ক্ষীরু নদীর গল্প (৩য় পর্ব)

Reading Time: 3 minutes

নাজমুল ভাইয়ের বাড়ি থেকে বের হয়ে ওরা তিন জন পোড়াবাড়ী-আছিম সড়ক ধরে জংগলবাড়ী প্রাইমারী স্কুলের সামনে আসলো।

এই জায়গাটা ওদের অত্যন্ত পছন্দের একটি জায়গা। এখানে জংগলবাড়ী জামে মসজিদ, জংগলবাড়ী নূরাণী হাফিজিয়া মাদ্রাসা এবং জংগলবাড়ী প্রাইমারি স্কুল একসাথে অবস্থিত। এই গ্রাম, এমনকি এই অঞ্চলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাথে এই স্থানের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তাই, মোটামুটিভাবে এই স্থানটিকে জংগলবাড়ী গ্রামের প্রাণকেন্দ্র বলা যায়।

যাহোক, প্রাইমারি স্কুলের বারান্দায় বসে সাকিব বললো, “তোরা এখানে বস, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে।”

নকিব পুরনো অভ্যাসমত বলল, “আমারও….।”

রাকিব নকিবকে ধমক দিয়ে থামিয়ে সাকিবকে জিজ্ঞেস করল, “কি বুদ্ধি?”

সাকিব : আজ বিকেলের মধ্যে যেভাবেই হোক, আমাদেরকে একটা না একটা সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।

নকিব : কিন্তু, আমরা কি করবো?

রাকিব : তাই তো! তাছাড়া, নাজমুল ভাইকে ছাড়া..

সাকিব : নাজমুল ভাই তো বলেছেনই, আমাদের যেকোন প্রয়োজনে পাশে থাকবেন।

রাকিব : তো? কি করতে চাচ্ছিস? খুলে বল?

নকিব : হা হা হা, ‘খুলে’ বল সাকিব …

সাকিব : নকিব, তোর না সবকিছুতেই ফাজলামো। ধ্যাৎ!

নকিব : ঠিক আছে, ঠিক আছে। এই আমি কানে ধরলাম, আর ফাজলামো করব না।

সাকিব : আচ্ছা, শোন। চল, আমরা একটা আন্দোলন শুরু করি ক্ষীরু নদী রক্ষার জন্য।

রাকিব : গ্রেট আইডিয়া! আমি এটার নাম প্রস্তাব করছি “ক্ষীরু নদী রক্ষা আন্দোলন।”

নকিব : কি বলছিস তোরা? আন্দোলন? কার বিরুদ্ধে আন্দোলন?

সাকিব : কেন? প্রশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করব আমরা।

নকিব : বুঝলাম, কিন্তু, ক্ষীরু নদী রক্ষার জন্য আন্দোলন করতে হবে কেন? এটা তো অন্য উপায়েও করা যায়।

রাকিব : কিভাবে? তুই বল?

নকিব : শোন রাকিব, গ্রামের মানুষ আন্দোলন বুঝে না। তাঁরা ভাবে আন্দোলন মানেই মারামারি, খুনোখুনি। এরচেয়ে চল “ক্ষীরু নদী রক্ষা কমিটি” গঠন করে আগে নিজেরাই সমস্যার সমাধান করতে চেষ্টা করি। এতে করে গ্রামের লোকদের সহযোগিতা পাওয়া যাবে, কারণ, কমিটি মানেই ভাল কিছু -এটা তাদের ধারণা।

সাকিব : এই কথাটা অবশ্য মন্দ বলিস নি তুই।

রাকিব : তারমানে তুই নকিবের প্রস্তাব মেনে নিচ্ছিস?

সাকিব : মোটামুটি সেইরকমই বলতে পারিস। তোর কি মত?

রাকিব : তোরা যা ভাল বুঝবি, আমিও তাই করতে রাজি আছি।

নকিব : তাহলে তো হয়েই গেল। এখন কাজ শুরু করা যাক?

সাকিব : হুম, অবশ্যই।

রাকিব : আমার একটা প্রস্তাব আছে এ ব্যপারে। কমিটি গঠনের আগে গ্রামের সব ছেলেদের ডেকে আলাপ করে নিলে কেমন হয়?

নকিব : আমিও তাই ভাবছিলাম!

সাকিব : ঠিক আছে। চল তাহলে, সবাইকে ডেকে নিয়ে আসি।

রাকিব : কিন্তু, নাজমুল ভাইকে জানানো দরকার আগে।

সাকিব : না, আগে সবাইকে ডেকে আনি। তারপর নকিব গিয়ে নাজমুল ভাইকে খবর দিবে নাহয়?

রাকিব : তাই ভাল হবে। ঠিক আছে, চল।

সাকিব : বিকেল চারটার সময় এই মাঠেই আমরা সবাইকে নিয়ে মিলিত হব ,ঠিক আছে? চল সবাই।

বাচ্চা বাচ্চা তিনটি ছেলে লেগে পড়লো এক ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপট তৈরীতে। জংগলবাড়ী গ্রামের তিন অংশে তিনজন চলে গেল। রাকিব গেল পূর্বে, সাকিব দক্ষিণে আর নকিব পশ্চিমে। মধ্যভাগে তাদের সম্মেলন স্থল, জংগলবাড়ী প্রাইমারী স্কুলের মাঠে। ফলে, এদিকের ছেলেরা এমনিতেই খবর পেয়ে যাবে।

ওদের এমন পাগলামীর খবর পেয়েছে ক্ষীরু নদী। প্রাইমারী স্কুলের পেছনে যে পুকুরটা আছে, সেখানে মাছ শিকার করতে গিয়েছিল এক মাছরাঙা পাখি। গ্রামের তিনটি মানবসন্তান ক্ষীরু নদীকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠেছে, এই খবর ক্ষীরু নদীর কাছে অবশ্যই পৌঁছানো দরকার। আর, এটা ভেবেই মাছরাঙা এক উড়াল দিয়ে ক্ষীরু নদীর কাছে চলে এল।

মাছরাঙার মুখে রাকিবদের কাহিনী শুনে ক্ষীরু নদীর বুকটা কৃতজ্ঞতায় ফুলে ওঠলো। ওদিকে মাছরাঙারও খুশির অন্ত নেই। কেননা, ক্ষীরু নদী যদি আবার পূর্বের ন্যায় যৌবনবতী হয়ে ওঠে, তাহলে, তার আর খাবারের জন্য দশ গাঁ উড়ে বেড়াতে হবে না।

এভাবেই একদিকে রাকিবরা ছুটে চলেছে গ্রামের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। ক্ষীরু নদী রক্ষায় কমিটি গঠন করা হবে বিকেল চারটায় -সবাইকে জানাচ্ছে সে খবর। আর, অন্যদিকে ক্ষীরু নদীর কোণায় কোণায় আলোচনায় মুখরিত হয়ে ওঠেছে। মৎসনেতাগন জরুরি বৈঠক ডেকেছে। মাছরাঙাদের আনন্দের সীমা নেই। ক্ষীরু নদী সংলগ্ন জীববৈচিত্র্যে যেন নতুন করে প্রাণসঞ্চার ঘটেছে। সবার মনে একটাই আশা, “বাঁচবে ক্ষীরু নদী, বাঁচবো আমরাও…।” (…চলবে…)

 

-লেখক:

মোঃ মেহেদী কাউসার,

শিক্ষার্থী, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!