কারাগারের রোজনামচা : ব্যক্তি মুজিবের অন্তরঙ্গ পরিচয়

Reading Time: 4 minutes
“স্বাধীনতাকামী মানুষের পরিত্রাতা কে?
সাত কোটি বাঙ্গালীর ভাগ্য বিধাতা কে?
একটি সুরেতে কে দিয়েছে বেঁধে বাঙ্গালীর অন্তর?
সে তো শেখ মুজিব! ধন্য মুজিব!”
১৯৭১ সালে ওপার বাংলার প্রখ্যাত শিল্পী, লেখক ও  ছড়াকার লক্ষীকান্ত রায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এ গানটি গেয়েছিলেন। যার জন্ম না হলে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হতো না সেই ধন্য মুজিবের জন্মদিন ১৭ মার্চ। সেদিন টুঙ্গিপাড়ার নিভৃত এক পল্লীতে এমন একজনের জন্ম হয়েছিল, যার হাত ধরে বাঙালি জাতি দীর্ঘ সংগ্রামের পথপরিক্রমায় ২শ’ বছরের পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করেছিল; পেয়েছিল স্বাধীনতার স্বাদ, বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে এক স্বাধীন- সার্বভৌম ভূ-খণ্ডের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার। জাতির জনকের ৯৭ তম জন্মদিনে বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত হয় তার রচিত ২য় বই  কারাগারের রোজনামচা
অসমাপ্ত আত্মজীবনীর পর যে বইটি সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলেছে সেটি হল কারাগারের রোজনামচা। কত কণ্টকাকীর্ণ পথ, কত ষড়যন্ত্র, কত বিশ্বাসঘাতকতা, কত ব্যথা, কত বেদনা, কত রক্তক্ষরণ, কত ক্রান্তিকাল পাড়ি দিয়ে বঙ্গবন্ধু একটি দেশ, একটি জাতীয় পতাকা আমাদেরকে দিয়েছেন; তা অনুধাবন করা যায় তার লেখা কারাগারের রোজনামচা গ্রন্থটি পাঠ করলে। বাঙালির ভাগ্য উন্নয়নের জন্য তথা স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকারের জন্য নিজের জীবন-যৌবন উজাড় করে দিয়ে যে মহান আত্মত্যাগের পরিচয় তিনি দিয়েছেন, তাই এই গ্রন্থের পাতায়-পাতায় পরম মমতায় শব্দে-বাক্যে গ্রথিত আছে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর রাজনৈতিক জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাভোগ করেছেন। এর মধ্যে স্কুলের ছাত্র অবস্থায় ব্রিটিশ আমলে সাত দিন কারা ভোগ করেন। বাকি ৪ হাজার ৬৭৫ দিন তিনি কারাভোগ করেন পাকিস্তান সরকারের আমলে। ভাগ্য বিড়ম্বিত বাঙালি অনাহারে থাকে, বাংলার মানুষের মুখে হাসি নাই, পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর নির্মম নির্যাতন; সেই ক্রান্তিকালকে মোকাবেলা করে বাঙালির মুখে হাসি ফোটানোই ছিল তার একমাত্র ব্রত। তাইতো তিনি নিজের জন্মদিনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে বলেছেন: “আমি একজন মানুষ, আর আমার আবার জন্মদিবস!” (কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা: ২০৯ ; ১৭ই মার্চ ১৯৬৭, শুক্রবার)
১৯৬৬ সালে ৬ দফা দেবার পর বাঙালি জাতির মহানায়ক গ্রেফতার হন। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু কারান্তরীণ থাকেন। সেই সময়ে কারাগারে প্রতিদিন তিনি ডায়েরী লেখা শুরু করেন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ঘটনাবহুল জেল-জীবনচিত্র এ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। কারাগারের রোজনামচা- গ্রন্থটির নামকরণ করেছেন বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা। বইটির ভূমিকা লেখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভূমিকাতে তিনি ২৫ শে মার্চ কাল রাতের পর প্রথমবার খাতা উদ্ধার এবং ১৯৮১ সালে ২য় বার কিভাবে খাতা উদ্ধার করেন সে বিষয়টি লিখেছেন। প্রকাশের পর থেকে এখন পর্যন্ত বইটির ৭০ হাজার কপি বিক্রি হয়েছে।
১৯৬৬ সালের বিখ্যাত থালা বাটি কম্বল জেলখানার সম্বল এই লেখার (গানের) মধ্য দিয়ে কারাগারের রোজনামচা পড়ার সময় জেলখানা সম্পর্কে পাঠকের একটা ধারণা হবে। আর এই লেখা থেকে জেলের জীবনযাপন এবং কয়েদিদের অনেক অজানা কথা, অপরাধীদের কথা, কেন তারা এই অপরাধ জগতে পা দিয়েছিল সেসব কথা জানা যাবে। জেলখানায় সেই যুগে অনেক শব্দ ব্যবহার হতো। এখন অবশ্য সেসব অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। তারপরও মানুষ জানতে পারবে বহু অজানা কাহিনি। অন্যদিকে ১৯৬৭ ও ৬৮ সালের রোজনামচায় পারিবারিক জীবন, দেশের জন্য আত্মত্যাগ, কাছের প্রিয়জনরা  কিভাবে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে সেসব বিষয় লিখেন। সমাজের উচুস্তরের মানুষের নিচতলার মানুষকে শোষন করার মানসিকতা কিভাবে একজন সাধারন মানুষকে চোরে পরিনত করে সে বিষয়টিও বাদ যায়নি তার লেখায়।
নিচে কারাগারের রোজনামচা থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ন উদ্ধৃতি তুলে ধরা হলো:
দেশ ও জনগণের প্রয়োজনে রাজনীতি; সেই রাজনীতিতে দ্বিচারিতা ও কপটতা চলে না। ব্যক্তি স্বার্থের চেয়েও সেখানে দেশ ও জনগণের স্বার্থই বড়। বঙ্গবন্ধু দেশ ও জনগণের স্বার্থেই রাজনীতি করেছেন। তিনি বলেন, “রাজনীতি করতে হলে নীতি থাকতে হয়। সত্য কথা বলার সাহস থাকতে হয়। বুকে আর মুখে আলাদা না হওয়াই উচিত” (পৃষ্ঠা: ৫৭-৫৮, ২রা জুন ১৯৬৬, বৃহস্পতিবার)। বাঙালি চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বাঙালিকে যেমন বীরের জাত বলেছেন, ঠিক তেমনি বাঙালি যে পরশ্রীকাতর সেটিও বলতে ভুলেননি। বাঙালিরা অন্যের দুঃখে ব্যথিত হয়, আবার এই বাঙালিই যে অন্যের ভালো দেখতে পারে না, সেটিও উল্লেখ করেছেন তাঁর দিনলিপিতে।  তিনি লিখেছেন “এই সুজলা-সুফলা বাংলাদেশ এতো উর্বর; এখানে যেমন সোনার ফসল হয়, আবার পরগাছা আর আগাছাও বেশি জন্মে। জানি না বিশ্বাসঘাতকদের হাত থেকে এই সোনার দেশকে বাঁচানো যাবে কিনা!” ( পৃষ্ঠা: ১১১-১১২, ২০শে জুন ১৯৬৬, সোমবার)। একদিকে ‘৬৬ সালের ভয়াবহ বন্যার ফলে জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী। অন্যদিকে ৬ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে আওয়ামীলীগসহ সারাদেশের মানুষ সোচ্চার, তখন চলছে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর নির্মম নির্যাতন। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ কেউই রক্ষা পাচ্ছে না পাকবাহিনীর হাত থেকে। জাতির সেই সংকট কালে কিছু মানুষকে বঙ্গবন্ধু দেখেছেন বাঙালি জাতির সাথে বেঈমানি করতে। যাদেরকে বঙ্গবন্ধু ‘আগাছা- পরগাছার’ সাথে তুলনা করে লিখেছেন,  “বাজে গাছগুলো আমি নিজেই তুলে ফেলি। আগাছাগুলিকে আমার বড় ভয়, এগুলি না তুললে আসল গাছগুলি ধ্বংস হয়ে যাবে। …আজ বিকেলে অনেকগুলি তুললাম” (পৃষ্ঠা: ১১৭, ২৩ জুন ১৯৬৬, বৃহস্পতিবার)
বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব যখন জেলগেটে বঙ্গবন্ধুকে দেখতে আসতেন, তখন একটু বেশি করে বিভিন্ন পদের খাবার বঙ্গবন্ধুর জন্য নিয়ে আসতেন। বঙ্গবন্ধু সেই খাবার শুধু নিজেই খেতেন না, অন্যান্য কয়েদীদেরকে সেসব খাবার বণ্টন করে দিতেন। তিনি সারা জীবন মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখেছেন। মাঝে মাঝে তিনি নিজে না খেয়েও অন্য কয়েদিদের নিজের খাবার খেতে দিয়েছেন। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর শাসন আমলে ধনী-গরীবের ব্যবধান এত চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল তা বঙ্গবন্ধু তার লেখায় উল্লেখ করেছেন: “আমি যাহা খাই ওদের না দিয়ে খাই না। আমার বাড়িতেও একই নিয়ম” (পৃষ্ঠা: ১৮৯, ৪ঠা আগস্ট ১৯৬৬, বৃহস্পতিবার)
এই মহান নেতা যিনি তার পরিবার পরিজন ত্যাগ করেছেন দেশবাসীর জন্য তাকেও মানুষ চোর অববাদ দিতে ভুল করে নি।  তিনি আক্ষেপ করে লিখেন, “এই তো দুনিয়া! জনাব সোহরাওয়ার্দীকে ‘চোর’ বলেছে, হক সাহেবকে ‘চোর’ বলেছে, নেতাজি সুভাষ বসুকে, দেশবন্ধু ‘চিত্তরঞ্জন’কে এই বাঙালিরাই ‘চোর’ বলেছে, দুঃখ করার কি আছে!(পৃষ্ঠা: ১৮৮-১৮৯)
কারাগারে বঙ্গবন্ধুর অবসর কাটত বই পড়ে আর প্রকৃতিকে ভালোবেসে। চমৎকার ভাবে তিনি তার বাগানের বর্ণনা, মুরগির বর্ণনা যেমন লিখেছেন তেমনি তুলে ধরেছেন জুলম-নির্যাতনের পাশাপাশি ৬-দফার আন্দোলনের বিকল্প হিসেবে বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহের সমন্বয়ে সর্বদলীয় ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা হয় সে বিষয়টিও ।
আত্মজীবনী লেখা কঠিন কারন সেখানে যেমন নিজের প্রশংসা করলে পাঠক নিবে না ঠিক তেমনি কেউ নিজের ভুলগুলোও লিখতে চান না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সব কিছুর  ঊর্ধ্বে জেলখানায় তার চারপাশের মানুষদের সম্পর্কে লিখেছেন। তাকে কিভাবে জেলখানায় বন্দী করে নির্যাতন করেছে সে বিষয়টি যেমন লিখেছেন, তেমনি একে ফজলুল হক,  মানিক মিয়া সহ দেশপ্রেমি নেতাদের সম্পর্কে লিখেছেন। হাস্যরস,  সাহিত্যগুন কি নেই বইটিতে! মোট কথা ব্যক্তি মুজির অন্তরঙ্গ পরিচয় মিলে এই কারাগারের রোজনামচা বইটিতে।
Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!