পাঠকের চোখে হুমায়ূন আহমেদ

Reading Time: 3 minutes

একবার এক সাংবাদিক হুমায়ূন আহমেদকে বললেন, অমুক ভদ্রলোক বলেছেন আপনার লেখায় নাকি শিক্ষণীয় কিছুই নেই। জবাবে হুমায়ূন আহমেদ বললেন, ঠিকই তো বলেছেন আমি তো পাঠ্যবই লিখি না। নিজ লেখার সমালোচনার জবাবে এমনই ছিল হুমায়ূনের দৃষ্টিভঙ্গি। তবে যত সমালোচনাই হোক না কেন, বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী একাধিক চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বকে অবিস্মরণীয় করে রেখেছেন এ অমর কথাশিল্পী।

বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে ষাট ও আংশিকভাবে সত্তরের দশককে মোটামুটি উপন্যাসের সোনালি সময় বলা যায়। এর আগে পঞ্চাশের দশকে আমাদের কথাসাহিত্যে উত্থান ঘটেছে কয়েকজন অসামান্য কথাশিল্পীর। সমসাময়িক কালেই আমরা পেয়েছি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর মতো অসামান্য ঔপন্যাসিক ও শওকত ওসমানের মতো শক্তিমান কথাকারকে। জহির রায়হান, আবু জাফর শামসুদ্দীন, আবু রুশদ, রশীদ করিম, সৈয়দ শামসুল হক, মাহমুদুল হক উপন্যাস লেখেন উল্লিখিত সময়ে। আরও পরে পাই হাসান আজিজুল হকের মতো গল্পকার ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহিরের মতো কয়েকজনকে।

পঞ্চাশ-ষাট ও সত্তরের প্রথম অংশের লেখকদের সৃষ্টি অধিকার করে ছিল প্রথমে দেশভাগের চেতনা, পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা আন্দোলনের স্বপ্ন। এ সময়ের অধিকাংশ ঔপন্যাসিক লিখেছেন কয়েকটি পরিকল্পিত কাঠামোয়। বিষয়বস্তু ছিল পূর্ব-বাংলা ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সংখ্যায় বিশাল হয়ে ওঠা মধ্যবিত্ত সমাজ এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মন ও মননে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানের নিষ্পেষণ থেকে মুক্ত হয়ে উন্নতি ও প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন আর প্রত্যাশিত বাংলাদেশ না পাওয়ার হতাশা তাদের মধ্যে দ্বৈত চরিত্রের জš§ দেয়। এ শ্রেণির পাঠক সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি। এরা খুব সচ্ছল নয়, অথচ নি¤œবিত্তের একরৈখিক সরল জীবনও তাদের নয়, সামাজিকভাবে এ বৈচিত্র্যময় টানাপড়েন তাদের মধ্যে এক ভিন্নধর্মী আবেগ জš§ দেয়। আশির দশকে হুমায়ূন আহমেদ এ শ্রেণির কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। কারণ তিনি তার গল্পের উপাদান-প্রেক্ষাপট নেন একেবারেই ওই মধ্যবিত্তের জীবন ও আবেগ থেকে।

নানা অপ্রাপ্তি ও জটিল জীবন থেকে মুক্তির দূরাগত আশায় থাকা এ পাঠক আসক্ত হয়ে পড়লেন সরল বিনোদনে, নাটকীয় কল্পনায় এবং তারা চাইলো একেবারেই তাদের গল্প। হুমায়ূন তার উপন্যাসে এসব উপাদানের সমাবেশ ঘটালেন প্রচুর। অসম্ভব মমতা ও আবেগ নিয়ে তার চরিত্রগুলো চিত্রিত হলো। পাঠক তাদের ভাবালু কল্পনাকে পেল তার লেখায়। তাদের কৈশোরিক প্রেম, খাদ্যাভ্যাস, স্মৃতিময় সামান্য-অসামান্য মুহূর্ত, সরল ভাষাভঙ্গিতে ও প্রচুর হাস্যরস সহযোগে তুলে আনলেন হুমায়ূন।

এ সময়ে নতুন টেলেভিশন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে হুমায়ূন আহমেদ এক আলাদা ধারার নাট্যকার হিসেবে আবির্ভূত হলেন। এটাও তার জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান নিয়ামক। পাঠক যা করতে চায়, অথচ পারে না বিপুল জ্যোৎস্নায় রাস্তায় হাঁটা, ভিজে যাওয়া বৃষ্টিকে স্পর্শ করা, খুব সাধারণ একটি ছেলের অসম্ভব সুন্দর কোনো তরুণীকে পাশে পাওয়া, সহজ ধরনের পরিবার, সহমর্মী বাবা-মা, একরকম চিন্তাহীন নির্বিকার ভাসা ভাসা জীবন। এ চাপা ইচ্ছেগুলোর প্রতিফলন পাওয়া গেল তার উপন্যাস ও নাটকে।

সাহিত্য সমালোচক সাযযাদ কাদির হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে তিনটি কারণের কথা উল্লেখ করেছিলেন। প্রথমত, বাংলা বেস্টসেলারে কলকাতার প্রাধান্যকে ছাড়িয়ে তিনি ঢাকার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেন প্রথম। এর আগে নজিবর রহমান সাহিত্যরতœ থেকে আকবর হোসেন পর্যন্ত কিছু উদাহরণ থাকলেও বিশেষ ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন একমাত্র কাজী আনোয়ার হোসেন। তবে হুমায়ূন অবদান রেখেছেন সামগ্রিক পরিসরে। দ্বিতীয়ত, বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমানকে স্থায়ী আসন দিয়েছেন তিনি। এর আগের ১৫০ বছরের উপন্যাস পড়ে তেমন করে বোঝা যায় না যে বাঙালিদের ৬০ শতাংশ মুসলমান। তৃতীয়ত, উপন্যাসের কাটতি বাড়াতে তিনি সেক্স বা ভায়োলেন্সের আশ্রয় নেননি কখনও।

বাংলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে হুমায়ূন ছিলেন পরশ পাথরের মতো। চলচ্চিত্র থেকে নাটক, গল্প-উপন্যাস থেকে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি যেখানেই হাত দিয়েছেন, সেখানেই সোনা ফলেছে। সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে শিক্ষকতা, নাট্যাঙ্গন, সাহিত্যাঙ্গন সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম সারির একজন। তার বড় অবদান তিনি জনপ্রিয় ধারার সাহিত্যকে কলকাতাকেন্দ্রিক প্রভাব-বলয়ের বাইরে বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটা স্বতন্ত্র ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছেন। হুমায়ূন আহমেদ তার জাদুমন্ত্রে কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্য বিলাসিতাকে ভুলিয়ে বাংলাদেশি শুভ্রকে, আবার কখনও পাগলাটে, ছন্নছাড়া ঘটিবাটিবিহীন হিমু কিংবা কবি আতাহারকে ভালোবাসিয়েছেন। জোছনার আলো আর ঝুম বৃষ্টির সৌন্দর্যকে নতুন করে চিনতে শিখিয়েছেন।

পশ্চিম বাংলার সাহিত্যের প্রতি আমাদের নির্ভরতা কমিয়েছিলেন তিনি। গর্ব করে বলেছিলেনÑবাংলা সাহিত্যে ডমিনেট করবো আমরা। এ প্রজšে§র তরুণরা যে পল্লিগীতিগুলো শুনলে নাক সিঁটকাত, সেগুলোকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন পরম মমতা দিয়ে। এ দেশের সাহিত্যপ্রেমী যুবসমাজকে তিনি বিশ্বাস করাতে সমর্থ হয়েছিলেন যে বাংলাদেশের মতো দেশেও লেখালেখিটা জীবিকা হতে পারে।

তবে সব প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি উপেক্ষা করে হুমায়ূনের দুর্ভাগ্য বলতে গেলে একটাইÑতিনি প্রকৃত অর্থে কখনও সমালোচিত হতে পারেননি। তার নিজস্ব পাঠক তাকে বানিয়ে তুলতে চাইল দেবতা, প্রকাশকরা বানাতে চাইল লেখা-উৎপাদন যন্ত্র আর তথাকথিত প্রজ্ঞাবান পাঠক ও উন্নাসিক সমালোচকরা তাকে আলোচনার যোগ্যই মনে করলেন না। এক্ষেত্রে তার সব অধ্যবসায়-লঘুতা-কপটতা-প্রতিভা ইত্যাদি মিলিয়ে তিনি শ্রেষ্ঠ হয়তো নন, তাকে হয়তো অপছন্দ করা যেতে পারে কিন্তু কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না।

বাংলা সাহিত্য আর হুমায়ূনের পরিপূরকতা প্রকাশে বলা যায় বাংলা সাহিত্য যদি একটি পূর্ণ জীবন হয়, হুমায়ূন আহমেদ তার সবচেয়ে উচ্ছল ও প্রাণবন্ত শিশুকাল, কৈশোর ও যৌবন তথা বয়ঃসন্ধিকালের স্মারক পুরুষ। আর বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মধ্যবিত্তের তরুণ মানসের একমাত্র প্রতিনিধিত্ব হুমায়ূন আহমেদই করছেন।

লেখক:সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!