বর্ধমানের চিঠি – ০৬

Reading Time: 3 minutes

প্রায় একমাস হতে চললো বর্ধমান এসেছি। এই দীর্ঘ সময়ে ভারতীয় দক্ষিণবঙ্গের এই জেলা শহরটিতে নতুন অনেক কিছু সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়েছে। আমার জন্মস্থান বাংলার সাথে পশ্চিমবঙ্গের অনেক সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য অবলোকন করেছি। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি পর্বে কিছু বিষয় তুলে ধরেছি। আজ লিখব পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বাংলাদেশ নিয়ে কি ভাবেন।

 

গত মাসের এগারো তারিখ বর্ধমানে আসার পর থেকে আজ পর্যন্ত যতজন ‘ভারতীয় বাঙালির’ সাথে কথা হয়েছে, পরিচয় হয়েছে -প্রত্যেকেরই চোখেমুখে আমি দেখেছি বাংলাদেশ নিয়ে প্রচন্ড রকমের কৌতুহল। যেন তাঁদের এক প্রবল আগ্রহ যে, সীমান্তে কাঁটাতারের ওপারেও একই রকম দেখতে, একই রকম আবহাওয়া-সংস্কৃতির একটি সবুজ-শ্যামল ছোট্ট স্বাধীন দেশ আছে, যেটি পৃথিবীর বুকে ‘বাঙালি’ জাতিসত্তার একমাত্র রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব বহন করছে। যেখানকার বাঙালিরা সেই ঊনিশশো বায়ান্ন সালেই বাংলা ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে!

 

কিছু কথোপকথন তুলে দিচ্ছি। এখানে কিছু বানান এখানকার উচ্চারণে লিখেছি। কেউ আবার ভুল বানান ভাববেন না যেন!

(১)

হোস্টেলের ছাদে একদিন মন খারাপ করে পূর্বদিকের আকাশের দিকে চেয়ে আছি। এমন সময় এক দাদার আগমন।

 

-তুমি কোত্থেকে এসচ?

– জ্বি, বাংলাদেশ।

-তাই নাকি? বাংলাদেশ! বাংলাদেশের কোথায়?

– ময়মনসিংহ। আপনার বাড়ি কোথায়, দাদা?

-আমার? এইতো, বর্ধমানের পাছেই (পাশেই), জামালপুর।

– কি বলেন? জামালপুর? এটা তো আমার বাংলাদেশেও আছে!

-তাই? তোমার মাধ্যমিকে বোর্ড কোনটা ছিল? আর, উচ্চমাধ্যমিককে তোমরা কি যেন বল?

– ঢাকা বোর্ড, দাদা। এইচএসসি। হায়ার সেকন্ডারী সার্টিফিকেট।

– ওহ! তোমাদের কি কি সাব্জেক্ট ওখানে? বাংলা, ইতিহাস এগুলো আচে তো?

– জ্বি আছে।

– বলচি, তোমরা রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়েচ? তারপর জীবনানন্দ, সুকান্ত, মধুসূদন, ঈশ্বরচন্দ্র?

– কি বলেন দাদা? এগুলো পড়ব না? মানচিত্র ভাগ হয়েছে শুধু, বাংলা সাহিত্য তো আর ভাগ হয়নি! রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, সুকান্ত এঁরা যেমন আপনাদের, তেমনই আমাদেরও।

– তা অবছ্য ঠিক। তোমাদের দেশের কয়েকজন কবির নাম বল তো?

– জসীম উদদীন, শামসুর রাহমান ….. আচ্ছা, আপনি নজরুলকে চেনেন?

– কোন নজরুল বলচ?

– কাজী নজরুল ইসলাম, বর্ধমানের ছেলে, বাংলাদেশের জাতীয় কবি।

– ও হ্যাঁ, চিনতে পেরেচি। তোমরা কি কি ইতিহাস পড়েচ? পলাছীর যুদ্ধ, সিপাহী বিপ্লব, ছদেছী আন্দোলন এগুলো পড়েচ? মহাত্মা গান্ধী, ছুভাছ চন্দ্র এঁদের চেন?

– সাতচল্লিশের পূর্বের ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস তো একই দাদা! এগুলো সবই পড়েছি আমরা।

– তোমাদের ন্যাছনাল হিরো কে?

– আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের হিরো।

-ওহ্ হ্যাঁ, বঙ্গবন্ধুর নাম শুনেচি! ঠিক আচে। অনেক কথা বললাম। আসলে বাংলাদেশ ছম্পর্কে জানলাম।

-সমস্যা নেই, দাদা। বাংলাদেশে স্বাগতম। সময় পেলে বেড়াতে যাইয়েন।

 

(২)

রাতের বেলা পাশের রুমে গিয়েছি। দুই দাদা ল্যাপটপে নাটক দেখছেন। বাংলাদেশের বর্তমানের সেরা নাট্যাভিনেতা মোশাররফ করিমের “উচ্চ মাধ্যমিক সমাধান” নাটক চলছে। আমাকে দেখেই এক দাদা বলে ওঠলেন :

 

– এই, এদিকে এছো! তোমাদের বাংলাদেশের নাটক দেখছি। এর নাম যেন কি?

– জ্বি দাদা, মোশারফ করিম।

– ছেইরাম অভিনয় করে! আমি খুব পচন্দ করি।

– হ্যাঁ, আমাদের দেশের জনপ্রিয় অভিনেতা।

 

(৩)

কয়েকদিন আগে সন্ধায় দোতলার এক রুমে গিয়ে বসে আছি। রুমের এক দাদার বন্ধু আসলেন বাইরে থেকে। পরিচয় পর্বে বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনেই ওনি বললেন :

– বাংলাদেছের কোথায় তোমার বাড়ি?

– ময়মনসিংহ।

– ঢাকা থেকে কতক্ষণ লাগে?

– দুই/আড়াই ঘন্টা।

– ও। আমার এক মামার বাড়ি বাংলাদেছে।

– তাই? কোথায়?

– ঢাকার পাছে পাবনা বলে কোন এক জায়গা। আছলে আমি ছঠিক জানি না।

– ওহ, তাহলে এরপর ঠিকানা নিয়ে বাংলাদেশ থেকে ঘুরে আসবেন একবার।

 

(৪)

একদিন ক্লাসে ফ্রেন্ডদের সাথে বাংলাদেশ নিয়ে ভাইভা দিচ্ছি। আসলে সবাই যখন এত আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে, তখন আমার মনে হয় আমি আমার দেশকে রিপ্রেজেন্ট করছি। সুতরাং, দেশপ্রেমিক বাঙালির চেতনা তখন সদা জাগ্রত! বন্ধুদের কিছু প্রশ্ন ও আমার উত্তর :

 

– তোদের ওখানে হিন্দি মুভি চলে?

–  না, সিনেমা হলে হিন্দি মুভি চলে না। তবে, এখানকার চ্যানেলগুলোতে দেখায়।

– ভারতের চ্যানেল তোদের ওখানে চলে?

– হ্যাঁ, চলে তো।

– আচ্ছা, এই যে নতুন মুভি চলছে ‘বাদশা’। হিরোইনটাতো বাংলাদেশী? কি যেন নাম?

– নুসরাত ফারিয়া।

– মোস্তাফিজকে চিনিস?

– হ্যাঁ, চিনি। আমাদের দেশের স্টার, তাকে চিনব না?

– আর সাকিব, মুশফিক এদের? তামিম অনেক ভাল খেলোয়াড়।

– হ্যাঁ, সবাই ভাল খেলে। সাকিব তো বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার!

– সাকিবের একটা রেস্টুরেন্ট আছে না ঢাকায়? মোস্তাফিজের বাড়ি থেকে তোর বাড়ি কতদূর?

– হ্যাঁ, আছে। সাকিব’স ডাইন। অনেকদূর। তাঁর বাড়ি দক্ষিণবঙ্গে, আমার উত্তরবঙ্গে।

– তা, তোর এলাকার কোন ক্রিকেটার নেই?

– আছে তো! মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, আমার স্কুলের বড়ভাই!

– ওহ, সেই অলরাউন্ডারটা? গত বিশ্বকাপের সেরা পারফর্মার? কোন স্কুল?

– ময়মনসিংহ জিলা স্কুল।

– ও, আচ্ছা।

 

প্রথম ক্লাসে এক ফ্রেন্ড জিজ্ঞেস করলো, ময়মনসিংহে বিখ্যাত কে যেন একজন জন্মেছিলেন? আমার ঝটপট উত্তর, কে আবার? আমি!

 

এই হচ্ছে এখানকার বর্তমান প্রজন্মের বাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহ। আরও অনেক অনেক প্রশ্ন আর উত্তর, সব একদিনে লেখা সম্ভব না। এবার একটা দুঃখের কথা বলি, এখানে সবাই আমাকে ডাকে “কসার”, “কউসর” ইত্যাদি! অথচ, আমার নামের সঠিক উচ্চারণ : ক -এ আকার কা, হ্রস্ব উ, দন্ত্যস আকার, ব এ শূণ্য র — “কাউসার।” কেউ বুঝে না, কেউ ডাকে না!

আমার নাম যে কউসর! এ কী! আমিও তো ভুলে যাচ্ছি! 🙂 …চলবে…

 

—লেখক :

মোঃ মেহেদী কাউসার,

শিক্ষার্থী, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়।

০৮-০৮-২০১৬ ইং।

Spread the love

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!