জুলাই মাসের পাঠসম্ভার

Reading Time: 8 minutes

গত মাসে মোট ১৩টি বই পড়েছি। ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে থাকাতে ও একাডেমিক প্রেশার থাকাতে বই পড়াতে বেশ ভালোভাবেই ভাটার টান পড়েছিল অন্য মাসের তুলনায়। আশা করি, পরবর্তী মাস থেকে এ দুরাবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারব, ইনশাআল্লাহ। তাহলে আর দেরি কেন? চলুন, কথা আর না বাড়িয়ে এবার এক নজরে দেখে আসা যাক গতমাসে পড়া বইসমূহের সংক্ষিপ্ত রিভিউঃ

১) তানিয়াঃ এ বইটি লিখেছেন রাশিয়ান কথাসাহিত্যিক পি. লিডভ। বইটিকে বাংলা ভাষায় রূপদান করেছেন আহমদ ছফা। বইটির মূল আলোচ্য বিষয়বস্তু তানিয়া নামের এক দুঃসাহসিক রাশিয়ান কিশোরী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে হিটলারের নেতৃত্বে জার্মান নাৎসি বাহিনী জার্মানিকে অতর্কিত আক্রমণ করে। অমানবিক অত্যাচার চালায় জার্মানবাসীদের উপরে। নৃশংসতা পূর্বের সকল রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যায়। উক্ত উপন্যাসটির নাম চরিত্র তানিয়ার উপরে অকথ্য ভাষায় নির্যাতন চালায়। জনসম্মুখে তাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু তারা শুধু এটুকুতেই ক্ষান্ত হয়নি। মৃত্যুর পরেও তানিয়ার মৃতদেহ পর্যন্ত তাদের নৃশংসতা থেকে নিস্তার পায়নি। মৃত্যুদণ্ডের পরে তার মৃতদেহের উপরেও চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। এতদসত্ত্বেও তানিয়া তার নীতি থেকে কখনওই একবিন্দু বিস্মৃত হয়নি। এ দিক থেকে তানিয়া দুঃসাহসিক, আদর্শবাদী নারীর এক মূর্তপ্রতীক। নিজের অবস্থান থেকে দেশের তরে নিজের সর্বোচ্চ দান করে গেছে সে। নিজের স্বার্থের কথা ভুলে গিয়ে পিতৃভূমির স্বাধিকার আন্দোলনে বীরাঙ্গনা হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেনি এ নারীযোদ্ধা। সার্বিক বিবেচনায় বেশ ভালো মানের লিখা। আহমদ ছফার করা অনুবাদ ভালো লেগেছে। “আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি ” বইটার মত এটিতেও নাৎসি বাহিনীর নৃশংসতার চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আশা করি, ভালো লাগবে সকলের।

২) পাক সার জমিন সাদ বাদঃ এ বইটি লিখেছেন বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদ। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের প্রেক্ষাপটে এ উপন্যাসটি রচনা করা হয়েছে। লেখাটিতে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি ও পাকবাহিনীর দোসর যারা, এদেরকে অত্যন্ত কঠিন ভাষায় সমালোচনা করা হয়েছে। তারা ইসলাম ধর্ম রক্ষার নামে যেভাবে অধর্ম চর্চার লড়াইয়ে নেমেছিল, সে ব্যাপারটিকে কড়া ভাষায় বিদ্রূপ করেছেন লেখক। বিদ্রুপাত্মক ভাষায় তাদের যুক্তিকে অত্যন্ত হাস্যরসাত্মক ভাষায় পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন হুমায়ূন আজাদ। এছাড়া পুরো বই জুড়েই অনেক জায়গায় অনেক অকথ্য ভাষা ব্যবহার করেছেন লেখক। অনেক জায়গাতে বিদ্রূপ করতে গিয়ে বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যাপারকে একরকম অপমান করা হয়েছে বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। এটা নিয়ে অনেকের মধ্যেই মতবিরোধ রয়েছে। যা হোক, বিতর্কিত ইস্যুতে কথা না বাড়ানোই শ্রেয়। কারণ এতে অযথা বিতর্ক বাড়বে শুধু; কাজের কাজ কিছুই হবে না। সব মিলিয়ে খারাপ লাগেনি বইটা। আশা করি, ভালো লাগবে সকলের।

৩) The prince: বিশ্বব্যাপী জননন্দিত এ ক্লাসিক বইটির লেখক নিকেলো ম্যাকিয়াভেলি। রাজতন্ত্রের প্রেক্ষাপটে এ বইটি রচিত। এক কথায় বলতে গেলে, এ বইটিতে একজন রাজকুমারের করণীয় ও অকরণীয় নানা দিক সম্পর্কে অধ্যায় ও টপিক ভিত্তিক আলোচনা করা হয়েছে। তুলে ধরা হয়েছে রাজতন্ত্রের নানা গুপ্ত, ভেতরের কথা। পাশাপাশি রাজতন্ত্র সম্পর্কিত বিভিন্ন ইতিবাচক ও নেতিবাচক ব্যাপারগুলোও একই সাথে আলোচনাতে উঠে এসেছে। মনে রাখতে হবে যে, এটি একটি ক্লাসিক সিরিজের বই। স্বীকার করতে আজ দ্বিধা নেই যে, আগে কখনো ক্লাসিক বই খুব বেশি পরিমাণে পড়িনি বলে এ বইটি আমার কাছে প্রথম অবস্থায় অপাচ্য, অখাদ্যের মত লাগছিল। এছাড়া বাংলা বাদে অন্য ভাষায় রচিত বই পড়ার অভ্যাস এককথায় আমার নেই বললেই চলে। এরপরেও ভালো লেগেছে বইটি। আর যাই হোক, নতুন অনেক কিছুই জানতে পেরেছি। শিখতে পেরেছি। একজন পাঠকের এটা কি কম পাওনা?

৪) রাস্তাফারাই, রেগে ও বব মার্লিঃ এ বইটির লেখক কাজী মুনতাসির বিল্লাহ। অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ বলে পরিচিত আফ্রিকার নিপীড়িত জনগণ এ উপন্যাসের মূল আলোচ্য বিষয়বস্তু। পৃথিবীর ইতিহাস ঘাটলে  একটি ব্যাপার অতি সহজেই আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। সেটি হলোঃ সাদা চামড়ার মানুষেরা যুগ যুগ ধরে কালো চামড়ার মানুষদের উপরে অত্যন্ত নিষ্ঠুর আচরণ করে এসেছে। তারা এদেরকে মানুষ বলেই মনে করত না। অথচ তারাও ছিল রক্ত-মাংসে গড়া পূর্ণাঙ্গ মানুষ। তাদের অপরাধ ছিল শুধু একটাই—- তারা কৃষ্ণাঙ্গ! এ অপরাধে তাদেরকে অত্যন্ত নিষ্ঠুর নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করতে হত। কেউ মুখ খুললেই তার উপরে নেমে আসত আরো বড় কোনো নির্যাতনের খড়গ। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা—কেউই তাদের এ নির্যাতনের হাত থেকে নিস্তার পায়নি কখনোই। এরপরেও এসবের বিরুদ্ধে কালে-কালে, যুগে-যুগে প্রতিবাদ হয়েছে। পুরোপুরি থেমে থাকেনি মজলুম জনতার আর্তনাদে ভরা কণ্ঠস্বর। এ কারণে আমরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সময়ে বিশ্বনেতা দেখতে পাই। এদের হাত ধরেই উঠে আসে নেলসন ম্যান্ডেলার নাম…..আব্রাহাম লিংকনের নাম। আরো উঠে আসে মার্টিন লুথার কিংয়ের নাম। এ আন্দোলনে এরা একেকজন অমর কিংবদন্তী। এ রকম একজন কিংবদন্তী হলেন বব মার্লি। আমরা তাকে একজন বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে চিনলেও এর বাইরে তার আরেকটা পরিচয় ছিল। সঙ্গীতের পাশাপাশি তিনি কৃষ্ণাঙ্গদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সাথে আমৃত্যুকাল জড়িত ছিলেন। যুক্ত ছিলেন বামঘরানার রাজনীতির সঙ্গেও। এসব আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র অত্যন্ত সুনিপুণতার সাথে বইয়ের ক্যানভাসে তুলে ধরেছেন কাজী মুনতাসির। নিজেদেরকে দুনিয়ার সবচাইতে সভ্য বলে দাবি করা পশ্চিমা বিশ্বের জনগোষ্ঠীর অসভ্যতার জলছবি ফুটে উঠেছে শিল্পীর তুলির প্রতিটি আঁচড়ে। সবকিছু মিলিয়ে বেশ ভালো মানের একটি বই ছিল এটি। আশা করি, কেউ এতে নিরাশ হবেন না। ভালো লাগবে সকলের।

৫) নদী ও নারীঃ বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত এ উপন্যাসের রচয়িতা অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর। নদীমাতৃক এ দেশের মানুষের জীবনের সাথে নদী যে কত বেশি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের অজান্তেই, সে বিষয়টির উপরে এ উপন্যাসে মূল আলোকপাত করা হয়েছে। এ দেশের মানুষের জীবনের সাথে নদী ঠিক সেভাবেই জড়িয়ে আছে, যেভাবে পুরুষের জীবনে নারী জড়িয়ে আছে —- এ কথাটিকেই পুরো উপন্যাসজুড়ে নানা আঙ্গিকে, নানা ভঙ্গিমায় ফুটিয়ে তোলবার চেষ্টা করেছেন ঔপন্যাসিক। এসব কিছুর পাশাপাশি এ উপন্যাসটির অঞ্চলভিত্তিক দিকটি দেখতে গেলে এটিকে চরাঞ্চলের মানুষের জীবনাখ্যান বললেও খুব একটা অত্যুক্তি হবে না কখনওই। কারণ এ উপন্যাসের পুরো কাহিনী জুড়েই রয়েছে রাক্ষুসী পদ্মার ভাঙনের শিকার হওয়া নিপীড়িত গণমানুষের গল্প। বর্ণনাভঙ্গি ও উপন্যাসের কাহিনী এটিকে আলাদা রকম এক অনন্যতা দান করেছে। এসব কিছু মিলিয়ে এটি পড়বার অভিজ্ঞতা বেশ ভালো ছিল। আশা করি, কেউ নিরাশ বা আশাহত হবেনা না কোনোভাবেই।

৬) ডিরোজিওঃ এ বইটি লিখেছেন অভীক মজুমদার। এ বইটিতে ডিরোজিও নামক এক প্রগতিশীল সমাজ সংস্কারকের জীবনের গল্প সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হয়েছে অত্যন্ত সুন্দরভাবে। ব্রিটিশ ভারতে উনবিংশ শতাব্দীতে  Young Bengal Movement নামক এক বিপ্লব সংঘটিত হয়। কলকাতার হিন্দু কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে সংঘটিত এ আন্দোলনে সম্মুখপান থেকে নেতৃত্ব দেন এক ইউরেশীয় ব্যক্তিত্ব। বাবা জন্মসূত্রে পর্তুগীজ ও মা জন্মসূত্রে ভারতীয়। ক্ষণজন্মা এ মহীয়ান ব্যক্তিত্ব তৎকালীন সমাজে প্রচলিত ধর্মীয় গোঁড়ামি, অন্ধবিশ্বাস, রক্ষণশীলতা ইত্যাদির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যেই। অত্যন্ত আধুনিক মানসিকতার অধিকারী ডিরোজিও অত্যন্ত বন্ধুবৎসল ও স্নেহপরায়ণ ছিলেন। আজীবন সংগ্রাম করেছেন মানবতার পক্ষে। জীবনে অনেক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। কিন্তু কখনওই নিজের নীতি- নৈতিকতা, আদর্শ, মূল্যবোধ ইত্যাদি থেকে একচুল বিচ্যুত হননি। জীবনের প্রতিটি বিষয়কে তিনি তার যুক্তিবাদী দর্শনের সাহায্যে বিচার-বিশ্লেষণ করতে পছন্দ করতেন। তার এসব সংগ্রামের কিছু খণ্ডচিত্র ঠাঁই পেয়েছে আলোচ্য বইটিতে। আমার কাছে অনেক ভালো লেগেছে। তার চেয়ে বড় কথা, একজন পাঠক হিসেবে অনেক কিছু জানতে পেরেছি। শিখতে পেরেছি। আশা করি,আপনাদের কাছেও ভালো লাগবে।

৭) যদুনাথ সরকারঃ এটি একটি জীবনীগ্রন্থ, যার লেখক নূরুল ইসলাম মঞ্জুর। যদুনাথ সরকার নামক একজন বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তার জীবন কাহিনী এখানে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি তুলে ধরা হয়েছে তাঁর জীবনের নানা দিক। বিশেষত ইতিহাসবিদ হিসেবে তাঁর কর্ম ও অর্জনসমূহ এ গ্রন্থে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। এছাড়াও একটা ব্যাপারে এ বইটিতে খুব চমৎকারভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। সেটা হলোঃ মানুষের দৃঢ় ইচ্ছা থাকলে যেকোনো জায়গা থেকে নিজের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ যদুনাথ সরকারের কথা বলা যেতে পারে। তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। অথচ পরবর্তীকালে ইতিহাস বিষয়ে গবেষণা করে জগতে নাম কুড়িয়েছেন। এ থেকে উপরের কথার সত্যতা পাওয়া যায়। সবমিলিয়ে বেশ ভালো লেগেছে বইটি আমার। আশা করি,বাকিদেরও ভালো লাগবে অনেক।‌

৮) ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলঃ এ ব ইটি লিখেছেন বাংলা সাহিত্যের প্রধান প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ূন আজাদ। বরাবরের মত এ ব ইটিতেও তিনি প্রচলিত প্রথার তুমুল সমালোচনা করেছেন। এটি করতে গিয়ে তিনি পুরো বাংলাদেশের ধর্মের নামে চলে আসা কিছু নৃ্শংসতার নির্মম চিত্র তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি যারা ধর্মের মুখোশের আড়ালে অপকর্মে লিপ্ত থাকে সকলের দৃষ্টির বাইরে থেকে, এরকম উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গের প্রকৃত চেহারা তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন। এছাড়া তিনি এ দেশের দুজন স্বৈরশাসকের শাসনকালে চলা অমানবিকতার চিত্র ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছেন। এর সাথে ১৯৭১ সালের পাকবাহিনীর নির্মমতার চিত্র তুলে এটা বুঝাতে চেষ্টা করেছেন যে বাঙালি কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্মমতায় পাকবাহিনীকেও ছাপিয়ে গেছে। তবে এসব সমালোচনা করতে গিয়ে অনেক জায়গায় তিনি খুব বেশি পরিমাণেই অশ্লীল ভাষাপ্রয়োগের শরনাপন্ন হয়েছেন। ৫৬ হাজার বর্গমাইল আয়তনের এ দেশটির নানা অসঙ্গতি নিয়ে লেখা এ ব ইটির আলোচ্য বিষয়বস্তু ও সার্বিক ভাষারীতি ভালো লাগলেও এ দিকটি আমার কাছে একদম-ই ভালো লাগেনি। তার লেখাতে এ দিকটি না থাকলে তার লেখা আরো বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেত বলে আমার ধারণা। জানিনা, অন্যরা কী মনে করেন এ ব্যাপারে! এ দিকটি ছাড় দিলে বাকি দিকগুলো ভালো লাগবে সবার। কারণ এ লেখকের বইতে যেমন অশ্লীলতার প্রাচুর্য থাকে, তেমনি শিক্ষণীয় অনেক কিছুও থাকে।

৯) শ্রেষ্ঠ বড় গল্প (শরৎচন্দ্র)ঃ বইয়ের নাম দেখে কারোরই নিশ্চয়ই বুঝতে বাকি নেই যে এ বইটি কে লিখেছেন! তবুও সকলের জ্ঞাতার্থে আরেকবার বলছি— এটি অপরাজেয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত একটি গ্রন্থ। ছোটগল্পের সঙ্গে আমরা সকলেই কমবেশি পরিচিত হলেও বড়গল্প শব্দটার সাথে তেমন পরিচিত নই কেউই তেমন। সত্যি বলতে, এ বইটি পড়বার আগে এ ব্যাপারে আমার নিজেরও কৌতূহলের অন্ত ছিল না। যা হোক, এটিতে আসলে ভিন্নধর্মী তিনটি গল্প তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো হলোঃ রামের সুমতি, বিন্দুর ছেলে ও মেজদিদি। এগুলো আকৃতিতে উপন্যাসের মত হলেও প্রকৃতার্থে এগুলিকে উপন্যাস না বলে বড়গল্প বলাটাই অধিকতর শ্রেয়। গল্প তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্নস্বাদের, ভিন্নরসের হলেও এ গল্পত্রয়ের মাঝে এক অদ্ভুত মিল রয়েছে। সেটা হচ্ছে, এ তিনটি গল্পই কিশোর পাঠ উপযোগী করে লেখা। পাশাপাশি তিনটিতে গুরুত্বপূর্ণ বা মুখ্য চরিত্রে কিশোর বয়সী কাউকে দেখা যায়। যা হোক, সবমিলিয়ে বেশ ভালো মানের লেখা বলে মনে হয়েছে। কিশোর পাঠক-পাঠিকাদের জন্য কঠিন বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞানলাভে বইটি সহায়ক হবে বলে আমার ধারণা। অন্যরাও এতে উপকৃত হবেন নিশ্চয়ই। সর্বোপরি কেউ নিরাশ হবেন না বইটি পড়ে।

১০) বিশ্বপরিচয়ঃ এ বইটি লিখেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তথ্যবহুল এ বইটিতে লেখক বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি ও চলমান কার্যপ্রণালী তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রহ-উপগ্রহ, নক্ষত্র, চন্দ্র-সূর্য প্রভৃতির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি অত্যন্ত চমৎকার ভাষায় তুলে ধরার কাজটি বেশ সুন্দরভাবেই সমাধা করতে পেরেছেন রবীন্দ্রনাথ। এছাড়াও বিভিন্ন পরিসংখ্যানগত সহায়ক তথ্য-উপাত্তের সাবলীল উপস্থাপনা বইটিকে এক আলাদা মাত্রা দান করেছে। সত্যি বলতে, বইটি পড়ে আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে অনেক বেশি উপকৃত হয়েছি। মহাবিশ্ব সম্পর্কে ব্যাসিক জ্ঞান লাভের পাশাপাশি আমার একাডেমিক ফিল্ডের অনেক কিছুই জানতে পেরেছি, যা আমি একাডেমিক বই পড়েও জানতে পারিনি অনেকক্ষেত্রে। সবকিছু মিলিয়ে, অনন্যসাধারণ মানের একটি বই এটি। আশা করি, সকলেরই ভালো লাগবে। পাশাপাশি প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে উপকৃত হবেন অবশ্যই!

১১) কোন কাননের ফুলঃ এ উপন্যাসটি লিখেছেন ইমদাদুল হক মিলন। সমসাময়িক কালের জীবন কাহিনীকে উপজীব্য করে এ উপন্যাসটি রচনা করা হয়েছে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রাত্যহিক জীবন কাহিনীর চিত্র উঠে এসেছে এ বইটির পাতায় পাতায়। পাশাপাশি বয়স পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের জীবনযাত্রায় যেসব বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়, সেটিও তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়াও আনুষঙ্গিক আরো অনেক কিছুই এর সাথে ছিল। সবকিছু মিলিয়ে তেমন খারাপ লাগেনি বইটি। তবে সার্বিক বিবেচনায় আমার কাছে মনে হয়েছে যে ঔপন্যাসিক খুব বেশি পরিমাণে জটিল করে ফেলেছেন লেখাটিকে। লেখনী সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় হলেও অত্যধিক বিষয়ের অবতারণা এটিকে হালকা করে তুলেছে বলে আমার ধারণা। জানিনা, অন্য পাঠকেরা আমার সাথে এ বিষয়ে একমত পোষণ করবেন কিনা!

১২) মেমসাহেবঃ এ বইটি লিখেছেন ওপার বাংলায় জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও বিশিষ্ট সাংবাদিক নিমাই ভট্টাচার্য। বইটির মূল আলোচ্য বিষয়বস্তু নর-নারীর শাশ্বত প্রেম। একজন পুরুষের উত্থানের পেছনে একজন প্রেরণাদায়িনী নারীর ভূমিকা যে ঠিক কতখানি, সেটা এ বই পড়ার পূর্বে জানলেও সেভাবে অনুধাবন করতে পারতাম না আসলে। প্রেমের উপন্যাস অনেকেই লিখে। কিন্তু এটাকে যে এত চমকপ্রদ ও অনন্যসাধারণ ভাষাতেও উপস্থাপন করা যায়, সেটা এ বই পড়বার আগে আমার জানা ছিল না। বইয়ের ভাষার গাঁথুনি আসলেই অত্যন্ত অসাধারণ। শেষের দিকে যে ট্রাজেডি রয়েছে, তাতে যেকোনো পাঠকের হৃদয় অশ্রুভারাক্রান্ত হতে বাধ্য। সবকিছু মিলিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে, এটাকে সাধারণ প্রেমের উপন্যাস না বলে একজন পুরুষের উত্থানের জন্য একজন নারীর নিরব আত্মত্যাগের উপাখ্যান বলাটাই বোধ হয় অধিকতর শ্রেয় হবে। যা-ই হোক, সার্বিক বিবেচনায় বলতে গেলে একটি কথাই বলতে হয়…….এটি একটি অবশ্যপাঠ্য বই।

১৩) আহমদ ছফার ডায়েরিঃ এ বইটি একটি সম্পাদিত গ্রন্থ। বইটি সম্পাদনা করেছেন আহমদ ছফার ভ্রাতুষ্পুত্র নূরুল আনোয়ার। বইটির নাম দেখেই এর আলোচ্য বিষয়বস্তু অত্যন্ত সহজেই অনুমেয়। এখানে মূলত আহমদ ছফার জীবন কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। তবে তফাৎ হলো, আর দশজন সাধারণ মানুষের ডায়েরির মত শুধু জীবন কাহিনীর বর্ণনা এখানে বিবৃত করা হয়নি। জীবনের ঘটনাপঞ্জী বর্ণনার সাথে সাথে উঠে এসেছে আহমদ ছফার জীবন দর্শন। উঠে এসেছে সমকালীন রাজনীতি, সমাজব্যবস্থা ও অর্থনীতি সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা। এসব আলোচনা বইটিতে স্থান করে নেওয়াতে বইটি আলাদা মর্যাদার আসনে আসীন হয়েছে। সার্বিকভাবে বইটি আমার কাছে বেশ ভালোই লেগেছে। আশা করি, কোনো পাঠক বইটি পড়লে আশাহত হবেন না কোনোভাবেই।

 

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!