নজরুল জীবন ও সৃষ্টিতে কুমিল্লা

Reading Time: 3 minutes

কবি কাজী নজরুল বাংলাদেশের জাতীয় কবি। এ প্রসঙ্গে যে কথাটি আমাদের মনে আসে তা হল, নজরুল তার চিন্তায় ও কাজে সাহিত্য, রাজনীতি,বা অসাম্প্রদায়িক বাঙালী জাতীয়তার প্রতিক হয়ে উঠেছিলেন। সংকর বাঙালী জাতিসত্তার এমন সেক্যুলার চেতনার সামাজিক প্রতিষ্ঠায় এমন আন্তরিক সাধনা বাংলা সাহিত্যের দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তিত্বের মধ্যে দেখা যায়না।

নজরুল তার প্রতিভার ধার ও ভার দুই-ই ঢেলে দিয়েছিলেন তার সাধনায় সৃষ্টি ও কর্মে। কুমিল্লায় নজরুল গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন। তিনি মোট পাঁচবারের মত কুমিল্লায় এসেছিলেন। তার এই আগমন ও নির্গমন বাংলা সাহিত্যের মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। কারণ তিনি কুমিল্লাতেই মা খুঁজে পেয়েছিলেন, বন্ধু খুঁজে পেয়েছিলেন; আর পেয়েছিলেন জীবনসঙ্গিনী নারী। এ সম্পর্কে আবুল ফজল বলেন “সে কালেই নজরুলের সাথে কুমিল্লার সম্পর্ক গড়ে ওঠেছিল। আর তা যে আবেগে, উচ্ছ্বাসে, যৌবনের প্রথম উন্মাদনায় কতখানি ঐশ্বর্যশালী ছিল তার পরিচয় নজরুলের সে যুগের কাব্যে তা বিধৃত”। নজরুল প্রেমের কবি, প্রেমিক কবি, লিখেছেন অজস্র প্রেমের কবিতা ও গান। এ সব রচনার উৎস মোটেও বায়বীয় নয়,রক্ত মাংসের মানবীই, আর এ মানবীরা ছিলেন কুমিল্লার মেয়ে। এ দুই মহিয়সী নারীর পাণিগ্রহণ করে কুমিল্লার সাথে তার চিরায়ত নারীর সংযোগ ঘটিয়েছেন। তাদের প্রেরণায় তিনি কবিতা ও সংগীত রচনা করে বিপুলভাবে সমৃদ্ধ করেন বাংলা সাহিত্যকে। নজরুলের সমগ্র অস্তিত্ব নোঙর বেঁধেছিল কুমিল্লার মাটি ও মানুষের সাথে।

কুমিল্লা শহরের যে সকল জায়গায় আড্ডা দিয়েছেন, গান গেয়েছেন, গ্রেফতার হয়েছেন, এবং দৌলতপুর এ যেসব জায়গায় বাঁশি বাজিয়েছিলেন, সেসব কথা ও কাহিনী কুমিল্লায় নজরুলের স্মৃতির অন্তর্ভুক্ত। এসব জায়গাতে স্মৃতি ফলক বসানো হয়। এ কাজটি করেন তৎকালীন সময়ের সংস্কৃতিবান জেলা প্রশাসক সৈয়দ আমিনুর রহমান। কুমিল্লা শহরে নজরুলের স্মৃতি ফলক ১২ টি দৌলতপুরে রয়েছে ৪ টি। এর মানে এই নয় যে, এর বাইরে নজরুলের বিচরণ নেই, শুধুমাত্র বিশেষ স্থানেই এগুলো নির্মিত হয়।

কুমিল্লায় কাজী নজরুল ইসলাম প্রথম আসেন ১৯২১ সালে। কুমিল্লার অন্তর্গত দৌলতপুরে যাবার উদ্দেশ্যেই তাকে কুমিল্লায় আসতে হয়েছিল জনৈক পুস্তক ব্যবসায়ী আলী আকবর খানের সাথে। কবি কাজী নজরুলকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রথমে কান্দিরপাড়ে শ্রীইন্দ্র কুুমার সেনের বাসায় আসেন। শ্রীইন্দ্র কুমার সেনের বাসায় তার দুই মেয়ে কমলা ও অঞ্জলি ছাড়াও তার বড় ভাইয়ের একমাত্র মেয়ে আশালতা সেনগুপ্তা ওরফে দোলন/দুলী থাকতেন। কবি নজরুল ইসলাম কবিতা আবৃত্তি ও গানে গানে সেন বাড়ির পরিবেশ কে কলমুখর করে তুলেছিলেন। শহরের যুবকেরা তার গান শুনতে ভিড় শুরু করল। কমলা, অঞ্জলি, দুলী সকলের কবিদা হয়ে ওঠল। এই মোহময় পরিবেশে নজরুল দিন চারেক ছিলেন। এখান থেকে নজরুল দৌলতপুর যাওয়ার পর মুন্সী বাড়ির আব্দুল খালেকের কন্যা সৈয়দা খাতুনের সাথে নজরুলের প্রথম বিয়ে হয় (৩রা আষাঢ় ১৩২৮ সনে)। বিয়ের পর কবি সৈয়দা খাতুনের নতুন নামকরণ করেন নার্গিস আসার খানম। দৌলতপুর থেকে ৪ই আষাঢ় পুনরায় সেন বাড়িতে ফিরে আসেন অনেক দুঃখ, যন্ত্রণা, অপমান, ক্রোধ ও ঘৃণা নিয়ে, কেননা বাসর রাতেই তাকে পালাতে হয়েছিল। হয়ত আকদের ব্যাপারে বনিবনা না হওয়ায়।

দৌলতপুর থেকে শ্রীইন্দ্র সেনের বাসায় আসার পর নজরুল খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাড়ির সকলেই নজরুলের সেবা করেন। অসুখের সুবাদেই আশালতা সেনগুপ্তা নজরুলের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পায়। ক্রমান্বয়ে এদের মধ্যে হৃদ্যতা বেড়ে ওঠে। তবে এখানে বলে রাখা দরকার নজরুল দৌলতপুর থেকে ফিরে আসার পর যে সতেরো দিন সেনগুপ্ত বাড়িতে ছিলেন। সে সময়ে আশালতার সাথে মন দেয়া নেয়া হয়ে যায়।

ধূমকেতু পত্রিকায় “আনন্দময়ীর আগমনী” শীর্ষক কবিতা প্রকাশের জন্য কবি কাজী নজরুলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। তারপর তিনি ১৯২২ সালে ২৩ নভেম্বর বিকেলে কুমিল্লার ঝাউতলা রোড থেকে গ্রেফতার হন। এরপর ১৯২৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর তিনি বহরমপুর জেল থেকে মুক্তি পান, এবং মুক্তির পরক্ষণেই আশালতার প্রেমের টানে কুমিল্লায় ছুটে আসেন। এবার আর সভা মিটিং আড্ডা নিয়ে হৈ চৈ করেন নি, বরং আশালতার সাথে বিয়ের কথা পাকাপাকি করে নেন। ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল শুক্রবার আশালতার সাথে বিয়ে সম্পন্ন হয়।

কুমিল্লায় বসে কবি নজরুল ইসলাম যে সব গান, গজল, ছড়া ইত্যাদি রচনা রচনা করেছেন সেগুলো তার কুমিল্লায় নজরুল সাহিত্যের অন্তর্গত। বলা আবশ্যক কুমিল্লায় নজরুল সাহিত্যখনির সন্ধান পেয়েছিলেন। কুমিল্লার দুই মহিয়সী নারী তার জীবনে একদিকে সাহিত্যের খনিরুপে অন্যদিকে প্রিয়া ও বধূরুপে আগমন করেন। প্রিয়ার রুপকলা তিনি নানা ছলে কৌশলে এবং নানা রঙে প্রকাশ করেন। কখনো গদ্যে, কখনো পদ্যে। এই দুই প্রেয়সী নারীই মূলত তার সাহিত্য প্রেরণার উৎস মুখ খুলে দিয়েছিলেন। কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর জীবনের ১৯২১-১৯২৬ সাল পর্যন্ত ছিল প্রচন্ডভাবে, তীব্রভাবে এবং খাড়াভাবে সৃষ্টির কাল। এ সময়েই আমরা তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনাগুলির সাক্ষাৎ পাই। প্রলোয়োল্লাস থেকে বিদ্রোহী, যুগবাণী থেকে রাজবন্দীর জবানবন্দি প্রভৃতি এ সময়ের রচনা। নতুন চিন্তা চেতনা সমন্বিত কবিতা ও গান রচনার দিক দিয়ে এ কালটাই ছিল সবচেয়ে সমৃদ্ধ ফসলের কাল। হিসেব নিলে চোখে পড়বে এ যেন দীর্ঘ রেখার বিলম্বিত নতুন ভাবের কবিতা ও গানের এক সারিবদ্ধ মিছিল। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে সে যেন এক আশ্চর্য আবিষ্কার। সৃজনী আবেগের এক আকস্মিক বিস্ফারণ। কোরবানি, খেয়াপারের তরণী, বিদ্রোহী, আমার কৈফিয়ত, ফরিয়াদ, সাম্যবাদী, বন্দী বন্দনা, ভাঙার গান, আনন্দময়ীর আগমনে, কান্ডারী হুশিয়ার নামক প্রসিদ্ধ কোরাস, অন্তর জাতীয় সংগীত প্রভৃতি সুপরিচিত কবিতা ও গান এ পর্বেরই রচনা। এ কথা সত্য যে, কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের বেশ কিছু শ্রেষ্ঠ রচনা কুমিল্লায় রচিত এবং পরবর্তী কালের শ্রেষ্ঠ রচনাগুলোতে কুমিল্লা ও দৌলতপুর এর প্রভাব অনস্বীকার্য। কাজী নজরল ইসলাম আজীবন এক নীড় থেকে অন্য নীড়ে ছুটেছেন, এক বসন্তে এক নীড়ে বাস করে অন্য বসন্তে অন্য নীড়ের সন্ধানে ব্যাকুল হয়েছেন। তার চিরকালের স্বভাব কোথাও তিনি এক জায়গায় স্থির হয়ে বসতে পারেন নি।এক্ষেত্রে তিনি বোধহয় রবীন্দ্রনাথ এর দর্শন গ্রহণ করেছিলেন।

“হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথাও,অন্য কোনখানে”।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!