ক্লাসিক বুক ‘দ্য প্রফেট’

Reading Time: 4 minutes

ক্লাসিক বই ‘দ্যা প্রফেট’ এর লেখক কাহলিল জিবরান। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল জিবরান খলিল জিবরান বিন মিখাইল সাদ। তিনি ছিলেন একজন কবি, দার্শনিক, প্রাবন্ধিক,ঔপন্যাসিক, চিত্রশিল্পী। ১৮০৩ সালে লেবাননের ম্যারোনাইট খ্রিস্টান পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মূলত তিনি কবি হিসেবেই পরিচিত লাভ করেন। তাকে বলা হয় লেবাননের জাতীয় কবি। আমাদের কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন লেবানন বা সিরিয়াবাসীদের কাছে কাহলিল জিবরানও তেমন। আবার রবীন্দ্রনাথ যেমন কেবল আমাদের নন সমগ্র বিশ্বের, জিবরান ও তেমনি। তিনি একজন প্রথাবিরোধী লেখক ছিলেন। ধর্মীয় ভন্ডামি, কুসংস্কার এর বিরোধিতায় তিনি ছিলেন অপ্রতিরোদ্ধ।

তাঁর কবিতা যেন উঠে এসেছে পর্বতের উচ্চতা থেকে, সমুদ্রের নাভীমূল থেকে, কখনও দেবকণ্ঠ থেকে। তিনি তার কবিতায় তুলে ধরেছেন সুফিবাদ, দর্শন, আরব রোমান্টিক ও প্রতীকবাদী কবিদের প্রাচীন ঐতিহ্য। এক অনির্বচনীয় আনন্দ ও অভিজ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায় তার কাব্য গ্রন্থ গুলোতে। ‘দ্যা প্রফেট তেমনি একটা কবিতা গ্রন্থ। কিংবা বলা যায় অনেক গুলো কবিতা-ফুল দিয়ে গাঁথা মালার মতো একটি দীর্ঘ কবিতা গ্রন্থ। তবে এই কাব্য গ্রন্থটি মূলত উপদেশ মূলক একটি গ্রন্থ। যেখানে একজন প্রফেট বা প্রেরিত পুরুষ ওর্ফালিস নগরীতে দীর্ঘদিন প্রবাস জীবন শেষে তাঁর জন্মের দীপে ফিরে যাওয়ার আগে নগরীর মানুষদের বিভিন্ন উপদেশ দিয়েছিলেন, এই উপদেশ গুলোই স্থান পেয়েছে ‘দ্যা প্রফেটে’।

তবে ‘জীবন ও মৃত্যুর’ মধ্যস্থিত বিষয় সম্পর্কে সর্বরোগগ্রস্থ আত্মজ্ঞান সমবেত জ্ঞানার্তীদের উপদেশ দেন এবং এই প্রতিশ্রুতি দেন যে তারা যেন তা অন্তরে ধারণ করে এবং তার বিনাশ না করে। এই বিখ্যাত বইটি মূলত শুরু হয় সত্য বলা প্রফেট বা সন্তের ওরপেলিস নগরী থেকে বিদায়ের দিনে এবং শেষ হয় তাঁর নগরটি ছেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। এর মাঝেই তিনি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষদের নানা বিষয়ে তার ভাবনা ও চিন্তার ব্যাখ্যা জানান। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল- ধর্ম, মৃত্যু,ভালবাসা, বিবাহ, দান, সন্তান, গৃহ, অপরাধ ও শাস্তি, শিক্ষাদান , ক্রয়-বিক্রয়, আইন, যুক্তি ও আবেগ, বন্ধু, প্রার্থনা ইত্যাদি।

‘দ্যা প্রফেট’ বইটি এত জনপ্রিয় কেন তা নিয়ে নানা গুঞ্জন রয়েছে। তবে জিবরান বাইবেলের ভাষার ব্যঞ্জনায় আধুনিক মানুষের চিত্তের অসুখের নিরাময় করতে চেয়েছেন এই কাব্য গ্রন্থের মাধ্যমে। আধ্যাত্মিক চিন্তায় সমৃদ্ধ তার জগৎ ভাবনায় মানুষের নানা বিষয়ের সংকটের সমাধান রয়েছে। এসব সমাধান আসলে মানুষ নিজেই খুঁজে নিতে পারে। প্রফেট পড়ে একজন মানুষ নিজেই নিজেকে সাহায্য করতে পারবে। এই সাহায্য শুধু আত্মার এবং হৃদয়ের জাগরণে ভূমিকা রাখে। জনপ্রিয়কতার আরেকটি কারণের মধ্যে রয়েছে- মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন ভূগোল, জলবায়ু, নির্সগ, বৃক্ষ-প্রান্তর ইত্যাদির সুন্দর সাবলিল বর্ণণা। তার চেয়ে বড় কথা এর মধ্যে রয়েছে জীবনের ঘোর বাস্তব উপদেশ। যে গুলো একজন মানুষকে জীবনের চলার পথে প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে।

বাস্তব জীবনে দেখা যায় আমরা একটু নির্ভশীলতার সুযোগ পেলেই হাল ছেড়ে দেই। অন্যের উপর সঁপে দেই নিজের সবকিছু। তিনি যে বাস্তবাদী কবি ছিলেন তারই একটি প্রমাণ পাওয়া যায় নিচের উদ্ধৃতিতে। ‘বিবাহ’ নামক কবিতায় তিনি বলেন, ‘তোমরা তোমাদের হৃদয় বিনিময় করো কিন্তুু একে অপরের হাতে সপেঁ দিও না।’ প্রতিনিয়তই মানুষ একজনের দর্শন দ্বারা অন্য জনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। এমকি পরিবারও তার বাহিরে নয়। সন্তানদের তাঁর বাবা তাদের চিন্তা ভাবনা তাদের মধ্যে পোশ করিয়ে দিতে চান। কিন্তু জিবরান বলেছের ভিন্নকথা- ‘সন্তানদের তোমরা ভালবাসা দিতে পার কিন্তু তোমাদের ভাবনা তাদের দিতে পারো না। কারণ তাদেও নিজস্ব ভাবনা রয়েছে।’ দান কবিতায় তিনি ধন সম্পদ দানের চেয়ে নিজের আত্মাদান করাকে উত্তম দান বলেছেন। কারন মানুষ যখন ধন-সম্পদ গরীব দুস্থদের মাঝে দান করে সেটা আসলে মহত্ব অল্প সময় থাকে। কিন্তু একজন মানুষ যখন দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য নিজের জীবন দিয়ে দেন তখন তিনি চির ওমর হয়ে বেঁচে থাকেন। আর এই বেঁচে থাকাটাই আসলে প্রকৃত বাঁচা। তাইতো তিনি বলেছেন-‘তুমি যখন ধন সম্পদ দান করো সেই দান এক ক্ষুদ্রদান কিন্তু যখন আত্মদান করো সে দানই আসলে দান।’

কত আগেই জিবরান বাস্তব জীবনের কথা বলে গিয়েছেন। বর্তমান সময়ে দানের বিষয়টি হয়ে গেছে আত্ম প্রচারের মাধ্যম। সবাই আত্মপ্রচার চাই। আমি এটা, ওটা দান করছি সেটা মানুষ জানুক। আমার দানের বিষয়টি সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক, সবাই চাই। এই চাওয়া থেকে বিরত থাকতে বলেছেন কবি। কারন এরকম প্রত্যাশা দানকে কলুশিত করে। তিনি বলেন- ‘ যারা অন্তরের আত্মপ্রচারের উদ্দেশ্য নিয়ে দান করে তাদের গোপন বাসনা তাদের দানকে কলোসিত করে।’ আমরা কর্ম করতে চাইনা । কাজের প্রতি ভালবাসা নেই বললেই চলে। কিন্তু কর্মের সুফল ভোগ করতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকি। আবার আমরা জ্ঞান অর্জন করি কিন্তু তা বাস্তব জীবনে কাজে লাগাই না অর্থাৎ প্রায়োগিক দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে আছি আমরা। তাইতো তিনি বলেছেন, ‘জ্ঞান অর্জন করো এবং তার প্রয়োগ ঘটাও কারণ কর্মহীন যতজ্ঞান সকলই বৃথা।’

একজন মানুষ যে কাজই করুক না কেন, সে যেন তার কাজকে ভালোবেসে করে। তিনি বলেছেন, ‘ভালবেসে কাজ করাটা হচ্ছে তোমার হৃদয় থেকে সুতা বের করে কাপড় বোনা। যেন তোমার প্রিয়তমা পরবে সে কাপড়।’ কাজের প্রতি অবহেলা আমাদের রয়েছেই যার কারণে আমাদের কাজ শেষে ভাল ফলাফল পাইনা। তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেছেন- অযত্নে রুটি সেক দিলে সে রুটিতো পুড়বেই। মানুষ পোশাক পরে লজ্জা নিবারণ করার জন্য। কটু দৃষ্টি প্রতিহত করার জন্য। অশালীনতা থেকে বিরত থাকার জন্য। কিন্তুু মাঝে মাঝে রাস্তাঘাটে এর বিপরীত দৃশ্যও লক্ষ্য করা যায়। তিনি বলেছেন-‘পোশাক হচ্ছে অসচ্চরিত্র মানুষের দৃষ্টি প্রতিহত করার একমাত্র ঢাল।’

জিবরান তার প্রফেট কাব্য গ্রন্থে পুজিবাদেরও বিরোধিতা করেছেন। ব্যবসায়িরা যারা সস্তা দামে পণ্য ক্রয় করে চড়া দামে বিক্রি করে তাদের এসব থেকে বিরত তাকার আহ্বান করেছেন। তিনি ক্রয় বিক্রয়ের সুবিচার করার কথা বলেছেন। যদি না করা হয় তাহলে এক শেণীর মানুষ হবে লোভে উন্মত্ত এবং অন্যরা হবে অভুক্ত। বাস্ত জীবনে আমরা এখন তাই দেখতে পাচ্ছি। আইন ও বিচার ব্যবস্থা নিয়ে তিনি দারুণ কথা বলেছে। তিনি বলেছেন আইন যেন বালির স্মৃতি সৌধ না হয়ে যায়। যে আইন করা হবে সেটা হবে সবার জন্য সমান এবং প্রযোজ্য। সূর্যকে পেছনে ফিরে তাকালে যে ছায়া দেখা যায় তাই হচ্ছে আইন। প্রত্যেকটা মানুষের জীবনে যুক্তি এবং আবেগ থাকা দরকার। আবেগ দিয়ে যেন যুক্তিকে না ভাঙা হয় বরং যুক্তি দিয়ে আবেগকে নিয়ন্ত্রিত করতে হবে। কারণ আবেগ হচ্ছে একটি জাহাজের ‘পাল’ আর যুক্তি হচ্ছে জাহাজের ‘হাল’।

আবার আবেগ মানুষের হৃদয়ে অগ্নি শিখার মতো কাজ করে। তিনি বলেছেন, ‘আবেগ হচ্ছে এমন এক অগ্নিশিখা যে জ্বলে পুড়ে নিজেকে নিঃশেষ করে দেয়।’ বন্ধু নির্বাচনে নানা সময় আমরা ভুল করি। বন্ধু এমন মানুষকে নির্বাচন করতে হবে যাকে সব সময় পাশে পান। সেই তোমার বন্ধু যার কাছে তুমি গেলে শান্তি পাও। কবি কাহলিল এত চমৎকার চমৎকার কথা বলে গেছেন যে গুলো আমরা বাস্তব জীবনে কাজে লাগাতে পারি। উপকৃত হতে পারি আমি, আপনি, আমরা। কারণ এই কাব্য গ্রন্থের প্রত্যেকটি লাইনই মানব জীবনের কোন না কাজের সাথে জড়িত। আর এই সকল উপদেশ দিয়ে একজন মানুষ জীবনে উন্নতিসহ একজন মানুষ সত্যিকারের মানুষ হিসেবে নিজে আবিষ্কার করতে পারে। নির্বাসন দন্ডে দন্ডিত কবির খুব ইচ্ছা ছিল জীবিত অবস্তায় দেশে ফেরার। কিন্তু তিনি জীবিত অবস্থায় ফিরতে পারেননি। ১৯৩১ সালে ১০ এপ্রিল তার জীবনাবসান হয়। মৃত্যুর পরে তাকে দেশে আনা হয়। সেদিন বৈরুত সমুদ্র বন্দওে হাজার হাজার অশ্রুসিক্ত মানুষ তাকে বরণ করে নেয়। তিনি বীরের বেশে দেশে ফিরে এসছিলেন। তিনি তার সৃষ্টি কর্মের মধ্যে বেঁচে আছেন আমাদের মাঝে।

লেখক : শতাব্দী জুবায়ের

বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!