অ্যান্থনী ম্যাসকারেনহাসের ‘দ্য রেইপ অব বাংলাদেশ’

Reading Time: 8 minutes

পূর্ব বাংলায় স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে এ বিষয়ে সংবাদ প্রচার করা ছিল আমাদের কাজ বা এ্যাসাইনমেন্টদ্য রেইপ অব বাংলাদেশ গ্রন্থের রচয়িতা অ্যান্থনী ম্যাসকারেনহাস তাঁর এই উক্তির মাধ্যমে তুলে ধরেন পূর্ব পাকিস্তানে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ রাত থেকে পাক বাহিনী যে নারকীয় গণহত্যাকান্ড পরিচালনা করে তা বিশ্ববাসীর কাছে ধামা চাপা দেয়ার জন্য অ্যান্থনী ম্যাসকারেনহাস সহ কয়েক জন সাংবাদিক ও আলোক চিত্রশিল্পীকে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা পূর্ব পাকিস্তানে পাঠায়। যেন তারা মিডিয়ায় প্রচার করে যে পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজমান।

পূর্ব বাংলায় আমি যা দেখেছি, হিটলার বা নাৎসীদের অমানবিক অত্যাচারের কথা যা পড়েছি, তার চেয়েও ভয়াবহ মনে হয়েছে। পূর্ব বাংলায় পৌছার পর লেখক যা দেখলেন, তাতে তিনি শিউরে ওঠেন। নিরীহ বাঙালির উপর এ কেমন অত্যাচার! তিনি তাৎক্ষনিক মত পরিবর্তন করেন। মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে তিনি লন্ডনে পৌঁছান এবং সানডে টাইমস এর কাছে বাঙালিদের উপর পাক বাহিনীর বর্বরতার খবর জমা দেন। ১৩ জুন ১৯৭১ তারিখে সানডে টাইমস পাকিস্তানের গণহত্যার সকল ঘটনা বিশ্ববাসীর কাছে প্রকাশ করে। বিশ্ববাসী জানতে পারে পূর্ব পাকিস্তানেরর নির্মম পরিহাসের কথা।

সানডে টাইমস এ যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল, এই বইটি সেই প্রতিবেদনেরই যুক্তিসঙ্গত অনুসিদ্ধান্ত। এ বইটিতে উঠে এসেছে, ভয়াবহ ঘটনাগুলোর রাজনৈতিক পটভূমি এবং সে সময়ের মানবজাতির সবচেয়ে বিয়োগান্ত ঘটনার প্রধান চরিত্রগুলোর অভিসন্ধির ব্যাখ্যা। লেখক নিজ অভিজ্ঞতা থেকেই তা করেছেন। ১৪ টি অধ্যায়ে লেখক তা প্রকাশ করেছেন।

.পাকিস্তানে দুর্বিপাকের পূর্বরঙ্গ : এ অধ্যায়ে লেখক ২৫ শে মার্চ ১৯৭১ রোজ বৃহস্পতিবারের ঢাকা বিমান বন্দরের চিত্র তুলে ধরেছেন। আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান দশ দিন পূর্বে ফুরফুরে মেজাজে ঢাকায় এসেছিলেন আলোচনা করে সমঝোতায় পৌঁছাতে। কিন্তু তিনি হতাশা নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যান। লেখক এখানে একটা বিষয় স্পট করেছেন যে, ইয়াহিয়া মুখে আলোচনার কথা বললেও অন্তরে তার অন্য কিছু ছিল। পূর্ব পাকিস্তানে এসে তিনি ২৫ শে মার্চ রাতের নীল নকশা তৈরি করেন। আর তার দায়িত্ব টিক্কা খানকে দিয়ে তিনি করাচিতে পাড়ি জমান।

. পাকিস্তান পতনের কারন গুলোর যৌক্তিকতা : ন্যায় সঙ্গত দাবীর সামান্যটুকু পর্যন্ত তোমাদের নিকট থেকে অর্জন করতে আমাদের বার বার প্রচুর ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে এবং চরম মূল্য দিতে হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমানের এই উক্তির মাধ্যমে উঠে আসে ২৪ বছরের ঔপনিবেশিক সম্পর্কের এক ইতিহাস। পাকিস্তানের পতন যে যুক্তি সঙ্গত তা লেখক এ অধ্যায়ে আলোকপাত করেছেন। পাকিস্তানের সত্যিকার অর্থে একটি আদর্শিক ভিত্তি থাকলেও, আদর্শিক রাষ্ট্র হিসেবে যা সাধারণত বলা হয়ে থাকে তা ছিল না। একজন মুসলিম কি করে একজন মুসলিমের উপর গুলি করতে পারে, ধর্ষণ করতে পারে, হত্যা করতে পারে?

ধর্মের ভিত্তিতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠলেও, এ ধর্ম দু’দেশের মধ্যে স্থায়ী কোনো সম্পর্ক তৈরি করতে পারেনি। ধর্ম ছাড়া অন্য কোনো দিক দিয়ে দু’দেশের মধ্যে মিল ছিল না। দু’দেশের জনগনের ভাষা ও চিন্তার রয়েছে পার্থক্য, তাদের জীবনযাত্রা, আহার ও বেশ ভূষার নিজস্বতা রয়েছে। তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে বসবাস করে। এমন কি তাদের খেলাধুলা ও আলাদা মেজাজের। রাজনৈতিক ভাবেও দুটি অঞ্চল ভিন্ন তরঙ্গে বাঁধা। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রকৃতি জনগনকে কর্মঠ ও উগ্র করেছে। বাঙালিরা এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ আলাদা। ভদ্র ও মর্যাদা সম্পূর্ণ বাঙালি, তারা সহজ জীবন যাবন ও ব-দ্বীপ এলাকার প্রাচুর্যে বসবাসে অভ্যস্ত।

আরেক টা বিষয় লক্ষ্য করলে দেখব, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান দেশ একটা হলেও এপারের সাথে ওপারের বিয়ে-সাদী হচ্ছে না। দু’দেশের একমাত্র যোগসূত্র ইসলাম। কিন্তু ২৪ বছরের ইতিহাস প্রমাণ করে যে, দু’ অঞ্চলের পরস্পরের সাধারণ ক্ষেত্র হিসেবে ধর্ম খুব নগন্য বন্ধন সৃষ্টি করেছে। সময়ের সাথে সাথে পাকিস্তানিরা প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ ও জনবহুল পূর্বাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করতে লাগলো। পূর্ব বাংলা তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রতিরোধ করতে শুরু করলো। এ পটভূমিতে অর্থনৈতিক বিষয় গুলো এলো সামনে আর ধর্মের স্থান গেল পিছনে। দু’দেশের মধ্যে বিরোধ তীব্র হতে লাগলো। পাঞ্জাবের এক রাজনীতিবিদ এমন পরিস্থিতিতে বলতেন- শুধু দু’টো পাখাই দেখা যাচ্ছে, পাখি দেখা যাচ্ছে না

. পাকিস্তানে সংঘর্ষের মূল কারন সমূহ : বাঙালিরা নানাবিধ কারনে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের উপর অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে যা ‘৪৭ পর থেকে সৃষ্টি হয়েছে। লেখক এখানে মূলত ৪ টি কারন কে গুরুত্ব দিয়েছেন—

  • রাষ্টীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণভাবে বাঙালিদের অস্বিকার করা।
  • মাতৃভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বহু বছরের অস্বীকৃতি।
  • পশ্চিম পাকিস্তানের অবজ্ঞার চোখে বাঙালিদের দেখা।
  • অর্থনৈতিক বৈষম্য যা ছিল গলা টিপে ধরার শামিল।

কেন্দীয় আইন সভায় দুই পাকিস্তানের নেতৃত্বের সম-প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়নি। প্রশাসনে উচ্চতর পদে বাঙালিদের সংখ্যা শতকরা ৩৬ ভাগ। এমন কি ১৯৬৯ সালে ইয়াহিয়া ১৯ জন সচিব পদে মাত্র ৩ জন বাঙালি নিয়োগ দেন। সামরিক ও বিমান বাহিনীতেও একই রকম বৈষম্য। রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে বাঙালিরা আন্দোলন গড়ে তোলে যার ফল স্বরূপ অনেকে নিহত আবার অনেকে গ্রেফতার হন। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে অন্যতম শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি এই প্রথম পাকিস্তানের কারাগারের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। তারা বাঙালি মুসলমানদের কাফের ও হিন্দু বলতো, কারন বাঙালিরা পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্য না মেনে বাঙালি জাতীয়তাবাদে সমর্থন দিয়েছে। লেখক এ ধরনের দোষারোপ করা সত্যের অপলাপের সামিল হিসেবে উল্লেখ করেন।

পাকিস্তানের মতো, ঢাকা এক হাজার মসজিদের শহর, এ ন্যায্যা দাবি করতে পারে। পূর্ব বাংলায় মদ বিক্রি কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রিত, যেখানে ইসলামাবাদে শুক্রবারেও মদের দোকান খোলা থাকে। করাচি ও লাহোরে যৌন আবেদন মূলক চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়, এগুলো ঢাকা ও চট্টগ্রামে দেখানো হলে সঙ্গে সঙ্গে জনতার রূদ্র প্রতিবাদের শিকার হত। লেখক নিজ অভিজ্ঞতা দিয়ে দেখেন, রমজান মাসে পূর্ব বাংলার সম্পদশালী মুসলমানরা কঠোর ভাবে রোজা পালন করত,যা পশ্চিম পাকিস্তানের সমশ্রেণিভুক্তদের মধ্যে দেখেন নি। ১৯৭০ সালের কষ্টকর নির্বাচনী প্রচার অভিযানের মধ্যেও শেখ মুজিব প্রতিদিন রোজা রাখতেন। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের সাথে রমজান মাসে লেখক খেয়েছেন এবং মদ্যপান করেছেন। এ সব সত্ত্বেও মুজিব ও তাঁর লোকদের বলা হত কাফের। সংবেদনশীল বাঙালিদের বেদনাদায়ক অপমানই তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী হওয়ার অন্যতম অনিবার্যকারন হয়ে থাকবে।

. অর্থনৈতিক বৈষম্য : এ অধ্যায়ে লেখক একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন যেখানে দেখা যাচ্ছে, পূর্ব পাকিস্তানের আয় পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় অনেক বেশি কিন্তু বাজেট ঘোষণার সময় দেখা যায়, বাজেটের শতকরা ২০ ভাগ পূর্ব পাকিস্তানের ভাগ্যে জুটে। এর ফলে দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। পশ্চিম পাকিস্তানের মাল বোঝাই থাকে পূর্ব পাকিস্তানের দোকান গুলোতে। এই নির্মম চিত্র দিয়ে ফুটে উঠেছে উপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এভাবেই শোষিত হতে থাকে বাঙালিরা।

. পাকিস্তানি শাসকচক্রের বিশ্বাসঘাতকতা : তারা অন্য কাউকে নি:শ্বাস নিতে দেবে না। প্রধানমন্ত্রীরর পদ থেকে অপসারিত হবার পর লেখককে এক ব্যক্তিগত সাক্ষাতকারে সোহরাওয়ার্দী এ তিক্ত মন্তব্য করেছিলেন। ১৯৪৮ সালে কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মারা গেলে নিচের সারির লোকেরা উত্তরাধীকারি হন। তৎকালিন সময়ে পাকিস্তানে সব চেয়ে শক্তিশালী ও উগ্র জাতি ছিল পাঞ্জাবরা। কারন, এরা ছিল শিক্ষিত ভূস্বামী। এরাই ছিল সিভিল সার্ভিসের মেরুদন্ড এবং সামরিক বাহিনীর ক্যাডার ভুক্ত উচু পদের অফিসার। এরা কখনো চায়নি, কেউ তাদের শাসন করুক। যে কোনো মূল্যে তারা ক্ষমতা নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিল।

পাঞ্জাবী চক্র দেশে ক্ষমতার আধিপত্য বজায় রেখেছিল। তারা ক্ষমতা ছেড়ে দেবে না এবং সেনা বাহিনীকে দিয়ে ক্ষমতা রক্ষা করতে তারা ছিল তৎপর। ক্ষমতার এ নেশায় তাদের কাছে শুধু পূর্ব পাকিস্তানিরাই শোষিত হতনা বরং পশ্চিম পাকিস্তানেও ছিল অশান্তি। কায়েদে আজম ১৯৪৮ সালে মারা যাওয়া পর যদি আমরা পশ্চিম পাকিস্তানের গণতন্ত্রের দিকে লক্ষ্য করি তবে দেখবো, এগার বছরে কখনে নির্বাচনী পদ্ধতিতে সরকার পরিবর্তন হয়নি।

  • প্রথম প্রধানমন্ত্রী নওয়াবজাদা লিয়াকত আলী খান রাওয়ালপিন্ডির এক জনসভায় রহস্যজনক ভাবে নিহত হলেন। নিহত হওয়ার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা কখনই সরকার দেয়নি।
  • খাজা নাজিমুদ্দিন যিনি লিয়াকত আলী খানের স্থলাভিষিক্ত হন, তিনিও পাঞ্জাবী গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদের দ্বারা অপসারিত হন।
  • পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী বগুড়া যিনি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ছিলেন অপরিচিত, তাঁকে ওয়াশিংটনের রাষ্ট্রদূত পদ থেকে ডেকে এনে গদিনসীন করা হয় এবং আবার রাষ্ট্রদূত বানিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।
  • এবার ১৯৫৭ সালে প্রধানমন্ত্রী বানানো হয় ফিরোজ খান নুন কে। হটাৎ করে ১৯৫৮ সালে জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ূব খান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্বৈরতন্ত্র যুগের প্রতিষ্ঠা করেন। পশ্চিম পাকিস্তানের এহেন অশান্তির ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার তিন বছরের মধ্যেই মুসলিম লীগের আনুকূল্য থেকে বেরিয়ে আসেন।

. এক নতুন সূচনা পর্ব : আমি আপনাদের কাছে খোলাসা করে বলতে চাই যে, সাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা ছাড়া আমার আর কোনো আকাঙ্খা নেই। ক্ষমতায় এসেই ইয়াহিয়া বেতারে জনগণের উদ্দেশ্যে এ ভাষণ দেন। ১৯৬৯ সালের ২৬ শে মার্চ ইয়াহিয়ার নেতৃত্বে গণতন্ত্র যাত্রার আনন্দে দেশ জেগে ওঠে। স্বৈরাচারী ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুক খান দেশের ইতিহাসে জনগনের নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমাতাচ্যুত হন। ইয়াহিয়া ক্ষমতা গ্রহনের দিন তিনটি ওয়াদা করেছিলেন—

  • দুর্নীতি ও অদক্ষ প্রশাসনকে পরিচ্ছন্ন করা।
  • সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা।
  • জনপ্রতিনিধিদের­ কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।

তিনি প্রথম দুটি যথার্থ পালন করলেও তৃতীয়টি পালন করেন নি। দেশ ভাগের ২৩ বছরের মধ্যে নির্বাচন না হওয়াটা জনগণ স্বভাবিকভাবে গ্রহণ করেনি। যার ফলে তিনি নির্বাচন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন নির্বাচনে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জয় লাভ করলে ইয়াহিয়া ক্ষমতা হস্তান্তর না করে নানা টালবাহানা শুরু করেন। তখনি চরম সংকট তৈরি হয়।

. ১৯৭০ এর নির্বাচনপূর্ব টালবাহানা : সাধারণ নির্বাচন যতই অপ্রিয় হোক তবু তা প্রয়োজনীয় কারনে গিলতে হবে। কিন্তু ওয়াদা মোতাবেক তিনি জনগনের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দেবার কোনো ইচ্ছা পোষণ করেন নি। ১৯৬৯ সালে তাঁর প্রশ্ন ছিল জনমনে সংঘাত না হেনে কীভাবে মতলব হাসিল করা যায়। উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য তিনি শাসনতন্ত্র তৈরি করেন। বাঙালিদের মন পাবার জন্য সচিবালায়, পরিকল্পনা কমিশন, সরকারি কর্পোরেশন, দূতাবাস এবং সরকারি বেতার ও টেলিভিশনে বাঙালিদের প্রবেশ ঘটাতে লাগলেন। হটাৎ করেই ১৯৭০, ১২ ই নভেম্বর নেমে আসল প্রলয়ংকারী সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণাবাত। উপকূলবর্তী এলাকায় যে মরনছোবল আঘাত হানে, যা ছিল সে শতাব্দির সবচেয়ে মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

বিশ্বের সকল দেশ থেকে যখন সাহায্য আসতে লাগলো, তখন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে একটি সহানুভূতি সূচক বাণী ও শোনা গেল না। যা নতুন করে বাঙালি অসন্তোষের মাত্রাকে বাড়িয়ে দিল। তখন আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। একজন এক ভোট নীতিতে জাতীয় পরিষদে ৩১৩ টি আসনের মধ্যে পূর্ব বাংলা পায় ১৬৯ টি আসন। যা ছিল শেখ মুজিবের জন্য স্বর্গ থেকে প্রেরিত একটি অমোঘ সুযোগ।

. ১৯৭১ নির্বাচনোত্তর প্রহসন : ৭ ডিসেম্বর ‘৭১ সালের নির্বাচনে ৩১৩ টি আসনের মধ্যে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ১৬৭ টি আসন নিয়ে সরকার গঠন করার ক্ষমতা লাভ করে আওয়ামী লীগ। অপর পক্ষে ভুট্টোর নেতৃত্বে পিপিপি ৮১ টি আসন পেয়ে বিরোধী হল হবার যোগ্যতা লাভ করে। পূর্ব বাংলার ঘূর্ণিঝড় ও সামুদিক জলোচ্ছ্বাসের দরুন বাস্তব ক্ষতির চেয়েও পাকিস্তানিদের কাছে নির্বাচনের ফলাফল হলো আরো শোকাবহ ও ধ্বংসাত্বক। ক্ষমতা হস্তান্তর না করার জন্য ইয়াহিয়া টালবাহানা শুরু করেন। তিনি অধিবেশন স্থগিতের কারন হিসেবে দেখান—

  • পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিরোধ।
  • পিপিপি দলের অধিবেশন বয়কট।
  • পাকিস্তানে গভীরতম রাজনৈতিক সংকট আমরা যদি একটু লক্ষ্য করি তবে দেখব যে, উপরক্ত সমস্যা গুলো ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর পরিকল্পিত। শেখ মুজিবের একটাই ভুল ছিল। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে নির্বাচনোত্তর সফরে যাননি। তাহলে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী পেতে পারতেন।

. পাকসামরিক বাহিনীর অভিযান : যিনি তার নিজের গোপনীয়তা রক্ষা করেন, তিনি গন্তব্যের শীর্ষে আরোহণ করেন–আল কোরআন”। ‘৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া রাজনীতিবিদদের সঙ্গে বিড়াল ইঁদুরের খেলা খেলতে থাকেন। তিনি তাঁর মনের কথা গোপন রাখেন। পূর্ব পাকিস্তানে আক্রমনের পরিকল্পনা তিনি ইতোমধ্যে তৈরি করে ফেলেন। আক্রমনের জন্য তাঁর কিছু সময়ের প্রয়োজন হয়। তাঁর হাতে একটা নতুন সুযোগ আসে, এই সময়টায় ভারতের সাথে পাকিস্তানের একটা উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ সুযোগ টাকে তিনি কাজে লাগান। পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক সৈন্য দ্বিগুণ করেন। এম ভি সোয়াত নামে একটি মালবাহী জাহাজ চট্টগ্রামে পৌঁছায়। এই সৈন্যদের উপস্থিতি দেখে বাঙালিরা বিস্মিত হয়েছিল। তাদের বুঝতে বাকি রইলনা, কি হতে যাচ্ছে। পাকিস্তানের সামরিক অফিসাররা তাদের পরিবারবর্গকে করাচিতে পাঠিয়ে দিতে থাকে।

১০. অবিস্মরণীয় পঁচিশ দিন : আমাদের এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। দুঃখের কথা এই যে, সমস্ত বিমান গুলো ব্যবহার করার কথা ছিল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে আসার জন্য, তার বদলে সেগুলো সামরিক বাহিনীর লোক ও অস্ত্রশস্ত্র বহন করার কাজে নিয়োজিত হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান হটাৎ একটা বোমা বিস্ফোরনের মত ঘোষণা শোনেন, ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ রাখার ঘোষনা দেন। সেইদিন বিক্ষুব্ধ বাঙালির মনে বাংলাদেশের জন্ম হলো। সাথে সাথে শেখ মুজিব কর্মসূচি ঘোষনা করেন—

  • ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সারা প্রদেশে ধর্মঘট পালিত হবে।
  • ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেবেন এবং স্বাধিকার অর্জনের জন্য কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।
  • সেই সাথে তিনি অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন।

শুরু হয় সেনাবাহিনীর সাথে বাঙালির দ্বন্দ্ব। সেনাবাহিনীর গুলিতে মারা যায় বাঙালি। পরিস্তিতি নিয়ন্ত্রনের জন্য লেঃ জেনারেল টিক্কা খানকে গভর্নর আহসানের স্থলাভিষিক্ত করা হয়। কতটা চতুর ইয়াহিয়া খান, বাঙালিরা যেন এমন পরিস্থিতিতে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করে তাই সে আবার ২৫ মার্চ অধিবেশনের তারিখ ঘোষনা করে।

এদিকে শেখ মুজিব ৭ মার্চে ভাষণ দেন যার মাধ্যমে ৪টি দাবি এবং বাঙালিদের প্রতি ১০ টা নির্দেশনা প্রদান করেন। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের প্রতি ৪ টি দাবি—

  • অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে হবে।
  • সামরিক বাহিনীর লোকদের অবিলম্বে ছাউনিতে ফিরে যেতে হবে।
  • নিহতদের জন্য তদন্ত করতে হবে এবং
  • অবিলম্বে অর্থাৎ ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসার আগেই জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।

বাঙালিদের প্রতি দশটি নির্দেশনামা জারি করেন। যা মুক্তিযুদ্ধে দিক নির্দেশনা হিসেবে কাজ করে। সময় যত গড়াতে থাকে পানি তত ঘোলাটে হতে থাকে। ইয়াহিয়া খানের চতুরি শেষ হয় ২৫ মার্চ সামরিক বাহিনীর ‘অপারেশন সার্চ লাইটের’ সঙ্গে সঙ্গে।

১১. গণহত্যা : আপনার বাসভবন আজ রাতে আক্রান্ত হতে যাচ্ছে। ২৫ মার্চ রাত ৮ টায় এমন সংবাদ পাবার পরও শেখ মুজিব নিজে আত্মরক্ষার চিন্তা না করে নিজ দলের নেতাদের আত্মরক্ষা করার জন্য পরামর্শ দেন। রাত দেড়টায় গোলাগুলির আওয়াজে আকাশ বাতাস উত্তাল হয়। শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পাক সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনী আক্রমনের জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করে নেয়—

  • আওয়ামী লীগ নেতা, ছাত্র নেতা।
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে­র ছাত্র-শিক্ষক।
  • মুসলিম ছাত্রবাস ‘ইকবাল হল’ ও হিন্দু ছাত্রাবাস ‘জগন্নাথ হল’
  • অসহযোগ আন্দোলনের সময় যারা সেনাবাহিনীকে কটাক্ষ করেছিল।
  • হিন্দু, যাদের মনে করা হত ভারতের অনুচর। যারা মুসলমানদের কলুষিত করছে।

১২. গোয়েবলসের পুনরাগমন : হত্যাকান্ড চালানোর সময় ইয়াহিয়া মিডিয়ার উপর পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। নারকীয় ঘটনার কোনো কিছুই পশ্চিম পাকিস্তানিদের জানতে দেওয়া হয়নি। পশ্চিম পাকিস্তানিরা জানতো, ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী এবং সংঘবদ্ধ দুস্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী অভিযান চালাচ্ছে। শুধু মাত্র বিবিসি, আকাশবানী, রেডিও অস্ট্রেলিয়া সত্য ঘটনা প্রচার করত।

১৩. আশি লাখ লোক কেন মারা যাবে? ১৯৭০ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পূর্ব বাংলাকে তিনটি বড় দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

  • সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস।
  • পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংস গণহত্যা।
  • দুর্ভিক্ষ, ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষেরর চেয়েও ভয়াবহ ছিল এই দুর্ভক্ষ।

১৪. কেন বাংলাদেশ? এই প্রশ্নের উত্তরেই লেখক স্পষ্ট করে দিয়েছেন, কেন পাকিস্তান ভাগ হলো। ১৯৪৭ সালে লক্ষ করলে দেখব, হিন্দুদের আধিপত্য থেকে মুক্তি পেতে ভারতবর্ষ ভাগ হয়। ‘৪৭ এ দেশ ভাগ হওয়ার ফলে মুসলমানরা হিন্দুদের আধিপত্য থেকে মুক্তি পায় ঠিকই কিন্তু এবার মুসলমানরাই মুসলমানের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে। আধিপত্য থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আবারও প্রয়োজন পড়ে দেশ ভাগের।

শাহীন আলম, সমন্বয়কারী, বিডিএসএফ রাবি, ইংরেজি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

                                                            

Spread the love

Related Posts

2 Comments

Add Comment

error: Content is protected !!