ইতিহাস যাকে মনে রাখেনি

Reading Time: 2 minutes

কথায় আছে, সময়ের পরিক্রমায় মানুষ হারিয়ে গেলে তাকে জগতের কেউ আর মনে রাখে না। বিজয়ের মাসে আজ এমন এক হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা আপনাদের সামনে তুলে ধরবো। লোকটির নাম শহীদ খবিরুজ্জামান (কবির)। ১৯৭১ সালে সংঘটিত মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখবার জন্য যে ১৭৫ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত করা হয়, তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। আরো স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, মরণোত্তর যে ৮২ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে বীর উত্তম খেতাব প্রদান করা হয়, তিনি তাদের-ই একজন।

শহীদ খবিরুজ্জামান ১৯৫১ সালে তৎকালীন ফরিদপুর জেলার পাংশা থানায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস বর্তমান রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের কাজীপাড়া গ্রামে। তার পিতার নাম আবদুল জব্বার মৃধা ও মাতার নাম সুফিয়া খাতুন। তারা মোট চার ভাই ও তিন বোন ছিলেন। 

১৯৭১ সালে খবিরুজ্জামান পাকিস্তান নৌবাহিনীতে যোগ দিয়ে নৌকমান্ডোর প্রশিক্ষণ নেন। দেশব্যাপী যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলে তিনি দেশমাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে অংশ নেন। প্রথমে তিনি চট্টগ্রামের এক অপারেশনে অংশ নেন। পরবর্তীতে তিনি খুলনার চালনা বন্দরে এগারো নম্বর সেক্টরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের প্রথম দিক। চারিদিকে যুদ্ধের ডামাডোল বাজছে। খবিরুজ্জামান সহ তিনজন নৌ কমান্ডো গেরিলা প্রশিক্ষণ শেষে ভারত থেকে রওনা হলেন মাদারীপুরের উদ্দেশে। লক্ষ্য টেকেরহাট ফেরিঘাটে আক্রমণ। নিরাপত্তাজনিত কারণে দিনের তুলনায় রাতে চলাফেরা করাই তাদের পক্ষে নিরাপদ ব্যাপার। এর পাশাপাশি মাদারীপুরের পথঘাট-ও তাদের কাছে অচেনা। ফলে ঝুঁকি রয়েই যায়। যাই হোক, সাত দিন টানা কষ্ট সহ্য করে যুদ্ধাস্ত্র ও মাইনসহ তারা মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার এক গোপন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে গিয়ে হাজির হলেন। সেখানকার পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে তারা সকলে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, অক্টোবর মাসের শেষ দিকে টেকেরহাট ফেরিঘাটে আক্রমণ চালাবেন। এ সময় মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারটি দেখভাল করবে।

নির্ধারিত দিনে খবিরুজ্জামান সহ বাকি দুই নৌ কমান্ডো পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী মাইন বুকে বেঁধে এগিয়ে যেতে লাগলেন। কিন্তু তাদের রেকিতে ভুল ছিল। এ কারণে খবিরুজ্জামান তার টার্গেট টহলবোট খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এ সময় তিনি পানি থেকে মাথা উঁচু করে তা খুঁজতে থাকলে পাক হানাদার বাহিনী তাকে দেখে ফেলে। মুক্তিযোদ্ধারা এ অপারেশনে ভুল করলেও পাকবাহিনী কোনো ভুল করতে রাজি ছিল না।তাকে দেখামাত্র পাকিস্তানী সেনারা তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করলে খবিরুজ্জামানের মাথা ও দেহ ঝাঁঝরা হয়ে যায়। দেশের স্বাধীনতা আদায়ের সে লড়াইয়ে শহীদ হন খবিরুজ্জামান। তিনি শহীদ হলেও বাকি দুই কমান্ডো নিজেদের উপরে অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করায় সে অপারেশন সফল হয়েছিল। তাদের লাগানো মাইনে টেকেরহাট ফেরিঘাট সেদিন সম্পূর্ণভাবে ডুবে গিয়েছিল।

এ ঘটনার তিন দিন তার সহযোদ্ধারা জানতে পারেন, টেকেরহাট থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরবর্তী এক স্থানে নদীতে খবিরুজ্জামানের লাশ ভাসছে। তখন তারা সেখানে গিয়ে লাশ শনাক্ত করলেও পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ভয়ে লাশ দাফন করতে পারেন নি। তৎক্ষণাৎ তারা ডুবুরির পোশাক খুলে খবিরুজ্জামানের লাশ কুমার নদীতে ভাসিয়ে দেন।

মুক্তিযুদ্ধে এমন সাহসী ভূমিকা প্রদর্শনের জন্য বাংলাদেশ সরকার শহীদ খবিরুজ্জামানকে মরণোত্তর বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করে। তার সম্মানে স্বাধীনতা উত্তর কালে বাহাদুরপুর হাই স্কুলকে তার নামে নামকরণ করা হয়। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, এই একটি স্থাপনা ছাড়া তার নামে আর কোথাও কোনো কিছুর নামকরণ করার কথা জানা যায়নি। এমনকি তার নিজের জেলাতেও তার নামে কোনো স্থাপনা স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও গড়ে ওঠেনি। জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে কেউই এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেননি। এমনকি, জেলার বরেণ্য ব্যক্তিদের তালিকায় আজ পর্যন্ত তার নাম আজ পর্যন্ত কোথাও চোখে পড়েনি আমার। নিজের জীবনের বিনিময়ে যে বাঙালি জাতিকে তিনি সহস্রাধিক বছরের আরাধ্য স্বাধীনতার স্বাদ এনে দিলেন, সে জাতি আজ তাকে ভুলতে বসেছে। এভাবে চলতে থাকলে সেদিন বুঝি আর খুব বেশি দেরি নেই, যেদিন খোদ রাজবাড়ী জেলার মানুষ-ই তাকে আর চিনবে না। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ এ অসম সাহসী বীরের স্মৃতি রক্ষার্থে কোনো উদ্যোগ নেয়া না হলে নতুন প্রজন্ম তাকে কী করে চিনবে? কী করে জানবে তার বীরত্বের কথা?

এ ব্যাপারে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সদয় দৃষ্টি ও সহায়তা কামনা করছি। আমার-আপনার সামান্য উদ্যোগ-ই পারে, কালের আবর্তে হারিয়ে ফেলতে বসা একজন রাষ্ট্রীয় খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মসহ অনাগত প্রজন্মের কাছে অমর করে রাখতে।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!