জুকারবার্গের নীল দুনিয়া ও বাঙালির সস্তা খ্যাতিপ্রিয়তা

Reading Time: 2 minutes

ক্রমে ক্রমে ফেসবুক আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থাকছে না! অসামাজিক মানুষ জনের আড্ডাখানায় পরিণত হয়ে যাচ্ছে। দিন দিন মানুষের মাঝে অসামাজিকতা বেড়ে যাচ্ছে। ব্যাপারখানা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে এটা মানুষের নিজস্ব প্রভাব-প্রতিপত্তি-ক্ষমতা প্রদর্শনের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এখানে মানুষের যোগ্যতা বিচার করা হয় তার কতজন ফ্রেন্ড ও ফলোয়ার আছে এবং কতজন তার পোস্টে লাইক/কমেন্ট/শেয়ার করে, সেই সংখ্যার ভিত্তিতে। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের যোগ্যতা এখানে বিবেচ্য নয়। দেখা যায়, বাস্তব দুনিয়ায় যাদেরকে কেউ চিনেই না, তারাই এখানে তথাকথিত ফেসবুক সেলিব্রিটি। তাদের হাজার হাজার লাইক কাম কমেন্টার রয়েছে। এমনও দেখা যায় যে ক্লাসের শেষ বেঞ্চে মুখ লুকিয়ে বসে থাকা লাজুক ছেলে/মেয়েটিও জুকারবার্গের দুনিয়ার মস্ত বড় সেলিব্রিটি। মস্ত বড় তারকা খ্যাতি তার জুটে গেছে ইতোমধ্যেই, হাজার হাজার লাইক,কমেন্ট এর কারণে। শুধু তাই নয়, নগদ টাকার বিনিময়ে আজকাল এসব লাইকার/কমেন্টার/গ্রুপ মেম্বার দেদারসে বিক্রি হচ্ছে। কী? শুনতে ভীষণ অবাক লাগছে ভায়া/আপি?? অবাক লাগলেও এটাই বাস্তবতা।

কিন্তু কী লাভ হচ্ছে এসব করে? এ খ্যাতি কি আমাদের পার্থিব জীবনে কোনো কাজে আসছে আদৌও? প্রশ্নটা আপনাদের কাছে রইলো। আমার মতে, এগুলো কোনো কাজেই আসছে না, বরং নৈতিক অবক্ষয় ঘটাচ্ছে।

কীভাবে? জানতে হলে নিচের অংশটুকু মনোযোগ সহকারে পড়ুন:
(১) জাতিগতভাবে আমরা অনেক বেশি অতিথিপরায়ণ ও বন্ধুসুলভ। এর জন্য দেশে-বিদেশে আমাদের বেশ সুনাম রয়েছে। কিন্তু অনলাইন ভিত্তিক এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির কারণে আমাদের এ সুনাম আজ নষ্ট হতে বসেছে। দেখা যাচ্ছে যে, অনেকদিন পর কারো সাথে দেখা হলেও আমরা তার সাথে কুশল বিনিময়ের ব্যাপারে ততটা আগ্রহ দেখাই না, যতটা আগ্রহ আমাদের চ্যাটিং লাইনের অপরপ্রান্তে থাকা কোনো অচেনা দেশী/ভিনদেশীর সাথে চ্যাট করার প্রতি। এতে আমাদের মাঝে পারস্পরিক দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি বসে থেকেও আমাদের মধ্যকার আন্তরিক দূরত্ব কয়েক লক্ষ-কোটি আলোকবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। এতেই প্রমাণিত হয় যে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের।

(২) অনলাইন ভিত্তিক এসব মাধ্যমে সস্তা তারকাখ্যাতির লোভে আমরা এসবে আসক্ত হয়ে পড়ছি। এদের ভেতর সিংহভাগই বিভিন্ন লেভেলের, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। সার্বিকভাবে টিনেজারদের মধ্যে এ ঝোঁক একটু বেশিই দেখা যায়। এমনও অনেক দেখা যায় যে তারা লেখাপড়া বাদ দিয়ে ফেসবুকিংয়ে ব্যস্ত আছে। অর্থাৎ নিজের কর্মের চাইতে তাদের এসবে মনোযোগ বেশি। ফলে অ্যাকাডেমিক ফলাফল যা হবার তাই হচ্ছে! অন্য দেশীয়রা যেখানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে,সেখানে এ দেশীয়রা তুলনামূলকভাবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।

(৩) দেশে সামাজিক অবক্ষয় বেড়ে যাচ্ছে, বিশেষত তরুণ সমাজে। এসব যোগাযোগ মাধ্যম তো সবার জন্যই সমানভাবে উন্মুক্ত। ফলে সহজেই যে কারো সাথে যোগাযোগ করা যায়, যদি না কোনো শক্তিশালী প্রাইভেসি দেয়া থাকে। এর কারণে মানুষ নানারকম অনৈতিক সম্পর্কে সহজেই জড়িয়ে যাচ্ছে। পারিবারিক অশান্তি বাড়ছে। ফলে পরকীয়ার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। ভেঙে যাচ্ছে পারিবারিক বন্ধন। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় এমন ঘটনাও জানার সুযোগ হয়েছে যে, ফেসবুকে পরিচয়ের মাধ্যমে একজন পুরুষ আরেক নারীর সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে গেছে। অথচ ঘরে তার মাত্র ৪ মাসের নবজাতক শিশু রয়েছে। আরেকটি বাচ্চা ও স্ত্রী রয়েছে। অথচ সেদিকে তার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। এতেই বোঝা যায়, সমাজ আজ ঠিক কোন পথে চলেছে!
এ সবকিছুই হচ্ছে সস্তা তারকাখ্যাতির লোভে পড়ে। এটা যে শুধু আমাদের দেশের চিত্র, তা কিন্তু নয়। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দিকে তাকালেও একই চিত্র আমাদের চোখে পড়বে। বরং সেখানকার অবস্থা আরো ভয়াবহ। শুধু ভারত বা বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের নানা দেশেই আজ একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। পরিস্থিতি দিন দিন এমন হচ্ছে যে অদূর ভবিষ্যতে এটি হয়ত এইড্স(!) এর চাইতেও ভয়াবহ এবং মারাত্মক ব্যাধিতে রূপ লাভ করবে। এখন থেকে সচেতন না হলে তখন হয়তো আর কিছুই করার থাকবে না আমাদের কারোরই!

Save Humanity!
‎Save Society!

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!