্দেহ করি, যে তারা হয়তো টাকা পয়সার লোভে মিথ্যা জাদু মন্ত্র /তাবিজ-কবচের অলৌকিক ক্ষমতার কথা বলছে । ভাবতাম,তারা নিজেরা আসলে জানে যে এসবের কোনো ক্ষমতা নেই। কিন্তু এই ১৪ বছরের কিশোর তান্ত্রিকের এত কিছু বোঝা সম্ভব না। সে যা করেছে, সেটা মোস্ট প্রবাবলি নিজের অন্ধ বিশ্বাস থেকেই করেছে।
৩। বাংলাদেশের ঢাকা শহরেরই আরেক ঘটনা বলি । ২০১৯ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি । পোস্তগোলা শ্মশানে রাত দুইটার সময়ে ৫ কিশোরকে পাওয়া গেল। তারা একটা বাচ্চার ডেডবডি কবর খুড়ে বের করে এনেছে, লাশের মাথা ধারালো ছুরি দিয়ে কেটেছে, এরপর সেই কাটা মুন্ডু কে লাল রঙ কিংবা রক্ত দিয়ে পেইন্ট করেছে। পুলিশ যখন তাদেরকে এ্যারেস্ট করে তখন তারা ওই কাটা মুন্ড নিয়ে কোনো একটা বিশেষ তন্ত্রসাধনা করছিল

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তারা বলেছে যে, এরকম সাধনা করলে নাকি তারা অলৌকিক শক্তির অধিকারী হতে পারবে বলে তারা জেনেছে ।

৪। এছাড়া, গুপ্তধনের গল্প আমাদের একেবারে কম না । সান্টিয়াগোর মত আমাদের অনেকেরই গুপ্তধনের লোভ আছে। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে গুপ্তধনের গুজবে মীরপুরের একটা বাড়ি খোড়া হয়েছিল।  আরো ভয়ংকর ঘটনাও আছে। ২০১৯ সালের জুন মাসে ঠাকুরগাওয়ের এক কৃষক,গুপ্তধন পাওয়ার লোভে জিনের বাদশাকে আড়াই লাখ টাকা দিয়েছিল ।
চিন্তা করুন, জিন-ভূত কোনো কিছুর গল্প যদি আমাদের সোসাইটিতে প্রচলিত না থাকত, তাইলে জিনের বাদশারা মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে পারত? লোভ দেখিয়ে প্রতারনা করতে পারত?

৬.

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিলাসী গল্পে আমরা দেখেছিলাম, সাপুড়েরা বিভিন্ন মন্ত্র পড়ে,মাদুলি বেধে সাপ ধরতে যাইতো। কিন্তু ওরা নিজেরা জানতো যে এসব মন্ত্রের কোনো ক্ষমতা নেই। হুদাই ব্যবসা করার জন্য তারা এই কাজ করত। তবে পাবলিকলি তারা কখনো সত্যটা প্রকাশ করত না। পাবলিকলি, কাস্টমারদেরকে বুঝাত যে এই মন্ত্রের অনেক ক্ষমতা। সাপের বিষ নষ্ট করা সহ অনেক উপকার হবে তাবিজগুলাতে। কাস্টমার মন্ত্রের অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাস না করলে তো তাদেরর তাবিজ আর বিক্রি হবেনা ।

পাওলো কোয়েলহো হয়তো সেই কাজই করেছেন। কাস্টমারকে বই কেনানোর জন্য আলকেমিতে বিশ্বাস করাচ্ছেন। অনেক মানুষ হয়তো একটু গুগল করে প্রকৃত সত্যটা জানতে পারবে। কিন্তু অনেকেই হয়তো অন্ধভাবে দ্য এ্যালকেমিস্টের কথাগুলো বিশ্বাস করে মিসগাইডেড হবে।

শুধুমাত্র দ্য এ্যালকেমিস্ট একা নয়। রিসেন্টলি অনেক বইতেই অনেক অবৈজ্ঞানিক তথ্য সংযোজিত হচ্ছে। রূপকথার বইতে পাঠক ধরেই নেয় যে সবই মিথ্যা কথা। কিন্তু কোনো বইতে যখন ৯৯% সত্য, বিজ্ঞানভিত্তিক কথা বলে ১% অবৈজ্ঞানিক কথা বলা হয়, তখন পাঠক খুব সহজে মিসগাইডেড হতে পারে।

উদাহরনস্বরূপ-  ”রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো খেতে আসেননি”  এবং তার সিকুয়েল ”রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো আসেনি” বই দুইটার কথা বলা যায়। বইগুলাতে  দেখানো হয়েছে, মানব শরীরের একটা নির্দিষ্ট অংগ কেটে রান্না করে খেলে যৌবন দীর্ঘস্থায়ী হয়।বইয়ের নায়িকা মুশকান জুবেরী এবং তার গ্রুপের লোকেরা এই জিনিস খেয়ে খেয়ে দীর্ঘস্থায়ী জীবন পেয়েছে । তারা আর বুড়ো হচ্ছে না।

বইটা পড়ে এনকারেজড হয়ে কেউ যদি নিচের লিংকের এই ঘটনার মত কোনো কান্ড ঘটায়, তাহলে তার দায় কি লেখক মুহম্মদ নাজিম উদ্দিন এর উপর পড়বে ?

৭.

দ্য এ্যালকেমিস্টের মত যেসব বইতে অবৈজ্ঞানিক তথ্য আছে, সেসব বইয়ের ভূমিকা বা উপসংহারে এক্সট্রা কয়েক পৃষ্ঠা যোগ করে যদি অবৈজ্ঞানিক ঘটনাগুলোর সঠিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সংযোজন করা যায় , তাহলে পাঠকদের মিসগাইডেড হওয়ার চান্স থাকেনা

কিছু কিছু বইয়ের শেষে লেখক স্পেশালি এই ধরনের ব্যাখ্যা/ টীকা লিখে দেন। উদাহরনস্বরূপ, মুহম্মদ জাফর ইকবালের ত্রাতুলের জগত এবং মহাকাশে মহাত্রাস বই দুইটার লাস্ট পেজের স্ক্রিনশট দিলাম। বইয়ে ব্যবহৃত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক এবং অবৈজ্ঞানিক টার্মের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়েছেন তিনি এখানে। ফ্লাইং সসার যে গুজব সেটা এখানে তিনি বলেছেন। লেখকের উদ্ভাবিত কপোট্রন বা ভাই ভার্বাল শব্দগুলা যে কাল্পনিক সেটা জানিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু যেগুলো আসলে এক্সিস্ট করে , যেমন -রোবট কিংবা ব্ল্যাকহোল ,সেগুলার কথাও জানিয়ে দিয়েছেন পাঠককে।

সো, এইখানে পাঠক নির্দিষ্ট করে জানতে পারছে ,কোনটা আসল আর কোনটা অসম্ভব। বিভ্রান্ত হওয়ার চান্স কম

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!