জাসদ বিপ্লবীদের পতনের কাব্য

Reading Time: 4 minutes

জাসদের উত্থান-পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি

লেখক-গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ

বুক  রিভিয়্যু- শতাব্দী জুবায়ের

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিখে তাকালে দেখা যায় রাজনৈতিক মহলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বা জাসদ সম্পর্কে দুটি বিপরীতধর্মী ব্যাখ্যা ও বক্তব্য আছে। এক. জাসদের প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল। দুই. স্বাধীনতার পর স্বাধীনতা সংগ্রমে নেতৃত্বদানকারী ‘আওয়ামীলীগ’ ত্যাগী তরুণদের আশা-আকাঙ্খা পূরণ করতে পারেনি বলেই জাসদের অভ্যূদয়।

জাসদের বিপ্লবের আকাঙ্খা ও নেতৃত্বের হঠকারিতার দায় শোধ করতে যে দেশের হাজার হাজার তরুণ নিগ্রহের শিকার হলেন, অনেকে জীবন দিলেন, কিন্তু বিপ্লবটি সফল হতে পারেনি। এ জন্য কে দায়ী রাষ্ট্রশক্তি, নাকি দলটির হঠকারী নেতৃত্ব, না দুটোই? এসব অমীমাংসিত প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছেন লেখক-গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ, তাঁর জাসদের উত্থান-পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি বইয়ে।

নেতাদের উদ্দেশ্য যাই থাকুক না কেন, সেই সময়ে বিপুলসংখ্যক তরুণ সমাজ বিপ্লবের আকাঙ্খা নিয়ে জাসদের পতাকাতলে সমবেত হয়েছিলেন। কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতার পর বাম ধারার রাজনীতির  উত্থানের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের আগ বাড়ানোর মৈত্রীর নীতি তা ধ্বংস করে দেয়। সুযোগটি কাজে লাগায় জাসদ। কিন্তু নেতৃত্বের অস্থিরতা, হঠকারিতা ও যত দ্রুত সম্ভব ক্ষমতা দখলের উগ্র বাসনার কারণে দলটি সমাজ বিপ্লবের সারথি না হয়ে অন্ধ মুজিব ও ভারত বিরোধিতার হাতিয়ারে পরিণত হয়। এই সময় স্বাধীনতা বিরোধীদের কেউ কেউ জাসদে যোগ দিয়ে রাজনৈতিকভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করারও মওকা পেয়ে যান। আর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগানের আড়ালে দলটির কর্মকা- পরিচালিত হয় মূলত মুজিব উৎখাতে। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল চক্র যখন পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সেই কাজটি করে ফেলে, তখন কার্যত জাসদের রাজনৈতিক প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। এরপর জাসদ নেতৃত্ব যা করেছেন, সেটি হলো যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় যাওয়া কিংবা তার অংশীদার হওয়া। এই লক্ষ্যে কখনো তাঁরা ১৫ আগস্টের অভ্যূত্থানকারীদের কাছে জাতীয় সরকারের দাবি তোলেন, কখনো জিয়ার কাঁধে ভর করে ‘সিপাহি বিপ্লব’ করেন, কখনো সামরিক সরকারের সঙ্গে ফ্রন্ট গঠনের কৌশল নিয়ে এগোতে থাকেন। জাসদের দাবি অনুযায়ী, ‘বিপ্লব’ হলো; কিন্তু ততক্ষণে দলটি ক্ষমতা নামের প্রাসাদ থেকে ছিটকে পড়েছে।

লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলতে চেয়েছেন, ষাটের দশকের শুরুতে ছাত্রলীগের যে বিপ্লবী অংশটি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিল, গঠন করেছিল নিউক্লিয়াস বা স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ, তাদের নেতৃত্বেই প্রতিষ্ঠিত হয় জাসদ। তবে সেই বিপ্লবী অংশের সবাই জাসদে যোগ দেন নি। স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের তিন পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদ। পরবর্তী সময়ে তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হন শেখ ফজলুল হক মণি ও তোফায়েল আহমেদ। উনসত্তরের গণ-অভ্যূত্থান, সত্তরের নির্বাচনের আগে ও পরে বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিতে তাঁরা যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন, সে বিষয়েও সন্দেহ নেই। স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা তৈরি, জয় বাংলা বাহিনী গঠন, ইশতেহার ঘোষণা, শেখ মুজিবুর রহমানকে সর্বাধিনায়ক ঘোষণা ইত্যাদি ছাত্রলীগের নামে হলেও সিরাজ অনুসারীরাই জোরালো ভূমিকা নেন। আবার মুক্তিযুদ্ধকালে মুজিবনগর সরকারের বিরোধিতা সত্ত্বেও চার যুবনেতা গঠন করেছিলেন বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স বা মুজিব বাহিনী। তাঁদের চিন্তা ছিল, মুক্তিযুদ্ধটা যেন কোনোভাবেই আওয়ামী লীগের নাগালের বাইরে না যায়।

মহিউদ্দিন আহমদের বই থেকে আমরা আরও জানতে পারি যে সত্তরের নির্বাচনের আগেই শেখ মুজিব চিত্তরঞ্জন সুতারের মাধ্যমে তরুণদেও একটি দলকে ভারতে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। সে ক্ষেত্রে যাঁরা বলেন স্বাধীনতার ব্যাপারে শেখ মুজিবের কোনো প্রস্তুত ছিল না, তাঁদের বক্তব্য তথ্যনিষ্ঠ প্রমাণিত হয় না। তবে তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যুদ্ধ ও আলোচনা দুই পথই খোলা রেখেছিলেন।

মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, সিরাজুল আলম খান ও তাঁর অনুসারীরা প্রথমে শেখ মুজিবকে দিয়েই ‘নতুন ধরনের দেশ ও সরকার’ গঠন করতে চেয়েছিলেন। তাঁর সেই প্রস্তাব নাকচ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতেই নাকি তিনি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগান নিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠন করেন। কিন্তু জাসদের পরবর্তী কর্মকান্ড প্রমাণ করে বিপ্লব নয়, সম্ভবত মুজিবকে উৎখাত করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও নবীন এই দলটির চ্যালেঞ্জকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার পরিবর্তে দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়। একপর্যায়ে জাসদ নেতৃত্ব গণবাহিনী গঠন করে সশস্ত্র উপায়ে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা চালায়। আর এ কাজে তারা সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের আওয়ামী লীগ ও ভারতবিরোধী অংশকে পরম মিত্র হিসেবে নেয়। ফলে সদ্য স্বাধীন দেশটিকে অস্থিতিশীল করতে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির প্রয়োজন হলো না। যুদ্ধ শেষের প্রাপ্য বুঝে নিতে মুক্তিযোদ্ধারাই আত্মকলহে লিপ্ত হলেন, যার জন্য মুক্তিযুদ্ধের চার সেক্টর কমান্ডারকে জীবন দিতে হয়।

এখন যে ব্যাখ্যাই দেওয়া হোক না কেন, ১৫ আগস্টের বিয়োগান্ত ঘটনায় জাসদ নেতৃত্ব উল্লসিত হয়েছিলেন। ‘খুনি মুজিব খুন হয়েছেন’ বলে প্রচারপত্র বিলি করেছিলেন। যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তাঁরা মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। ১৫ আগস্টের ভোরে গণবাহিনীর প্রধান কর্নেল আবু তাহেরের রেডিও অফিস ও বঙ্গভবনে যাওয়া, খুনি মেজর চক্রের সঙ্গে বৈঠক করা, বাকশাল বাদে সব দলকে নিয়ে সরকার গঠনের প্রস্তাব ছিল তারই অংশমাত্র। ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের অভ্যূত্থানকে তাঁরা ‘ক্ষমতার ট্রেন’ ৭ নভেম্বরের ঘটনা ঘটান, যা তাঁদের ভাষায় ছিল সিপাহি জনতার বিপ্লব আর বিরোধীদের ভাষায় পাকিস্তানবাদের পূণরুন্তানের সূচনা।

জাসদের দাবি অনুযায়ী ৭ নভেম্বরের ‘বিপ্লবে’ জিয়াউর রহমানের কোনো ভূমিকা ছিল না। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি তাঁরই মুক্তিদাতা তাহেরকে হত্যা করেন। মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, তাহের ও জিয়া দুজনই ক্ষমতায় যেতে একে অপরকে ব্যবহার করেছেন। ক্ষমতার লড়াইয়ে জিয়া সফল হয়েছিলেন বলেই তাহের জীবন দিতে হয়েছে। তাহের সফল হলে জিয়াকেও হয়তো একই ভাগ্য বরণ করতে হতো। ক্ষমতার এই খেলাটি জাসদ নেতারা বুঝতে পারেননি বলেই বহু তরুণকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন।

মহিউদ্দিন আহমদ জাসদের উত্থানকে অনিবার্য বলেছেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দলটির পতনটিও অনিবার্য ছিল। যে বুর্জোয়া ও সুবিধাবাদী রাজনীতির প্রতিবাদ করতে জাসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই রাজনীতির কাছেই নেতারা আত্মসমর্পণ করেছেন, ক্ষমতার ছিটেফোঁটা নিয়ে সন্তুষ্ট থেকেছেন। তাহলে এত তরুণ কেন জীবন উৎসর্গ করলেন?

অস্বীকার করার উপায় নেই যে আজ জাসদ নেতারা যেমন যেকোনো মূল্যে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বন্ধুত্ব রক্ষায় সচেষ্ট, পঁচাত্তরে তাঁরা আওয়ামী লীগকে পরাস্ত করতে শয়তানের সঙ্গে হাত মেলাতেও দ্বিধা করেননি। কাউকে ছোট বা বড় করা নয়, লেখক বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে ওলটপালট করা সময়কে তুলে ধরেছেন কুশীলবদের কথন ও তাঁর সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। জাসদের উত্থানপতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি আমাদের জানা ইতিহাসের অনেক অজানা ঘটনা সামনে তুলে এনেছে। আর এর মাধ্যমেই রচিত হয়েছে জাসদ বিপ্লবীদের পতনের কাব্য।

শতাব্দী জুবায়ের

বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

 

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!