ছিটমহলের ইতিহাস ( প্রথম পর্ব)

Reading Time: 4 minutes

৩১ জুলাই ছিটমহল স্বাধীনতার দ্বিতীয় বছর। ২০১৫ সালের এই দিনে ৬৯ বছর পরাধীনতা  থেকে মুক্তি পেয়েছে। স্বাধীন হওয়ার আগে তারা কেমন ছিল তা জানতে আমার ধারাবাহিক লেখাটি পড়ুন।

দক্ষিণ এশিয়ার নাগরিকত্ববিহীন এক জনগোষ্ঠির নাম ছিটমহলবাসী। এরা ভৌগোলিক সীমানা থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু জনপদের মানুষ। ভারত ও বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে এমন বিচ্ছিন্ন জনপদ আছে ১৬২টি। ওই সব বিচ্ছিন্ন জনপদ বা ছিটমহলের অধিবাসীরা পাথর ও সিমেন্টের কিছু পিলার মধ্যে বন্দি জীবন কাটাচ্ছে। ইচ্ছে হলেই তারা দেশের মূল ভূখণ্ডে আসতে বা যেতে পারেন না। অবরুদ্ধ ভারতের ভূখণ্ডে অবস্থিত বাংলাদেশি ছিটমহলের মানুষ জন্মসূত্রে বাংলাদেশি অবস্থানসূত্রে ভারতীয় একইভাবে বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় ছিটমহলের মানুষ জন্মসূত্রে ভারতীয় অবস্থানসূত্রে বাংলাদেশি। আর অবস্থান নিয়ে দু‘দেশের টানাপড়েন থাকলেও আসলে ওদের কোনো দেশ নেই, ঠিকানা নেই এবং পরিচয়ও নেই। একটাই পরিচয় ওরা ছিটের মানুষ। বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় ছিটের মানুষের আচার, আচরণ, ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বাংলাদেশের সংমিশ্রণের গড়া। একইভাবে ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশি ছিটমহলের মানুষের আচার আচরণ ভারতীয়দের সংমিশ্রণে গড়া। কিন্তু বাংলাদেশ যেমন ওদের নাগরিকত্ব দেয়নি, তেমনি ভারতও তাদের নাগরিকত্ব দেয়নি ঠিকই কিন্তু পড়াশোনা, জীবন জীবিকা সবকিছুই উভয় দেশের উপর নির্ভরশীল।

ছিটমহলের সংজ্ঞা :

যখন কোনো রাষ্ট্রের ক্ষুদ্র এক অংশ সম্পূর্ণভাবে অন্য অন্য রাষ্ট্র দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে তাকে ঐ পরিবেষ্টিত রাষ্ট্রের ছিটমহল বলা হয়। কিন্তু যে রাষ্ট্রের অর্ন্তভূক্ত সে রাষ্ট্রের ছিটমহল বলা হয়। “রবিসসনের” মতে, ছিটমহল রাজনৈতিক ভূতাত্বিক আলোচনায় তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয় কিন্তু বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্রিয় সম্পর্ক স্থাপনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ছিটমহল শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে দ্বীপায়নিক রাজ্য। রাষ্ট্রিয় ভূখণ্ডের বিচ্ছিন্ন অংশ ভিন্ন রাষ্ট্রিয় স্থল দ্ধারা বেষ্টিত রাষ্ট্রের এ ধরনের অসংলগ্ন বিচ্ছিন্ন অংশ যাহা ভিন্ন রাষ্ট্রের স্থল ভাগ দ্ধারা বেষ্টিত থাকে সে গুলোকে এনক্লেভ ( Enclave) বা ছিটমহল বলা হয়। ছিটমহল বলতে সাধারণ অর্থে যা বোঝায় তা হচ্ছে কোনো রাষ্ট্রের মধ্যে অবস্থিত ভূখণ্ড যা তার শাসনাধীন নয়। অন্যভাবে বলা যায় একটি দেশের ভিতর ক্ষুদ্র এলাকা যা অন্যদেশের রাষ্ট প্রশাসন কতৃক পরিচালিত হয়।

ছিটমহলের ইতিহাস :

ছিটমহলের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। আজকের বাংলাদেশ ও ভারতের ছিটমহলবাসী অনেক ভোগান্তির মাঝে থাকলেও সমস্যার সৃষ্টি ব্রিটিশ শাসনামলে। মূলত ব্রিটিশরাই ছিটমহল সমস্যাটি তৈরি করে গেছে। উপমহাদেশ জুড়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের মুখে এক সময় তারা উপমহাদেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু সমাধান দিয়ে যায়নি ছিটমহল সমস্যার। ছিটমহল সমস্যা এক সময় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে থাকলেও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তা ভারত ও বাংলাদেশ সীমান্ত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। কুচ রাজা এবং মুঘল সাম্রাজ্যের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে যে সন্ধিসূত্র স্থাপিত হয়েছিল তার জেরেই এই ছিটের উৎপত্তি।

রাজা-বাদশাদের ‘ইচ্ছায়’ বিভিন্ন এলাকার রাজনৈতিক চিত্র বদলে গিয়েছে যখন তখন। কোনো কোনো এলাকা তাঁরা বিভিন্ন সময়ে উপহার হিসেবে দিয়েছেন কাউকে। ইংরেজ আমলেও সেই ‘বদান্যতা’-র ট্রাডিমন থেকে গিয়েছে। দেশভাগের পরে তার মাসুল দিচ্ছেন ছিটমহলবাসীরা। ছিটমহলসমূহ সৃষ্টির উৎস আর সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক ও ধোঁয়াশা আছে। তবে ঐতিহাসিক ভাবে জানা যায়, ১৬৯৯ থেকে মুঘলরা পরপর কয়েকবার কুচবিহারে হামলা চালায়। ভুটান রাজার সঙ্গেও কুচবিহারের রাজার কয়েকটি যুদ্ধ হয়। এসব যুদ্ধে চাকলা বা অঞ্চল চলে যায় অন্যের দখলে। তেমনি কুচবিহারের দখলে আসে রাজ্য। তার সীমন্তের বাইরে, ভারতের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট ভূখণ্ড ছিল যা কুচবিহারের অংশ বলে গণ্য হত। ১৯৪৯ সলের ২৮ আগস্ট কুচবিহার ভারতীয় ভূখণ্ডে যুক্ত হয়। ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি কুচবিহার পশ্চিমবঙ্গের আওতায় চলে আসে। তখনকার পূর্বপাকিস্তানের ভেতরে কুচবিহারের কিছু অঞ্চল ভারতীয় ছিটে রূপান্তরিত হয়। তেমনি কুচবিহারের কয়েকটি এলাকা ভারতের ভেতর পূর্বপাকিস্তানের ছিটমহল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়।

দেশভাগের সময় দু‘দেশের সীমানা নির্দিষ্ট হয়েছিল সীমান্ত কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে। ভারতের দিনহাটায় অবস্থিত বাংলাদেশি ছিটমহল পোয়াতুর কুটির বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী কাজীর (১০৭) দেয়া তথ্য মতে, ব্রিটিশ শাসনামলে কুচবিহার ছিল একটি দেশিয় করদ রাজ্য। ব্রিটিশ শাসনের আওতায় থাকলেও দেশিয় রাজ্যগুলো ছিল স্বায়ত্তশাসিত। ১৬৬১ সালে মীর জুমলা কুচবিহার আক্রমণ করার পর থেকে কুচবিহারে রাজার সঙ্গে মুঘলদের যুদ্ধ চলে দীর্ঘ সময় ধরে। ওই যুদ্ধে যেসব এলাকা নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে দখল ও পাল্টা দখলের ঘটনা ঘটে, ক্রমে সেগুলো আলাদা অঞ্চলে স্বীকৃতি পেয়ে যায়। ঐ সময়ে মুঘল অধিকৃত এলাকায় কুচরাজ্যের অনুগত কিছুলোক ছিল যাদেরকে “রাজগীর” বলা হতো। দুই শক্তির অনুগত বাসিন্দাদের সম্পত্তি চিহ্নিতকরণের কারণে ছিটমহলের সৃষ্টি হয়। এসব ছিটমহল তৎকালীন তিনটি পরগনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এগুলো যথাক্রমে কই কোনা, পাটগ্রাম ও পাটগ্রাম উত্তর। ব্রিটিশদের সাথে কুচরাজের সন্ধির চুক্তির শর্ত মোতাবেক কুচবিহারের মহারাজের অনুগত রাজগীর সম্পত্তিগুলো মোগলাম রাজ্যের ভেতর কুচরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হয়।

১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্তির পর ১৯৪৯ সালে গভর্নর জেনারেল অব দ্য ইণ্ডিয়ার সঙ্গে কুচবিহারের মহারাজার চুক্তির ফলে ১৯৫০ সালে করদ রাজ্য কুচবিহার ভারতভুক্ত হয়। এ সময়ে কুচবিহারের ১৩১টি ছিটমহল ভারতভুক্ত হয়। যদিও এগুলোর অবস্থান বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের অভ্যান্তরে। তেমনিভাবে ‘‘মোগলাম” ৯৫ ছিটমহল বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়। যদিও এগুলোর অবস্থান ভারতের মূল ভূখণ্ডের ভিতরে। মোগলাম দুটি ছিটমহল ভারতের সাথে ১৯৭৪ সালের চুক্তি মোতাবেক ২০১১ সালের ১১ নভেম্বর থেকে ২৪ ঘণ্টার করিডোর দিয়ে যাতায়াত করছে ছিটমহল আঙ্গরপোতা ও দহগ্রামবাসী। পোয়াতুর কুটির ছিটের আরেক বাসিন্দা মনসুর আলী (৭৮) দেয়া তথ্যমতে, ১৫১৯ সালে বিশ্বসিংহের রাজত্ব কায়েম হয়? তিনি কুচ বিহারের শক্তিশালী ও প্রভাবশালী রাজা ছিলেন। সেই সময় পশ্চিমবঙ্গে কয়েকজন ছোট ছোট রাজা ছিলেন এবং তাদের মধ্যে দ্বন্ধ সবসময় লেগেই থাকত মাঝে মধ্যে তারা আবার রংপুর রাজাদের সঙ্গে দাবা, পাশা খেলায় বাজি ধরতেন। যারা হারতেন তাদের মধ্যে এক একটি তালুক লিখে দিতেন।

পরবর্তীতে ব্রিটিশ সরকারের রাজত্ত্ব শুরু হয় এবং ছোট ছোট রাজারা ইংরেজদের সঙ্গে সন্ধিবদ্ধ চুক্তি স্বাক্ষরিত করে রাজত্ব চালাতেন। ২ শত বছর পর ইংরেজেদের বিরুদ্ধে ভারত ছাড় আন্দোলন শুরু হয় কিন্তু ১৯৪৭ সালে ১৫ আগষ্ট ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়। ইংরেজদের চক্রান্তে অথবা উদ্ধর্তন নেতাদের প্ররোচণায় হিন্দস্থান বা পাকিস্তান হিসাবে ২টি রাষ্ট্র গঠিত হয়। তখন কুচবিহার স্বাধীন রাজ্য ছিল কিন্তু ১৯৪৯ সালে ২৮ আগস্ট রাজা জগদ্দিপেনন্দ্র নারায়ণ ভুপবাহাদুর ভারতের সঙ্গে সংযুূক্ত হন। তখন থেকে কুচবিহার ও রংপুরের রাজাদের জমিগুলো উভয় দেশের মধ্যে ছিটমহল হিসাবে পরিণত হয়। অপরদিকে ১৯৯৯ সালে নিউজ নেটওয়ার্ক কতৃক প্রকাশিত লাইফ ইন ইনক্লেভস রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে ১৯৪৭ সালে যখন উপমহাদেশ ব্রিটিশ উপনিবেশ মুক্ত হয় তখন তারা দেশিয় রাজ্যগুলোর ব্যাপারে কিছু বলে যায়নি। ইংরেজদের এই ক্ষমতা হস্তান্তর পরিকল্পনায় দেশিয় রাজ্যের ওই সব দখলী এলাকা সম্পর্কে কিছু উল্লেখ ছিল না। উপমহাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ব্রিটিশদের সরাসরি শাসনে ছিল ১১টি প্রদেশ ও ছোট বড় মিলে ৬১৩ টি দেশিয় করদরাজ্য। দেশিয় বড় ও মাঝারি রাজ্যগুলোর মধ্যে ছিল জম্মু-কাশ্মীর, হায়দারাবাদ, মহীশুর, ত্রিবাংকুর, ভূপাল, জুরগড়, বিকানীর, বরোদা, চিত্রল, যোধপুর, বরানগর, জয়সালামার ইত্যাদি। তবে এছাড়াও ছিল ৩২৭টি ক্ষুুদ্র রাজ্য।

 

ছিটমহলের ইতিহাস (দ্বিতীয় পর্ব)

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!