আত্মপ্রতিকৃতি – কাহলিল জিবরান

Reading Time: 5 minutes

কাহলিল জিবরান

মনের ঘরের দুয়ার খুলে কথা বলতে পারা সত্যিই আনন্দের। যারা এ কাজে সফল হয়েছেন তারা এই ধরণীতেই সর্গীয় সুধা কিছুটা হলেও পান করতে পেরেছেন। সফল তারাই হয়েছেন যারা তাদের নিজস্ব প্রকৃতি নিয়ে মিশে গেছেন পৃথিবীর আত্মার সাথে। এইক্ষেত্রে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিকে তুলে ধরতে চিঠি এক অনন্য মাধ্যম হিসেবে পরিচিত। যে কথা কোনোভাবেই বলা যায় না মনের মতো করে অথচ তা মনের গহীন ঘরের কথা। আমার মনে হয় একমাত্র চিঠিই সাবলীলভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে তুলে ধরতে পারে আমাদের মনের সেই কথাগুলোকে।

গত কয়েক মাস ধরে লেবাননের অমর পন্ডিত এবং নব মতবাদের প্রবক্তা এবং শিল্পী কাহলিল জিবরানের ‘আত্মপ্রতিকৃতি’ নামক বইটি পড়ছি। কিন্তু কেন যেন শেষ করেও শেষ করতে পারছি না। বইয়ের সবগুলো পৃষ্ঠা শেষ করে আমার চোখ বিশ্রামে গেছে বেশ কয়েকবার কিন্তু আমার আত্মা বইয়ের শেষ পর্যন্ত পৌছাতে পারছে না কিছুতেই। কোথায় যেন সে আটকে আছে, কোন লেখার সাথে যেন একাত্ম হয়ে আছে। ভাষাগত মাধুর্যতা, ভাবের গভীরতা, জীবনের প্রতিটি বিষয়ের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন জিবরানকে পড়তে গিয়ে আমি ভীষণ চমকে গেছি। অনুভুতিগুলোকে কতটা সহজ এবং আকর্ষণীয় করে ভাষায় প্রকাশ করা যায় যুগ যুগ ধরে তার এক বিরল নিদর্শন হয়ে থাকবে এই বই।

ক্লাস নাইনে থাকতে একটা বই উপহার পেয়েছিলাম। ‘বাঁধনহারা’ একটি পত্র উপন্যাস। এর লেখক আমাদের জাতীয় কবি। সেটা ছিল আমার পাঠক জীবনে সাহিত্যের প্রথম কোন বিল্পব ঘটানোর মতো একটা বই। সেই চমকপ্রদ লেখা দীর্ঘ ৭ বছর ধরে আমাকে একইভাবে মোহিত করে রেখেছে। যত বই পড়ি না কেন, সেই ভবঘুরে জীবন অথচ চারপাশের মানুষের ভালোবাসায় জর্জড়িত সৈনিক জীবনের কবিকে ভুলতে পারিনি আজও। সীমাহীন মায়ায় ভরা অথচ দায়িত্বপরায়ন, মোহহীন হৃদয়ের লেখকের প্রতিকৃতি নিজের মধ্যে আঁকার যে কতরকম চেষ্টায় ব্রত হয়েছিলাম তা বর্ণনায় সীমাবদ্ধ থাকে না।

‘আত্মপ্রতিকৃতি’- শীর্ষক এই সংকলনটিতে জিবরানের প্রিয় মানুষদেরকে লেখা পত্রগুলো পাঠককে নিয়ে যাবে অকল্পনীয় সব চিন্তার মোহনীয় ভুবনে। বিশেষ করে চিঠির শুরু এবং এর শেষাংশ উপভোগ্য এক ভালো লাগার আবেশে মেশানো। চিঠিগুলো পড়তে গিয়ে মনে হবে তিনি তার সম্পর্কে লিখতে গিয়ে যেন পৃথিবীর সকল মানুষের মনের কথাগুলোকে একত্রিত করেছেন। জিবরানের নিজস্ব কিছু অনুভুতি মধ্যে প্রথমেই চোখে পড়বে লেবানীয় নবীন কবি-লেখক জামিল মালুফকে লেখা চিঠির শেষাংশে-

“আমার স্বাস্থ্য! তুমিতো জানোই সেটি বাজাতে না জানা ব্যক্তির হাতের বেহালার মতো, যে শুধু এর সুরের কর্কশতাকে শোনে। আমার ভাবানুভূতি সামুদ্রিক জোয়ার-ভাটার মতো; আর অন্তর ভাঙাডানার তিতিরপাখি। আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির ওড়াউড়ি দেখে নিজের উড়তে না পারার অক্ষমতায় সে মন কষ্টকাতর। তবে পাখিকূলের মতো রাতের নৈঃশব্দ, উষার প্রকাশ, সূর্যালোক আর উপত্যকার সৌন্দর্য সেটি ঠিকই উপভোগ করে। আমি মাঝে-মধ্যে আঁকছি, লিখছি। লেখা আর আঁকায় আমি যেন অন্তহীন গভীরতার সমুদ্র এবং অসীম নীলিমার আকাশের মধ্যে একটি ভাসমান নৌকা- সাথে অদ্ভুত স্বপ্নাবলি, ভীষণসুন্দর বাসনাসমূহ, মহত্তম সব প্রত্যাশা, জীর্ণ কিন্তু রিপুকৃত চিন্তামালা; আর এসবের ভেতরে কিছু একটা বিদ্ধমান যাকে কেউ বলে হতাশা, আমি বলি নরক।”
অন্যসব মানুষের চেয়ে জিবরান জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে যে খুব বেশী গভীরভাবেই অনুভব করতেন তা তার আপন কাজিন নাখালিকে তাদের শৈশব স্মৃতি স্মরণ করে লেখা চিঠিতে কিছুটা প্রকাশ পায়-

“প্রিয় নাখলি, জীবন বাৎসরিক ঋতুর মতো। আনন্দময় গ্রীষ্মের পর আসে বিষাদময় শরৎ; বিষণ্ন শরতের পশ্চাতে আসে ক্রোধী শীত। আবার ভয়ানক শীত গেলে উপস্থিতি ঘটে চমৎকার বসন্তের। আবার আমাদের জীবনে কী কখনো বসন্ত ফিরে আসবে যাতে আমরা বৃক্ষদের মাঝে সুখী হতে পারি, ফুলের সাথে হাসতে পারি, ছোট নদী ¯স্রোতের সাথে ছুটতে পারি কিংবা পাখিদের সাথে গাইতে পারি- যেমনটা পিটার থাকতে বাশরিতে করেছিলাম? যে ঝড়ে আমরা বিভাজিত তা কী আমাদের কখনো একত্র করবে? আবার কী কখনো আমরা বাশরিতে ফিরে সেন্ট জর্জ চার্চে মিলিত হবো? আমি জানি না, কিন্তু আমি উপলব্ধি করি এক ধরনের দেনা-পাওনার প্রক্রিয়াই জীবন। এটি আজ আমাদেরকে দেয় কাল তা ফিরিয়ে নেয়ার জন্যই। তারপর আবারও আমাদেরকে দেয়, পুনরায় নিয়ে নেয়। দেওয়া-নেওয়ার এ চক্র আমরা ক্লান্ত-শ্রান্ত হতে হতে চিরনিদ্রায় নিজেকে সমর্পণ না করা পর্যন্ত চলমান।”

বইয়ে জিবরানের পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধবদেরকে লেখা এবং জিবরানকে পাঠানো কয়েকটি চিঠিসহ মোট ৪৯ টি চিঠি জায়গা পেয়েছে। তার যুবক বয়সে বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া মন্দভাগ্যের দুঃখবোধের পাঠ উন্মোচিত হয়েছে এই চিঠিগুলোতে। খুব অল্পসময়ের ব্যবধানে তিনি তার ভাই, বোন এবং মাকে হারান। মায়ের প্রতি জিবরানের ছিল গভীর মমত্ববোধ এবং সুনিবিঢ় ভালোবাসা।


মা সম্পর্কে জিবরান বলেন- “মানুষের ঠোঁটে সবচেয়ে সুন্দর যে শব্দটি উচ্চারিত হয় তা হচ্ছে ‘মা’; অত্যন্ত চমৎকার ডাক হলো, ‘আমার মা’। শব্দটির অন্তরভর্তি আশা ও ভালোবাসা; কেবল গভীর কন্দর থেকেই এই সুন্দর আর দয়ার্দ্র শব্দটি উঠে আসে। মা-ই সবকিছু তিনিই দুঃখে সান্তনা, দুর্দশায় আশা, এবং দুর্বলতায় শক্তি। তিনিই ভালোবাসা, করুণা সহানুভূতি এবং ক্ষমার উৎস। কেউ মাকে হারালো তো একটি নির্ভেজাল সত্তাকেই হারালো যিনি সর্বদাই তাকে আগলে রাখে আর দোয়া করে। সমস্ত জীবসত্তার আদিরুপ মা হচ্ছেন সৌন্দর্য ও প্রেমের এক চিরন্তন শক্তি।”

জিবরান জ্ঞান অন্বেষণের তাগিদে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তিনি লেবাননের বিখ্যাত মাদ্রাসা আল-হিকমত থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করে সমগ্র সিরিয়া ও লেবাননের প্রাচীন সভ্যতার ঐতিহাসিক স্থান, ধ্বংসস্তুপ ও পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো ঘুরে ঘুরে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেন। এরপরে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে গিয়ে শিল্পকলার উপর জ্ঞান আরোহন করেন। ছেলেবেলা থেকেই তিনি একাকী অধ্যয়ন ও সাধনামগ্ন হয়ে থাকতেন এড়িয়ে চলতেন বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের সাহচর্য। এজন্য জিবরান সম্পর্কে অধিকাংশ লোকের ধারণা তিনি স্বভাবগতভাবেই মুখচোরা আর অসামাজিক। পড়াশোনা, লেখালেখি বা আঁকাআঁকিতেই তিনি বেশীর ভাগ সময় কাটাতেন। অন্য ছেলেপিলেরা কোনোপ্রকারে তাঁর সাথে আলাপের সুযোগ পেলে তিনি তাদেরকে আশ্চর্যজনক এমন সব বিষয়ের কথা শোনাতেন যা ওদের পক্ষে বোঝা সম্ভব হতো না, ফলে তারা জিবরানকে ভিন্নরকমের অদ্ভুত ছেলে বলে ভাবতো।

তবে জিবরানকে যারা বন্ধুস্বভাবী হিসেবে ভাবেননি তাদের প্রতি আমার বিরোধিতা আছে। যদিও তিনি যার তার সাথে বন্ধুত্ব করতেন না। কিন্তু যার সাথে করতেন তিনি হয়ে যেতেন তার অন্তরের খুব কাছের আত্মীয়। তিনি যে কতোটা বন্ধুত্বপূর্ণ মনের ছিলেন তার প্রমাণ মিলবে নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত আল মুহাজের নামীয় আরবী দৈনিক সংবাদপত্রের মালিক আমেন গুরাইবকে লেখা পত্রের এই কাব্যিক আকুতিটুকুতে-

“তুমি যখন কোনো চমৎকার স্থানে যাবে, কিংবা বিদ্বান মানুষদের সাথে থাকবে, বা প্রাচীন কোন ধ্বংসাবশেষের পাশে অথবা পাহাড়শীর্ষে যাবে তখন আমার নামটি নিও যাতে আমার আত্মা লেবাননে গিয়ে পৌঁছে তোমার চারপাশে ঘুরঘুর করতে আর তোমার সাথে জীবন ও জীবনের অন্তর্নিহিত অর্থবহতার আনন্দ ভাগ করে নিতে পারে। ‘সুনিন’ বা ‘ফাম এল মিজাব’ পাহাড়ের পেছন থেকে সূর্যোদয় দেখবার সময় আমাকে স্মরণ করো। সূর্যাস্তকালে উপত্যকাসহ পাহাড়কে সূর্যের লালিমার লালরঙা পোশাক পরিয়ে দেওয়ার ক্ষণটিতে আর লেবাননকে বিদায় জানাতে গিয়ে অশ্রুর বদলে রক্তঝরানো সেই সূর্যকে দেখবার সময় আমাকে মনে করো। পৃথিবীতে নির্বাসিত এ্যাপোলোর মতো রাখালেরা গাছের ছায়ায় বসে বাঁশি বাজিয়ে প্রান্তরের নীরবতা মধুর সুরের ধারায় ভরিয়ে দেবার সময় আমাকে স্মরণ করো। কাঁধে করে পোড়ামাটির কলসিভরা পানি নিয়ে যুবতীদের যেতে দেখলে আমাকে মনে করো। ভরসূর্যের মুখে জমিতে লাঙ্গল দিতে গিয়ে কপাল জুড়ে বিন্দু বিন্দু ঘামের অলংকারমন্ডিত প্রচন্ড শ্রমে কুঁজোপিঠ লেবাননী কৃষকদের দেখেও স্মরণ করো আমাকে। চন্দ্রালোকের শক্তি ছেনে, উপত্যকার সোঁদাগন্ধ আর পবিত্র সিডারের রঙ্গপ্রিয় হাওয়ার মিশ্রণে সৃজিত লেবানীয় মানুষের হৃদয় ভরানো নিসর্গের সঙ্গীত ও স্ত্রোতগীত শুনে আমার কথা মনে করো। লোকেরা তোমাকে আমোদপ্রমোদের অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ দিলে আমাকে মনে করো; তাতে সে সব মানুষের প্রতি আমার ভালোবাসা ও আকুল আগ্রহের সুর গভীর দ্যোতনা যুক্ত হবে। প্রিয় আমেন, ভালোবাসা আর আকাঙ্খা আমাদের সকল কর্মেও আদি এবং অন্ত।
তোমাকে এসব লিখবার সময় আমার নিজেকে মনে হচ্ছে যেন সৈকতে ছোট্ট একটা গর্ত খুঁড়ে একটি সমুদ্রঝিনুক দিয়ে গোটা সমুদ্রের পানি সেঁচে সেটি ভর্তি করবার বাসনাতুর এক বালক। কিন্তু এসব কথার আড়ালে কী অন্য কোনপ্রকার কথাকে তুমি দেখছো না যার রহস্য তোমার অনুসন্ধান করা দরকার?”

কাহলিল জিবরানের প্রতিটি চিঠির বক্তব্য আমি মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। যে প্রতিশ্রুতিশীল সৃজনশক্তির পরিচয় লেখালেখির শুরুতে জিবরান দিয়েছিলেন বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত ও ব্যাপকভাবে পঠিত তার অনেক সৃষ্টিকর্মে পরিলক্ষিত হয়েছে এবং সেটি তিনি আজীবন ধরে রেখেছিলেন। জীবরানের নিজস্ব লিখনশৈলী এবং মৌলিকত্ব তাকে শক্তভিত্তি এনে দিয়েছে। জীবন নিয়ে তার যে উপলব্ধি তা কেবল বাস্তব পরীক্ষণের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব। পাশ্চাত্য পৃথিবী যখন বিজ্ঞান চর্চার মাধ্যমে তার সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধানে ব্যস্ত, তখন আরবিভাষী বিভিন্ন মানুষের বিশ্ব কাব্যিক এবং দার্শনিক দৃষ্টিতে জীবনকে দেখাই শ্রেয় মনে করেছে। আবার ধর্মীয় পক্ষপাতদুষ্ট না হয়ে অথবা বৈজ্ঞানিক মতবাদে মোহগ্রস্ত না হয়ে আরব লেখকবৃন্দ প্রকাশের স্বাধীনতাকে পুরোপুরি অনুভব করেছে যা পাশ্চাত্যের লেখকদের জন্য ঈর্ষার কারণ হতে পারে। আরব লেখকদের রয়েছে নিজস্ব প্রকাশভঙ্গী বাহ্যিক চাপ কিংবা সমালোচনা তাদেরকে এ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। আরবি সাহিত্যের প্রতি আগ্রহের বর্তমান পরিবেশে প্রাচ্যের কোনো সাহিত্যিকই কাহলিল জিবরানের চাইতে বেশী অবদান রাখতে পারেনি। প্রাচ্যসাহিত্যেও মানসম্মত সৃষ্টিসম্ভারের চূড়ায় একাকীই দাঁড়িয়ে আছেন তিনি স্বমহিমায়।

 

লেখকঃ আল আমিন হাওলাদার

ইমেইলঃ alamin.duj@gmail.com

তারিখঃ ২ এপ্রিল, ২০১৬

সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাবি।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!