আত্মহত্যার ব্যাধিতে আক্রান্ত বিশ্ব!

Reading Time: 3 minutes

অতিসম্প্রতি পৃথিবীর সঙ্গীতাঙ্গণে ঘটে গিয়েছে একটি হৃদয় বিদারক ঘটনা। বিশ্ব খ্যাত সঙ্গীত ব্যান্ড লিংকিন পার্কের সহযোগী গীতিকার ও কন্ঠশিল্পী চেস্টার বেনিংটন গত ২০ শে জুলাই নিজেই টেনে দিয়েছেন জীবনের পরিসমাপ্তি। জীবনের খেলা সাঙ্গ করতে বেছে নিয়েছেন আত্মহত্যার পথ। এই শোক যেতে না যেতেই বাংলাদেশের মেকানিক্স ব্যান্ডের তরুণ গিটারিস্ট জাহিন আহমেদ ছিন্ন করেছেন পৃথিবীর মায়া। তার এই অনন্ত যাত্রায় বেছে নিয়েছেন আত্মহত্যার পথকেই। এমনকি আমি যখন এই লেখাটি লিখছি, তখন দেখলাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অরিন্দম সৈকত নামের এক তরুণের আত্মহত্যার খবর ছড়িয়ে পড়েছে, তাও আবার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় আশানুরূপ ফলাফল না পাওয়ার কারনে! চারিদিকে এমন আত্মহত্যার মিছিল দেখে হঠাৎ ই আমার একটি গল্প মনে পড়ে গেল।

রুশ নাট্যকার ও ছোটগল্প লেখক আন্তন পাভলোভিচ চেখভের অনেকগুলো রম্য-রচনার একটি সংকলন “OMotley Stories” এর এক নায়ক দারিদ্র্য আর প্রেমে ব্যর্থতায় কাতর হয়ে আত্মহত্যার সীদ্ধান্ত নেন। কিন্তু কীভাবে তিনি আত্মহত্যা করবেন? গলায় ফাঁস কিংবা বিষ পান কোনটাই তার পছন্দ হলো না। তিনি সীদ্ধান্ত নিলেন পানিতে ডুবে মরবেন। তাতে হয়তো পুলিশি ঝামেলা এবং ডোমের কাটাছেঁড়া থেকে বাঁচতে পারবেন। কিন্তু তিনি আবার এটাও ভাবলেন, যে নর্দমায় তিনি লাফ দিবন সেখানে শহরের সব নোংরা পানি এসে জমা হয়, যেখানে থাকে অসংখ্য ময়লা আর কীট। এই নর্দমায় ঝাঁপিয়ে পড়ার অর্থ- ওসব ময়লা আর কীট আমার নাক-মুখ দিয়ে ভেতরে ঢুকবে! কী বিভৎস!! অবশেষে নায়ক আত্মহত্যার চিন্তা বাদ দিয়ে নতুন করে বাঁচার সীদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, খুব কম মানুষই নায়কের মত নতুন করে বাঁচার সাহস পায়। তাইতো প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে আত্মহত্যার ঘটনা।

আত্মহত্যার দর্শন উদ্ভুত হয়েছিল গ্রীক দার্শনিক প্লেটোর চিন্তা থেকেই, তিনিই প্রথম আত্মহত্যার নৈতিকতার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন। প্লেটো বলেন- যখন কেউ রাষ্ট্রীয় আইনে মৃত্যুদন্ডাদেশ প্রাপ্ত হয় বা সাধারণ জীবন ধারনে অপারগ হয় কিংবা অনিবর্তনীয় অপমানে জর্জরিত হয় তখন তার জন্য আত্মহত্যা করা অনৈতিক নয়। তবে প্লেটো এটাও বিশ্বাস করতেন, কেই যদি নিস্ক্রিয়তা কিংবা কাপুরুষতার জন্য এটি করে, সে ক্ষেত্রে অবশ্যই এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

কিন্তু আদর্শবাদী স্কোপেনহাওয়ার এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিরোধিতা করেছেন প্লেটোর। তিনি আত্মহত্যাকে অনৈতিক বলে মনে করেন না, বরং এটি মানুষের অধিকার হিসেবেই বিবেচনা করেন! স্কোপেনহাওয়ার আত্মহত্যার সমর্থনে একটি রুপক ব্যবহার করেছেন, তিনি বলেন- আত্মহত্যার মাধ্যমে মৃত্যু হচ্ছে দুঃস্বপ্ন দেখতে থাকা একজন ঘুমন্ত মানুষের ঘুম ভেঙ্গে বাস্তবে ফিরে আসার মত। অন্যদিকে হিউম, জন লক ও ইমানুয়েল কান্ট এর মতো ইতিহাস বিখ্যাত দার্শনিকেরা আত্মহত্যাকে বরাবরই অগ্রহনযোগ্য হিসেবে গণ্য করেছেন।

আধুনিক বিশ্বের বহু দেশেই আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে ধরা পড়লে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। তবে অতীতে কোন কোন দেশ ও সংস্কৃতিতে আত্মহত্যা ছিল রীতিমত গৌরবের কাজ! আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এক সময় মৃত স্বামীর চিতায় সদ্য বিধবা স্ত্রীর আত্মাহূতি দেয়া ছিল বাধ্যতামূলক এবং পূণ্যের কাজ হিসেবে বিবেচিত! প্রাচীন গ্রীসে অপরাধীদের সুযোগ দেয়া হতো আত্মহত্যা করবার। আবার জাপানে ‘হারিকিরি’ নামক আত্মহত্যা ছিল সৈনিকদের জন্য বিশেষ মর্যাদার। আর প্রাচীন ভাইকিংসরা তো বিশ্বাস করতো যুদ্ধের ময়দানে কিংবা আত্মহত্যার মাধ্যমে মৃত্যু না হলে স্বর্গেই যাওয়া যাবে না!!

তবে এদের বাইরে ভিন্ন চিন্তার মানুষও কিছু কম ছিল না। মার্কিন লেখক এডওয়ার্ড ডালবার্গ বলেছেন- “যখন কেই উপলব্ধি করে যে, তাঁর জীবনের কোন মূল্য নেই, তখন সে আত্মহত্যা করে অথবা ভ্রমনে বেরিয়ে পড়ে”। এখন কথা হচ্ছে কোন মানুষের জীবনই মূল্যহীন বা অর্থহীন হতে পারে না। তবুও কেই যদি তা মনে করেন-ই, তাহলে আত্মহত্যার পরিবর্তে তাঁর ভ্রমনকেই বেছে নেয়া উচিত। কে জানে, হয়তো ঘুরতে ঘুরতেই তিনি খুঁজে পাবেন জীবনের অর্থ! যেমনটি পেয়েছিলেন চেখভের গল্পের নায়ক।

আত্মহত্যা নিয়ে আমাদের মধ্যে রয়েছে ভিষণ রকমের কৌতূহল, বিশেষত তরুণ তরুণীদের মাঝে দেখা যায় এর প্রতি প্রচন্ড রকমের দুর্বলতা। ছোটবেলায় ভাবসম্প্রসারন পড়েছিলাম ‘প্রয়োজনে যে মরিতে প্রস্তুত, বাঁচিবার অধিকার কেবল  তারই’। কিন্তু এখন জানি, সামান্য কারনে যে মরতে চায় পৃথিবীতে তার বেঁচে থাকার কি প্রয়োজন? জীবনে চলার পথে বিভিন্ন রকমের অভিজ্ঞতার সামনে দাড়াতে হবে, যেখানে থাকবে হাজারো সমস্যা, থাকবে তার সমাধান, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না। কিন্তু তাই বলে কি আত্মহত্যা করতে হবে?

আমরা যখন যৌবনে পা দেই, চোখে ওঠে নতুন সানগ্লাস, হাতে আসে স্বাধীনতার সার্টিফিকেট, তখন মনে হয় পৃথিবীটা কেবল আমার ইচ্ছেতেই চলবে। নিজের চাওয়া-পাওয়ায় একটুখানি কমতি হলেই বেছে নিতে চাই আত্মহননের পথ। কি আজব চিন্তা-ভাবনা! এর কি আর কোনই সমাধান নেই?

অনেকেই হয়তো বলেন, জীবনে এমন অনেক পরিস্থিতি আসে যখন আর কোন পথ থাকে না। তখন মনে হয় জীবন থেকে পাওয়ার আর কিছুই নেই। হ্যাঁ জানি, অনেককেই এমন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে সময় পার করে হয়, মনে হয় পৃথিবীতে নিজের প্রয়োজন টা বোধহয় শেষ হয়ে এসেছে। কিন্তু তাই বলে আত্মহত্যাই কেবল উত্তোরণের একমাত্র পথ হতে পারে না। সময় হয়েছে নিজের চোখের সকল বাঁধন খুলে ফেলবার। রংধনুর সাত রঙে রঙিন পৃথিবীকে সাদাকালো ক্যানভাসে আঁকবার কী প্রয়োজন আছে? যখন পাশে কেউ থাকবে না, মনে রাখবেন আপনিই তো এখনো আছেন নিজের জন্য, এবার না হয় নিজের জন্য ভাবুন, নিজেকে নিয়েই বাঁচুন। জীবন যুদ্ধে হার মানা তো ব্যর্থ সৈনিকের কাজ।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!