বই আলোচনা : বায়ান্ন থেকে একাত্তর

Reading Time: 2 minutes

ভাষা মনের ভাব প্রকাশের একটি মাধ্যম। তবে বাংলা আমাদের কাছে শুধুই ভাব প্রকাশের একটি মাধ্যম নয় বরং একটি জাতীয় চেতনা। ছাত্রসমাজ তাদের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল রাজপথে শুধু এই মাতৃভাষাকে রক্ষা করবার জন্য, যা আজও কোন জাতি বা সভ্যতা করে দেখাতে পারেনি। এই ভাষাকে কেন্দ্র করেই বাঙালী জাতি একত্রিত হয়ে পরিচালনা করেছিল রক্তক্ষয়ী কত সংগ্রাম, যার শুরুটা সেই বায়ান্ন থেকে এবং সর্বশেষ উদাহরণ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ।

বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন সমগ্র বাঙালী জাতিকে একই সুতোয় বেধেছিল মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। এই ভাষা আন্দোলনই বাঙালী জাতির মধ্য বিকষিত করেছিল তাদের সক্ষমতাকে, যা পরবর্তি আন্দোলনে যুগিয়েছিল দৃঢ় মনোবল। সেই বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত অনেকগুলো সংগ্রাম আমাদের জাতীয় জীবনের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।

বিশিষ্ট কলামিস্ট জনাব এবনে গোলাম সামাদ রচিত “বায়ান্ন থেকে একাত্তর” নামক বইটিতে সেই সংগ্রামের চিত্র তার দৃষ্টিতে তুলে ধরেছেন। এই স্বাধীন বাংলার ইতিহাস, বাঙালী জাতির ইতিহাস জানতে বইটি আমাদের কিছুটা হলেও সহায়তা করবে বলে আশা করছি।

লেখক বইটি শুরু করেছেন “বাংলাদেশে বাংলাভাষা” নামক একটি শিরোনাম দিয়ে। যেহতু ভাষা আন্দোলনই প্রথম বাঙালী জাতিকে জাগ্রত করেছিল তাই হয়তো লেখক এমনটি করবার প্রয়াস দেখিয়েছেন। এই অংশে বাংলা ভাষার ইতিহাস তুলে ধরার সাথে সাথে আলোচনা করা হয়েছে উর্দূ, হিন্দি, ফারসি ও পাঞ্জাবী ভাষার সাথে বাংলা ভাষার সম্পর্ক।

ভাষা আন্দোলন উজ্জীবিত করেছিল একটি জাতিস্বত্তাকে, যার রেষ আমরা মুক্তিযুদ্ধে পেয়েছিলাম। মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ২১শে ফেব্রুয়ারীকে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্বরন করলেও ভুলে যাই ৮ই ফাল্গুনের কথা! যা আমাদের বাঙালীয়ানাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। জনাব এবনে গোলাম সামাদ বইটির প্রথমদিকে তুলে ধরেছেন ভাষা আন্দোলনের পটভূমি, তুলে ধরেছেন তৎকালীন ছাত্রনেতাদের ভুমিকা যেখানে বাদ যায়নি পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের আহাম্মকি কথামালাও!

বইটির অধিকাংশ স্থান জুড়েই আলোচিত হয়েছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কথা। তুলে ধরা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মতৎপরতা। উঠে এসেছে সেই সময়ে ভেঙ্গে যাওয়া কম্যুনিস্ট পার্টির দুটি ভিন্ন মতাদর্শের কথা, যারা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধকে প্রভাবিত করেছিল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বাঙালী যোদ্ধাদের অবদান, ভারতীয় সেনাবাহীনীর সহায়তা, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সবকিছুই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে বইটিতে। এছাড়াও উল্লেখ করা হয়েছে যুদ্ধকালিন মুজিবনগর সরকার এবং প্রবাসি বাংলাদেশ সরকারের ভুমিকা। বাদ যায়নি যুদ্ধ পরবর্তি ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সাক্ষরিত হওয়া ‘সিমলা’ চুক্তিও। এর প্রত্যেকটি ঘটনাই আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জনাব এবনে গোলাম বইটিতে আরও তুলে ধরেছেন যুদ্ধ পরবর্তি গঠিত মুজিব সরকারের বিভিন্ন কর্মকান্ড, যার অন্যতম ছিল ‘বাকশাল’। অনেকেই বাকশালকে উল্লেখ করেন মেধাবী, সাহসী ও সংগ্রামী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ভুল রাজনীতির অংশ হিসেবে।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জনের পর লেখা হয়েছে অনেক বই, তুলে ধরা হয়েছে ইতিহাস। কেউ করেছেন মিথ্যাচার কেউ আবার করেছের অতিরঞ্জিত। কিন্তু আমরা তরুণেরা আমাদের মহান স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে কোনরুপ উপহাস চাই না। আমরা চাই মুক্তিযুদ্ধের সত্য ও নির্ভুল ইতিহাস তুলে ধরা হোক। আর সেই ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে এই বই গুলো হয়তো আমাদের কিছুটা সহায়তা করবে।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!