দশটি বই সম্পর্কে কিছু কথা

Reading Time: 6 minutes

কথিত আছে, বই মানুষের সবচাইতে কাছের বন্ধু। জ্ঞানচর্চার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে এটি বিবেচিত হয়ে থাকে। আমার পড়া দশটি বই সম্পর্কে নিজস্ব কিছু মতামত পাঠকের সমীপে তুলে ধরাই এ পোস্টের মূল লক্ষ্য, যেন তারা বই পড়ার প্রতি আরো আগ্রহী হয়ে ওঠেন। আমার এ পোস্ট পড়ার পরে একজন পাঠকেরও যদি বই পড়ার আগ্রহ বাড়ে একটু হলেও, তবে সেটাই হবে আমার পরম সার্থকতা। তো, আর দেরি কেন,পাঠক? আসুন, এক নিমিষে দেখে আসা যাক—–

১) সংস্কৃতিঃ এ বইটি লিখেছেন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক আহমদ শরীফ। এ বইটিতে মূলত সংস্কৃতির বিভিন্ন তাত্ত্বিক দিকসমূহ তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক সংস্কৃতির সাথে বাঙালি সংস্কৃতির বিভিন্ন দিকসমূহের তুলনামূলক একটি ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়েছে। আরেকটা ব্যাপার হলো…….এ ব্যাপারে আমরা সকলেই কম-বেশি অবগত আছি যে ব্যক্তিগত জীবনে আহমদ শরীফ ছিলেন স্বঘোষিত নাস্তিক। কোনো লেখক যেহেতু তার লেখনীতে নিজস্ব চিন্তাধারারই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে থাকেন, সেহেতু এ দিকটি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি লেখকের পক্ষে। অর্থাৎ এ বইটি নাস্তিক্যবাদের প্রভাব অত্যন্ত সুস্পষ্ট, যা কোনো আস্তিকের নিকটে অবশ্যই বর্জনীয়। এ দিকটি বাদ দিলে সার্বিক বিবেচনায় বইটি অনেক ভালো, বিশেষত আমাদের সংস্কৃতির বিবর্তনের ইতিহাস জানবার পক্ষে। আশা করি, সকলের ভালো লাগবে।

২) তেইশ নম্বর তৈলচিত্রঃ এ উপন্যাসের রচয়িতা আলাউদ্দিন আল আজাদ। এ ব ইটি মূলত কিছুটা ইতিহাস নির্ভর। না, এটা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ইতিহাস নয়। শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি যে, একটি চিত্রকর্মের পেছনের গল্পকে কেন্দ্র করে এগিয়ে গেছে এ উপন্যাসের গল্প। অর্থাৎ একটি চিত্রকর্মের আড়ালে লুকিয়ে থাকা গল্পকে ঘিরে রচিত হয়েছে বইটি……গল্পটি শুধু ইতিহাস নয়; একটি সম্পূর্ণ জীবন দর্শন রয়েছে এতে। সচরাচর কোনো সাধারণ দর্শকের পক্ষে এভাবে কোনো সৃষ্টিকর্মের পেছনের গল্প জানা সম্ভব হয় না কখনোই। সত্যি বলতে, তেমন কোনো সুযোগ সাধারণত থাকে না। যা হোক, ঔপন্যাসিকের অসাধারণ লেখনশৈলী গল্পটিকে এক আলাদা অনন্যতা দান করেছে, যা গল্পটির ঐতিহাসিকতাকে ছাড়িয়ে তাকে নিয়ে গেছে অনেক উর্ধ্বে। সার্বিক বিবেচনায় খুব ভালো লেগেছে আমার বইটি।

৩) হুমায়ূননামাঃ এ বইটি লিখেছেন গুলবদন বেগম। নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে, এটি মুঘল সম্রাট হুমায়ূনের আত্মজীবনী। মূল গ্রন্থটি ফারসি ভাষায় লেখা হলেও বিভিন্ন ভাষায় এটি অনুদিত হয়েছে। এ বইটিতে মূলত সম্রাট হুমায়ূনের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। এসব ঘটনার অনেক কিছুই আমরা ইতিহাসের কোথাও খুঁজে পাইনা। কেননা, এগুলো কোথাও সেভাবে তুলে ধরার উদ্যোগ নেয়া হয়নি সেভাবে। বইটিতে লেখিকার জবানিতে সম্রাট হুমায়ূনের জীবনের অনেক অজানা সত্য উঠে এসেছে। এক কথায়, একটি রাজ পরিবারের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ইস্যু যেমন, ফ্যামিলি পলিটিক্স, অভ্যন্তরীন কোন্দল, অন্তর্দ্বন্দ্ব, ভ্রাতৃত্ববোধ, পারস্পরিক সম্প্রীতি, ক্ষমতার লড়াই ইত্যাদি ব্যাপারগুলো উঠে এসেছে এ বইটিতে। বস্তুত লেখিকা সম্পর্কে সম্রাট হুমায়ূনের বৈমাত্রেয় ভগিনী ছিলেন। এ কারণে তার পক্ষে ভেতরের ব্যাপারগুলো জানা সম্ভব হয়েছে বলে আমার ধারণা। আশা করি, অন্যান্য পাঠকেরাও এ ব্যাপারে আমার সাথে দ্বিমত পোষণ করবেন না। এছাড়া এ বইটিকে কোনো ঐতিহাসিক গ্রন্থ না ভেবে লেখিকার নিজস্ব স্মৃতিচারণা বলে বিবেচনা করাই অধিকতর শ্রেয় হবে বলে আমার ধারণা। লেখিকা অনেকটা গল্পচ্ছলে ইতিহাসকে টেনে এনেছেন এ বইটিতে। এখানেই তার বিশেষত্ব, বইটির বিশেষত্ব। সবমিলিয়ে খারাপ লাগেনি বইটি। তবে কেউ এটিকে ইতিহাসের প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করলে তাকে এ বইটি না পড়ার পরামর্শ থাকবে আমার পক্ষ থেকে।

৪) ক্রীতদাসের  হাসিঃ এটি একটি ব্যঙ্গমূলক উপন্যাস, যার রচয়িতা শওকত ওসমান। ব্যঙ্গমূলক উপন্যাস হলেও বেশ কিছু বাস্তবধর্মী, দর্শনগত সত্য উঠে এসেছে বইটাতে। সবচেয়ে বড় যে সত্যটি এ বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে, তা হলোঃ হাসি মানুষের আত্মারই প্রতিধ্বনি। অর্থ-সম্পদ-অস্ত্রের জোরে সবকিছু করা সম্ভব হলেও কারো মুখে প্রকৃত হাসি ফোটানো সম্ভব হয় না কখনোই। উল্লেখ্য যে, এটি বিখ্যাত আরব্য উপন্যাস “সহস্র ও এক রজনী” শীর্ষক উপন্যাসে উল্লেখিত একটি গল্পের কাহিনীকে নির্ভর করে রচিত একটি উপন্যাস। সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে এটি বেশ উঁচুমানের একটি সাহিত্যকর্ম। বেশ ভালো লেগেছে বইটি।

৫) সূর্যদীঘল বাড়িঃ বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত এ উপন্যাসটির রচয়িতা আবু ইসহাক। উপমহাদেশ বিভক্ত করণকালীন সময়ের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এ উপন্যাসটি রচিত। তৎকালীন সময়ের সামাজিক বাস্তবতা, ধর্মবিশ্বাস, কুসংস্কার ইত্যাদি বিষয়গুলোর খুব চমৎকার একটি উপস্থাপনা এ উপন্যাস। এছাড়া সে সময়কার জীবন বাস্তবতার পাশাপাশি ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের কারণে মানুষের জীবনে নেমে আসা আকালের দিকটিও উঠে এসেছে এ উপন্যাসে। সার্বিক বিবেচনায় বেশ দারুণ একটি বই এটি। অনেক ভালো লেগেছে আমার কাছে।

৬) রাইফেল, রোটি, আওরাতঃ এটি একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস, যার রচয়িতা আনোয়ার পাশা। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এ দেশে কীভাবে পাক হানাদার বাহিনী নির্বিচারে ধ্বংসলীলা চালিয়েছে, তার-ই একটি সামগ্রিক চিত্র ফুটে উঠেছে এ বইটিতে। বিশেষ করে পঁচিশে মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানী খানসেনা কর্তৃক ঘটে যাওয়া অমানবিক হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে এ উপন্যাসে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এ দেশের মানুষের মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র এখানে প্রতিফলিত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, এটি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে রচিত প্রথম উপন্যাস। একটা কথা না বলে পারছি না। সেটা হলোঃ ব্যক্তিগত জীবনে আনোয়ার পাশা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। ইংরেজি সাহিত্যের একজন শিক্ষকের হাত ধরে বাংলা সাহিত্যের এরকম উঁচুদরের সাহিত্যকর্ম রচিত হতে দেখলে সত্যিই ভীষণভাবে অবাক হতেই হয়। আমার এ কথাটি কতটা যৌক্তিক, তা কোনো পাঠক বইটি পড়লে অনুধাবন করতে পারবেন। লেখকের ভাষাশৈলী আমাকে দারুণভাবে অবাক করে দিয়েছে। এক কথায়, সবকিছু মিলিয়ে অনন্যসাধারণ একটি বই!!

৭) পুতুল নাচের ইতিকথাঃ এ উপন্যাসের রচয়িতা বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক মানিক বন্দোপাধ্যায়। এ  উপন্যাসটি মূলত একটি গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে। আরো সুস্পষ্ট ভাষায় বলতে গেলে একজন গ্রাম্য চিকিৎসকের গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এ উপন্যাসে। গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায় সর্বত্র কুসংস্কার-অন্ধবিশ্বাসের ছড়াছড়ি। এরকম একটি সমাজব্যবস্থায় একজন বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষ কী করে টিকে থাকেন, কীভাবে সামাজিক বিষয়গুলো বিবেচনা করেন, এসব ব্যাপারগুলোও উঠে এসেছে উপন্যাসটিতে। এছাড়াও মানুষের চিরাচরিত জীবনধারা, প্রণয়, বিয়ে ইত্যাদি ব্যাপারগুলোও বাদ পড়েনি উপন্যাসটিতে। সার্বিক বিবেচনায়, বেশ ভালো মানের একটি বই। আশা করি, ভালো লাগবে সকলের। একটা কথা উল্লেখ না করে পারছি না……উপন্যাসটি এমন ধরনের যে এর মূল বিষয়বস্তু খুঁজে পেতে আমাকে রীতিমত হিমশিম খেতে হয়েছে। এমনকি বইটির শুরুতে উল্লেখকৃত ভূমিকা পড়েও তেমন কিছুই আন্দাজ করা সম্ভব হয়নি আমার পক্ষে!

৮) লালসালুঃ এ উপন্যাসটি লিখেছেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। আমাদের সমাজের কিছু নির্মম বাস্তবতার নিরিখে এ বইটি লেখা। জাতিগতভাবে আমরা প্রচণ্ড ধর্মভীরু। পাশাপাশি প্রকৃত ধর্মীয় জ্ঞান আমাদের অধিকাংশ লোকের নেই বললেই চলে। এ কারণে একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী মহল এ সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকে। ধর্মের নামে তারা নিজেদের পকেট ভারী করে। ঠিক এরকম একটি বাস্তবধর্মী গল্পকে কেন্দ্র করেই এগিয়ে চলে “লালসালু” উপন্যাসের কাহিনী। সার্বিকভাবে, বেশ ভালোই লেগেছে বইটি আমার! জানিনা, অন্যদের কেমন লাগবে!!!

৯) আমারে কবর দিও হাঁটুভাঙ্গার বাঁকেঃ এটি একটি অনুবাদ গ্রন্থ। অনুবাদ করেছেন দাউদ হোসেন। মূল বইয়ের নাম Bury my heart at wounded knee, যার রচয়িতা ডি ব্রাউন। এ বইটির মূল আলোচ্য বিষয় আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রেড ইন্ডিয়ানদের ইতিহাস। মূলত বইটিতে তৎকালীন রেড ইন্ডিয়ান উপজাতির লোকেদের আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ কর্তৃক নির্যাতিত হবার গল্প তুলে ধরা হয়েছে। দেখানো হয়েছে, কীভাবে শ্বেতাঙ্গরা অত্যন্ত নির্মমভাবে নির্যাতন চালিয়েছে কৃষ্ণাঙ্গ লোকেদের উপরে। পাশাপাশি বর্ণিত হয়েছে শান্তিচুক্তির নামে তাদের প্রতারণা তথা বিশ্বাসঘাতকতার গল্প। পুরো উনবিংশ শতাব্দী জুড়ে চলা শ্বেতাঙ্গদের এ নিষ্ঠুরতার কাহিনী এ বইটিতে বেশ চমকপ্রদভাবে, গল্পাকারে তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী মানবতার ধোঁয়া তুলে বেড়ানো আমেরিকানদের হাঁড়ির খবর জানতে এ বইটি বেশ ভালোই কাজে আসবে বলে আমার বিশ্বাস। সার্বিকভাবে অনেক ভালো লাগার একটি বই।

 

১০) বিপন্ন জাহাজের এক নাবিকের গল্পঃ বইটি একটি অনুবাদ গ্রন্থ।মূল বইটি (The story of a shipwrecked sailor) লিখেছেন বিখ্যাত কলম্বিয়ান সাহিত্যিক গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। ভাষান্তর করেছেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। ১৯৫৫ সালে ঘটে যাওয়া এক সত্যিকারের জাহাজ দুর্ঘটনার আলোকে এটি লেখা। উক্ত দুর্ঘটনায় মাত্র একজন নাবিক জীবিত ফিরে আসতে সক্ষম হয়। এ জন্য তাকে টানা ১১ দিন কোনোরকম পানাহার ছাড়াই নির্ঘুম অবস্থায় প্রতিকূল প্রকৃতির সাথে লড়াই করে যেতে হয়। অবিশ্বাস্য রকম মানসিক দৃঢ়চেতার অধিকারী এ জীবনযোদ্ধার অসম লড়াইয়ের গল্প উঠে এসেছে বইটিতে। এ ধরনের গল্প আমাদেরকে প্রেরণা জোগানোর জন্য অত্যন্ত সহায়ক বলে আমি মনে করি। গল্পটি অতি সাধারণ বা চিরাচরিত ধরনের হলেও গল্পকারের লেখনশৈলী অত্যন্ত উঁচুদরের,যা পাঠকের কাছে বইটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে বলে আমার ধারণা।

 

 

 

 

 

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!