আগরতলার চিঠি (১ম পর্ব)

Reading Time: 4 minutes

মেহেদী কাউসার ফরাজী:
বছর কয়েক আগে বর্ধমানে থাকতে সেখানকার কিছু ঘটনা ধারাবাহিকভাবে লিখেছিলাম। “বর্ধমানের চিঠি” শিরোনামে অনলাইনে প্রকাশিত লেখাগুলো পড়ে অনেকেই বিচিত্র মন্তব্য করেছেন। মফস্বলের এক তরুণের হঠাৎ মাতৃভূমি ছেড়ে রাজনৈতিক-কাঁটাতার টপকে নতুন পরিবেশে নতুন শহরে বসবাসের সাধারণ অনুভূতিগুলোই সেসব লেখায় প্রকাশিত হয়েছিলো হৃদয়ের সবটুকু আবেগের মাধ্যমে। যাক সেসব কথা।
পার্থিব সময়ের হিসেবে এখন আমি নিজেকে তরুণ বলবো না যুবক বলবো, তা বোঝা মুশকিল। তবে, আবেগ-অনুভূতির দিক থেকে অবশ্যই আগের চেয়ে সামান্যতম ম্যাচুরিটি এসেছে, তা নেহাৎ বুঝতে পারি বৈকি!

গত এক বছর পৃথিবী একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং সময়টুকু অতিক্রম করছে। অদৃশ্য করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে পৃথিবী থমকে গিয়েছিলো গত বছরের মার্চে। অনাকাঙ্ক্ষিত লকডাউনের ফলে বিশ্বের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর মতো আমার শিক্ষাজীবনও থমকে গিয়েছিলো। স্নাতক শেষ করে দেশে ফিরে মাস ছয়েক বেহুদা সময় নষ্টের পর যখন স্নাতকোত্তর ভর্তির মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখনই শুরু হলো লকডাউন। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। গ্রামে ও শহরে লকডাউনের কড়াকড়ি। বিকল্প হিসেবে স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি হলাম। মহামারী করোনার হাত থেকে বাঁচতে কয়েকশো বই (নন-একাডেমিক) সংগ্রহ করে দিনরাত পড়া-খাওয়া-ঘুম করে কাটিয়ে দিতে লাগলাম অনিশ্চিত দিনগুলি।

যাহোক, এক দশক আগে গ্রামে বসবাসের যে উল্টোমুখী স্বপ্নে বিভোর হয়েছিলাম, করোনার কয়েকমাসেই যেন গ্রাম আমাকে চূড়ান্ত বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছে। আগস্ট থেকে দেশের বাইরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন শুরু করলাম। 

ক্রমবর্ধমান লকডাউনের ফলে যখন দমবন্ধ অবস্থা হলো, তখন করোনা-বিধ্বস্ত ঢাকায় ফিরলাম। সময় কাটাতে একটি জাতীয় দৈনিকের সহসম্পাদক হিসেবে মাসখানেক কাজ করলাম। কিন্তু, মনে তখন বইছে ঝড়। সেই ঝড় ঢাকায় থেমে থাকার জন্য নয়। বরং বীতশ্রদ্ধ হৃদয়ে তখন সবকিছু ছেড়ে নির্বাসনের প্রবল তাড়া। দিন যায়, রাত যায়। মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকি। অদৃশ্য পরিবর্তনের স্বপ্নে কেবলই সময়ের স্রোতে ভেসে চলা।
ডিসেম্বরের দিকে বর্ধমানেই ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করলাম। সবকিছু যখন প্রায় ঠিকঠাক, জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে ঐতিহাসিক আগরতলা নগরীর ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়ার খবরটি এলো। এ যেন সৃষ্টিকর্তার নিকট থেকে নববর্ষের উপহার!
পুরো ফেব্রুয়ারি অনলাইন ক্লাস আর আগরতলা গমনের প্রস্তুতিতে কাটলো।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে প্রবেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম ফেব্রুয়ারির শেষ দিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কাননের আমন্ত্রণে তিতাস নদীর তীরে তার বড়ভাইয়ের বাসায় একদিন রইলাম। রেলওয়ে কর্মকর্তা বড়ভাইয়ের চমৎকার আতিথেয়তা এবং কল্পনার রাজ্য ত্রিপুরায় প্রবেশের উত্তেজনা ম্লান হয়ে গেলো স্থলবন্দরের জিরো পয়েন্টে। বাংলাদেশ ও ভারতীয় ইমিগ্রেশন অফিসার এবং বিএসএফ আমাকে হতাশ করলেন। 

করোনা মহামারীর কারণে আমার ভিসায় ভারতীয় হাইকমিশন কোন পোর্ট উল্লেখ করে দেয়নি। কেবলমাত্র স্থলপথে বেনাপোল, রেলপথে গেদে কিংবা আকাশপথে ভারত ভ্রমণের অনুমতি থাকায় আখাউড়া-আগরতলা সীমান্ত চেকপোস্টের (যেখান থেকে আমার বিশ্ববিদ্যালয় মাত্র মিনিট ত্রিশেকের দূরত্বে!) জিরো পয়েন্ট থেকে ফিরে এলাম ঢাকায়।

ঢাকায় ফিরে ফ্লাইটের টিকিট বুকিং আর নতুন করে করোনা পরীক্ষায় কয়েকদিন কেটে গেলো। ঘোরতর অনিশ্চয়তা নিয়ে চৌঠা মার্চ দুপুরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে করে কলকাতার নেতাজি সুভাষ চন্দ্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে মাতৃভূমি ত্যাগ করলাম। সেখান থেকে ইন্ডিগোর ফ্লাইটে আগরতলার মহারাজা বীর বিক্রম বিমানবন্দরে যখন পোঁছুলাম, তখন বাংলাদেশ-ভারত পূর্ব সীমান্তে গোধূলির আলোমাখা অন্ধকার নেমেছে।

বাংলাদেশ সীমান্ত-লাগোয়া আগরতলা বিমানবন্দর থেকে গ্রামীণফোন নম্বর দিয়েই মায়ের সঙ্গে কথা বললাম, সারাদিন উড়ে উড়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরা পাখির মতোন স্বদেশী সিম দিয়ে মায়ের সঙ্গে কথা বলা -এ এক আশ্চর্যজনক ঘটনাই বটে! এরপর বিচ্ছেদ।
বিমানবন্দর থেকে আগে থেকেই আগরতলার শ্রদ্ধাভাজন সুহৃদ সাংবাদিক তপন মজুমদার দাদার বুকিং করে রাখা ত্রিপুরা রাজ্য সরকারের হজ ভবনে আসলাম। রাতে হোস্টেলের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বন্ধ থাকবে বিধায় হজ ভবনের গেস্টরুমেই রাতটুকু কাটাতে হবে।

পরদিন ভোরে উঠে স্নান সেরে প্রস্তুত হচ্ছি, এমন সময় তপন মজুমদার দাদার ফোন। তড়িঘড়ি নীচে নামলাম। ডায়েরি ও কলম উপহার দিয়ে আগরতলায় অভ্যর্থনা জানালেন তিনি। হজ ভবনের পাশেই একটি হোটেলে নাশতা করার সময়ই তপন মজুমদার দাদা আরেকজন সাংবাদিককে ফোনে ডেকে নিলেন, ময়মনসিংহের অষ্টগ্রাম (বর্তমানে কিশোরগঞ্জ জেলার অধীনে) এলাকায় নবাগত ভদ্রলোকের পৈত্রিক ভিটা। তিনি জানালেন তার বাবা আগরতলা এসেছেন ১৯৩২ সালে, অর্থাৎ দেশভাগের অনেক আগে। তবুও অধুনা বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের আগ্রহ ও জ্ঞানের পরিধি দেখে বিস্ময়াভিভূত হলাম।

সাড়ে দশটার দিকে রিজার্ভড অটো নিয়ে আগরতলার অদূরে ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করলাম। গুগল ম্যাপে এর আগে বহুবার দেখেছি। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক ক্যাম্পাস। মনোমুগ্ধকর। বিশ্ববিদ্যালয় হেলথ সেন্টার থেকে কোভিড সার্টিফিকেট প্রত্যয়ন করে হোস্টেলে আসলাম। প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে শুরু হলো এক নতুন যাত্রা। সেই যাত্রা অনাগত ভবিষ্যতের দিকে সময়ের বেগে ছুটে চলার মতোই অনিশ্চিত, তবে মধুর।

হোস্টেলে ব্যাগপত্র রেখে ছুটলাম প্রশাসনিক ভবনে রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে। সেখানকার কাজ শেষে গেলাম ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস’ এডাভাইজার স্যারের কাছে, তাঁর সঙ্গে দেখা করে প্রয়োজনীয় আলোচনা সারলাম। এরপর বিকেলে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে প্রবেশ করে বিভাগীয় প্রধান ড. বিপিন কুমার শর্মা স্যারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে ক্লাসরুমে গিয়ে দু’টো ক্লাস করলাম। 

ক্লাস থেকে দ্রুত ফিরে সন্ধ্যায় রুমমেট সিনিয়রের সঙ্গে ফের আগরতলা শহরে গেলাম প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে। আগরতলায় জিনিসপত্রের দাম বাংলাদেশের মতোই, ক্ষেত্রবিশেষে একটু বেশীই। ভারতের অন্যান্য রাজধানী শহরের তুলনায় আগরতলা অপেক্ষাকৃত কম জনাকীর্ণ, শান্ত ও মনোরম। সম্পূর্ণ ল্যান্ডলকড হওয়ায় ত্রিপুরা রাজ্যের মানুষকে অন্যান্য ভারতীয় রাজ্যের মানুষের তুলনায় বেশি পয়সা খরচ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ ট্রানজিট সুবিধা দেয়ায় চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে উত্তরপূর্ব ভারতীয় এই রাজ্য। অদূর ভবিষ্যতে এখানকার জীবনযাত্রা আরেকটু সহজলভ্য হবে বলেই আশা করছি।

(আগরতলায় নিযুক্ত বাংলাদেশের মান্যবর সহকারী হাইকমিশনার জনাব মোহাম্মদ জোবায়েদ হাসান, বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনের প্রথম সচিব মো. জাকির হোসেন ভূঁঞা এবং প্রথম সচিব (স্থানীয়) মো. এস. এম. আসাদুজ্জামান -এর সাথে লেখক (৭ মার্চ, ২০২১ খ্রি. )

ছয় তারিখ আগরতলাস্থ বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনের সঙ্গে ইমেইল যোগাযোগ ঘটে। এসময় ঐতিহাসিক সাতই মার্চের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পাই। সাতই মার্চ রোববার এখানকার সাপ্তাহিক ছুটির দিন বিধায় নির্ধারিত সময়ে সহকারী হাইকমিশন প্রাঙ্গণে উপস্থিত হই।

শৈশব থেকেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের নিবিড় চর্চায় নিজেকে নিয়োজিত রাখায় বঙ্গবন্ধু ও আগরতলা শহর সম্পর্কে বিশেষ আগ্রহ বোধ করি। সেই আগ্রহ আরও দৃঢ় হলো আগরতলার মাটিতে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষণের ৫০ বছরপূর্তি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়ায়। এ এক অনন্য অনুভূতি, যা কেবল হৃদয় দিয়ে অনুভব করা যায় কিন্তু ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

আগরতলায় নিযুক্ত বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনার মোহাম্মদ জোবায়েদ হাসান মহোদয়ের উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আন্তরিক ব্যবহারে মুগ্ধ হলাম। একে একে সহকারী হাইকমিশনের প্রথম সচিব মোঃ জাকির হোসেন ভূঞা মহোদয় ও প্রথম সচিব (স্থানীয়) এস. এম. আসাদুজ্জামান মহোদয় -সহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় হলো। সকলের আন্তরিক ব্যবহারে কৃতজ্ঞ বোধ করছি। 

মূল অনুষ্ঠান শুরু হলো জাতীয় সঙ্গীতের সাথে লাল-সবুজের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে। এরপর বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করলেন আগত সকলেই। ত্রিপুরা রাজ্যের বুদ্ধিজীবী, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং আগরতলার নাগরিকবৃন্দ এতে অংশ নেন ও নিজ নিজ অভিজ্ঞতা-আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানের ফাঁকে বাংলাদেশের জনপ্রিয় অনলাইন পোর্টাল বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর ডটকমের আগরতলা ব্যুরো চীফ সুদীপ চন্দ্র দত্ত দাদার সঙ্গে আন্তরিক আলাপচারিতা বেশ ভাল লাগলো।

অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিলো আগরতলার স্কুল শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ উপস্থাপন প্রতিযোগিতাটি। ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের কর্তৃক বাঙালির আত্মপরিচয়ের দিশা নির্দেশক ঐতিহাসিক এই ভাষণটির হৃদয়গ্রাহী উপস্থাপনা বার বার শিহরণ জাগিয়েছে। সব মিলিয়ে এমন একটি অনন্য আয়োজন সম্পন্ন করায় আগরতলার বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনকে ধন্যবাদ দিতেই হয়।…চলবে…

লেখক: স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী, ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়; ইমেইল: mahedikawser.bd@gmail.com

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!