জগত নামক আরশিনগর ও মানুষ নামক চতুষ্পদী জীবের স্বার্থপরতা

Reading Time: 2 minutes

কথায় আছে, এ দুনিয়াটা নাকি আয়নার মত! আয়নায় যেমন সবকিছুরই প্রতিফলন ঘটে, তেমনি দুনিয়াতেও মানুষের যাবতীয় কিছুর প্রতিফলন ঘটতে দেখা যায়! আমরা তার প্রতি যেমন আচরণ করি, তাকেও অনুরূপ আচরণই করতে দেখা যায়। আমরা হাসলে সেও হাঁসে। আমরা কাঁদলে সেও কাঁদে। ব্যাপারটা আসলেই বড় অদ্ভুত। কিছুটা রহস্যময়ও বটে। সহজ ভাষায় ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করতে গেলে এভাবে বলতে হয় যে, পৃথিবীর বিষয়বস্তুগুলো অনেকটা আপেক্ষিক ব্যাপার। এগুলো আমাদের চোখে কীভাবে, কোন দৃষ্টিকোণ থেকে ধরা পড়বে, তা পুরোপুরি ভাবে নির্ভর করে ঠিক কোন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাপারটা আমাদের নিকট বিবেচ্য, তার উপরে।

যেকোনো জিনিস, যেকোনো ভাবে দেখা যেতে পারে। এটা যেমন ইতিবাচক হতে পারে, ঠিক তেমনিভাবে নেতিবাচকও হতে পারে একই সাথে। এর মানে কখনই এটা নয় যে, দুজনের একজন ভুল আর একজন সঠিক। আসলে দুজন, দুইটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাপারটাকে নিরীক্ষা করেছে। এ কারণে একই বস্তু দুজনের চোখে দুইটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চেহারায় প্রতিভাত হয়েছে। এ ব্যাপারে একটি সহজ উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বাঁশির কথাই ধরা যাক না! বাঁশির মন ভোলানো সুরে বিমুগ্ধ হ‌ই না, আমাদের মাঝে এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে। বাঁশির সুরের বিমুগ্ধতা আমাদেরকে নিজেদের থেকে কেড়ে নেয়। মন যেন হারিয়ে যেতে চায় কোনো দূর অজানায়। এমনও জনশ্রুতি রয়েছে, জোছনা রাতে নির্জন স্থানে বাঁশি বাজালে নাকি পরীরা দলবেঁধে সেখানে ভীড় করে! কথাটা কতখানি সত্য, সে ব্যাপারে আমার জ্ঞান প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। তাই এ ব্যাপারে কোনো রকম বিতর্কে জড়ানোটাকে ঠিক বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে হলো না আমার। এছাড়া ছোটবেলায় পড়েছিলাম ” হ্যামিলিয়নের বাঁশিওয়ালা ” নামক এক রূপকথা। সেখানে রূপকার লিখেছিলেন যে জার্মানির ছোট্ট কিন্তু সাজানো-গোছানো, ছবির মত এক শহর ছিল  হ্যামিলিয়ন। সত্যিকারের সুখ ছিল মানুষের জীবনে। তবে সেখানকার  মানুষেরা ইঁদুরের উপদ্রবে ভীষণ  অতিষ্ঠ ছিল। সেই ইঁদুর পর্যন্ত এক জাদুকরের মোহিনী বাঁশির সুরে পাগল হয়ে দলে দলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নদীর জলে। এছাড়া অনেক সময় বাঁশিওয়ালার বাঁশির সুরে মনোমুগ্ধ হয়ে তার প্রেমে পর্যন্ত পড়ে গেছে অনেক অনিন্দ্য বসনা, নীলনয়না রূপসী। ইতিহাসে এরকম ঘটনার নজির অনেক বেশি পাওয়া যাবে।

তবে আসল ব্যাপারটা হচ্ছে,বাঁশির সুরে আমরা যতই মনোমুগ্ধ হই না কেন, বাঁশিওয়ালার কাছে এর আবেদন কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাঁশিওয়ালার কাছে মোহিনী বাঁশির সকরুণ সুর নিদারুণ বিরহের প্রতীক, নিজের মাঝে লুকিয়ে থাকা মনোবেদনা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। এটা একটা সত্যিকারের নিরব মাধ্যম। কেউ একজন বলেছিলেন,“নিরব মাধ্যম সরব মাধ্যমের তুলনায় অধিকতর শক্তিশালী।” বাঁশিওয়ালার মনের কষ্ট বাঁশির সুর হয়ে ভেসে আসে আমাদের কর্ণকুহরে। আমরা তাতে বিমোহিত হই। ছয় ছিদ্রের বাঁশের বাঁশি আসলে বাঁজে না, বাঁশি কাঁদে। বাঁশি কাঁদে কষ্টে। কখনো নিজের দুঃখে, কখনো বা বংশীবাদকের লুকানো কষ্টে। কিন্তু বাঁশির কান্নার কারণ কেইবা খুঁজতে যাই আমরা? স্বার্থপর এ দুনিয়ার বাসিন্দা হিসেবে আমরা তো শুধু নিজেরটাই ভাবতে পারি! নিজের স্বার্থের বাইরেও যে কিছু থাকতে পারে, সেটা আমরা নিজেদের জ্ঞানসীমার বাইরের বিষয় বলেই এড়িয়ে যাই। ভাবনার জগতে তার কোনো ঠাঁই আদৌও নেই।

 

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!