কারো অধিকার না করি খর্ব, সম অধিকার সকলের প্রাপ্য

Reading Time: 4 minutes

আমাদের পৃথিবীটা যে এত সুন্দর, তার কারণ হচ্ছে পৃথিবী বৈচিত্র্যময়। আর বৈচিত্র্যময় এই ধরণী সবচেয়ে আকর্ষণীয় হয় তখনি, যখন স্বর্গীয় ফুলের মত পবিত্র আর নিষ্পাপ শিশুদের আগমন ঘটে। তবে এ কথা নির্মম সত্য হলেও বলতে হয় যে, আমাদের সমাজে প্রতিটি শিশু আন্তরিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। এদের অনেকের পরিচয় পর্বে বিশেষণ যোগ করা হয় ( যেমন: বুদ্ধি প্রতিবন্ধী,শারীরিক প্রতিবন্ধী,বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক)। আবার অনেকেই পাগল,কানা,বোবা প্রভৃতি শব্দ জুড়ে দেয়, যা একটি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। সেই সাথে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর এবং তাদের অভিভাবকদের মানসিক পীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সমাজের মানুষ প্রতিনিয়ত এই বিশেষ শিশুদের এবং তাদের বাবা-মা কে ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ করতে পিছপা হয় না। অনেক সময় বিশেষ শিশু জন্ম নেওয়াতে সকল দোষ যেন ওই শিশুর মায়ের একার! এই রেশ ধরে দাম্পত্য জীবনে কলহ দেখা দেয়। কখনো বা শিশুটির বাবা অন্যত্র বিয়ে করে নিজ বংশ রক্ষায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে, এই শিশুদের জীবনটা রঙিন রঙে উদ্ভাসিত হবার অনেক আগেই ধূসর আর নিকষ কালো অন্ধকারে ডুবে যায়। কেউ কেউ বদ্ধ ঘরের এককোণে শেকলবদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকে; আবার কেউ বা ঘরের জানালার গ্রীল ধরে বাইরের জগতের আলোর মিছিলে চোখ মেলাতে ব্যস্ত।

এই যুগে আমরা যখন অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি সৃষ্টিতে, পৃথিবী ছাড়িয়ে সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহ আবিষ্কারে, তথ্য ও উপাত্ত নিয়ে চিন্তায় মগ্ন, মরণঘাতী ক্যান্সার নিরাময়ে যখন চিকিৎসা পদ্ধতি উন্নতের শিখরে পৌঁছাতে ব্যস্ত, সাধারণ মানুষ জ্ঞান অর্জনে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি দিতে সবর্দা প্রস্তুত সেখানে আমরা এই শিশু ও ব্যক্তিদের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য প্রাপ্য অধিকার, সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, উপযুক্ত পরিবেশ দিতে নিস্পৃহ ভাব দেখাই। অনেকেই সহযোগিতা সম্পন্ন মনোভাব নিয়ে পাশে দাঁড়ান। আবার অনেকেই লেখনী ধারণ করেন, যাতে লেখা স্বরূপ হিসেবে থাকে যেমন: তাদেরকে ভালোবাসতে হবে, কাছে টেনে নিতে হবে, অধিকার দিতে হবে।

এই চিত্র বা লেখনীর মাধ্যমে আজকের দিনে যে বিষয়গুলো চিন্তার উদ্রেক ঘটায়, তা হল:

১. বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে ২০১৩ সালে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করে, যা ২০১৫ সালে গেজেট আকারে প্রকাশ পায়। বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, অধিকার আইনে প্রনীত আছে তা আমরা কেন এখনও বাস্তবে প্রয়োগ করার চেষ্টা করি না?
২. তাহলে এখনও কি আমরা তাদেরকে একজন সাধারণ মানুষ ভাবতে পারি নি?
৩. তারা কোনো বিক্ষিপ্ত জনগোষ্ঠী নয়— এই যুগে এসেও এ ভাবনা ধারণ করতে পারি নি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কিছু নির্ধারিত উত্তর পাওয়া যায়। যেমন: অজ্ঞতা, সচেতনতার অভাব,শিক্ষার অভাব।

আমাদের দেশ যেহেতু একটি উন্নয়নশীল দেশ, সেহেতু নিরক্ষতা, দারিদ্র্যতা, সুশিক্ষার অভাব বিদ্যমান। এত প্রতিকূলতা ছাপিয়ে প্রতিটি মানুষের দ্বার প্রান্তে গিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর অন্যতম মাধ্যম হল মিডিয়া (গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম)। মিডিয়াই পারে সমাজের সকলের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে। মিডিয়ায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা বিধিমালার ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞাপন, প্রামাণ্যচিত্র, সিনেমা, নাটক, স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা, বেতার ও টেলিভিশনে নানা কর্মসূচি তৈরি করা দরকার। এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের নিয়ে লেখালেখি, ভিডিও শেয়ার করা, সচেতনমূলক ও অনুপ্রেরণামূলক বিষয় তুলে ধরাও অত্যন্ত জরুরি। মিডিয়াকে সবসময় তাদের সক্ষমতার বিষয় তুলে ধরতে হবে, যাতে সকলেই বুঝতে পারে যে, আর দশজন স্বাভাবিক মানুষের মতো তারাও পারে। আমাদের সমাজের প্রতিটা সদস্য যেন বুঝতে পারে যে, তাদের সীমাবদ্ধতা থাকার পরেও পারিবারিক যত্ন, চিকিৎসা (উপযোগী থেরাপি), শিক্ষার সুযোগ, একীভূত শিক্ষার অন্তর্ভূক্তকরণ, সমাজের সকলের সহযোগিতা ও ভালবাসার মাধ্যমে স্বাভাবিক বিকাশ লাভ করতে পারে।

মিডিয়াকে সচেতনতার চাবিকাঠি হিসেবে চিহ্নিত করার কারণ হলো সাধারণ মানুষ খুব সহজেই মিডিয়ার মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে পড়ে। তার ছোট্ট একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ “মীনা” কার্টুন, যার মাধ্যমে শিশু থেকে বয়ঃপ্রাপ্ত সকলেই নারী শিক্ষার গুরুত্ব, বাল্যবিবাহ রোধ করা, যৌতুক প্রথার কুফল সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত হয়েছিল। এছাড়া বাল্যবিবাহ বন্ধ ও যৌতুক প্রথার শাস্তি, নারী নির্যাতনের শাস্তি, এসিড নিক্ষেপের ফলে ভুক্তভোগীর প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে তাৎক্ষণিক কী করনীয় এবং নিক্ষেপকারীর কী কী শাস্তি হতে পারে তা মিডিয়ার প্রচারের মাধ্যমে সকল স্তরের মানুষ জানতে পেরেছে ও সচেতন হয়েছে।

২০১৮ সালের ২ এপ্রিল তারিখে একাদশ তম বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সরকারের তাৎকালীন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী জনাব রাশেদ খান মেনন বলেন, “আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী সংখ্যা ১৫ লাখ ৫৮ হাজার ৫৪৩ জন।” এই বড় অংকের সংখ্যার মানুষদের প্রাপ্য অধিকার ও সুবিধা বঞ্চিত করলে কখনো কোন সমাজ বা দেশ উন্নয়নের দিকে ধাবিত হতে পারবে না। তবে, এই অবহেলা, অধিকার না দেওয়া, সুযোগ করে না দেওয়ার নজির আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়। অন্যদিকে বিদেশে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, যার ফলে তারা এগিয়ে যাচ্ছে।
উদাহরণ:
১.টেম্পল গ্র্যান্ডিন: তিনি অটিজম আক্রান্ত নারী,পশুপালনে ডক্টরেট অর্জন করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন, তৈরি করেছেন “Squeeze machine” নামে একটি যন্ত্র।এই যন্ত্রটির বৈশিষ্ট্য হল এটি স্বনিয়ন্ত্রিতভাবে চাপ তৈরি করতে পারে যা তার আরামদায়ক শিথিলায়নে সাহায্য করত।
২. হেলেন কেলার: (বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী) তিনি ছিলেন বিশ্বখ্যাত লেখিকা। আজীবন তিনি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অধিকারের জন্য লড়াই করেছেন। তাঁর রচিত বইয়ের সংখ্যা ১২ টি এর মধ্যে প্রধান বই “স্টোরি অফ মাই লাইফ” এছাড়াও লেট আস হ্যাভ ফেইথ,দি ওয়ার্ল্ড আই লিভ ইন (১৯০৮),ওপেন ডোর প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। তিনি একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন (Deliverance-1919)।এটি মূলত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনের ওপর নির্মিত।
৩.লুই ব্রেইল: (দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী) তিনি দৃষ্টিহীন লোকদের শিক্ষা দানের জন্য ব্রেইল পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। যার ফলে তারা উপকৃত হয়েছেন এবং এটি এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে।
৪.ভিনসেন্ট ভ্যান গগ: (মানসিক সমস্যা) তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী। তাঁর অন্যতম সৃষ্টি ” ওয়াইল্ড বিটেন দ্য ট্রি”(১৮৮৩)। এছাড়া উল্লেখযোগ্য আত্মপ্রতিকৃতি হল:
১. স্ট্র হ্যাটওয়ালা আত্মপ্রতিকৃতি (১৮৮৭/৮৮)
২. শুশ্রূমুণ্ডিত আত্মপ্রতিকৃতি (১৮৮৯)

এমন অনেক ব্যক্তিবর্গ আছেন যারা তাদের সীমাবদ্ধতাকে পরাজিত করে সাফল্যমণ্ডিত হয়েছেন। এর কারণ তারা পেয়েছেন উপযুক্ত পরিবেশ,শিক্ষার সুযোগ, বিকশিত হওয়ার অনুপ্রেরণা। এদিক থেকে আমাদের দেশের চিত্র ঠিক বিপরীতধর্মী। তবে আজকের দিনে প্রতিটি মানুষের জানা উচিত বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন মানুষ শুধু নিতে জানে না, তারাও সুশিক্ষায় শিক্ষিত হলে দেশ ও জাতির কল্যাণে অবদান রাখতে সম্ভব হবে।
উদাহরণ: ৩৪ তম বিসিএসে মাহবুবুর রহমান (দৃষ্টি প্রতিবন্ধী) যিনি শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। শিউলি আক্তার সাথী (বুদ্ধি প্রতিবন্ধী) একজন সফল অ্যাথলেট।এছাড়া টেবিল টেনিসে গোল্ড মেডেল প্রাপ্ত, নিপা বোস যার অগনিত গোল্ড মেডেল রয়েছে।

এই থেকে প্রমাণ হয় তারাও পারে বরং ভালোভাবে পারে।
আমরা মানুষ। মানুষ হয়ে কেন আমরা অন্যের প্রাপ্য অধিকার খর্ব করি?
আসুন আজ থেকে আমরা তাদের না করি অবহেলা
দেব অফুরন্ত ভালোবাসা
মনুষ্যত্বের দ্বার দেব খুলে
মুক্তির আলো ছড়িয়ে পড়ুক তাদের চারপাশে

(বিভিন্ন সংবাদপত্র ও ইন্টারনেট অবলম্বনে এই লেখাটি লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী তন্বী আক্তার।)

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!