অসমাপ্ত আত্নজীবনী

Reading Time: 3 minutes

বই : অসমাপ্ত আত্নজীবনী

লেখক : শেখ মুজিবুর রহমান

কোন সময়ের সেরা মানব সন্তানদের খুব কাছ থেকে জানতে ও দেখতে সুবিধা হয় যদি দেখা যায় সেই ব্যক্তিটি নিজেকে কিভাবে নিজেকে লিপিবদ্ধ করেছেন । বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ।

অসমাপ্ত আত্নজীবনী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্নজীবনীমূলক বই । বইয়ের নামই বলে দেয় লেখকের লেখা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে । পুরোটা লিখে যেতে পারেননি ।

অসমাপ্ত আত্নজীবনী ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় । এখন পর্যন্ত মোট ছয়টি ভাষায় বইটি অনূদিত হয়েছে । কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় শেখ মুজিবুর রহমান লেখা শুরু করেন । বইটিতে উঠে এসেছে লেখকের জন্ম, বংশ পরিচয়, শৈশব , শিক্ষা জীবন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, দেশভাগ, কলকাতার সাম্প্রদায়িক গাঙ্গা, ভাষা আন্দোলন, কলকাতা কেন্দ্রিক প্রাদেশিক মুসলিম ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগের রাজনীতি, ৫৪ সাল অবধি পূর্ব বাংলার রাজনীতি, মুসলিম লীগ সরকারের অপশাসন, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা,যুক্তফ্রন্ট গঠন ও সরকার গঠন, কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক শাসন ও রাজনৈতিক নানান বিষয় । অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তির উপস্থিতি ও পাওয়া যায় বইটিতে ।

বইটি শুরু হয়েছে কিভাবে লেখক জীবনী লেখতে অনুপ্রেরণা পেলেন তা দিয়ে । ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে । টুঙ্গিপাড়ার শেখ বংশে জন্মগ্রহণ করেন । শেখ মুজিবের বাবার নাম শেখ লুৎপর রহমান ও মায়ের নাম সায়েরা খাতুন । লেখক শেখ বংশের উত্থান-পতনের উল্লেখ করেছেন ।

বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাজীবন শুরু হয় শেখ আবদুর রশিদ প্রতিষ্ঠিত একটি ইংরেজি স্কুলে । তিনি সেখানে ৩য় শ্রেণী পর্যন্ত পড়েন । এরপর ভর্তি হন গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে । সপ্তম শ্রেণীতে  ১৯৩৭ সালে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে ভর্তি হন । পড়েছেন কলকাতা ইসলামিয়া ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ।

‘ মুসলিম সেবা সমিতি’ নামের সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে শুরু করেন সামাজিক কর্মকাণ্ড । সংগঠনটি গরিব ছাত্রদের সাহায্য করত । সম্ভবত এটিই ছিল সংগঠক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর প্রথম যাত্রা ।

১৯৩৮ সালে শেরে বাংলা ও সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জে আসেন । তাদের এই আগমন মুসলমানদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে ।  ঐ সময় শেখ মুজিবের উপর পড়ল স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী তৈরির দায়িত্ব । সোহরাওয়ার্দী মিশন স্কুলে পরিদর্শনে যান । সেখানেই শেখ মুজিবের সাথে সোহরাওয়ার্দীর কথা হয় ।

লেখকের ভাষায় , ‘ হক সাহেব ও সোহরাওয়ার্দী এলেন, সভা হল । এগজিবিশন উদ্বোধন করলেন। শান্তিপূর্ণ ভাবে সকল কিছু শেষ হয়ে গেল । হক সাহেব পাবলিক হল দেখতে গেলেন । আর শহীদ সাহেব গেলেন মিশন স্কুল দেখতে । আমি মিশন স্কুলের ছাত্র । তাই তাকে সম্বর্ধনা দিলাম । তিনি স্কুল পরিদর্শন করে হাঁটতে হাঁটতে লঞ্চের দিকে চললেন, আমিও সাথে সাথে চললাম । তিনি ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করছিলেন, আর আমি উত্তর দিচ্ছিলাম । আমার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন , আমার নাম এবং বাড়ি কোথায়। একজন সরকারি কর্মচারী আমার বংশের কথা বলে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন । তিনি আমাকে ডেকে নিলেন খুব কাছে, আদর করলেন এবং বললেন , ‘তোমাদের এখানে মুসলিম লীগ করা হয় নাই ?’’ বললাম ‘কোন প্রতিষ্ঠান নাই । মুসলিম ছাত্রলীগ ও নাই । তিনি আর কিছুই বললেন না, শুধু নোটবুক বের করে আমার নাম ও ঠিকানা লিখে নিলেন’

সোহরাওয়ার্দী ছিলেন মুজিবের রাজনৈতিক গুরু । ১৯৩৮ সালে কলকাতায় গেলে  সোহরাওয়ার্দীর সাথে দেখা করেন ।

শেখ মুজিব প্রথম জেলে যান স্কুলে পড়া অবস্থায় । হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে বিদ্বেষ ভাব চলাকালে মালেক নামের এক ব্যক্তিকে হিন্দু মহাসভার বাড়িতে নিয়ে আটকে রাখা হয় । শেখ মুজিব ও তার বন্ধুরা ঐ ব্যক্তিকে উদ্ধার করেন । হিন্দু নেতারা তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন । শেখ মুজিব চাইলে পালিয়ে গিয়ে গ্রেপ্তার এড়াতে পারতেন । বরং নিজেই থানায় চলে যান ।

দেশভাগ নিয়ে নাজিমুদ্দীন ও সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা উল্লেখ করেছেন । ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় নাজিমুদ্দীন ছিলেন প্রধানমন্ত্রী ও সোহরাওয়ার্দী ছিলেন সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রী ।

শেখ মুজিব ম্যাট্রিক পাশ করে ভর্তি হন কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে । থাকতেন ‘বেকার’ হোস্টেলে । কলকাতায় থাকাকালিন সময়ে যোগদেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ।

সোহরাওয়ার্দীর সাথে এসময় নিয়মিত সাক্ষাৎ করতেন । নানান বিষয়ে আলাপ- আলোচনা করতেন । শেখ মুজিব রাজনৈতিক তাত্ত্বিক জ্ঞান লাভ করেন হাশিম সাহেবের কাছ থাকে ।

পাকিস্তান আন্দোলনকে বাংলার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সোহরাওয়ার্দী ও হাশিম সাহেব সবচেয়ে ভূমিকা পালন করেন । এই সম্পর্কে তিনি বলেন ‘শহীদ ও হাশেম সাহেব যদি বাংলার যুবক ও ছাত্রদের মধ্যে মুসলিম লীগকে জনপ্রিয় না করতে পারতেন এবং বুদ্ধিজীবী শ্রেণীকে টেনে আনতে না পারতেন তাহলে কোনদিনও পাকিস্তান আন্দোলন বাংলার কৃষকদের লাভ করতে পারত না’।

দেশভাগের পর শেখ মুজিব চলে আসেন ঢাকায় । এখান থেকেই আবার শুরু করেন  রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে । ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন । জেল ও খেটেছেন ।

অল্প বয়সে হয়ে ছিলেন যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী । কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে সব সময় ছিলেন সোচ্চার ।

বইটি শুধু শেখ মুজিবের জীবনী ধারণ করেনি এটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রে সৃষ্টির ইতিহাসও ধারণ করেছে ।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!