ডায়েরির আলোয় তরুণ তাজউদ্দীন

Reading Time: 3 minutes

বাংলাদেশকে পৃথিবীর বুকে একটি মুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে যে ক’জন মহান ব্যক্তির অবদান কখনো ভুলবার নয় এবং যাদের ঋণ কোনদিন শোধ করা যাবে না, তাঁদের মধ্যে যাকে নিয়ে সবচেয়ে কম আলোচনা হয় এবং যাকে জানার আগ্রহ তরুণদের মধ্যে যতসামান্য! তিনি আর কেউ নন, স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ।

বাঙালি জাতির একজন শ্রেষ্ঠ সন্তান তাজউদ্দীন আহমদের জন্ম ২৩ শে জুলাই। আর এই জন্মদিন উপলক্ষে তরুণ তাজউদ্দীন আহমদের বীরত্ব গাথা জীবনের খানিকটা অংশ জানবার একটি মোক্ষম সুযোগ তৈরি করেছিল বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম। বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম গত ২২ শে জুলাই শনিবার তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে একটি বিশেষ লেকচার আয়োজন করে যার শিরোনাম ছিলো “ডায়েরির আলোয় তরুণ তাজউদ্দীন”। তাজউদ্দীন আহমেদের নিজের লেখা ডায়েরি থেকে তাঁর জীবন শৈলী তুলে আনেন বিশিষ্ট লেখক, সাংবাদিক ও গবেষক ড. কাজল রশীদ শাহীন।

ড. কাজল রশীদ শাহীন ইতিপূর্বেই একটি লেকচারে আলোচনা উপস্থাপনে শব্দ চয়নের বৈচিত্র্যতার মাধ্যমে শ্রোতাদের মন কে কীভাবে আলোচনায় ডুবিয়ে রাখা যায় তা দেখিয়েছেন। তবে এই আলোচনায় তিনি তুলে এনেছিলেন একটি ডায়েরির পাতায় লুকায়িত ছোট ছোট তথ্যগুলোকে যা হয়তো অবলিলায় একজন সাধারণ পাঠকের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়।

আলোচক শুরুতেই তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে সরদার ফজলুল করিম স্যারের করা একটি উক্তি তুলে ধরেন। ফজলুল করিম স্যার বলেছিলেন- “তাজউদ্দীন তাঁর সময়ের আগে জন্মেছিলেন, তাই তাঁকে বুঝতে আমাদের এখনো অনেক বাকি”। তাজউদ্দীন সত্যিই কি সময়ের আগে এসেছিলেন, নাকি সময় তার ব্যর্থতা ঢাকবার জন্য এই শব্দ গুলো তৈরি করেছে তার একটি ব্যাখ্যা তুলে ধরবার চেষ্টা করেন কাজল রশীদ। আলোচক বলেন, তাজউদ্দীন আহমদের বুদ্ধিদীপ্ত মেধার বিকাশ ঘটেছিল শৈশবেই। উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র অবস্থাতেই ডায়েরি লেখা শুরু করেন। তিনি তাঁর ডায়েরিতে প্রতিটি কাজের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উল্লেখ করেছেন। তবে তার ডায়েরির একটি বিশেষ  বৈশিষ্ট্য ছিল যে, প্রতিটি পৃষ্ঠার শেষে তিনি ঐ দিনের আবহাওয়া ও লিখে রেখেছিলেন যা তখনকার সময়ে ছিল বিরল ইতিহাস। এখান থেকেই তাজউদ্দীন আহমদের কোন বিষয়ের প্রতি দূরদৃষ্টির একটি বাস্তব প্রমান পাওয়া যায়।

১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ যখন তিনি বাসা থেকে বের হয়ে যান, তখন তার স্ত্রীর কাছে শুধুমাত্র একটি চিরকুট লিখে গিয়েছিলেন “যদি বেঁচে থাকি দেখা হবে দেশ স্বাধীনের পর”। যুদ্ধের সময় কলকাতা থাকাকালীন তিনি পরিবারের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেননি নিজের ইচ্ছেতেই। তিনি যখন সৈয়দ নজরুল ইসলামের সাথে দেখা করতে যেতেন তখন চাইলে তাঁর পরিবারের সাথেও দেখা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি, বরং তিনি ভেবেছেন সমগ্র বাঙালি জাতির কথা। তাঁর এই কর্তব্যবোধের কাছে হার মেনেছিল সন্তানের প্রতি একজন পিতার ভালোবাসাও।

ড. কাজল রশীদ শাহীন, তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি থেকে যে বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন তা হলো সময়ের প্রতি তাজউদ্দীন আহমদের সচেতনতা। তিনি যুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাস মাত্র একটি জামা পরিধান করেছিলেন! যা প্রতি রাতেই নিজ হাতে ধুয়ে দিতেন। একদিন রাতে জোহরা তাজউদ্দীন তার সন্তানদের নিয়ে হাজির হলেন তাজউদ্দীন আহমদের কাছে। তাদের দেখে তিনি বললেন, “আগামীকাল সিনেটর কেনেডিকে নিয়ে রণাঙ্গনে যেতে হবে তাই রাতেই জ্বরের সুযোগে শার্টটি ধুয়ে ফেললাম”। আমরা যেখানে জ্বরের অজুহাতে নিজেদের দৈনন্দিন কাজ থেকে দৌড়ে পালাই, তাজউদ্দীন আহমদ সেখানে জ্বরের সুযোগকে শার্ট ধোয়ার কাজে লাগিয়েছেন। একারনেই তার নেতৃত্বে অর্জিত হয়েছিল স্বাধীনতা, সৃষ্টি হয়েছিল একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’।

মূল আলোচনা শেষে শ্রোতাদের মধ্যে থেকে অনেকেই তাদের মতামত ব্যক্ত করেন, তুলে ধরেন তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে নিজেদের চিন্তা-চেতনা। জনাব সাবিদিন ইব্রাহিম বলেন, “আমরা তাজউদ্দীন আহমদকে জাতীয় চার নেতার খেতাবে আবদ্ধ করে ফেলেছি, যার কারনে ব্যক্তি তাজউদ্দীন রয়ে গেছে আলোচনার বাইরে। আমাদের এই ফ্রেমবন্দি চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে স্বতন্ত্র ব্যক্তিস্বত্বাকে জানবার আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে”।

তবে উপস্থিত শ্রোতাদের আলোচনায় যে প্রশ্নটি উঠে আসে তা হলো স্বাধীনতা পরবর্তী শেখ মুজিবের সাথে তাজউদ্দীন আহমদের সম্পর্কের শীতলতার কারন। সবশেষে ড. কাজল রশীদ শাহীন বঙ্গবন্ধু এবং তাজউদ্দীন আহমদের মধ্যে সম্পর্কের বৈরিতার সমসাময়িক কারনগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরেন।

***এই আলোচনা অনুষ্ঠানের প্রশ্নোত্তর পর্বটি দেখতে চাইলে এই লিঙ্ককে ক্লিক করুন।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!