প্রাত্যহিক জীবনে স্টোয়িকবাদের ব্যবহার

Reading Time: 9 minutes

আজকের দিনে স্টোয়িকবাদের জনপ্রিয়তা ও প্রাসঙ্গিকতার পেছনে এর শুরুর দিককার ভাবনারই ছাপ পাওয়া যায়। এ দর্শনের উদগাতা গ্রিক দার্শনিকগণ এবং বিকাশকারী রোমান দার্শনিকরা সবসময়ই চেয়েছেন স্টোয়িকবাদ যেন কেবল একাডেমিক চর্চার বিষয় হয়ে না দাঁড়ায় বরং এটা হয়ে উঠুক জীবন যাপনের/ধারণের উপায়। জেনো থেকে শুরু করে মার্কাস অরেলিয়াস-প্রত্যেকেই জীবনের সব ধরণের সমস্যার সামনা করতে এ দর্শনের ছাহারা নিয়েছেন। বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়ক থেকে শুরু করে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ক্রীড়াবিদ থেকে হলিউডের সিনেমা-সব জায়গায় গ্রীক দর্শনের যেকোন শাখার চেয়ে সবচেয়ে জৌলুসপূর্ণ অবস্থান স্টোয়িকবাদের।
স্টোয়িক দর্শনকে প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহার করা যায় বলেই এটা এতদিন প্রাসঙ্গিক ছিল এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তরোত্তর জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।স্টোয়িক কিছু প্র্যাকটিস বা চর্চা আছে যা রপ্ত করতে পারলে আমরা উপকৃত হতে পারি। এমন কয়েকটি চর্চা নিয়ে এবার সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক:


সব বিষয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করা
স্টোয়িক দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চর্চা হলো আমরা কোন জিনিস পরিবর্তন করতে পারি এবং কোনটা পারিনা তার মধ্যে ফারাক করতে শেখা।কোন জিনিসে আমাদের প্রভাব আছে এবং কোথায় আমাদের কিছুই করার নেই। আপনি যতই চেষ্টা করেন নির্দিষ্ট বয়স শেষে ৫/১০ ইঞ্চি লম্বা হতে পারবেন না; আপনি যতই কামনা করেন না কেন আপনি আপনার জন্মস্থান, পরিবার পাল্টাতে পারবেন না। যে অতীত চলে গেছে তা নিয়ে যতই কান্নাকাটি করুন তাকে ফেরত আনতে পারবেন না। কেবল বর্তমানটাই আপনার নিয়ন্ত্রণের এবং এ সময়ে নেয়া সিদ্ধান্ত আপনার।


নিজেকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়া

জ্ঞানের অনেক শাখাতেই শুরুর দিকে শিক্ষার্থী নিজেকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়ার মাধ্যমে শিক্ষা লাভ করে। এটা নতুন কিছু নয়। যেমন ধরেন সেনাবাহিনীতে এটা অতি প্রাচীনকাল থেকেই এটা ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অনেকের এ ভুল ধারণা রয়েছে যে পার্থিব ভোগবিলাস ও ধন-সম্পদের প্রতি কোন আগ্রহ নেই স্টোয়িকদের। নিজেদেরকে কিছু সময়ের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলে রাখার মাধ্যমে কাজ শেষ করেন না স্টোয়িক চিন্তকরা। বরং এ চর্চার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক একটি মার্গে পৌছাতে চান যার মাধ্যমে আত্মার পরিশুদ্ধি অর্জন করা যায়। পার্থিব ধন-সম্পদ ও ভোগ-বিলাসের প্রতি অনন্ত ক্ষুধা থেকে মুক্তির জন্য মাঝে মাঝে সাময়িক অস্বস্তিতে থাকতে হয়। নিজেকে বঞ্চিত করার মাধ্যমে স্টোয়িকরা এটা অনুভব করতে সক্ষম হয়, কত অল্পতে তুষ্ট থাকা যায়।
এপিকটেটিউসের ‘ডিসকোর্সেস’ এর প্রধান শিক্ষা সেটাই। এক্ষেত্রে নিজের জীবনের প্রথম দিকে দাসের অভিজ্ঞতা তার দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ। তার জীবনের ওই কঠিন পর্ব তার দর্শনের মজবুত পাটাতন তৈরিতে সহায়তা করেছে।


প্রতিবন্ধকতায় সুযোগ অনুসন্ধান
প্রতিনিয়ত আমাদের সামনে যে বাধা এসে হাজির হয় সেগুলো হয় আমাদেরকে কাবু করে দেয় কিংবা আমরা সেসব বাধাকে পরাজিত করে সামনে এগিয়ে যাই। প্রত্যেকটি চ্যালেঞ্জের মধ্যেই আমাদের বিকাশের সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিবন্ধকতাই আমাদেরকে উচ্চ মার্গে নিয়ে যাওয়ার পাথেয় হিসেবে হাজির হয়।


সব কিছুই একসময় ফিকে হয়ে যায়, তাই ভয় কেন
আমাদের সবচেয়ে বড় ভয় কী; যদি মরে যাই, যদি ব্যর্থ হই, কেই যদি কিছু বলে, অন্য কেউ যদি এটা করে ফেলে? ইত্যকার বিভিন্ন ভয়ের সমুদ্রে হাবুডুবু খেয়ে আমরা জীবন অতিবাহিত করি। এসব ভয় আমাদেরকে কিছুই করতে দেয় না। এ ভয়ের পেছনের একটি কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে-আমরা অজ্ঞাতে নিজেদেরকে এই প্রবোধ দেই-আমরা অনেকদিন বাঁচবো, আমরা অমর। কিন্তু গূঢ় সত্য হচ্ছে মৃত্যু যেকোন সময়েই আসতে পারে। এটা সবসময়ই বিনা আমন্ত্রণে দরজায় কড়া নাড়ে। কিন্তু আমরা যদি এর জন্য যেকোন সময় প্রস্তুত থাকি তাহলে প্রাত্যহিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে আগাতে পারবো। এজন্য আশপাশে অন্যের মৃত্যুসহ নিজের মৃত্যু নিয়েও নিয়মিত ভাবতে হবে। আমাদের জীবনের উপর সবচেয়ে প্রভাব রাখতে পারে আমাদের মৃত্যুভাবনা। আমরা যদি আমাদের মরণশীল প্রকৃতি নিয়ে সবসময় সচেতন থাকি তাহলে আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সর্বোত্ত কাজে ব্যবহারের চেষ্টা চালাবো। বিপরীতে এ নিয়ে যদি আমাদের ভাবনা চিন্তা না থাকে তাহলে আমরা বেহিসেবি জীবনযাপন করতে পারে এবং অনেকটা অপ্রস্তুত অবস্থায় মৃত্যুর কাছে হাজির হতে পারি।জীবনের ক্ষণস্থায়ী রূপের ব্যাপারে বলতে গিয়ে মার্কাস অরেলিয়াস লিখেন, মহা প্রতাপশালী সম্রাট আলেক্সান্ডার যেমন মৃত্যুবরণ করেছেন তেমনি একই পথ অনুসরণ করেছেন তার খচ্চরচালক; দুই প্রান্তের দুজনেই তো একই পরিণতি লাভ করেছেন!
জীবনের এ ক্ষণস্থায়ী রূপকে স্টোয়িক দার্শনিকরা লাতিনে সুন্দর একটি এক্সপ্রেশন দিয়েছেন। তা হলো-মেমেন্টো মোরি।
যেকোন সময় হানা দিতে পারে মৃত্যু এমনটা বুঝাতে লাতিনে এ বাগবিধিটি ব্যবহৃত হয়।

সবসময় নিজের অস্ত্রপাতি সাথেই রাখুন
মার্কাস অরেলিয়াস বলেন, ডাক্তার-বৈদ্যরা সঙ্গে কাচি ও চিকিৎসার অন্যান্য যন্ত্রপাতি সবসময় রাখেন। আপনার দর্শনও সবসময় সাথে রাখুন।
রোমান সম্রাট অরেলিয়াসের উক্তিটি যেন গ্রন্থসর্বস্ব বিদ্যার প্রতি বড় প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। এর সঙ্গে বাংলা একটি প্রবচন খুবই প্রাসঙ্গিক। তা হলো:
গ্রন্থগত বিদ্যা আর পর হস্তে ধন
নহে বিদ্যা নহে ধন হলে প্রয়োজন
এ ইস্যুতে মার্কাস অরেলিয়াসের আরেকটি তুলনা খুবই প্রাসঙ্গিক।নিজের দর্শনকে কাজে লাগানোর সাচ্চা তুলনা হতে পারে কোন গ্ল্যাডিয়টর নয় বরং কোন বক্সার।একজন গ্ল্যাডিয়েটর তার তরবারি বা ব্যবহৃত অন্যান্য অস্ত্র নিয়ে মাঠে নামে। কিন্তু একজন বক্সার তার দুই হাতকেই অস্ত্র বানিয়ে মাঠে নামে। প্রস্তুতি বলতে হাতকে মুষ্ঠিবদ্ধ করতে যত সময় লাগে তা। একজন বক্সার যেমন যেকোন সময় মুষ্ঠিবদ্ধ হাত নিয়ে প্রস্তুত থাকে তেমনি নিজের দর্শনকে সবসময় ব্যবহার উপযোগী রাখে।
স্টোয়িকরা সবসময়ই তাদের নীতিকে কাজে লাগানোতে বিশ্বাসী। এ কারণে নিজেদের দর্শনকে অত্যন্ত ছোট ছোট বাক্যে প্রকাশ করে গেছেন যাতে সহজে মনে রাখা যায় এবং মান্য করা যায়।


অতি গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন জিনিস জীবন থেকে বিয়োগ
পরবর্তী মুহূর্তে কী ঘটবে এটা নিশ্চিত বলা যায় না।কিন্তু তারপরও বিভিন্ন অগুরুত্বপূর্ণ কাজে দিনের পর দিন পার করে দেয় অনেকে।কোন সুস্পষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ঠিক না করেই এদিকওদিক ঘুরে বেড়ায়।আমাদের জীবনের গ্লাস থেকে চুইয়ে চুইয়ে একেক ফোটা সময় নিঃশেষ হয়ে যায়, আমাদের অজান্তেই। এক্ষেত্রে স্টোয়িক নীতি হচ্ছে-আমাদের জীবন থেকে অগুরুত্বপূর্ণ জিনিস একেবারে বিয়োগ করে দিতে হবে।আমাদের জোর দিতে হবে একান্তই জরুরী জিনিসের উপর।কোনটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কোনটা তেমন গুরুত্বই রাখে না তা বাছাই ও মূল্যায়ন করা অত্যন্ত বড় যোগ্যতা। আমরা যদি জীবনে থেকে অপ্রয়োজনীয় অনেক কাজ, চর্চা, অধ্যায় বিয়োগ করে দিই তাহলে আমাদের অনেক শক্তি বেঁচে যাবে।
মার্কাস অরেলিয়াস বলেন, আমরা যা বলি এবং যা করি তার বেশিরভাগই অপ্রয়োজনীয়। আমরা যদি এগুলো বাদ দিতে পারি তাহলে আমাদের অনেক সময় বেঁচে যাবে এবং আমাদেরকে অধিকতর প্রশান্তি দেবে। প্রতি মুহূর্তে নিজেকে এই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে হবে-যা করছি তা কী গুরুত্বপূর্ণ? আমাদেরকে বেহুদা চিন্তা-ধারণাকে সবার আগে বিদায় করতে হবে। কারণে বেহুদা ধারণা থেকে বেহুদা কাজের উৎপত্তি হয়।


খ্যাতির পেছনে ইদুরদৌড় থামান
আমরা যদি খ্যাতি ও সামাজিক মর্যাদা অর্জনের ইদুরদৌড় থেকে দূরে থাকি তাহলে ভালো থাকবো। কারণ এগুলো একান্তই আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। বরং এটা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টাই আমাদের দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অন্যরা আমাকে নিয়ে কী ভাবছে তাতো আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। সুনাম ও সামাজিক মর্যাদা অর্জনের চেষ্টায় আমাদের উপর অন্যকে নিয়ন্ত্রণ নিতে দেই।আমরা খ্যাতির পেছনে দৌড়াতে গিয়ে অন্যের দাসে পরিণত হই। অনেকটা সার্কাসের বান্দরের মতো আমরা আমাদের খ্যাতির দাস হয় অপরের প্রত্যাশিত কাজ করে যাই।
খ্যাতি নিয়ে মার্কাস অরেলিয়াসের একটি কথা বেশ প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন-নিজের মৃত্যুর পরও খ্যাতি থাকবে এটা নিয়ে যারা উল্লসিত তারা হয়তো ভুলে যায়, তাদেরকে যারা স্মরণ করছে তারাও একদিন পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে। তাদের পরবর্তী প্রজন্মও একই পথ ধরবে।


জ্ঞানদীপ্ত অবকাশ
স্টোয়িকরা বারবার অবকাশকে পরম কাঙ্খিত হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। আবার এটাও সত্য নিষ্কাম অবকাশের কথা তারা বলেননি। অবকাশ তখনই অসাধারণ যা চিন্তাপূর্ণ ও জ্ঞানদীপ্ত। এক্ষেত্রে সেনেকার একটি কথা খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন-অধ্যয়নবিহীন অবকাশ মৃত্যুতুল্য-যেন জীবিত মানুষের সমাধি।অপর স্টোয়িক দার্শনিক জ্ঞান ও অধ্যয়নের উপর জোর দিয়ে বলেন-শিক্ষা বা জ্ঞান হচ্ছে সোনাতুল্য; যা পৃথিবীর সব জায়গাতেই মূল্যবান। আবার বিদ্যার্জন যে মানুষের অহমকে ফুলিয়ে-ফাপিয়ে তুলে সে ব্যাপারে সচেতন হয়ে বিনয়ী হওয়ার কথাও বলছেন স্টোয়িক দার্শনিকগণ। এপিকটেটিউস বলেন, কারো পক্ষে ওই জিনিসটা জানা অসম্ভব যদি সে মনে করে এরই মধ্যে তা জেনে ফেলেছে।
বিনয়ী হওয়ার গুরুত্ব ফুটে উঠে রোমান প্রতাপশালী সম্রাট অরেলিয়াসের এ উক্তিতে যেখানে তিনি বলেন-কেউ যদি দেখিয়ে দিতে পারে এবং প্রমাণ করতে পারে আমার চিন্তা ও কাজ ত্রুটিপূর্ণ, আমি সানন্দে তা পরিবর্তন করবো। কারণ আমি সত্য অনুসন্ধান করি। (অহমের/ইগোর তুষ্টি নয়)
কেবল জ্ঞান অর্জন করে যাওয়া অনেকটা সম্পদ পুঞ্জিবূত করার মতোও হতে পারে। শুধু জ্ঞান অর্জন নিয়ে তুষ্ট থাকার পক্ষপাতি নয় স্টোয়িকরা। এপিকটেটিউস বলেন, আমরা যদি আমাদের লব্ধ জ্ঞানকে কাজে না লাগাই তাহলে একটি নির্দিষ্ট সময় পর আমরা তা ভুলে যাই এবং যা শিখেছিলাম তার বিপরীতটাই করে বসি।
স্টোয়িক দর্শনের অনুসারী হিসেবে আমাদেরকে প্রাত্যহিক জীবনে উত্তম জ্ঞানের সর্বোত্তম ব্যবহার করতে হবে।


জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে করণীয়
জীবন যখন সরল ও স্বাভাবিক থাকে তখন স্টোয়িক নীতি অনুসরণ করা খুব সহজ। কিন্তু যখন জীবন তার ক্রুঢ়, কদর্য রূপ দেখায় তখনো এ দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা সর্বোচ্চ থাকে। বিশ্বখ্যাত বক্সার মাইক টাইসন বলতেন, সবারই একটি ভালো পরিকল্পনা থাকে যতক্ষণ না মুখের উপর দশাসই একটি ঘুষি (পাঞ্চ) এসে পড়ে।সুখি ও সফল হওয়ার জন্য আমাদের সামনে চমৎকার চমৎকার পরিকল্পনা থাকতে পারে কিন্তু জীবন তো আমাদের লেখা স্ক্রিপ্ট অনুসরণ করে আগাবে না। এটা আমাদেরকে অপ্রত্যাশিত, অনাকাঙ্ঘিত ও অসহনীয় অনেক ঘটনা নিয়ে হাজির হয়। ঠিক ওই সময়টাতে আমাদেরকে ধীর-স্থির হতে হবে, তাৎক্ষণিক ভাবাবেগ দ্বারা তাড়িত সিদ্ধান্তের স্থলে সচেতনভাবে সর্বোত্তম জবাব দিতে হবে। এখানে স্টোয়িক এ নীতিটি গুরুত্বপূর্ণ-আমাদের সঙ্গে কী হচ্ছে এটা নয় বরং ওই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় আমরা কী করছি তা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কোন ঘটনা দ্বারা প্রকৃত অর্থে তাড়িত না হলেও সেটাকে কীভাবে দেখছি বা ভাবছি তা দ্বারা তাড়িত বা প্রভাবিত হই। জীবন সরলভাবে আগায় না। আমাদের পছন্দের অনেকেই অপ্রত্যাশিত সময়ে মারা যেতে পারে, আপনি যেকোন সময় চাকরি হারাতে পারেন, অসুস্থ হতে পারেন, আপনি জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার দ্বারপ্রান্তে চলে আসতে পারেন যেকোন সময়। হয়তো ভেঙ্গে যেতে পারে পছন্দের কোন পানপাত্র কিংবা নিত্যসঙ্গী মোবাইল। এমন পরিস্থিতি যথাযথ ও যৌক্তিক পদক্ষেপ নেয়া স্টোয়িক চর্চা।
মার্কাস অরেলিয়াসের একটি উক্তি এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন-আপনি যদি কোন বাহ্যিক বস্তু বা ঘটনার কারণে বিভ্রত হচ্ছেন বলে মনে করছেন, তাহলে এটা আসলে ওই বস্তু বা ঘটনা নয় বরং ওই বস্তু বা ঘটনার উপর আপনার বিচার। আপনি আপনার ওই বিচার এই মুহূর্তেই মুছে ফেলতে পারেন।


কীভাবে শোক-দুঃখের মোকাবেলা করি
সেনেকা বলতেন-দুঃখকে ফাকি দেয়ার চেয়ে তাকে জয় করা উত্তম। স্টোয়িকদের ছবি আঁকার সময় অনেকে মনে করেন তারা দুঃখকে দামাচাপা দিয়ে রাখেন। কিন্তু এ দাবি সত্য নয়। ভাবাবেগ থেকে পালিয়ে বেড়ানোর চেয়ে সঙ্গে সঙ্গেই তার ছামনা করায় জোর দেয়া হয় স্টোয়িক দর্শনে। কিছু শোক পালন জরুরী; চোখের জল বইতে দেয়া আবশ্যক। তবে এক পর্যায়ে এসে শোক ও অশ্রুপ্রবাহ থামানোও জরুরী। প্রলম্ভিত শোক পালন শোকের কারণের চেয়ে ক্ষতিকর বলে মনে করতেন মার্কাস অরেলিয়াস।কারণ এক পর্যায়ে এসে নেতিবাচক চিন্তা আমাদেরকে এক দুষ্টচক্রে বেধে ফেলে।
শোকের বিরুদ্ধে যুক্তিকে সেরা অস্ত্র জ্ঞান করতেন সেনেকা। আমরা যদি যৌক্তিক বিবেচনা কাজে লাগিয়ে শোক-দুঃখের দুষ্ট চক্র থেকে বের হতে না পারি তাহলে এমনি এমনি সেখান থেকে বের হওয়া যাবে না।


রাগ-ক্রোধের স্থলে ধীরতা-স্থিরতা ও সাহসের উপর নির্ভর করা উত্তম
রাগ-ক্রোধ একটি নেতিবাচক আবেগ। এটা নির্মূলের কোন উপায় না থাকলেও এটাকে কমিয়ে আনা কিংবা বাগে আনার চেষ্টা করেছেন স্টোয়িক দার্শনিকরা।সেনেকা ক্রোধের উপর একটি নিবন্ধও লিখেছেন।রাগকে খণ্ডকালীন উন্মাদনা হিসেবে দেখেছেন সেনেকা। কারণ রাগে উন্মত্ত মানুষ আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এ সময়ে মানুষ আত্মীয়তার সম্পর্ক ভুলে যায়, যুক্তির ধার ধারেনা, অল্পতেই রেগে উন্মাদ হয়ে যায়; সত্য-মিথ্যার ফারাক ভুলে যায়। এভাবে বদরাগী ব্যক্তি কেবল নিজেরই ক্ষতি ডেকে আনেনা, তার পরিবার ও তার উপর নির্ভরশীল মানুষদের উপরও বিপর্যয় নিয়ে আসে। যদি সে কোন শাসক বা সেনানায়ক হয় তাহলে ওই ব্যক্তির ক্রোধের অনলে কোন জাতি বা সেনাদল সমূলে বিনাশ হতে পারে। পৃথিবীর ইতিহাস এমন উদাহরণে ভরপুর।
রাগ ও ক্রোধ নিয়ন্ত্রণে বেশ উত্তম পরামর্শ দিয়েছেন মার্কাস অরেলিয়াস। তিনি বলেন-যখনই আপনার মনে রাগ এসে ভর করতে চায় তখন এটা স্মরণ করুন, রাগে উন্মত্ত হওয়া কোন সক্ষম পুরুষের কম্ম নয়। বরং ভদ্র ও মার্জিত হওয়া অধিকতর সক্ষমতার পরিচায়ক। কোন সক্ষম পুরুষ কখনো ক্রোধ ও ক্ষোভের কাছে পরাজিত হয় না। বদরাগী ও অভিযোগ করে বেড়ানো ব্যক্তিদের চেয়ে এদের অধিক শক্তি, সাহস ও সহনশীলতা রয়েছে।
রাগে উন্মাদ হয়ে কোন ব্যক্তি কেবল নিজেরই ক্ষতি ডেকে আনে। কোন প্লেগ বা মহামারীর চেয়েও এটা অধিক ক্ষতি ডেকে এনেছে।এজন্য ক্রোধ মোকাবেলার সর্বোত্তম উপায় শুরুতেই এর রাশ টেনে ধরা। হয়তো এটা কঠিন কাজ কিন্তু শুরুতেই আমরা যদি এর উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হই তাহলে অন্তত তাতে ভেসে যাওয়া থেকে নিজেকে ও নির্ভরশীলদের রক্ষা করা যেতে পারে।


শুধু খারাপ থেকে বিরত থাকাই যথেষ্ঠ নয়, ভালোর সঙ্গী হতে হবে
অনেকসময় আমরা এই কমফোর্ট জোনে চলে যাই যেখানে মনে করি খারাপ থেকে বিরত থেকে, অন্যের ক্ষতি না করে আমরা আমাদের দায়িত্ব শেষ করেছি। কোন অন্যায়ে জড়িত না হওয়া যেমন ভালো তেমনি চোখের সামনে অন্যায় হলেও চুপ করে থাকা খুবই খারাপ।কোন দেশের ভালো নাগরিকরা যখন চুপ মেরে থাকে তখনই দেশে মন্দের জয় হয়।এই চুপ থাকার মধ্যে ভালো মানুষদের একটি কদর্য বাসনা লুপ্ত থাকে-তা হলো আমি না করলেও কেউ তো করে নিবে। পৃথিবীতে উত্তম ও মহত্তর কিছু এমনি এমনি আসেনি; তাকে আনতে হয়েছে। এক্ষেত্রে বিপ্লবী চে গুয়েভারার একটি উক্তি খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি বলতেন-বিপ্লব কোন আপেল নয় যে এটা পাকলে পড়ে যাবে; আপনাকে বিপ্লবকে ডেকে আনতে হয়।
অন্য কেউ কাজ করে নেবে এমন অপেক্ষায় না থেকে কোন উত্তম ও মহত্তর কাজের দায়িত্ব নিজের ঘাড়েই নিয়ে নিতে হবে।


অন্যকে নয় নিজেকে বিচার করুন
আমরা খুব দ্রুতই অন্যকে বিচারের জন্য নিজেদের আদালত বসিয়ে দিই; নিজেকে বিচারের জন্য আমাদের এ উদ্যম দেখা যায় না। আর জাতি হিসেবে পরচর্চায় আমরা সিদ্ধহস্ত। খুব অল্প তথ্যের ভিত্তিতেই আমরা কারো ব্যাপারে সিদ্ধান্তে চলে আসি।আমরা অনেকটা অসচেতনভাবে অভ্যাসবশত অন্যকে বিচারে তাড়াহুরো করলেও নিজের ব্যাপারে এমনটা দেখা যায় না। কোন ঘটনায় দ্রুত আমাদের নাক ডুকিয়ে দেয়ার আগে প্রকৃত ঘটনা কী এবং তাতে আমাদের নিজস্ব মতামত যুক্ত করেছি তার ফারাক করা শিখতে হবে। স্টোয়িক দার্শনিকরা জোর দেন এ জায়গায়-অন্যের দুর্বলতা নিয়ে ঢোল পেটানোর আগে নিজের দোষ-ত্রুটি ও দুর্বলতা খতিয়ে দেখুন । পরচর্চা ও নিন্দামন্দ করার চেয়ে চুপ থাকা বেহতর। এপিকটেটিউস বলেন-বেশিরভাগ সময় নীরব থাকাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। শুধু যা প্রয়োজনীয় তা-ই বলুন, এবং তা সংক্ষেপে বলুন। আপনাকে যদি কখনো বক্তব্য রাখতে দেয়া হয় তাহলে গ্ল্যাডিয়েটর, ঘোড়া, ক্রীড়ামোদ, খাদ্য ও পানীয়র মতো নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়াদি নিয়ে কথা বলা থেকে বিরত থাকুন।কোন ব্যক্তির সমালোচনা, কারো তোষামোদ, কাউকে দোষারোপ ও মানুষের মধ্যে তুলমূল্য করার গাল-গল্প থেকে বিরত থাকুন।
আমরা অন্যের দোষ-ত্রুটি ও খারাপ দিকগুলো যতটা ঢোল পেটে বলে বেড়াই ততটা জোর দিই আত্মপ্রচারে এবং নিজের বড় সব অর্জনকে মানুষের সামনে জোর করে উপস্থাপনে। এক্ষেত্রে এপিকটেটিউসের পরামর্শ অনুসরণীয়। এপিকটেটিউস আমাদের সতর্ক করে বলেন-আলাপ আলোচনায় নিজের অর্জন নিয়ে অতিরিক্ত বলে বেরিওনা বা আত্মপ্রচারণার ঝাপি খুলে বসোনা।
কথা নিয়ে মার্কাস অরেলিয়াসেরও একই নির্দেশনা। তখনই বলেন যখন মনে করেন এটা যথাযথ। এবং বলুন দয়া, ভদ্রতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে।
তাছাড়া কথায় বলার চেয়ে কাজের মাধ্যমে বলাকে উত্তম বলা মনে করেন স্টোয়িক দার্শনিকরা। আমরা নিজেদের অর্জন নিয়ে অন্যের কান ঝালাপালা করতে যতটা না আগ্রহী অন্যের কথা শুনার বেলায় ততটাই বেখেয়াল। কোন সংলাপে বসলে আমাদের উদ্দেশ্য থাকে যেন অন্যকে আমার সব কথা শুনিয়ে দেবো। কিন্তু অন্যের কথা বুঝাপড়ার আগ্রহ নিয়ে শোনায় জোর দেন স্টোয়িকরা। চিন্তাহীন কথার তুবড়ি ফুটানোর চেয়ে বলার লোভ সামলানো অনেক বড় ক্ষমতা। স্টোয়িক দর্শনের উদগাতা জেনো তার শিষ্যদের উপদেশ দিয়েছেন এই বলে যে-আমাদের দুই কান এবং একটি মুখ দেয়ার কারণ হচ্ছে এই যে আমরা যেন বলার চেয়ে শুনি বেশি।


নিজেই উত্তম কিছুর নতিজা হওয়া
আমাদের পরচর্চার পেছনের কারণ হচ্ছে আমরা অন্যের মধ্যে কিছু প্রত্যাশা করি এবং কিছু জিনিস প্রত্যাশা করি না। অন্যের মধ্যে ভালো কোন জিনিস যদি প্রত্যাশা করি তাহলে এটা নিজের মধ্যে আগে লালন করা উচিত। অন্যের কোন মন্দ দিক যদি আমাদের খারাপ লাগে তাহলে আত্মসমালোচনা করা উচিত আমাদের মধ্যে ওই দোষ-ত্রুটি আছে কীনা। যদি থাকে তাহলে তা দূর করা হবে আমাদের প্রধান কম্ম। অন্যকে নীতি কথা ও উপদেশ দিয়ে বেড়ানোর চেয়ে নিজেই ওই নীতির উদাহরণ হয়ে উঠা উত্তম। স্টোয়িক দার্শনিকগণ বলতেন, ভালো মানুষ কেমন এ নিয়ে তক্কাতক্কি না করে বরং একজন ভালো মানুষ হয়ে উঠা বেহতর।


দার্শনিক জার্নাল

প্রতিদিন নিজের সঙ্গে কী ঘটছে সে বিষয়ে অনেকে জার্নাল বা ডায়রী রাখে। ব্যক্তিগত ঘটনা লিপিবদ্ধ রাখার জন্য এটা ভালো তরিকা হলেও আত্মোন্নয়নে ততটা কার্যকর নয়। কারণ এটা স্রেফ ঘটনা লিপিবদ্ধ করে রাখে। এক্ষেত্রে জার্নাল কেমন হতে পারে তার সফল ও সার্থক উদাহরণ মার্কাস অরেলিয়াসের মেডিটেশনস। তিনি শুধু প্রাত্যহিক ঘটনাবলীরিই বয়ান করে বেড়াননি বরং তার গভীরে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন এবং তার বিশ্লেষণ করেছেন। জীবনে উপস্থিত হওয়া বিভিন্ন ঘটনাগুলোর রেকর্ড রাখা এবং তা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা স্টোয়িক চর্চার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফিলসফিক্যাল জার্নাল রাখা নতুন কোন কিছু যোগ করা নয় বরং স্বাভাবিক যে দিনপঞ্জী লেখা হয় তাকে একটু মডিফাই করা মাত্র। এ জার্নালে প্রাত্যহিক ঘটনার সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের মতো বর্ণনা নয় বরং কেন কিছু একটা করলেন বা কীভাবে কাজটা সম্পন্ন হলো তার ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করতে হবে।

ImageCredit:INTHEBLACK

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!