জ্যোতিষীরা কি COVID-19 সম্পর্কে আগাম সতর্কবার্তা দিতে পেরেছিলেন?

Reading Time: 5 minutes

দৈনিক পত্রিকায় রাশিফল নামে একটা কলাম থাকে। সেখানে জ্যোতিষীরা আপনার জন্মতারিখ অনুযায়ী ভবিষ্যৎবাণী করে, দূরের যাত্রা শুভ , আজ টাকা পয়সা পাবেন অনেক, প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে ই দেখেন , সফল হবেন ইনশাল্লাহ ইত্যাদি ইত্যাদি।

এই জ্যোতিষীদের দাবি, আকাশের কোন নক্ষত্র কোথায় অবস্থান করছে, তার উপর পৃথিবীর মানুষদের ভাগ্য নির্ভর করে। আকাশের নক্ষত্র বামে হেলে পড়লে আপনি বামপন্থী হয়ে যাবেন, ডান দিকে হেলে পড়লে আপনি ডানপন্থী হয়ে যাবেন 🙂

কথা হচ্ছে, আকাশের নক্ষত্র সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে। আজ মন চাইছে তাই এই পথ দিয়ে যাব , কাল ওই পথ দিয়ে হেলেদুলে যাব , এমনটা নয়। নক্ষত্রের অতীত আচরন দেখে (অর্থাৎ তার ভর,গতিবেগ,দূরত্ব হিসাব করে) , এবং আশেপাশের গ্রহ নক্ষত্রের সাথে তার আকর্ষন বল হিসাব করে বিজ্ঞানীরা বলে দিতে পারেন, কোন তারা বা নক্ষত্র কবে কোনদিক দিয়ে যাবে। কে কবে কোথায় থাকবে, সেটাও হিসাব করে বের করা সম্ভব। এই সকল হিসাব করেই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলে দেন, নেক্সট কবে সূর্যগ্রহন হবে, চন্দ্রগ্রহন হবে। এবং বিজ্ঞানীদের সেই সকল ভবিষ্যতবানী একেবারে মিনিটে মিনিটে, সেকেন্ডে সেকেন্ডে মিলে যায় ।

বিজ্ঞানীদের (Astronomy) ছেড়ে, আসুন আবার জ্যোতিষীদের (Astrology) কাছে যাই । জ্যোতিষীরা (Astrologer) জ্যোতির্বিদদের (Astronomer) কাছ থেকে ধার করে হোক, অথবা নিজেদের কোনো প্রসেসেই হোক, ফিউচারে কোন তারা কোথায় থাকবে , সেটা বের করতে পারে। সেই অনুযায়ী, ভবিষ্যতের তারার অবস্থানের উপর নির্ভর করে, আপনার জন্য ভবিষ্যতের রাশিফল ও বানাতে পারবে তারা । মানে, আজ ১৫ই এপ্রিল ২০২০ তারিখে পেপারে শুধু আজকের দিনে আপনার ভাগ্যে কি ঘটবে সেটাই লিখতেছে , কিন্তু একজন জ্যোতিষী হিসাব নিকাশ করে ২০৩০ সালের ১৫ই এপ্রিল আপনার লাইফে কি কি ঘটবে সেটাও তো বলে দেওয়ার কথা 🙂

জ্যোতিষীদের ব্যাপক টাকা পয়সা দেওয়া হলে, তারা এই কাজ করে। কোনো বাচ্চা জন্মানোর পরে তার জন্ম ক্ষন হিসাব করে তার সারা জীবনের জন্য একটা ভবিষ্যতবানী (কুষ্ঠী) তৈরি করে দেয়, যদি যথেষ্ট টাকা পয়সা দেওয়া হয়। একইভাবে যথেষ্ট টাকা পয়সা দেওয়া হলে , পত্রিকায় তারা দৈনিক ভবিষ্যত বানী করা ছাড়াও , সাপ্তাহিক ,মাসিক বা বার্ষিক ভবিষ্যত বানীও করে।

অনেক জ্যোতিষী আবার আমার-আপনার মত আমজনতার লাইফ নিয়ে ভবিষ্যতবানী করা ছাড়াও সেলিব্রেটিদের (সিনেমার নায়ক নায়িকা, পলিটিকাল পারসন, খেলোয়াড় ইত্যাদি) লাইফ এবং ক্যারিয়ার নিয়ে প্রেডিকশন করে। সেইগুলা তাদের পেপারে বা ওয়েবসাইটে ছাপাইয়া দেয়। কোনোটা যদি মিলে যায়, তাহলে পরের বছর সেটা নিয়ে ব্যাপক প্রচারনা করে।

This image has an empty alt attribute; its file name is Capture.jpg

এই ২০২০ সালে বিশ্বজুড়েই করোনা মহামারী ছড়িয়েছে। এটা শুধু চায়না বা বাংলাদেশ নয়, পুরা বিশ্বের ঘটনা। বিশ্বের সব জায়গা ই লকড ডাউন। ২০ লাখ মানুষ আক্রান্ত, দের লাখ মানুশ মারা গেছে। এই ভয়াবহ প্যান্ডেমিক এর কথা কি কোনো জ্যোতিষী predict করতে পেরেছিলেন?

দেখা যাক, বাংলাদেশি জ্যোতিশীরা কে কি বলেছিলেন। প্রথম স্ক্রিনশটটা ইত্তেফাক থেকে নেওয়া । তাদের জ্যোতিষী ২৯শে ডিসেম্বর বলেছিল , ২০২০ সালে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আসবে অনেক । অথচ করোনার কারনে রেমিটান্স আসা কমে গেছে অনেক। সামনে আরো কমবে। পুরা ভবিষ্যৎবানীর কোথাও করোনার মত কোনো মহামারীর পূর্বাভাস নাই।

করোনার কারনে যে সাইড ইফেক্টগুলা হবে (বেকার সমস্যা, দুর্ভিক্ষ,আইন শৃংখলার অবনতি) সেইগুলার ভবিষ্যতবাণী ও নাই কোথাও।

নিচের দ্বিতীয় স্ক্রিনশটটা নিয়েছি বাংলাদেশ প্রতিদিন এর ১ জানুয়ারির পেপার থেকে। সেখানে তারা জ্যোতিষী লিটন দেওয়ান চিশতি, ড. কে সি পাল, রামপ্রসাদ ভট্টাচার্য্য, অধ্যাপক আবুল হাসান ও আকবর হোসেনের সঙ্গে আলোচনা করে দেশের একটা ভবিষ্যতবাণী দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়ার মুক্তির পথ দীর্ঘ হবে । অথচ মার্চ মাসেই খালেদা জিয়া জেল থেকে বেরিয়ে গেছে। জ্যোতিষীর কেরামতি শেষ 🙂 ।

পদ্মা সেতুর কাজ এই বছরে শেষের দিকে থাকবে বলেছে এদের জ্যোতিষীরা । অথচ করোনার কারনে জানুয়ারী মাস থেকেই চীনের ম্যাক্সিমাম শ্রমিকরা আন এ্যাভেইলেবল ছিল। এখন বাংলাদেশী শ্রমিকরাও আন এ্যাভেইলেবল ।

দেশের প্রধানমন্ত্রী, সেখ হাসিনাকে নিয়েও ভবিষ্যৎবাণী করেছে কয়েক টা পত্রিকা । সেইখানেও কেউ লেখে নাই , আপনার সামনে একট বড় চ্যলেঞ্জ আসবে ২০২০ সালে।

এটা তো গেল সামগ্রিকভাবে দেশ সম্পর্কে ভবিষ্যতবাণী । ইন্ডিভিজুয়ালি আপনার জন্মতারিখ ধরে ধরে যে জ্যোতিষীরা সারা বছরের প্রেডিকশন দিয়েছিলেন, সেখানেও কোথাও পাইলাম না যে বছরের মাঝামাঝি সময়ে আমাদেরকে বেকার অবস্থায় ঘরে আটকা পড়ে থাকতে হবে। কিংবা এইচ এস সি পরীক্ষা ক্যান্সেল হবে, উচ্চশিক্ষার জন্য ভার্সিটিগুলার এ্যাডমিশন টেস্ট নেওয়া যাবে না –এসকল সাবধান বাণী কেউ শোনায় নাই। কয়েকটা প্রেডিকশনের লিংক দিচ্ছি, আপনি একটু মিলাইয়া দেখুন তো কিছু পান কিনা

জ্যোতিষী কাওসার আহমেদ চৌধুরীর ভবিষ্যৎবাণী

জ্যোতিষী গুরু নুরুনানন্দ এর ভবিষ্যৎবাণী

নামহীন জ্যোতিষীদের ভবিষ্যৎবাণী

কিছুই তো পাইলেন না, তাইনা ? তার মানে এত বড় একটা ঘটনা জ্যোতিষীদের হিসাব নিকাশে ধরা পড়েনি। তারা আগে থেকে কিছুই জানাতে পারেনি।

অথচ এখনো দৈনিক পত্রিকাগুলাতে জ্যোতিষীরা তাদের মুখস্থ ভবিষ্যৎবাণী ছাপিয়ে যাচ্ছে। লক ডাউনের মধ্যেও তারা বলে বেড়াচ্ছে, দূরের যাত্রা শুভ কিংবা অশুভ 🙂

জ্যোতিষীদের যদি আসলেই কোনো ক্ষমতা থাকে, গ্রহ নক্ষত্র হিসাব করে যদি ভবিষ্যৎবাণী করা যেত, তাহলে তারা বলুক, এই মহামারী কবে শেষ হবে, কত জন মানুষ মারা যাবে, কবে আবার সব স্বাভাবিক হবে !!! তাদের তেমন কোনো ক্ষমতা নাই বলেই তারা কেউ কিছু বলতে পারছে না।

এই সকল জ্যোতিষীদের নিয়ে নকুল কুমার বিশ্বাস খুবই প্রাসঙ্গিক একটা গান রিলিজ করেছেন রিসেন্টলি। গানের কইয়েক লাইন উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না

কোথায় গেল মন্ত্রতন্ত্র কোথায় গেল টিয়ার দল ?

কোথায় গেল তাবিজ কবজ পাথরের আশ্চর্য ফল ?

যারা পাথরের বিজ্ঞাপন করত তাদের কাছে প্রশ্ন আজ

মুখ দেখে করোনার কথা কইছেল নি জ্যোতিষরাজ?

জ্যোতিষভাস্করের কাছে আজ প্রশ্ন করি কাতরে

করোনার এ মৃত্যু থামবে বলে দেন কোন পাথরে?

কোথায় গেল জ্যোতিষ-সম্রাট স্বর্ণপদক খ্যাতিমান ?

কেউ তো দিতে আসল না ভাই একটা হাচির সমাধান

কোথায় গেল বশীকরণ কালা যাদুর খেলাটা ?

কোথায় গেল নজরবন্দীর ফন্দী আটা চ্যালাটা ?

কোথায় গেল ছালা পরা , তালা পরা সাধুরা?

অলৌকিক ক্ষমতা লইয়া কই লুকাইল যাদুরা?

কোথায় গেল বাবারা সব? তাদের চরণ ধরোনা

লাত্থি দিয়া দিক উড়াইয়া মরণ ব্যাধী করোনা

স্বপ্নে প্রাপ্ত বড়ি গুলা তোলা আছে কার শিকায়?

দেশের জন্য রাইখা কিছু বিক্রি করো আমেরিকায়

কোথায় গেল ইন্দ্রজালের অলৌকিক কেরামতি ?

কোথায় গেল জিনের বাদশার সমস্যার মেরামতি?

করোনার সমাধান দিতে তোমরা সবাই হও রাজি

তা না হলে স্বীকার করো, সব ছিল ধান্দাবাজি

দেশের সাধারন মানুষের চিরদিন সরল বিশ্বাস

সেই বিশ্বাস নিয়া করছো ব্যবসা, করোনা তা করল ফাস

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!