আমরা কি তবে এই স্বাধীনতা চেয়েছিলাম?

Reading Time: 4 minutes

স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের হয়েছে, তাও আজ ৪৫ বছরের গণ্ডি পেরিয়ে ৪৬ বছরে পা দিতে চললো। স্বাধীনতার এত বছর পরেও আজ মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা কতটুকু স্বাধীন হতে পেরেছি? তার চেয়ে বড় কথা, আমরা কি সত্যিকার অর্থেই স্বাধীনতা শব্দটাকে নিজেদের করে নিতে পেরেছি? আসুন এক নজরে দেখে নেয়া যাক এ দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা।

স্বাধীনতার পূর্ববর্তী ইতিহাসের দিকে যদি ফিরে তাকানো যায়, তাহলে দেখা যায়, আমরা ১৯০ বছর (প্রচলিত তথ্যানুযায়ী প্রায় ২০০ বছর) ব্রিটিশ কলোনিভুক্ত ছিলাম। সোজা বাংলায় ইংরেজদের দাস ছিলাম আমরা। তখন তারা এ ভূখণ্ডে ত্রাসের রাজত্ব চালিয়েছে। অর্থাৎ যা খুশি তাই করেছে। আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে যে কাজে, যেভাবে খুশি, তারা নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পিছপা হয়নি কখনই। মূলত বিনা পারিশ্রমিকেই তাদেরকে শ্রমদানে বাধ্য করা হয়েছে। কখনো কখনো সামান্য কিছু পারিশ্রমিক প্রদান করা হলেও তা ছিল নামেমাত্র। তাদের শ্রমের তুলনায় এ পারিশ্রমিক কিছুই ছিলনা। ধানি জমিতে কৃষকদেরকে নীলচাষ করতে বাধ্য করা হয়েছে। কেউ এর প্রতিবাদ করলেই তাকে নীলকুঠিতে আটকে রেখে চলত অমানবিক নির্যাতন। এ দেশের সম্পদ লুট করে নিয়ে নিজেদের রাজত্ব বাড়িয়েছে। কিন্তু এ দেশে এরকম ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা একদিনেই সম্ভব হয়নি। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে, তারা এদেশের শাসনভার পায় পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে। ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন তারিখে সংঘটিত এ যুদ্ধে বাংলা-বিহার-ঊড়িষ্যার শেষ স্বাধীন বিজেতা নবাব সিরাজঊদ্দৌলা ইংরেজ বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে পরাজয় বরণ করেন। এ পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল এ দেশীয় দোসরদের কূটচক্র। তারা নবাবকে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতায় বসতে চেয়েছিল। এ লক্ষ্য নিয়ে তারা তখন নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। কিন্তু তাদের সে দুরাশা কখনই পূরণ হয়নি।ক্ষমতালোভী ইংরেজ জাতি তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে তা বরঞ্চ নিজেরা কুক্ষিগত করে।

দীর্ঘ ১৯০ বছর ধরে এভাবে দমন-পীড়ন চলার পরে নানা সময়ে নানা আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশ স্বাধীন হয়। ব্রিটিশ শাসনামল বা তার আগে থেকেই তৎকালীন মুসলিমরা হিন্দুদের তুলনায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চায় অনেক পিছিয়ে ছিল। কেউ কেউ উচ্চপদে আসীন হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এক ভিন্ন চিত্র চোখে পড়ত। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চায় এগিয়ে থাকার কারণে বিভিন্ন চাকরি, ব্যবসা ইত্যাদিতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একক আধিপত্য ছিল চোখে পড়ার মত। এক্ষেত্রে মুসলিমদের পিছিয়ে পড়ার আরেকটি বড় কারণ ছিল কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামি। যাই হোক, এভাবে হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বিভাজন সৃষ্টি হয়। এছাড়া মৌলবাদী হিন্দুরা কখনই মুসলিমদের উন্নতি সহ্য করতে পারত না। এর বড় প্রমাণ স্বদেশী আন্দোলন, বঙ্গভঙ্গ রদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বাধা দেওয়া ইত্যাদি। জনৈক বিখ্যাত কবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বলেছিলেন, “পূর্ব বাংলার মুসলিমদের উচ্চশিক্ষার জন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নয়, একটি মাদ্রাসাই যথেষ্ট! “ পরবর্তীকালে তাকেও এ প্রতিষ্ঠান থেকে ডি.লিট. দেয়া হলো! আবার তিনি গ্রহণও করলেন।
কী সেলুকাস!

এ কারণে ভারত উপমহাদেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন তৎকালীন মুসলিম নেতারা নিজেদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এ অনুভব থেকেই পরিবর্তীকালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে হিন্দুস্থান(ভারত)-পাকিস্তান নামক দুইটি নতুন রাষ্ট্র আলাদা জায়গা করে নিলো পৃথিবীর মানচিত্রে। যেহেতু এ দেশ মুসলিম অধ্যুষিত, সেহেতু এটি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলো। পাকিস্তানে তখন মোট ৫টি প্রদেশ থাকলেও তা পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান নামে সর্বাধিক পরিচিতি লাভ করে। স্বাধীনতার পরেই শুরুতেই দেখা দিলো ভাষা নিয়ে দ্বন্দ্ব। সমগ্র পাকিস্তানের ৫৬% লোকের মুখের ভাষা ছিল বাংলা। অপরদিকে, পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু উচ্চ শ্রেণীর লোকেরা কেবল উর্দুতে কথা বলত। কিন্তু সংগ্রামী জাতি বাঙালি তা মেনে নিতে পারল না কোনোভাবেই। ফলে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি তারিখে ( ৮ই ফাল্গুন, ১৩৫৯) নিজেদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করল। পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোনো জাতিকে এভাবে মাতৃভাষার জন্য সংগ্রাম করতে হয়নি। দিতে হয়নি বুকের তাজা রক্ত। অবশেষে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের যে সংবিধান রচিত হয়, তাতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া হয়।

ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে পাকিস্তান গঠনের ক্ষেত্রে বাঙালিদের মূল উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতা লাভ। কিন্তু দেখা গেল, স্বাধীনতা শব্দটি কেবল কাগজে-কলমেই রয়ে গেল। আগে ব্রিটিশরা শোষণ করত। এবার পাকিস্তানিরা শোষণ করতে লাগল। একসময় বাঙালি বুঝে গেল, স্বাধীনতা শব্দটি কেবল লিখিতভাবে এসেছে। বাঙালির জীবনে এর বাস্তব কোনো প্রয়োগ ঘটেনি। ফলে ২৪ বছর শোষণের পর নানা আন্দোলন-সংগ্রাম করে, বহু প্রাণের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লক্ষ লোক শহীদ হলো। দুই লক্ষ মা-বোন সম্ভমহারা হলো। দেশের সূর্য সন্তানদেরকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হলো ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর তারিখে। হত্যা করা হলো রুমির মত আরো নাম না জানা অসংখ্য মেধাবী ছাত্রকে। জাতিকে করা হলো মেধাশূন্য।! এসব কাজে সহায়তা করল এ দেশীয় কিছু পাকিস্তানী দোসর। এ ক্ষেত্রেও তাদের ক্ষমতার লোভ ছিল। যাই হোক, সবকিছু হারিয়ে বাঙালি জাতির প্রাণে এবার এই ভেবে আশার সঞ্চার হলো যে এবার তো শাসনভার নিজেদের হাতে! অতএব, অন্যরা আর শোষণ করতে পারবে না। কিন্তু বিধিবাম! বাঙালির কপালে সে সুখ বেশিদিন সইলো না।

যে মানুষটা স্বাধীনতা যুদ্ধে অনন্য অবদান রেখেছিল, তাকে স্বাধীনতার মাত্র ৪ বছরের মাথায় সপরিবারে হত্যা করা হলো। আরো আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, যারা হত্যাকাণ্ড ঘটাল, তাদেরকে পদোন্নতি দিয়ে বিদেশ পাঠিয়ে দেয়া হলো শাস্তির পরিবর্তে। এরপর এলো সামরিক শাসন। মোটামুটিভাবে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম ছিল এ দেশে। পরবর্তীতে আন্দোলন করে দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করা হয়। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও অনেকে প্রাণ দিলেন। বুকেপিঠে “স্বৈরাচার নিপাত যাক,/গণতন্ত্র মুক্তি পাক!” শ্লোগান লিখে মিছিলে গেলেন নূর হোসেন। পেশায় ছিলেন রাজমিস্ত্রি। তিনি আর ফিরলেন না।পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারালেন।

এরপরের ইতিহাস আরো করুণ। এ ইতিহাস মোটামুটি সকলেরই কম-বেশি জানা আছে। এরপরের ইতিহাস কেবল এ দেশের রাজনৈতিক নেতাদের পকেট ভারী করার ইতিহাস। এরপরের ইতিহাস কেবল স্বাধীনতার ঘোষক কে? তা নিয়ে দুই দলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করার ইতিহাস। এরপরের ইতিহাস বিপক্ষ দলকে আক্রমণ করার ইতিহাস। এরপরের ইতিহাস ক্ষমতার লোভে স্বজাতিকে নির্মমভাবে হত্যার ইতিহাস। এরপরের ইতিহাস দেশের প্রতিটি সেক্টরে দুর্নীতি করে দুর্নীতিতে টানা ৫ পাঁচবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হবার ইতিহাস। এরপরের ইতিহাস বিপক্ষ দলকে “মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী” বলে গালি দেয়ার ইতিহাস। এরপরের ইতিহাস স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডারকে মুক্তিযোদ্ধা প্রমাণের চ্যালেঞ্জ করবার ইতিহাস।

ইহাই কি তবে স্বাধীনতা?  নাকি স্বাধীনতার স্বরূপ? আমরা কি তবে এই স্বাধীনতা চেয়েছিলাম!!!???

***বি:দ্র: কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল/গোষ্ঠী/ব্যক্তিকে এখানে আলাদাভাবে প্রশংসা বা সমালোচনা করা হয়নি।এখানে শুধু বাস্তবতাকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!