বুক রিভিয়্যু : “অসমাপ্ত আত্মজীবনী”

Reading Time: 2 minutes

বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর বাল‍্যকাল ও রাজনৈতিক জীবন ছিল অত‍্যন্ত ঘটনা বহুল। ব্রিটিশ শাসনের শেষ অধ‍্যায়, পাকিস্তান আন্দোলন, বাঙালি জাতির ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন তিনি দেখেছেন এবং সক্রিয় ভুমিকা পালন করেছেন। তার সেই সংগ্রামী জীবনের অসম্পূর্ণ ইতিহাস সুন্দর ও সাবলীল ভাষায় তিনি তার “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” তে তুলে ধরেছেন।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় শেখ বংশে জন্মগ্রহন করেন। বঙ্গবন্ধু ‘শেখ’ বংশের পরিচয় দিতে গিয়ে একটি পুরাতন ঘটনার অবতারনা করেন, ঘটনা টি হলো- শেখ বংশের একজন পূর্বপুরুষ কুদরতউদ্দিন ইংরেজ কুঠিয়াল মি.রাইনের সাথে একটি মামলায় জয়লাভ করবার পর কুদরতউদ্দিন কে ক্ষতিপূরণ চাইতে বলা হলে তিনি মি.রাইনকে অপমান করার জন্য “আধা পয়সা” ক্ষতিপূরণ দিতে বলেন, তিনি আরও বলেছিলেন “টাকা আমি গুনি না, মেপে রাখি”। সুতরাং এখান থেকে স্পষ্ট যে শেখ বংশ আগে থেকেই সমৃদ্ধ ছিল।

শেখ মুজিব বাল্যকাল থেকেই খুব সংগ্রামী ছিলেন, খানিকটা ডানপিটে ও বটে! বঙ্গবন্ধু তার জীবনী বর্ণনায় কতটা সরলতা প্রদর্শন করেছেন তার একটি ছোট্ট উদাহরন তুলে ধরলাম, বঙ্গবন্ধু দিল্লি গিয়েছিলেন একটি কনফারেন্সে যোগ দিতে, সেখান থেকে ফেরার সময়ের একটি ঘটনা- “হিসাব করে দেখলাম, তিনজনের টিকিট করার টাকা আমাদের নাই। দুইখানা টিকিট করা যায়, কিন্তু না খেয়ে থাকতে হবে। তিনজনে পরামর্শ করে ঠিক করলাম, একখানা টিকিট করব এবং কোন ‘সার্ভেন্ট’ ক্লাসে উঠে পড়ব। যদি ধরা পড়ি, হাওড়ায় একটা বন্দোবস্ত করা যাবে।“

আরেক বার জিন্নাহ সাহেব দিল্লিতে সমস্ত ভারতবর্ষের মুসলিম লীগ সদস্যদের কনভেনশন ডাকলেন যেখানে শেখ মুজিব ও অংশ গ্রহন করেন এবং পরে দিল্লির বিখ্যাত স্থান ও নিদর্শনগুলো পরিদর্শন করেন, যার একটি বর্ণনা তিনি এভাবে দিয়েছেন-“আমাদের দেরি আর সইছে না। মনে হচ্ছে ট্রেন খুব আস্তে চলছে, কারণ তাজ দেখার উদগ্র আগ্রহ আমাদের পেয়ে বসেছে। সুর্য যখন অস্ত গেল, সোনালি রঙ আকাশ থেকে ছুটে আসছে। মনে হল, তাজের যেন আর একটা নতুন রূপ। কি অপূর্ব দেখতে! আজও একুশ বৎসর পরে লিখতে বসে তাজের রূপকে আমি ভুলি নাই, আর ভুলতেও পারব না।“ তার এই উপস্থাপনাই বলে দেয় তিনি কতটা সাহিত্যিক মনের অধিকারি ছিলেন।

বাল্যকালে রোগে আক্রান্ত হওয়া, খেলাধুলার প্রতি ভালবাসা, বার-তেরো বছর বয়সেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া, বাল্যবয়সেই শহীদ সাহেব এবং হক সাহেবের মত নেতার সহচার্য পাওয়া সবকিছুই সুন্দর ভাবে নান্দনিক ভাষায় তুলে ধরেছেন তার এই আত্মজীবনীতে।

গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করার পর ১৯৪২ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন বিএ ডিগ্রী অর্জনের জন্য। তখন থেকেই তিনি একজন ফুলটাইম রাজনৈতিক কর্মী হয়ে ওঠেন। নিয়মিত সাক্ষাত করতেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির হাতেখড়ি শহীদ সাহেবের নিকট থেকেই। একজন আদর্শ নেতা কে কীভাবে সম্মান করতে হয়, মান্য করতে হয়, আনুগত্য করতে হয় সেগুলো শেখ মুজিব তার চরিত্রের মাধ্যমে সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান আন্দোলনে মুসলিম লীগের হয়ে রাজনৈতিক বিচক্ষণতা প্রদর্শন করতে সক্ষম হন। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও চতুর্থশ্রেণীর কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি আদায়ের সংগ্রামে সংহতি প্রকাশ করলে তাকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু শেখ মুজিব কখনই দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বার বার জেলের অন্ধকার সেলে বন্দি থেকেছেন বিনা অপরাধে। কিন্তু তার নীতি থেকে এক চুল পরিমানও সরে আসেননি, মাথানত করেননি অন্যায়ের কাছে, বরং হুঙ্কার ছেড়েছেন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে।

তিনি নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন দেশ, জাতি ও জনগনের জন্য। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করেছেন কারাগারের মধ্যে অনসনের মাধ্যমে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট সরকারের সর্বকনিষ্ঠ মন্ত্রী নির্বাচিত হন। শেখ মুজিব সবসময়ই বলতেন “আমি মন্ত্রী হতে চাই না, সাধারণ জনগনের শান্তি চাই”। ক্ষমতার লোভ তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। অন্যায়কে কখনই সমর্থন করেননি, প্রতিবাদ করেছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, ফজলুল হক এবং মাওলানা ভাষানীর মত নেতাদের অযৌক্তিক দাবির বিরুদ্ধে।

সর্বপরি বঙ্গবন্ধুর “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” বইটি পড়ার পর মনে হতে লাগলো সত্যই কোথায় যেন একটা অসম্পূর্ণতা রয়ে গেল।

 

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!