আমি বিজয় দেখেছি: এম আর আখতার মুকুল

Reading Time: 2 minutes

বাংলাদেশ পাঠ উৎসব- এ অংশ নেওয়া কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাফসা জাহানের রিভিয়্যু।

বইয়ের নাম: আমি বিজয় দেখেছি
লেখক: এম আর আখতার মুকুল

‘আমি বিজয় দেখেছি’ মূলত লেখকের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক আত্মজীবনী মূলক বই। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম স্থপতি এবং প্রতিদিন যুদ্ধকালীন অবস্থা পরিদর্শন শেষে একই সঙ্গে লেখক, কথক ও ভাষ্যকার হিসেবে বেতারে সাড়াজাগানো “চরমপত্র” অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন। মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে এম আর আখতার মুকুল ছিলেন প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের তথ্য ও প্রচার দপ্তরের পরিচালক। সেই সুবাদে মুজিবনগর কে দেখেছিলেন অনেকটা কাছ থেকে।

বইটি যদিও ‘৭১ এর মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে লেখা, কাহিনী পরিক্রমায় এই বইয়ে উঠে এসেছে আওয়ামীলীগের উত্থান ও পতন, ‘৬২ এর ছাত্র আন্দোলন, ‘৬৬ এর ছয়দফা, আগরতলা মামলা, অসহযোগ আন্দোলন, বামপন্থী বিভিন্ন দলের উত্থান ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের ভূমিকা। অত্যন্ত নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে লেখক তুলে ধরেছেন তৎকালীন সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মুক্তিযুদ্ধ কালীন ঘটনাপুঞ্জির প্রাঞ্জল বর্ণনা।

আমরা জানি যে মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশরক্ষার জন্য সকলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছিল। আসলে এর বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যেও ছিল একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পূর্ণ মনোভাব। এমনকি একজন আরেকজনকে হত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করেছিল। তাজউদ্দীন আহমেদ ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি শাণিত তরবারির মত। কিন্তু পরবর্তীতে বিশেষ বিশেষ মহলের কারসাজিতে শেখ মুজিব ও তাজউদ্দীন এই দুই অভিন্ন হৃদয়ের মধ্যে অবিশ্বাস ও সন্দেহের সূচনা হয়। সৃষ্টি হল দুজনের মধ্যে মতানৈক্য।

মার্ক্সীয় দর্শনের প্রবক্তা কার্ল মার্ক্স বিশ্বের সমস্ত দেশের মধ্যবিত্তদের ভূমিকা সম্পর্কে চমৎকার বিশ্লেষণ করে গেছেন। তিনি বলেছেন, সামন্তবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের শাসন শোষণের বিরুদ্ধে মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী শ্রেণী প্রতিটি দেশে যুগে যুগে সোচ্চার হয়েছে কিন্ত যেই মুহূর্তে রক্তাক্ত সংগ্রামের সূচনা হয়, বুদ্ধিজীবী শ্রেণী হয় সযত্নে দূরে সরে গেছে না হয় বিরোধিতার জন্য প্রতিক্রিয়াশীল মহলের সহযোগিতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। ‘৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় কার্ল মার্ক্সের ভবিষ্যদ্বানীর বাস্তব রূপায়ন আমরা দেখতে পাই। প্রায় দুই যুগ ধরে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীরা উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখর থাকা সত্ত্বেও ‘৭১ রক্তাক্ত যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তাদের বিরাট অংশ সযত্নে দূরে সরে গেল।

আঞ্চলিক ভাষা আর ক্ষুরধার লেখনির মাধ্যমে যুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাস উৎসাহ যুগিয়েছিলেন এম আর আখতার মুকুল এবং তাঁর অস্ত্র ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের “চরমপত্র” অনুষ্ঠান। তৎকালীন সময়ে কিছু দেশদ্রোহী ছাড়া সবাই যুদ্ধ করেছিলেন, একেক জন একেক ভাবে। কেউ অস্ত্র দিয়ে, কেউ কলম হাতে, কেউ মাইক্রোফোন নিয়ে আবার কেউ শব্দসৈনিক হয়ে। সকলে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। সবশেষে কবি আসাদ চৌধুরীর ভাষায় বলতে চাই-

দশ লক্ষ মৃতদেহ থেকে
দূর্গন্ধের দুর্বোধ জবাব জবাব শিখে রিপোর্ট লিখেছি-
পড় পাঠ কর
কুড়ি লক্ষ আহতের আর্তনাদ থেকে ঘৃণাকে জেনেছি
পড়, পাঠ কর
চল্লিশ হাজার ধর্ষিতা নারীর কাছে
সারসের সবক নিয়েছি-
পড়, পাঠ কর
পৃথিবীর ইতিহাস থেকে কলংকিত পৃষ্ঠাগুলো রেখে চলে আসি
ক্যানাডার বিশাল মিছিলে স্লোগান শোনাতে
মানুষের জয় হোক
অসত্যের পরাজয়ে খুশি হোক বিশ্বের বিবেক,
পলাতক শান্তি যেন ফিরে আসে
আহত বাংলার প্রতি ঘরে ঘরে।

১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে পঠিত কবি আসাদ চৌধুরীর “রিপোর্ট ১৯৭১” কবিতার অংশবিশেষ।

এম আর আখতার মুকুলের “আমি বিজয় দেখেছি” বইতে মনোযোগী পাঠকের জন্য রয়েছে একটি অসাধারণ বিজয় উল্লাস। এছাড়াও আছে লেখকের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কে দেখা এবং জানার সুযোগ।

লেখিকা:

Hafsa Jahan
Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!