ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াৎ অনুবাদ বিত্তান্ত

Reading Time: 2 minutes

হোর্হে লুইস বোর্হেস ও কাজী নজরুল ইসলাম একই বছর জন্মগ্রহন করেন দুই ভিন্ন মহাদেশে। ১৮৯৯। একজন পরিণত বয়সে অন্ধ হয়া যান, আরেকজন অপরিণত বয়সে মূক হয়া উঠেন স্বেচ্ছায়(!)। তাদের লিটারেরি দুনিয়া কয়েক আলোকবর্ষ দূরে ছিলো, দেখা হওয়ার কোন চান্স ই ছিলোনা, তবে এক নক্ষত্রের আলো তাদের দুইজনের চক্ষেই আইসা পড়ছিলো এক সময়। ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াৎ। ওরিয়েন্টালিস্ট লিটারেচারের রমরমা সময় ছিলো উনবিংশ শতকে। এডওয়ার্ড ফিটযেরাল্ড প্রথম ১৮৫৯ এ অনুবাদ করেন ১০০টার মতন রুবাঈয়াতের। একই বছরে কিন্তু ডারউইনের ‘অরিজিন অফ স্পেশিজ” ও বাইর হয় এবং এই দুইটাই ইউরোপীয়ান আজিজ মার্কেটগুলাতে পোলাপাইন হাতে নিয়া ঘুইরা বেড়াইতো তখন। “তুমি কি রুবাইয়াৎ পড়েছো” ছাড়া তারা কথাই শুরু করতে পারতোনা। মরার আগে ফিটযেরাল্ড ১৮৯১ এ পঞ্চম সংস্করণ বাইর কইরা যান। এরাবিয়ান নাইটস আর রুবাইয়াত, এই দুইটা জিনিষ নিখিল ইউরোপীয় নয়াবুর্জোয়াদের খুব প্রিয় বই ছিলো, বিশেষ কইরা এরাবিয়ান নাইটস নিয়া একটা কথা চালু আছিলো যে, It is too delicate to be written in East. রুবাইয়াৎ তখন ছিলো In Thing. এখন যেমন কোলম্যান বার্কসের অনুবাদের রুমী। রুমী একটা সিগনেচারের মতন। ছবি আপ্লোড দেয়ার পর তাতে রুমির কোটেশন দেয়নাই, এইরকম ওয়ানাবি আপনি ফেইসবুকে পাবেননা। কাস্টমাইজড স্পিরিচুয়ালিটি পশ্চিমা ইন্টেলেকচুয়ালেরা কখনো ওমর থেইকা নেয়, রুমী থেইকা নেয়, সিদ্ধার্থ থেইকা নেয়, কিছু অল্প সময়ের লাইগা রবীন্দ্রনাথ থেইকা ও নিছে। আর একটু খাটোমাথার মানুষেরা নিছে দীপক চোপড়া ধরনের কারো থেইকা। একসময় থিয়োসফির খুব চল আছিলো, এখন চল এই রেডিমেইড স্পিরিচুয়ালিটির, আর গর্দভদের জন্য তো রইলোই মোটিভেশনাল স্পিকারেরা। তো, বোর্হেস ও ফিটযেরাল্ড পড়ছেন একসময়। ১৯৫১ সালে তিনি জোশ একটা লেখা লিখেন, The Enigma of Fitzgerald নামে। সেইখানে তিনি বলেন যে, খৈয়াম ও ফিটযেরাল্ড মিলে একব্যাক্তি হয়া উঠেন, তারপরে তারা এই অনুবাদটা করেন।

এইখানে খৈয়াম ও নাই, ফিটযেরালড ও নাই। খুব পোয়েটিকভাবে বলেন যে, খৈয়াম যেহেতু প্লটিনাসের মতন আত্মার অবিনশ্বরতায় বিশ্বাস করতেন, আমরা ধইরা নিতে পারি যে খৈয়ামের আত্মা ফিটযেরাল্ডে ভর কইরা এইটা লেখাইছে। কথা সত্য। ফিটযেরাল্ড ছিলেন নায়ক রাহুল রায়ের মতন ওয়ান বুক ওয়ান্ডার। তিনি যেইটা করেন, সেইটারে বলে Transcreation. নিজের মতন কইরা সংযোজন-বিয়োজন করেন। ধরেন, ফার্সিতে “পিরি” মানে বয়স বোঝায়, যুগ বোঝায়, বয়স্ক বোঝায়। ফিটযেরাল্ড পিরি’রে ভাবছেন পারি, আমরা যেইটাকে পরী বলি সেইটা।অনুবাদকেরা মূলত বিশ্বাসঘাতক, সবদেশে সবসময়। এইটাকে আমরা অনুবাদকের অভিশাপ বলতে পারি। এদিকে আমাদের হাবিলদার নজরুল ইসলাম সম্ভবত যখন পল্টনে আছিলেন, তখন তিনি ফার্সি শেখার সুযোগ পান। তার চাচা ফার্সি জানতেন কিন্তু সেই চাচার সাথে তার রিশতা ভালো আছিলোনা বিকজ নজরুল ওয়াজ এ ব্যাডএস। যুদ্ধ থেইকা ফেরত আসার সময়ে তার ঝোলাতে একটাই বই ছিলো, দিওয়ান ই হাফিজ, তার উদীয়মান ফার্সি প্রেমের স্মারক। তিরিশের দশকে তিনি রুবাইয়াৎ অনুবাদ করা শুরু করেন ফার্সি থেইকা এবং একটা সুন্দর কৈফিয়ত লেখেন, কেন তিনি এইটা লিখতেছেন ধরনের। সেইখানে তিনি যারা ফিটজেরাল্ডের হাতে ঝোল খাইয়া খৈয়ামরে “Epicurean” বলেন, তাদের উপর নাখোশ ভাব প্রকাশ করেন এবং কইতে চান যে, ওমর ছয়ঘরানার কবিতা লিখছেন, এর মাঝে একটা শুধু আছিলো “কুফরিয়া” ঘরানা, এইটাই ওমর না, ওমর এর চাইতে ও বেশী কিছু। ওমর সুফী মিস্টিক এবং শরাব-সাকী এইগুলান এলিগোরি।

মজার ব্যাপার হইলো, ওমর খৈয়াম যে কি ছিলেন, এইটা রহস্য। তিনি এস্ট্রোনমার ছিলেন ও ম্যাথমেটিশিয়ান ছিলেন নামকরা। কিন্তু তার সময়ের লোকেরা কেউ ই তারে বড়কবি হিসেবে গোনায় ধরেনাই। পরবর্তী সুফি কবিদের মাঝে তারে নিয়া রিজার্ভেশন ছিলো, যেমন শামস তাবরিজ। ইবনে সিনা, ফখর উদ্দিন আর রাজীর যে ঘরানা,খৈয়াম প্রবাবলি সেই ঘরানার লোক। কবিতা, তার ভোকেশন না, প্যাশন আছিলো এবং ইবনে আরাবীর মতন তার একধরনের ফ্লার্টেশন ছিলো প্যানথিজমের সহিত। খৈয়ামের কবিতায় যে বিষাদ ও self pity, সেইটার সাথে আইডেন্টিফাই করতে পারবেনা, এমন মানুষ কোনযুগেই ছিলোনা, থাকবেনা। হাবিলদার নজরুল ইসলামের চক্ষে ওমর “মডার্ণ” বলে প্রতিভাত। ইন্টারেস্টিং।

একই বছরে জন্ম এই দুই লোকের যখন দেখা হয় দুনিয়ার বাইরে, তারা কি নিয়া কথা বলে, ভাবি বিরলে।

পুরান বইয়ের দোকান থেইকা কিনছি,পকেটবুক সংস্করণ। বিলাতের নিউ সাউথগেট থেকে ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত এই সংস্করন। ৭৩ বছরের পুরনো ছাপা।

মডেলঃ কায়ান কাফকা রুপাই

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!